ইসলাম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি



ইসলাম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি

সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যা মূলত খৃষ্টীয় সমাজ দ্বারা পরিচালিত ঐতিহাসিক ভাবেই একমাত্র ইসলামী সমাজকেই নিজের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছিল! ইউরোপের ইতিহাসই তার প্রমাণ! প্রথমদিকে ইসলাম খৃষ্টীয় সমাজের মতোই সামরিক শক্তির চর্চায় ধর্ম বিস্তারে জোর দিয়েছিল! যার পরিণতি ক্রুসেড! যদি না আমার ইতিহাস বোধ অসার হয়ে গিয়ে থাকে, এর পর থেকেই ইউরোপের খৃষ্টীয় সমাজ বাইবেল কেন্দ্রিক শিক্ষা ও চার্চ কেন্দ্রিক সমাজ জীবন থেকে দিনে দিনে বেরিয়ে এসে ধর্ম নিরপেক্ষ জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার উপর বেশি জোর দিতে থাকে! যদিও রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদের চর্চায় প্রয়োজন মতো ধর্মকে হাতিয়ার করা বন্ধ করে নি কখনো! অপর দিকে ইসলামী সমাজ ধর্ম নিরপেক্ষ জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার বদলে সমাজের সকল স্তরে কোরান কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার পত্তন ও ধর্মগ্রন্থ কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করে! এই দুই সমাজ ব্যবস্থায় খৃষ্টীয় সমাজ যত দ্রুত জ্ঞানবিজ্ঞানে উন্নত হতে থাকল, ইসলামী সমাজ ঠিক তত দ্রুতই মধ্যযুগীয় মানসিকতায় পড়ে থেকে, ক্রমশই সকল বিভাগে হীনবল হয়ে পড়ল! তাই পরবর্তীতে আর কোনো ক্রুসেড দেখতে হল না ইতিহাসকে! বদলে শক্তিমান খৃষ্টীয় সমাজের হাতে দূর্বল ও হীনবল ইসালামী সমাজ সর্বক্ষেত্রে পিছু হঠতে থাকল! আর এরই মধ্যে আধুনিক যুগে মধ্য প্রাচ্যে যখন মাটির তলায় তেলের সাগর আবিষ্কার হলো, (যে আবিষ্কার কোনো ধর্মগ্রন্থ করতে পারে না! ধর্ম নিরপেক্ষ জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চাই করতে পারে শুধু) ; সেই তেল মাটির উপরে তোলা ও তার লাভজনক ব্যবহার করার মতো বিজ্ঞান শুধু মাত্র ঐ খৃষ্টীয় সমাজেরই করায়ত্ত হওয়ায় কপাল পুড়ল আবিশ্ব গোটা ইসলামী সমাজেরই! আজকের সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মূল শিকর এইখানেই!

খৃষ্টীয় সমাজ বিশেষত অ্যাংলো স্যাকশান জাতি, ইতিহাসকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বরাবর! আর তার সুফলেই তাদের সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ড সফল হয়েছে খুব দ্রুত! আমরা বাঙালিরা এই সহজ সত্যটি আজও অনুধাবন করতে পারিনি! আজকের ইংল্যাণ্ড আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী খৃষ্টীয় শক্তি ইতিহাসের থেকেই শিক্ষা নিয়ে জানে যে ইসলামী সমাজকে যতবেশি করে ধর্মগ্রন্থ মুখী ও আল্লা নির্ভর করে রাখা যাবে তত বেশি আবিশ্ব মুসলিমদের পদানত রেখে তাদের ওপর ছড়ি ঘোড়ানো সহজ হবে! এটা ইতিহাসেরই শিক্ষা! আর ঠিক এই কারণেই এই অপশক্তি নানান ফিকিরে ইসলামী সমাজকে সাম্প্রদায়িক ধর্মচর্চার দিকে বেশি করে ঠেলে দেওয়ার নানান পরিকল্পনা করে থাকে! আজকের বিশ্বরাজনীতির অ আ ক খ বুঝতে হলে এই সত্যটি আগে বুঝতে হবে!

এই ইঙ্গ-মার্কিণ খৃষ্টীয় অপশক্তিই নানান ছদ্মবেশে আবিশ্ব ইসলাম চর্চায় সবচেয়ে বেশি মদত দেয়! এরাই নানান প্রক্রিয়ায় মুসলিমদের অপমানিত করে আরও বেশি করে তাদেরকে ইসলামের কাছে মানসিক ও আত্মিক আশ্রয় নিতে ঠেলে দেয়! কারণ সেটা সফল হলেই ইসলামী সমাজ যত আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় কম সময় দেবে, ততই তারা হীনবল হয়ে পড়ে থাকবে! যার ডাইরেক্ট এফেক্টে, আবিশ্ব মুসলীমদেরকে জীবনের সব বিষয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপর পরনির্ভর করে রাখবে! এটাই নয়া সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা!

এক দিকে ইসলামী সমাজকে ধর্মগ্রন্থমুখী করে ব্যস্ত করে রেখে হীনবল করে রাখা, আর একদিকে ইসলামের নামে কুৎসা রটিয়ে কোটি কোটি কর্মহীন শক্তিহীন যুবসম্প্রদায়কে জেহাদী বানিয়ে, ধীরে ধীরে অস্ত্র ও সন্ত্রাসের ট্রেনিং দিয়ে সন্ত্রাসী বানিয়ে তুলে আবিশ্ব ইসলামকে খাটো করে তোলার অপচেষ্টা। এই দুই ভাবেই এই ইঙ্গ-মার্কীণ খৃষ্টিয় অপশক্তি কাজ করে চলেছে! আর আমরা ২৫০ বছরের পরাধীন বাঙালিরা সেই শক্তিরই ভাষা শিখে তাদেরই শেখানো বুলি আউরিয়ে সব কিছুর চটজলদী বিচার করে ফেলি! ইতিহাস-অন্ধ জাতি কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না! পারবেও না কোনোদিন!

এটাই আরও একটি বড়ো লজ্জা যে, যে মধ্য প্রাচ্যের তেলে আধুনিক বিশ্বের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ঠিক হয়, সেই তেল নিজের দেশেরই মাটির উপর থেকে তোলার জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তিগত শক্তি নেই ইসলামী দুনীয়ার! আজকের পরিণতিই তো তাই স্বাভাবিক! ধর্মের সবকটা অক্ষর জানলেও এক ফোঁটা তেলও মাটির উপরে তোলা যাবে না নিজের শক্তিতে! তাই কোথায় ও কেন এই ইসলামী দুনিয়া সাম্রাজ্যবাদী খৃষ্টীয় শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হয়ে গেল, সেই সত্যকে আজ জানতে হবে ইসলামী সমাজকে! মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, যে যে ইসলামী দেশে ধর্মীয় গোঁড়ামীর চর্চার বদলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল যত বেশি, সেই সেই দেশগুলির উপরেই ইঙ্গ-মার্কীন অপশক্তির বিদ্ধংসী তাণ্ডব লীলা চলেছে সবচেয়ে বেশি! আজকের সিরিয়া জর্ডন লেবানন ইরাক লিবিয়া এমন কি সোভিয়েত আমলের অফগানিস্তানও ধর্মীয় গোঁড়ামীর চর্চার থেকে মুক্তির পথে হাঁটছিল! আজ তারই মূল্য চোকাতে হচ্ছে দেশটাকে কি বীভ(স ভাবেই না!

ওদিকে সৌদী আরব! না আছে গণতন্ত্র, না আছে আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার কোনো পরিকাঠামো! গোটা দেশটাকে ইঙ্গ-মার্কীণ শক্তির পকেটে বিক্রী করে দিয়ে আজও সেখানে কেমন সুন্দর রাজতন্ত্র টিকে আছে সগর্বে! তাই সেখানে সাম্রাজ্যবাদের মিসাইল আছড়ে পড়ে না গনতন্ত্র আনার মহান ব্রত নিয়ে!

কিন্তু আমাদের বাংলার মাটির তলায় তেল নেই। আমাদের সমস্যার ধরণ আলাদা! আমাদের দূর্বলতম জায়গা হচ্ছে সেই ধর্মীয় গোঁড়ামী, সেই সার্বিক অশিক্ষা! আর সমাজের সকল স্তরের মাথায় বসে থাকা ইঙ্গ-মার্কীণ দালালদের চক্র! এই চক্রব্যূহ থেকে দেশকে মুক্ত করার দীক্ষাই প্রকৃত মুক্তমন ও মুক্তচিন্তার পরিচয়! কোন ধর্মের কোন মুরুব্বী রাতে কজনের সাথে সহবাস করতেন, সেই কুটতর্ক করে মানুষের ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করা যায় না। বরং ধর্মভীরূকে আরও বেশি করে ধর্মীয় গোঁড়ামীর দিকে ঠেলে দিয়েই ইঙ্গ-মার্কীণ খৃষ্টীয় সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির কাজকে সহজ করে দেওয়া হয়! এই সরল সত্যটিকে আজ স্পষ্ট করে বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে! এই অপশক্তি একদিকে ইসলামের নিন্দে করবে ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করার নামে, অন্যদিকে কোটি কোটি মাদ্রাসাকে পুষ্ট করে তুলে জেহাদী বানানোর তলায় তলায় অস্ত্র সরবরাহ ও সন্ত্রাসের ট্রেনিং দিয়ে সারা বিশ্বে ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সমার্থক করে তোলার জন্যে সর্বদা স্বচেষ্ট থাকবে! আমরা আর কতদিন কতভাবে এই ফাঁদে পা দেব?

