ধর্ষক ধর্মগুরু ও আমরা



ধর্ষক ধর্মগুরু ও আমরা

ঈশ্বরভক্তিই কি তবে সব সমস্যার মূল? না না অনেকেই রে রে করে উঠতে পারেন এই বলে যে এটাই তো নাস্তিকদের অপপ্রচার। এখন বিষয়গুলি বড়োই গোলমেলে। কে প্রকৃত নাস্তিক আর কে প্রকৃত আস্তিক কে বলে দেবে। ভারতবর্ষ ঈশ্বরভক্তের দেশ। ভারতবর্ষ নিয়তিবাদের দেশ। ভারতবর্ষ ধর্মগুরুদেরও দেশ। আবার এখানেও গণ্ডগোল। গৌতমবুদ্ধ শঙ্করাচার্য্য শ্রীচৈতন্য রামকৃষ্ণদেব এঁরাই কি ধর্মগুরু? নাকি, বাবা রামরহিম আশারাম বাপু রামপাল এঁরাই ধর্মগুরু? কি মুশকিল এটাও আবার একটা বিতর্কের বিষয় হলো না কি, প্রশ্ন তুলবেন অনেকেই। কিন্তু আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে, কোটি কোটি ভারতবাসীর ধর্মবোধ ঈশ্বরভক্তি কিন্তু এই সব জেলেবন্দী ধর্মগুরু বাবাজীদেরকেই স্বয়ং ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি মনে করে এদেরকেই গুরুর আসনে বসিয়ে রেখেছে। এবং এদের সকল কথা ও কাজকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে এসেছে। এই ভক্তদের অধিকাংশের বিশ্বাসে এখনো এরা নির্দোষ। সমস্যা হলো এই অন্ধবিশ্বাস এই ঈশ্বরভক্তিই। আবার এই যে ধর্মগুরু বাবাজীরা, যাদের পেশাই হলো লোক ঠকানো, এবং নানান রকমের অপকর্ম করে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি গড়ে তোলা; নিয়তিবাদ থেকে ঈশ্বরভক্তি, আস্তিকতা থেকে ধর্ম সবই কিন্তু এদের নিজেদের বিশ্বাসে অর্থহীন। অনেকটাই ঠিক নাস্তিকদের মতোই। একটাই তফাৎ, নাস্তিকরা লোক ঠকায় না। কিন্তু লোক ঠকানোটাই এইসব বাবাজীদের পেশা। কিন্তু এরাও আসলেই নাস্তিক। কারণ ঈশ্বরতত্বের ফাঁকিবাজিটা এরাও খুব ভালো করেই জানেন।

আর এইটাই আসল ভারতবর্ষ। সাধারণ জানগণকে ঈশ্বরভক্তির জালে ফাঁসিয়ে সম্পদ ক্ষমতা প্রতিপত্তির রামরাজত্ব গোড়ে তোলার এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না নাকো তুমি। এরই সাথে যখন যোগ হয়ে যায়, রাজনীতিবিদদের ভোটে জেতার কৌশল, তখন তো সোনায় সোহাগা! এক একটি বাবাজীকে ধরতে পারলেই কয়েক কোটি মানুষের ভোট হাতের মুঠোয়। আর তাই দেশের নেতামন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীরা পর্যন্ত এইসব বাবাজীদের কথায় ওঠবোস করে। যতবেশি ওঠ বস করে তত বেশি বাবাজীরা ফুলেফেঁপে ওঠে। আর তত বেশি ভক্তের সংখ্যা যায় বেড়ে। এবং ততবেশি ভোট হাতের মুঠোয় চলে আসে ভারতবর্ষের রাজনীতিবিদদেরই। এটাই ভারতবর্ষ। তাই ধর্ম আর রাজনীতি এখানে পাশাপাশি চলে। নেতা মন্ত্রী আর ধর্মগুরুরা এখানে পাশাপাশি হাঁটে। আর বোকা বেকুব জনগণ ভক্তিতে গড়াগড়ি খায়।

আপনি ভাবছেন, সে তো সবাই জানে, এ আর নতুন কথা কি? এতো ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যই। আগে দেশের  রাজারা মুনিঋষিদের পাদদক খেয়ে রাজকার্য পরিচালনা করতেন, এখন নেতা মন্ত্রী আমলারা ধর্মগুরু বাবাজীদের আশীর্বাদ নিয়ে ভোটে নামেন। এবং সেই খবর যখন খবরের কাগজে ঢালাও করে প্রচার করা হয়, তখন আপনিও হয়তো আপনার ভোটটা ঠিক করে নেন। অনেকেই ভাবতে পারেন, এইসব বাবাজীদেরকে ভগবান মনে করে কারা? আমার আপনার মতো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙানো ইংরাজী জানা শিক্ষিত নাগরিক সমাজ? না কি সাধারণ খেটে খাওয়া দিন আনি দিন খাওয়া অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত ভারতীয় জনসমাজ? এইসব বাবাজীদের আখড়ায় নাম লেখালে কিন্তু ছবিটা পরিস্কার হয়ে যেতে পারে। তখন চোখ কপালে তুলে দেখতে পারেন, কে নাই সেখানে!

