অথৈ চোখের অকূল দরিয়ায়




অথৈ চোখের অকূল দরিয়ায়

নারীর রূপে ভুলুন। গুণে ভুলুন। চলে যাবে। কিন্তু নারীর চোখের অথৈ সাগরে ভুলেও পা ডোবাবেন না। ডোবালেই নিজের পায়ে আর খাড়া থাকতে পারবেন না। অথৈ জলের তলায় কোথাকার কোন চোরা স্রোতের টানে কোথায় যে গিয়ে পৌঁছাবেন তার ঠিক নাই। ঠিকানা নাই। নারীর চোখের অমোঘ টানের ঘূর্ণীতে একবার আটকিয়ে গেলেই সব শেষ। কথায় কথায় কেশর ফোলানোর দিন আর ফিরেও পাওয়া যাবে না। সেই চোখ যত বেশি অতলান্ত গভীর বলে মনে হবে, জানবেন ভয়ও ততই বেশি অনেকান্ত। আপনি কবিতা লিখুন। গল্প লিখুন। নারী চোখের বন্দনায় জীবনমুখী গান লিখে আসর মাত করে দিন। কিংবা যামিনী রায় হয়ে উঠুন। নারী চোখের কোলাজ এঁকে ভুবন মাতিয়ে দিন। সকলে ধন্য ধন্য করুক। নয়তো রঁদ্যার মতো ভাষ্কর্যের যাদুতে নারী সমাজে আলোড়ন ফেলে দিন। বিমুগ্ধ ফ্যান ফলোয়ারদের মাঝে তৃপ্তির সেল্ফি তুলুন। আপনার শিল্পী মননের কল্পনায় হৃদয়ের সবটুকু ঢেলে দিন। দুটি চোখের জন্য। এমন দুটি চোখ। যে চোখের কূল নাই কিনারা নাই। যেন অনন্ত সময় হাতছানি দিচ্ছে। অনাদী অনন্ত কাল ডেকে চলেছে। আয় আয়। আয়। সৃষ্টির কৌটো উপুর করে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা যেন আজীবন ধরে এঁকে চলেছেন দুটি চোখের ছবি। দুটি চোখ। কূল নাই। কিনারা নাই।

চোখ। দুই চোখ ভরে দুটি চোখ দেখার বাসনা । বহুদিনের। যে চোখের সাত সমুদ্র তেরো নদী পারে দিগন্ত ভরা ঢেউয়ে পাল তুলে দেওয়া যায় পরম নিশ্চিন্তে। নিশ্চিন্তের কথাই যখন উঠলো। স্বয়ং ঈশ্বরও নিশ্চিন্ত নন তাঁরা সৃষ্টি নিয়ে। সেখানে সামান্য মনুষ্য জীব আমরা। কি করে নিশ্চিন্ত থাকি? না নিশ্চিন্তে থাকার উপায় কই। উপায় থাকলেও আমরা কজনই বা খোঁজ পাই সেই উপায়ের? তাই আমরা কেউই কোন বিষয়েই নিশ্চিন্তে থাকি না। কিন্তু থাকতে চাই। আর চাই বলেই, থাকার চেষ্টা করতে করতে একসময় থাকার ভান করতে শুরু করে দিই। ভাবি এই তো নিশ্চিন্তে আছি। কোথা দিয়ে যে বেহুলার বাসর ঘরের মতো ছিদ্র রয়ে যায়, টের পাই না কখনোই। সে যাক। যে কথা বলছিলাম। সেই দুটি চোখ। এমন দুটি চোখের আশাতেই হয়তো কবি লিখেছলেন। সেদিন চৈত্র মাস। তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ! সত্যই কি সাংঘাতিক কথা। শুনলেই যেন নিজেকে ফাঁসীর আসামী বলে মনে হয়। আর চোখে ভেসে ওঠে এক জল্লাদের চোখ। ভুক্তোভুগী স্বামী মাত্রেই জানেন, জল্লাদ না হোক। শ্রীমতি ভয়ঙ্করীর চোখে যেদিন নিজের সর্বনাশ দেখতে পেয়েছিলেন, ততদিনে দেরি হয়ে গিয়েছে অনেক। আর কোন উপায় নাই। এখন চোখে সর্ষে ফুল না দেখুন ৪৯৮-এ ধারাটি দেখতে হচ্ছেই। তাই মুখে আঙুল লাগিয়ে স্পিকটি নট। আসলেই সংসার যাঁতাকলে ক্যাচ কট কট।