কোরাণের মধ্যে যে বিশেষ জ্ঞান সংহত হয়ে আছে, এবিষয়ে সংশয়ের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু কোনো জাতি বা সমাজ যখন সামগ্রিক ভাবে কোন বিশেষ ধর্মগ্রন্থকে পূজো বা আরাধনা করতে থাকে, প্রশ্নহীন আনুগত্যে অন্ধের মতো অনুসরণ করতে থাকে, তখন সেই জাতি বা সমাজ বিশ্বের অপরাপর জাতির কাছে যুগ পরম্পরায় পিছু হটতে বাধ্য। এটাই ইতিহাসের অন্যতম বড়ো শিক্ষা!

আমার নিজের একবর্ণও কোরাণ বাইবেল বেদ পুরাণ ত্রিপিটক গ্রণ্থসাহেবের জ্ঞান নাই। উপনিষদ যদিও কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, তবু যেটুকু পড়েছি, তাতে মনে করি সকল চিন্তাশীল মানুষেরই উপনিষদ পড়া জরুরি। যে রবীন্দ্রসংগীত আপামর বাঙালির এত আপন, সেই রবীন্দ্রসঙ্গীত উপনিষদ ভাবনারই আাধুনিক প্রকাশ। কিন্তু এমন শাশ্বত জ্ঞান ভাণ্ডারকেও অন্ধআনুগত্যে অনুসরণ করলে, উপনিষদের উদ্দেশ্যই মাটি। উপনিষদের অন্যতম প্রধান শিক্ষাই হল নিরন্তর প্রশ্ন করার মানসিক বল তৈরী করা। কবিগুরুও যদি তা না করে উপনিষদকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে মেনে নিয়ে অন্ধভাবে অনুসরণ করতেন, তাহলে সংস্কৃত পণ্ডিত হতেন ও তাঁদের মতন সংস্কৃত শ্লোক আুউড়িয়ে উপনিষদের বাণীগুলই মুখস্ত করাতেন। একটাও বরীন্দ্রসংগীত সৃষ্টি করতে পারতেন না। বা খৃষ্টিয় সমাজও যদি বাইবেলকে সমস্ত প্রশ্নের শেষ উত্তর ধরে নিয়ে বইবেল আঁকড়েই বসে থাকত, তবে আবিশ্ব জয় করতে পারতো না। বাঙালির ইতিহাসে এই পরম সত্যটি সর্বপ্রথম বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভারতীয় সভ্যতার হীনবল হয়ে পড়ার কারণ হিসেবে ঠিক এইটিকেই তিনি হাইলাইট করেছিলেন। পুরানো দিনের অর্জিত। শাশ্বত জ্ঞানও যখন অন্ধআনুগত্যে নিয়মতান্ত্রিক পুনরাবর্ত্তনের আবর্তে আচার বিচার সর্বস্ব হয়ে শাস্ত্রবচন হয়ে যায়, তখন সেই শাশ্বত জ্ঞানভাণ্ডারও মানুষের কাছে আর নতুন করে অর্থবহ হয়ে ওঠে না। কোনো নতুন পথের সন্ধান দিতে পারে না। ইতিহাসের এই বড়ো শিক্ষাটি কবি সকলের আগে অনুধাবন করেছিলেন। ঠিক এই কারণে আমার বক্তব্য, ধর্মগ্রন্থের ভালোটুকুকে নিজের জীবন সাধনায় কাজে লাগাতে গেলে, সবার আগে তাকে ধর্মের নাগপাশ থেকে মুক্ত করে, ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তচিন্তার আলোতে অনুধাবন করতে হবে। সে বড়ো কঠিন কাজ। তোমার মতো দুই একজন বিদগ্ধ মানুষ ছাড়া সকলের পক্ষে তা সম্ভব নয়। আর নয় বলেই ইউরোপ ধর্মচর্চার থেকেও কর্মচর্চা ও বিজ্ঞান চর্চার উপরেই বেশি জোর দিয়ে ছিল। যে কোনো জাতির পক্ষেই এর কোনো বিকল্প নেই।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষীত