সমাজ ও সাম্প্রদায়িকতা
সমাজের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
প্রাথমিক ভাবে কথাটি শুনতে খারাপ লাগলেও কথাটি সত্য। কারণ এটি একটি অতি বড়ো
সমাজবাস্তবতা। প্রতিটি সমাজ অন্য সব সমাজ থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতার মূল কারণ ভাষা ও
সংস্কৃতি। সেটা প্রকৃতিগত। যার পশ্চাত্যে ক্রিয়াশীল ভৌগলিক অবস্থানগত বৈশিষ্ট।
কিন্তু তাতে বিভিন্ন সমাজের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বিশেষ অবকাশ থাকে না।
পারস্পরিক ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দিলেই সমস্যার উদ্ভব হয় না। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি
হয় তখনই, যখন সাম্প্রদায়িকতা সমাজ সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এখন প্রথমেই
বলে রাখা ভালো সাম্প্রদায়িকতা মানেই কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা ইত্যাদি
নয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা ইত্যাদি রাজনৈতিক বিষয়। অনেক সময়েই অর্থনীতি যে
বিষয়ের সাথে জড়িয়ে থাকে ওতোপ্রতো ভাবে। সাম্প্রদায়িকতা হলো একটি মানসিকতা। যে
মানসিকতার থেকে মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক পরিসরে গড়ে ওঠে এক একটি নির্দিষ্ট
সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি। কালক্রমে যে সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের সামাজিক
ও সাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্যকেই আমরা প্রচলিত বাংলায় ধর্ম বলে মনে করে থাকি।
ইংরেজি পরিভাষায় যাকে বলা হয় রিলিজিয়ন। বস্তুত ধর্ম আর রিলিজিয়ন এক বিষয় নয়। বাংলা
পরিভাষায় রিলিজিয়নের কোন প্রতিশব্দ না থাকার কারণেই আমরা অধিকাংশই রিলিজিয়ন বলতে
ধর্মকেই বুঝি। বস্তত রিলিজিনের অর্থ সাম্প্রদায়িক ধর্ম। যে ধর্ম এক একটি
সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এক এক রকম। অর্থাৎ গোষ্ঠীভিত্তিক সম্প্রদায়গত আচার বিচার
বিধিবিধানই হলো সাম্প্রদায়িক ধর্ম বা রিলিজিয়ন। আমাদের আলোচনার বিষয় এই
সাম্প্রদায়িক ধর্ম তথা রিলিজিয়ন ও সমাজ নিয়েই। ধর্ম নিয়ে নয়।
আমাদের সমাজ সংসারে মাঝে মাঝেই সাম্প্রদায়িক
হিংসার নানাবিধ বীভৎস তাণ্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করে আমাদের মনে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামক
পরিভাষাটির প্রতি খুব স্বাভাবিক ভাবেই একটি আতংক ও বিদ্বেষের জন্ম হয়ে গিয়েছে। ফলে
প্রাথমিক ভাবে আমরা সকলেই এই কথাটি থেকে যতদূর সম্ভব দূরবর্তীতে অবস্থান করতেই
পছন্দ করি। এবং বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলির বিরুদ্ধে মানুষের সংগঠিত
প্রতিরোধের স্বপ্নও দেখি। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবো, বিষয়টি এরকম
একরৈখিক নয় আদৌ। সাম্প্রদায়িকতা আসলেই একটি মজ্জাগত মানসিকতা। যা গড়ে ওঠে বংশগত
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারজাত পারিবারিক ঘেরাটোপ থেকেই। আমাদের গোষ্ঠীবদ্ধ সামাজিক
পরিসরে যে মানসিকতা নিরন্তর পুষ্ট হতে থাকে। এই সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকেই আসলে
আমরা আমাদের ধর্মাচারণ আচার বিচার হিসাবে জেনে থাকি। শুধু খেয়াল করি না, এই ধর্মাচারণ আচার বিচার বিশ্বাস ও ভক্তির পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত সংস্কৃতিই
আমাদের সাম্প্রদায়িকতা। আমাদের আজন্ম লালিত সংস্কার বিশ্বাস ও ভক্তির মধ্যে দিয়েই
পুস্ট হয়ে উঠতে থাকে সাম্প্রদায়িকতা। হ্যা, আমাদের সচেতন
প্রজ্ঞার অন্তরালেই। সাম্প্রদায়িক বিবাদ বিসম্বাদের সাথে এই সাম্প্রদায়িক
মানসিকতার সরাসরি যোগ যে থাকতেই হবে এমনটাও নয়। অধিকাংশ মানুষই শান্তি প্রিয়।
পারস্পরিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তারা কেউই পারস্পরিক হানাহানিতে বিশ্বাসী না হয়েও
নিজের অটল বিশ্বাসের কাছে, নিজ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও
উত্তরাধিকারে সাম্প্রদায়িক। কারণ সেখানেই প্রত্যেকের নিজ নিজ আশ্রয়। তাই সাম্প্রদায়িকতা
মানেই সাম্প্রদায়িক হানাহানি নয়। রাজনৈতিক অপশক্তিগুলিই তাদের নানাবিধ স্বার্থে এই
হানাহানির সৃষ্টি করে মূলত অন্ধকার জগতের দুর্বৃত্তদেরকে ব্যবহার করেই। আর তখনই
সাধারণ মানুষ, তার সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় কোন না কোন একটি
পক্ষ নিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক শক্তিগুলি কাজে লাগায় সেই পক্ষ নিয়ে নেওয়া জনসমর্থনকেই।
সেটাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।
আমাদের ব্যক্তিগত ও সমাজিক জীবনের পরিসরের এই
সাম্প্রদায়িক মানসিকতাই রাজনৈতিক শক্তি ও অপশক্তিগুলির মূলধন। তারাই সাধারণ
মানুষের সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস ও ভক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির
ব্যবস্থা পাকা করে ফেলে। সেটা রাজনীতির বিষয়। কিন্তু সেই রাজনীতির বাইরে যে
বিস্তৃত সমাজবাস্তবতা,
সেই সমাজ বাস্তবতার পরতে পরতে সাম্প্রদায়িকতার সংস্কৃতি। যে
সংস্কৃতিতে একটি সম্প্রদায়ের উৎসবে সামিল হয় না অন্য সম্প্রদায়ের মনের আনন্দ। যে
সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নর নারীর মধ্যে পারস্পরিক বৈবাহিক সম্পর্ক
স্থাপনের কোন চল থাকে না সাধারণত। সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলেও নানারকম বাধা এসে
দাঁড়িয়ে থাকে। এই যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব ও ভিন্নতা এটাই
সাম্প্রদায়িকতা। এই যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভাব এটাই আসলে
সাম্প্রদায়িকতা। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষই মনে করে তার সম্প্রদায়ই সর্বশ্রেষ্ঠ।
অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন অজ্ঞ ও অন্ধ। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস তার
ধর্মের ঈশ্বরই সর্বশক্তিমান। নিজ সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থের অভ্রান্ততার উপরে সকল সম্প্রদায়েরই
অটল বিশ্বাস। অন্য সম্প্রদায়ের অবজ্ঞার মনোভাব কোন সম্প্রদায়ই ভালোভাবে মেনে নিতে
প্রস্তুত নয়। অথচ অন্য সম্প্রদায় সম্বন্ধে এই অবজ্ঞার মানসিকতা সকল সম্প্রদায়েরই
সাধারণ প্রকৃতি ও মজ্জাত চরিত্র। আমরা বলতে চাইছি এই সবই হল সাম্প্রদায়িক
মানসিকতা।
এবার দেখা যাক আমাদের বাংলার সমাজ জীবনে এই
সাম্প্রদায়িক মানসিকতার সরূপ ও বিস্তার। ঐতিহাসিক ভাবেই বাংলা সমাজ গড়ে উঠে ছিল যে
সাম্প্রদায়িক পরিসরে,
আজকের পরিভাষায় তার পরিচয় হিন্দু সম্প্রদায় হিসাবেই। কালের
পরিক্রমায় এরপর বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের প্রভাবে বাংলার সাম্প্রদায়িক বিন্যাসের
ধারাবাহিক পরিবর্তন ও বিবর্তন ঘটে গিয়েছে শত শত বছর ধরে। এই তিন প্রবল ধর্মের
বাইরেও বাংলার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি আজও
প্রবাহমান। তবে আমাদের আলোচনার পরিসর মূলত প্রধানতম ও প্রবলতর সাম্প্রদায়িক
পরিসরেই সীমাবদ্ধ। হিন্দু সমাজের মূলগত প্রকৃতি ও অভিশাপ দুটিই হল বর্ণভেদ প্রথা।
এই প্রথাকে কেন্দ্র করেই হিন্দু সমাজের সাম্প্রদায়িক চরিত্র ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
এই সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের ঐতিহাসিক ধারার অনুসন্ধান বর্তমান আলোচনার বিষয়বস্তু
নয়। আমাদের আলোচনা এর বাস্তব অভিঘাত নিয়ে। বাংলায় বর্ণভেদ প্রথার ব্যাপক প্রভাব
আজও সুষ্পষ্টরূপে প্রতীয়মান। হিন্দু সমাজের বৈবাহিক ক্রিয়াদির পরিসরে যার
দৃষ্টান্ত আজও ব্যাপক। একথা সকলেরই জানা। এই বর্ণভেদ প্রথার কারণেই তথাকথিত হিন্দু
সমাজ বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত। এবং এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ
অর্থাৎ উঁচু জাত ও নীচু জাতের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। এই বর্ণ ভিত্তিক গোষ্ঠীগত
সংস্কৃতির আচার বিচার বিধিনিষেধ নিয়েই এক হিন্দু সমাজেই গড়ে উঠেছে একাধিক
সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সংস্কৃতি। যা পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদের মধ্যে দিয়েই
পেরিয়ে এসেছে হাজার বছরেরও বেশি সময় কাল। এই যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার মানসিকতা,
এই মানসিকতার বংশগত ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের মধ্যে দিয়ে হিন্দু সমাজ
শতধা বিভিক্ত। যেখানে নীচু জাতের উপর উঁচুজাতের অর্থনৈতিক শোষণ বঞ্চনা ও নিপীড়নের
ধারাবাহিক সংস্কৃতিই মূলত হিন্দু সংস্কৃতির মজ্জাগত প্রকৃতি। অন্য গোষ্ঠীর
সম্বন্ধে নাকউঁচু মনোভাব পোষন করা থেকে শুরু করে, সামাজিক
মেলামেশায় নানাবিধ বাধানিষেধ, আপন বর্ণগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব
সম্বন্ধে অটল বিশ্বাস ও তথাকথিত নীম্নবর্ণ সম্বন্ধে অবিমিশ্র অশ্রদ্ধার বংশগত
ঐতিহ্য ইত্যাদিই এই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার স্বরূপ। বাঙালির সাম্প্রদায়িক চেতনার
এই হল মূল ভিত্তি।
এর পর বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ও তার প্রভাবে বাংলার
সমাজে বিশেষত পাল রাজাদের রাজত্বকালে বাংলার জনসাধারণের একটি অংশ বৌদ্ধ ধর্মে
দীক্ষিত হয়ে ওঠে। প্রধানত উঁচু জাতের বঞ্চনা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচার আশাতেই বৌদ্ধ
ধর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে সেই সময়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় পাল রাজত্বের পতনের পর
দক্ষিণ ভারত থেকে আগত সেনেদের রাজত্ব কালে সনাতন হিন্দু ধর্মের বাড়বাড়ন্তে বাংলা
থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে প্রায় নির্মূল করে দেওয়া হয়। সে অন্য ইতিহাস। কিন্তু এর ফলে
বাংলায় আর যাই হোক হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে সেই অর্থে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের
আর কোন অবকাশ নাই বর্তমানে। সেন বংশের রাজত্বকাল, বাংলায় হিন্দু সংস্কৃতির
পুনরুত্থানের স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। বিশেষত কুলীন ব্রাহ্মণ প্রথার উদ্ভব ও
বিকাশের ধারায় বাংলায় হিন্দু ধর্ম ও বর্ণভেদ প্রথার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সমাজে উঁচু
ও নীচু জাতের মধ্যে দূরত্ব হয়ে দাঁড়ায় সর্বাত্মক। বংশ পরম্পরার এই বর্ণভেদ প্রথায়
নীম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের শোষণ বঞ্চনা ও নিপীড়ন সর্বাত্লক
হয়ে ওঠে সেন বংশের রাজত্বকালেই। আর এর পরিণতি হয় মারাত্মক। বর্ণভেদে বিচ্ছিন্ন
একটি জাতিগোষ্ঠী একাধিক সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ায়, জাতি
হিসাবে বাঙালির সমগ্রতা গড়ে ওঠে নি কোন কালেই। এবং বিভিন্ন বর্ণের সম্প্রদায়ের
মধ্যে পারস্পরিক দূরাতিক্রম্য ব্যবধানের এক সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি জাঁকিয়ে বসলো এই
বাংলায়। যে সংস্কৃতির অভিশাপ প্রতিটি বাঙালিকে তাড়া করে বেড়ায় আজও।
এরই পরবর্তী কালে বাংলায় তুর্কি বিজয়ের হাত ধরে
আগত বৈদেশিক ইসলাম ধর্মের সরাসরি ও প্রচ্ছন্ন প্রভাবে গ্রাম বাংলার বংশানুক্রমিক
ভাবে অবহেলিত জনসাধারণের একটি বৃহৎ অংশই যখন কয়েক শত বছর ধরে দিনে দিনে ইসলাম
ধর্মের জাতপাতহীন বর্ণভেদহীন সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের সংস্কৃতির আশ্রয়ের টানে
ধর্মান্তরিত হতে থাকলো,
তখনই সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক বিবর্তন ঘটল এই বাংলায়।
তুর্কি বিজয়ের আগে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ঘেরাটোপ গড়ে উঠেছিল মূলত একই ধর্মের
পরিসরেই। কিন্তু ইসলামী যুগে এসে সেই সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি দুই ভিন্ন ধর্মের
পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। যে দুটি ধর্মের মধ্যে ব্যবধান প্রায় আকাশ
পাতাল। যে ব্যবধানের প্রকৃতি মূলত দেশি ও বৈদেশিক ভিন্নতার সূত্রেই গ্রথিত। অনেকেই
আমরা অনুধাবন করতে চাই না এই ঐতিহাসিক সত্যটিকেই। বাংলার হিন্দু লোকাচার কিংবা
বর্ণভেদের সংস্কৃতি কোনটাই বৃহত্তর ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির অভিন্ন রূপ নয়। বাংলার
সমাজ সংস্কৃতির ছিল একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র ধারা। যাকে বলতে পারি অখণ্ড বাঙালিয়ানা।
তা ভালোই হোক আর মন্দই হোক। কিন্তু বিদেশাগত ইসলামে বাঙালি মুসলিম তার নিজস্ব
স্বতন্ত্র বাঙালিয়ানাকে রক্ষা করতে পারলো না। পারলো না কারণ ধর্ম হিসাবে ইসলামের
প্রকৃতিগত স্বরূপের কারণেই। আর ঠিক এইখানেই বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলিমের
সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির মধ্যে যে দূরাতিগম্য ব্যবধানের সৃষ্টি হলো, তার মধ্যে গড়ে উঠতে পারলো না কোন সংযোগকারী সেতু।
বাংলার সমাজজীবন ভাগ হয়ে গেল মূলত পরস্পর বিপরীত
দুটি বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী চেতনায়।
যাকে আমরা বলছি হিন্দু মুসলমান। পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। পরস্পর সম্বন্ধে উদাসীন।
পারস্পরিক সাংস্কৃতিক উৎকর্ষতা সম্বন্ধে সম্পূর্ণতঃই অজ্ঞ। আর এরপরই এল সুমুদ্র
পারের সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ রাজশক্তি। শুরু হলো অভিশপ্ত সেই ব্রিটিশের শাসন
ও শোষণ। যার প্রকৃতিই ছিল ডিভাইড এণ্ড রুল। যার ফলে বাংলার হিন্দু মুসলিমের পরস্পর
বিচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ালো পরস্পর বিক্ষুব্ধ। পারস্পরিক
উদাসীনতা ও অজ্ঞতার জায়গা নিল পারস্পরিক
বিক্ষোভ ও বিদ্বেষ। এই যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও বিক্ষোভ এইটি ব্রিটিশের
দুরভিসন্ধির কূটকৌশলের দ্বারা সৃষ্ট। ফলে আবাহমান সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিতে যোগ হলো
এই বিক্ষোভ ও বিদ্বেষ। আমরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠলাম তীব্র ভাবেই সাম্প্রদায়িক
মানসিকতার শিকার। এই সম্প্রদায়িক মানসিকতাই আমাদের সমাজিক চিন্তা ভাবনার গতি
প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রিত করে চলে। আমাদের বিশ্বাস ও বোধের পরিমণ্ডলে এই
সাম্প্রদায়িকতা দিনে দিনে পুস্ট হয়ে ওঠে ক্রমাগত। আর সেই কারণেই আজকে এক জাতি হয়েও
আমরা দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ে শুধু বিভক্তই নই, ব্রিটিশের করে দিয়ে যাওয়া দেশভাগটিকেই
স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়ে আমরা কত সহজে অম্লান বদনে দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে
নিজস্ব সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে মশগুল হয়ে থাকতে পারি নিঃসঙ্কোচে। নিজের
দুটুকরো দেশটির খণ্ড বিখণ্ড অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথাও নাই। দুঃখও নাই। এই
না থাকার মধ্যেই সার্থক হয়ে উঠেছে বাঙালির সমাজবাস্তবতার সাম্প্রদায়িক চরিত্র।
বাংলার গোষ্ঠীভিত্তিক সমাজচেতনায় দ্বিখণ্ডিত
বাংলার এই সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বলি আপামর জনসাধারণ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের
পরতে পরতে এই অভিশাপকেই আমরা বহন করে চলেছি বংশগত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারসরূপ। আজকের
রাজনীতি দেশি বিদেশী নানান গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থে আমাদের এই
সাম্প্রদায়িকতাকেই মূলধন করে লাভের কড়ি ঘরে তুলে নেয়। আর আমরা পারস্পরিক বিক্ষোভ ও
বিদ্বেষের পাহাড়ে চড়ে আপন সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব প্রচারে ব্যাস্ত থাকি।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক প্রকাশিত