বড়ো বিস্ময় লাগে বলে ছিলেন কবি। সত্যই বিস্ময় লাগে এইভেবে যে, আমাদের দেশে শিক্ষার যে মানদণ্ডকে আমরা দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, তার ণত্বষত্ব অনুধাবন করলে। তাই কি অশিক্ষিত কি অর্ধশিক্ষিত কি ডিগ্রীধারী ঈশ্বরভক্তির জালে ফেঁসে যেতে সকলেই সমান দক্ষ। এটাই ভারতবর্ষ। যুক্তির থেকে আবেগ, অধ্যাবসয় থেকে ফাঁকিবাজী, মূল্যবোধ থেকে অন্ধবিশ্বাসের মূল্য এই উপমহাদেশে অনেক বেশি। এটাই হয়তো এই অঞ্চলের নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট। আর সেটাই ঈশ্বরভক্তির মূলধন। সেই মূলধনকে যে যতবেশি ঠিকঠাক ভাঙিয়ে নিতে পারবে, সেই তত বড়ো বাবাজী থেকে তত সফল রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারবে। হ্যাঁ আপনি অবশ্যই বলতে পারেন, সকল বাবাজীই ভণ্ড নয়। সব রাজনীতিবিদই ভণ্ড নয়। ঠিক। কিন্তু ঠগ বাছতে গেলে কিন্তু গাঁ উজার হয়ে গেলেও বিস্ময়ের কিছুই থাকবে না। আর সেই কারণেই এইসব বাবাজী আর রাজনীতিবিদদের এত বেশি মাখামাখি। হাতধরাধরি। দুজন দুজনের জন্যে।

তবু তো ঠকবাবাজীরা আইনের চৌকাঠে ধরা পড়ে যাচ্ছেন। রাজনীতিবিদরাও তাদের বাঁচাতে পারছেন কই? অবশ্যই এটা আশার কথা। আপনি নিশ্চিন্ত হতেই পারেন। কিন্তু সেখানেও সেই ভোট বড়ো বালাই। কোন না কোন ভাবে আইনের চোখে এক্সপোজ্ড হওয়া বাবাজীরাই আবার বৃহত্তর জনগণের ভোটের কাছে মস্তবড়ো রিক্স। সেই রিক্সটা কোন রাজনীতিবিদই নিতে চাইবেন না আন্তিম পর্বে। তাই আইনকে সবরকম ভাবে বাঁকানোর চেষ্টা করে বিফল হলেই ধর্মগুরুদের কাঁধ থেকে নামিয়ে ফেলেন মসনদে আসীন হেভিওয়েট নেতা মন্ত্রীরাই। সেই ভোটেরই গরজে। কারণ গণতন্ত্রে বিরোধী পক্ষেরও একটা ভুমিকা থাকে। নির্বাচনে বিরোধী পক্ষের হাতে তুরুপের তাস উঠিয়ে দিতে চাইবেন না কেউই। এটাই ভারতবর্ষের সেফ্টিভালভ।

আর সেই সেফ্টিভালভেই চেকমেট হয়ে যেতে হল রামরহিম আশারাম বাপুদের। রামপালের পালা হয়তো এর পরই। আপনিও নিশ্চিন্ত। ভারতবর্ষের আইন ও গণতন্ত্রের শক্তি ও কার্যকরিতায় স্থির বিশ্বাস রেখে। এটাই যদি পুরোচিত্র হয়, তবে অবশ্যই সেটা আশার কথা। কিন্তু এই বিরাট ভারতবর্ষে আরও কত রামরাহিম আশারাম রামপালের পাল হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিদিন সে হিসাব কে রাখছে। কজনই বা আর আইনের হাতে ধরা পড়ছে? যারা এখনো পড়েনি, ভাবতেই পারেন আপনি, অচিরেই পড়বে। কিন্তু সেটাও আশার কথা। বিশ্বাসের কথা। বাস্তবতা তার অনেক দূরবর্তী। আমি আপনি যত নিশ্চিন্তেই থাকি না কেন।

এবার একটু ঐ ঈশ্বরভক্তি ছেড়ে বাবাজীদের ধরা পড়ার কারণটুকুর দিকেই দৃষ্টিপাত করা যাক বরং। রামরহিম আশারাম দুই বাবাজীই ধর্ষণের দায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। অর্থাৎ এদের মূল অপরাধ ধর্ষেণের আওতায় সীমাবদ্ধ। এর বাইরে এঁরা আর কোন অপরাধে অভিযুক্ত হন নি। অবশ্যই ধর্ষণ একটি চুড়ান্ত অপরাধ। কিন্তু এইসব বাবাজীদের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির হিসাব কে নেবে? ভারতীয় আইনে এইসব বাবাজীদের আয়ের উপর কোন কর বসে না। কারণ এদের পেশাই হলো ধর্ম। আর এইসব অসৎ বাবাজীদের সমস্ত সম্পত্তিই সাধুপথে গড়ে উঠেছে ভাবার কোন কারন নাই নিশ্চয়ই। অথচ এঁরা ধরা পড়ার পরেও এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান কি, সেই বিষয়ে কিন্তু আমরা অন্ধকারেই। এইরকম লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার সম্পত্তির উপরেই ভারতবর্ষের ধর্মব্যবসা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই দেশের কোন রাজনৈতিক দলই এই বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। তাই রাষ্ট্রীয়স্তরে সরকারী ভাবে এইসব সম্পত্তির পোষকতা দেওয়ার বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দলেরই নীতি একরকম। ভোট বড়ো বালাই। কিন্তু আমরা, আমরাই বা কি করছি? ঘরে খিল দিয়ে টিভিতে খবর দেখা ছাড়া?

আবার ধর্ম আর ধর্ষণ যেন পাশাপাশি অবস্থান করে। ধর্মব্যবসার পড়তে পড়তে জড়িয়ে থাকে ধর্ষণ। ধর্মব্যবসা গোড়ে তোলে ক্ষমতা। আর ক্ষমতার সাথে লালসার সহবাস। ভারতীয় ঐতিহ্যে ধর্ম গুরুবাদ আর ধর্ষণ ওতপ্রোতো ভাবেই জড়িয়ে থাকে। আপনিও জানেন বই কি সে কথা। তাই এই সব খবরে আমি আপনি কেউই অবাক হই না আদৌ। এ সবই তো আমাদের জানা কথা। এমনটাই তো হয়ে আসছে এই দেশে। এটাই তো আবহমানের ধারা। সেই ধারাতেই নারীদেহ বলি হয় সকলের আগে। কিন্তু আমরা যাঁরা একটু সুশীল সমাজের চৌহদ্দীর অন্তর্গত, আমরা সেই নারীদেহের পাশবিক বলিটাই শুধু চোখে দেখি। আহা-উহু করি। সমবেদনার মোমবাতি জ্বালি মনে মনে। কখনো পথে হাঁটি নাগরিক মিছিলে। কিন্তু নারীআত্মার আর্তচিৎকারটুকু আমাদের কানে এসে পৌঁছায় কি? বাবাজীরা নারীর দেহটাকেই চটকায় শুধু? নারীর ব্যক্তিসত্ত্বার স্বাধীন পরিসরটাকেই ফালা ফালা করে ছিঁড়েখুঁড়ে খায় না কি? দেহের যন্ত্রণা ওষুধে চিকিৎসায় সারানো যায়। যত বেশই যন্ত্রণাদায়ক হোক না কেন। কিন্তু ছিন্নভিন্ন স্বাধীন ব্যক্তিসত্ত্বার একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরটুকু সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ফেরানোর পথ কই? বিশেষত আমাদের সমাজে? জানি অনেকের কাছেই নারীর কুমারীত্ব সতীত্ব নষ্ট হওয়ার কষ্টটাই প্রধান। কারণ তাঁদের ধারণায় ধর্ষণ তো হয় এই দুটিরই। কিন্তু নারীর ব্যক্তিসত্ত্বার স্বাধীন পরিসরটুকুই যে সকলের চেয়ে বেশি ধর্ষিত হয়, সে সত্য সম্বন্ধে ভারতীয় সমাজ আদৌ কতটা সচেতন সন্দেহ হয় বই কি। এর যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ রয়েছে আমাদের পরিবার থেকে সমাজে। শোওয়ার ঘর থেকে বদ্ধ চেতনার চার দেওয়ালে। আমাদের নারীবোধ শুধু নারীদেহটুকুকেই ঘিরে গড়ে ওঠে। নারীব্যক্তিত্বকে ঘিরে নয়। না শুধুই পুরুষেরই নয় নারীরও। তাই সেই দেহটিকেই শুধু বুঝি আমরা। সত্ত্বাটিকে নয়। নিজের নিজের ঘরেই নারীর সেই দেহটিকেই আগলিয়ে রাখি ভালবাসায় স্নেহে মমতায়। সুশীল সমাজ সচেতনতায়। এবং নিজের নিজের ঘরেই নারীসত্ত্বার স্বাধীন ব্যক্তিত্বের পরিসরটুকুকেই করে রাখি সংকুচিত। সম্পূর্ণ অবহেলিত। তাই ধর্ষিত নারীর দেহটুকুর বাইরে আর কোন আর্তনাদ পৌঁছায় না আমাদেরও কানে।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত