১৪ই আগস্টের শপথ



১৪ই আগস্টের শপথ

হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।

এক এক সময় সত্যিই মনে হয়, মানুষটি কি ঘোরের মধ্যে থাকতেন? স্বকল্পিত এক কাল্পনিক জগতেই কি বিরাজ করতো না তাঁর চিন্তাচেতনার দিগন্ত? না হলে একটা গোটা জাতিই যখন মনে করে হিন্দু মুসলিম এমনই দুইটি সম্প্রদায় যাদের মধ্যে তেলে জলে না মেলার মতোই মিলন সম্ভব নয়। উচিতও নয়। সেখানে এই মানুষটি বলতে বলছেন সন্তান মোর মা’র? কই সে কথা, আবৃত্তির আলোকিত মঞ্চে লক্ষকোটি বার গলার কারুকাজে উচ্চারণ করেও তো আমরা কেউই মনে করি না কখনো। আপনি করেন নাকি? বিশ্বাস করেন নাকি হিন্দু বাঙালি মুসলিম বাঙালি একই মায়ের সন্তান? একই জাতির অংশ? একটিই তার স্বদেশ?

কম বেশি প্রায় পঁচিশ কোটি বাঙালির কেউই কি কাজী নজরুল ইসলামের মতো এই একই কথা বিশ্বাস করে চেতনার অন্তঃগূঢ় প্রদেশ থেকে? নিশ্চয়ই নয়। করলে এই বাংলার ইতিহাস লেখা হতো অন্যরকম ভাবে। তাহলে একটা গোটা জাতিই যখন সে কথা বিশ্বাস করেই না, তখন কবির বিশ্বাসেই বা কি এসে যায়? পাগলে কি না বলে, তাই না? আমরা পাগল বলি কাকে? না, চারপাশের জীবন বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন সকল্পিত কাল্পনিক এক জগতে যে বসবাস করে তাকেই। তাহলে তেলে জলে না মেশার মতো পরস্পর ভিন্ন প্রকৃতির দুটি সম্প্রদায়কে গোটা জাতিই যখন এক মায়ের সন্তান বলে মনে করে না, তখন সেই কথা যিনি অন্তর্দীপ্ত চেতনার গভীরতম প্রত্যয় থেকেই মনে করেন তখন তো তিনি তাঁর চারপাশের বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন এক স্বকল্পিত কাল্পনিক জগতের একমাত্র নাগরিক, তাই নয় কি? অর্থাৎ চলতি কথায় পাগল।

হ্যাঁ তাই পাগলে কিনা বলে মনে করেই আমরা পঁচিশকোটি বাঙালি কেউই তাঁর কথাকে গুরুত্ব দিই নি কোনদিন। দিইও না। কোনভাবেই। কেননা আমরা সবাই সুস্থ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তাচেতনার অধিশ্বর! আমরা জানি তেলে জলে মেশে না কোনদিন। আমরা বাঙালি হিন্দু হলে জানি, ওরা বাঙালি মুসলিমরা বিদেশী। বেজাত। ভিন্ন ওদের সংস্কৃতি। বর্ণমালা এক হলেই ভাষা কিন্তু এক হয় না। তাই আমাদের জল ওদের পানি। আমরা চান করি। ওরা করে গোসল। আমরা শশ্মানে পুড়লে ওরা কবরে পচে। ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার আমরা বাঙালি মুসলিম হলে জানি ওরা হিন্দু কাফের। ওরা আল্লাতালহের সন্তান নয়। ওরা অবিশ্বাসী। তাই নাস্তিক। ওরা কিনা মূর্তি পূজা করে। পানিকে বলে জল। আমাদের ভাষা থেকে ওদের পরিভাষাগুলো ছেঁটে ফেলা দরকার। চিরদিন আমাদের দাবিয়ে রেখে দিয়েছিল। আর ওদের মাথায় চড়তে দেওয়া নয় কোনদিন। আমাদের সংস্কৃতির উপর ওদের কোন প্রভাব পড়তে দেওয়া উচিৎ নয়। আমাদের স্কুলের সিলেবাস থাকে ওদের সব লেখা দূর করে দিতে হবে। না হলে আমাদের শিশু কিশোররা বিপথে চলে যাবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমরা এই রকম করেই ভাবি। ভাবাই। বিশ্বাস করি। করিয়ে থাকি। কারণ আমরা সকলেই সুস্থ সবল ও স্বাভাবিক। আমরা কবি সাহিত্যিকদের মতো অবাস্তব জগতের বাসিন্দা নই। নই বলেই বাংলাভাগের ঐতিহাস গুরত্বকে আমরাই সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। পেরেছি বলেই ১৪ই আগস্ট আমাদের কাছে কোন শোকের দিন নয়। বরং জয়ের দিন। বাঙালি হিন্দুর আবেগে নিজেদের হিন্দুত্বকে ইসলামের ছায়া থেকে মুক্ত করার দিন। আবার বাঙালি মুসলিমের আবেগে হাজার বছরের হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্তির দিন। তাই উল্লাস করো। আজ ১৪ই আগস্ট। ১৯৪৭-এর এই দিনেই বাংলা ভাগ হয়েছিল। জয় হোক বাংলা ভাগের। জয় হোক কাঁটাতারের। এপারে আমার স্বদেশ। ওপারটা বিদেশ।

বিদেশীদের সাথে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু কোনরকম আত্মিক সম্পর্ক থাকে না। বরং বিদেশীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ষোলআনা। আর হিন্দু মুসলিম হলে তো যুদ্ধ বাঁধবেই। তাই সৈন্যসামান্ত বাড়াও। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করো। সবসময় নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে যাও। এটাই রণনীতি। কাঁটাতারের দুইপারের। এবং অনুপ্রবেশ আটকাও। অনুপ্রবেশকারী মানেই আমাদের শত্রু। গুপ্তচর। সন্ত্রাসবাদী। আমাদের অর্থনীতির পক্ষেও ক্ষতিকর। তা সে যতই বাংলায় কথা বলুক না কেন। সে বিধর্মী তো বটেই। কাঁটাতার ডিঙিয়েই তো ঢুকেছে। নিয়ম ভেঙ্গে। হ্যাঁ এই নিয়মটাই আসল। আমাদের মধ্যে যতই বিভেদ থাকুক, এই নিয়মটা কিন্তু এক। বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলিম দুইই এই নিয়মের বেলায় সহমত। কাঁটাতার ডিঙিয়ে ঢোকা যাবে না। আর এই কাঁটাতার সবখানেই। সাম্প্রদায়িক কাঁটাতার। রাজনৈতিক কাঁটাতার। সাংস্কৃতিক কাঁটাতার। ধর্মের কাঁটাতার। মননের কাঁটাতার। পারস্পরিক মিলনের কাঁটাতার। নিঃশ্ছিদ্র করো। কোন রকম ফাঁক যেন না থাকে। তাহলেই সর্বনাশ।

কাজী নজরুল ইসলামের স্বদেশ স্বজাতি আজ আর কোথাও নাই কেউ নাই। পাগলে কি না বলে। পাগলদের নিয়ে তো আর স্বদেশ হয় না। পাগলাগারদ হয়। পাগল নিয়ে তো স্বজাতিও হয় না। পাগলের পাল হতে পারে। না আমরা কেউই পাগল নই। আমরা বাঙালি হিন্দু। বাঙালি মুসলিম। ভারতীয় বাঙালি। বাংলাদেশী বাঙালি। ভারতীয় সংখ্যালঘু। বাংলাদেশী সংখ্যালঘু। আমরা কেউই বাঙালি নই। পাগল নই তাই। তাই বাংলা আমাদের স্বদেশ নয়। কারুর স্বদেশ ভারত। কারুর স্বদেশ বাংলাদেশ। বাংলা ও বাঙালি তাই অস্তিত্বহীন। বরং সত্য কাঁটাতার। সত্য ১৪ই আগস্ট। উদযাপন করা হোক বাংলাভাগের। আজ তো শোকদিবস নয়। তাই আজ উৎসব। উৎসব বিভেদের। উৎসব বিচ্ছেদের। উৎসব বিদ্বেষের।

কবি যত বড়োই পাগলই হন না কেন, ভেবেছিলেন আমাদের সকলকেও তাঁরই মতো পাগলাগারদের বাসিন্দা করে নেবেন তাই হয় না কি? একজন কবির কলমের কতটুকু শক্তি? কজন আমল দেয় কবিদের? সাহিত্যিকদের? তিনি বললেই আমরা বিশ্বাস করে নেবো, ‘সন্তান মোর মা’র’? এতই সোজা না কি কবি? আমরা কি জানি না ওরা মুসলিম। ওরা হিন্দু। আমরা হিন্দু। আমরা মুসলিম। কি করে ওরা আমারা একই মায়ের সন্তান হবো? ওরা বিজাতি। আমার স্বজাতিও নয়। স্বদেশীও নয়। কোনদিন ছিলও না। কোনদিন হবেও না। তা সে ইতিহাস যাই বলুক না কেন। তাই আমাদের আর ওদের মধ্যে চিরকাল বিভেদ ছিল। বিচ্ছেদ ছিল। বিদ্বেষ থাকবেই। আমরা কেউই কবির মতো পাগল নই। আমরা সুস্থ। স্বাভাবিক। বাস্তবের মাটিতে পা রেখে চলি। চলতে পছন্দ করি। চলবো। তাঁর কবিত্বের ছন্দে তাঁর পাগলামিকে প্রশ্রয় দিলে আমাদের চলবে না। ওদেরও চলবে না। এটাই অনুধাবন করতে পারেন নি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু আমরা পেরেছি। পেরেছি বলেই আমরা আদায় করে নিয়েছি একটা ১৪ই আগস্ট। ১৪ই আগস্টের মতো বিভেদকামী বিচ্ছেদকারী বিদ্বেষী একটি ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি আমরা শেষ অব্দি। এই অর্জনই আপামর বাঙালির সবচেয়ে সেরা অর্জন। সেই অর্জনকে কোনভাবেই আর নষ্ট হতে দিতে পারি না আমরা। সেই অর্জনকে যিনিই বিসর্জন দিতে উস্কাবেন, তাঁকেই বর্জন করবো আমরা। সে তিনি কাজী নজরুল ইসলামই হোন বা অন্য যে কেউই হন না কেন।


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত