৫২ ইঞ্চির ছাতি নয়
৩১শে জুলাইয়ের সকাল অব্দি সাড়ে ষোল
লাখ মানুষ আক্রান্ত। বিশ্ব পরিসংখ্যানের নিরিখে তৃতীয়। আর সাড়ে পঁয়ত্রিশ হাজার মৃত।
বিশ্ব পরিসংখ্যানে পঞ্চম। বাহ! আমরা কি সেদিন পাঁচ মিনিট ধরে থালা বাজাই নি? আমরা কি
সেদিন নয় মিনিট ধরে আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে করোনা তাড়াই নি? তবে? আর আমাদের হয়ে
যাঁরা গোমূত্র খেয়ে ও খাইয়ে দেশ সেবায় নিয়োজিত, তাঁদের সেই মূত্রশক্তি’র কি হলো তবে?
করোনাকে বশে আনা গেল না কেন? ওহো, ভুল হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। রামজন্মভুমিতে রামমন্দির নির্মাণ
শুরু হয় নি যে এখনো। এটাই তবে আসল কারণ। রামন্দির নির্মিত হয়ে গেলে। ভগবান রামচন্দর
তাঁর হনু বাহিনী নিয়ে নিশ্চয় করোনার করাল গ্রাস থেকে ভারতবর্ষের সকলেকে না হোক, ভক্তবৃন্দকে
নিশ্চয় রক্ষা করতেন। কি আর করা যাবে। তাঁর জন্যে লক্ষ কোটি টাকার মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ
না হলে, তারঁই বা করার কি আছে?
যেদিন কোটি
কোটি পরিযায়ী শ্রমিককে ট্রেনে বাসে চাপিয়ে, তাদের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমাদের।
সেদিন আমরা তাদের হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটিয়ে হাত তালি দিয়েছি। ঘন্টা নেড়ে পটকা ফাটিয়ে
বিজয় মিছিল বার করে হাঁক দিয়েছি। আসছে বছর আবার হবে বলে। যেদিন দেশ জুড়ে আরও বেশি করে
দ্রুততার সাথে করোনা পজিটিভদের চিহ্নিত করা ও তাদের দেখাশোনা চিকিৎসার সব দায়িত্ব ভার
নেওয়ার দরকার ছিল। সেদিন আমাদের বলা হয়েছিল রাত নয়টায় নয় মিনিট ধরে আলো নিভিয়ে প্রদীপ
জ্বালিয়ে করোনার সাথে মোকাবিলা করতে। আমরা সোটাই করেছি। আনন্দের সাথে পটকা ফাটিয়ে বাজি
পুড়িয়েই করেছি। যেদিন হাজার হাজার কোটি পিপিই তৈরী করে সব ডাক্তার স্বাস্থকর্মী পুলিশ
ব্যাংক কর্মী পরিবহন কর্মী দোকানদারদের কে বিনামূল্যে সরবরাহ করার দরকার ছিল, সেদিন
আমাদেরকে হাঁ করিয়ে আকাশ থেকে কোটি কোটি টাকার পুষ্প বৃষ্টি করা হয়েছিল। সবই করোনা
মোকাবিলায় একটি দেশের চমকপ্রদ লড়াই। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।
যে সময় বিজ্ঞানসম্মত
উপায়ে একদিকে লকডাউন ও অন্যদিকে অর্থনীতিকে সচল রাখার ভিতর কাম্য ভারসাম্য বজায় রাখার
দিকে নজর দেওয়ার দরকার ছিল, সেই সময় আমাদের নজর ঘুরিয়ে দেওয়া হলো গালওয়ানের দিকে। কফিন
বন্দী সৈনিকদের মৃতদেহ নিয়ে দেশভক্তির রাজনীতির চাকায় তেল দিতে। হ্যাঁ আমরা গোপাল বড়ো
সুবোধ বালকের মতোন সেটিও করলাম। সারাদিন ধরে সমস্বরে চিলচিৎকার জুড়ে দিয়ে চীন চীন করে
ভারতমাতার জয়ধ্বনি দিলাম। যেসময় বেসরকারী হাসপাতালগুলি সাময়িক ভাবে হলেও সরকারী ভাবে
অধিগ্রহণ করে সম্পূর্ণ নিখরচায় করোনা রুগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার প্রয়োজন ছিল।
সেসময় আমরা অনেকটা চুপিসাড়ে পড়ে পাওয়া চৌদ্দোআনা সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে কয়েকজন শিল্পপতির
স্বার্থরক্ষায় জলের দরে বেচে দেওয়ার পথ তৈরীতে ব্যস্ত থাকলাম। যেসময় ইউনিভার্সাল বেসিক
ইনকাম চালু করার দরকার, সে সময় আমরা হাজার হাজার টাকা অতিরিক্ত বেশি দামে কম দামী রাফায়েল
বিমান কিনে আস্ফালন শুরু করে দিলাম। দেখ নেবো এবার শত্রুদের।
নিত্য প্রয়োজনীয়
দ্রব্যের বাজারে আগুন। অধিকাংশ মানুষের হাতে টাকা নাই। কোটি কোটি মানুষের হাতে কাজ
নাই। কারখানার পর কারখানা বন্ধ। আর্থিক কর্মকাণ্ড টালমাটাল। ওষুধপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া।
হাসপাতালের পর হাসপাতালে রুগীর চিকিৎসা মুখ থুবড়ে পড়তে চলেছে। বেসরকারী হাসপাতালগুলি
রুগী ঠকানোর ব্যবসায় মুনাফার পাহাড় জমিয়ে ফেলছে মওকা বুঝে। দেশ জুড়ে করোনা সংক্রমণ
ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি কোণে। আর আমাদেরকে হিন্দুত্বের ক্লাসে বসিয়ে দেশভক্তি দেশপ্রেমের
পাঠ দেওয়া হচ্ছে প্রতিদিন। কখনো নিজামুদ্দিন। কখনো গালওয়ানে চীন। সিলেবাসের নিত্য নতুন
চ্যাপটারে আমাদের স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিকে নিরন্তর চ্যাপ্টা করে সাইজ করে দেওয়া হচ্ছে
পরিকল্পনা মাফিক। আর সাথে পোশাক দেখে মানুষ চিনে নেওয়ার ফর্মুলা তো আছেই। সেই ফর্মুলাতেই
অনুপ্রবেশকারী ধরতে দেশজুড়ে না হোক বাংলা জুড়ে এনপিআর এনআরসি হচ্ছে। হবেই। ১৯৪৮ সালের
১৯শে জুলাই রাত ১২টার আগের সরকারী দলিল দস্তাবেজে পূর্বপুরুষের নাম না থাকলেই আমরা
অনুপ্রবেশকারী।
অর্থাৎ ভারতবর্ষের
মূল সমস্যাগুলি তাহলে কি দাঁড়ালো? না এক, ১৯৪৮ সালের ১৯শে জুলাইয়ের রাত ১২টার পর থেকে
ঢোকা সব অনুপ্রবেপশকারী ও তাদের বংশধরদের ধরা ও ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক করা। দুই, মুসলিমদের
বংশবৃদ্ধির হাত থেকে ভারতের হিন্দুদের রক্ষা করা। তিন, পাকিস্তানের জঙ্গি কার্যকলাপ।
চার, চীনের আগ্রাসন। পাঁচ, সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠানের বিলগ্নীকরণ। ছয়, রামমন্দির নির্মাণ।
সাত, সব কয়টি রাজ্যে হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা ও আট, বহুজাতিক সংস্থাগুলির হাতে দেশের সম্পদ
তুলে দেওয়া। নয়, আমেরিকায় দ্বিতীয় বারের জন্য ট্রাম্প সাহেবকে জিতিয়ে আনা। দশ, ভারতকে
ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত করা। এবং সবসময় যুদ্ধজুজুকে বাঁচিয়ে রাখা। সত্যিই
এতগুলি সমস্যাকে সফল ভাবে বাস্তবায়িত করতে গেলে হাতে আর সময় থাকে? অন্য কোন বিষয়ে নজর
দেওয়ার?
না তাই আমরা
অন্য কোন বিষয়ের দিকে আর নজর দিতে রাজি নই। সবার আগে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
একশ তিরিশ কোটির দেশে কটা লোক করোনায় মরলেই দেশ রসাতলে যায় না। সেতো সব দেশেই মরছে।
এখনোতো মৃত্যুর পরিসংখ্যানে ভারতের সামনে ব্রিটেন মেস্কিকো ব্রাজিল ও আমেরিকা। কই সেসব
দেশের সরকারের বিরুদ্ধে কোন আওয়াজ উঠেছে? তবে ভারতের মাটিতেই বা উঠবে কেন? এই দেশবিরোধী
শক্তিগুলির আওয়াজ স্তব্ধ করে দিতে হবে। তাই রাত আটটায় যেদিন যেমন বলা হবে। সেগুলি যথাযথ
ভাবে পালন করে দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠার দিন এখন। এখন আর দেশের কথা ভাবলে চলবে না। দেশের
স্বার্থ দেখতে গেলে চলবে না। দেখতে হবে শাসকের স্বার্থ। ভাবতে হবে শাসকের কথা। শুনতে
হবে শাসকের নির্দেশ। সেটাই সাচ্চা দেশপ্রেমিকের কাজ। সেই দেশপ্রেমের রং যদি গেরুয়া
হয়, তবে সেটাকেই দেশের রং বলেই মেনে নিতে হবে মন থেকে।
মনে রাখতে
হবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতবর্ষ। সেই গণতন্ত্রে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার
গুরুত্বটা বুঝতে হবে। তার ভিতরে পুলওয়ামা বালাকোটের গন্ধ শুঁকতে গেলে চলবে না। সেটাও
কিন্তু বিবেচিত হবে দেশবিরোধী কার্যকলাপ হিসাবে। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠদের মন কি বাৎ মুখস্থ
করা দরকার রাত্রিদিন। নয়তো নিশিদিন দেশবিরোধী আইনে গারদের ওপারেও কাটাতে হতে পারে।
হ্যাঁ অনেকেই কাটাচ্ছে। সময় থাকতে তাঁরা কেউ মন কি বাৎ বুঝতে চায় নি। আজ তার মাশুল
দিতে হচ্ছে আয়ু গুণে গুণে।
না, সরকারের
সমালোচনার সময় এটা নয়। শাসকের তর্জনীর নিচে কান ধরে ওঠবোস করার সময় এটা। তাতে মনে অশান্তি
থাকলেও শরীর ভালো থাকে। নিয়মিত ব্যায়াম হয়। আর প্রতিদিনের অভ্যাসে মনও সমঝে আসে। একে
একে অনেক বুদ্ধিজীবীদেরই আসছে। শিখতে হবে তাদের দেখেই। কিভাবে শাসকের সুরে জনগণমন গাইতে
হয়। সেটাই তো সাচ্চা দেশপ্রেম। সুখের কথা ভারতবর্ষের অধিকাংশ শিক্ষিত জনগণই সে কথা
জানে। তাই তো সেদিন দেশ জুড়ে হাততালির লহরীতে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল কোটি কোটি পায়ের পদধ্বনির
কাৎরানির আওয়াজ। নয় মিনিট ধরে, গোটা দেশকে অন্ধকারে রাখার হাতে কলমে প্র্যাকটিসে হাত
পাকিয়ে ফেললাম আপামর দেশবাসী।
সেই অন্ধকারে
রেখেই আমাদের চালানো হচ্ছে ভেড়ার পালের মতোনই। করোনা চীন পাকিস্তান ইসলাম মুসোলমান
অনুপ্রবেশকারী। হিন্দুত্বের সামনে এতগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার শিডিউল প্রস্তুত।
আর সেই চ্যালেঞ্জ নিতে গেলে আমাদের রামমন্দির নির্মাণে ফাঁকি দিলে চলবে কেমন করে। মৃত্যুর
সংখ্যা দ্বিগুণ হোক। আক্রান্তের সংখ্যা চতুর্গুণ হোক। তাতে কিছু এসে যায় না। কথায় বলে
আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
আর আমরা ঠিক
সেই কাজেই ব্যস্ত এখন। তাই পথের মধ্যে এম্বুলেন্সে ওঠার চেষ্টা করতে করতে করোনা রুগীর
মৃত্যু ঘটে গেলেও আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই নি। সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতকে ছুঁতে যাবে
কে? আমাদের তো আর বাহান্ন ইঞ্চির ছাতি নয়।
৩১শে জুলাই’
২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