কিন্তু সংসার যাঁতাকলে কে আর স্বেচ্ছায় পড়তে চায়। বরং ফুলে ফুলে উড়ে উড়ে মধু খেয়ে বেড়াতে চাওয়াই আদতে পুরুষের ধর্ম। অন্তত শ্রীমতি ভয়ঙ্করীদের তেমনই গভীর বিশ্বাস। কিন্তু তাই নিয়ে তর্ক করা বৃথা। বিবাদী যখন নিজেই বিচারক। ফলে সেই দশটা পাঁচটার কলুর বলদ। টানো ঘানি। আনো তেল। সংসার স্মুথ চলে তৈলের গুণে। ফলে তেল দিয়ে যেতে হবে। সর্বত্র। যে চোখের দুই সমুদ্রে ভাসতে চাও, সেখানেও তৈলমর্দন ছাড়া তরণী মিলবে না। ঠিক ঠাক সময়ে ঠিক ঠাক ঘাটে, ঘাটে ঘাটে তেল লাগাও। আর ফসল তোল। পুরুষ থেকে পতিদেবতা। এই অভিজ্ঞতা সকলের।

অভিজ্ঞতার কথাই যখন উঠলো। নারীর দুইচোখের দৃষ্টি সায়রে একবার যে ডুবেছে, তার আর কূলকিনারার ঠিক নাই। ভাসতে ভাসতে কোন চরাতে গিয়ে যে সেই ভেলা ঠেকবে, কেউ জানে না। তখন আর ফেরার পথ পাবে না। ফলে সাধু সাবধান। চোখ দেখো। ঠিক আছে। চোখের দিকে থাকিয়ে থাকো। ভ্যাবলার মতো। সেও নিরাপদ। কিন্তু ভুলেও চোখের অকূল দরিয়ায় পাল খাটাতে যেও না। গেলেই গেলে। কিন্তু ভালো কথা কে আর শুনেছে কবে? তাই যার কপালে যা লেখা আছে খণ্ডাবে কে? স্বয়ং ঈশ্বরেরই সাধ্য নাই। থাকলে আর সৃষ্টির দরিয়ায় পাল খাটিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনতেন না। সেই যে সৃষ্টির বন্ধনে জড়িয়ে গেলেন ভদ্রলোকই হন আর ভদ্রমহিলা। সে জট আর ছাড়াতে পারলেন কই? জড়ায়ে আছে বাধা ছাড়ায়ে যেতে চাই। ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে। ভগবানেরই যদি এই দশা হয়। তবে ভাবুন একবার। আমার আপনার হলে কি হবে? তাই যতই ছাড়াতে যাবেন ততই জড়িয়ে যাবেন আরও আরও পাকে। এ সেই ছাদনাতলায় দাঁড়িয়ে সাতপাক ঘোরা নয়। এ দ্রৌপদীর শাড়ীর মতো অনন্ত পাকে পাকে জড়িয়ে পড়া।

এই জড়িয়ে পড়ার একটা ভয় আছে। না, অনভিজ্ঞ যৌবনের কেশর ফোলানো দিনগুলোতে এই ভয়ের কথা খেয়াল থাকে না কারুর। থাকলে শুনশান ছাদনাতলায় পুরুতঠাকুরের ভাত মারা যেত। কিন্তু একবার জড়িয়ে পড়লে? আপনার স্বাধীন অস্তিত্বও গেল। রাতের ঘুমও গেল। একটাই শুধু চিন্তা। কি করে পারি দেবেন এমন আমফানের ভিতর দিয়ে। শুধু তো কয়টা বিদ্যুতের খুঁটি উপড়িয়ে পড়া নয়। একে একে সব মজবুত খুঁঠিগুলিকে পরের পর মুখ থুবড়ে পড়তে দেখতে হবে। বিশ্বাসের খুঁটি। মোহের খুঁটি। আশার প্রত্যকটা আলাদা আলাদা খুঁটি। ভরসার খুঁটি। স্বপ্নের খুঁটি। আর কল্পনার খুঁটি যে কোন দিকে উড়ে চলে যাবে সে আর ঠাওর করতে পারবেন না শতবার খুঁজলেও। কিন্তু হলে কি হবে। যে খুঁটিতে নিজেকে বেঁধে রেখে ছিলেন। দেখবেন সেই খুঁটি যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটিই আছে। সে হোল ভালোবাসার খুঁটি। এত যে উথাল পাথাল ঝঞ্ঝা। তাতে কি। সব কয়টি খুঁটি উপড়িয়ে যাওয়া বিদ্ধস্ত জীবনের উঠানে নিজেকে খুঁজে পাবেন ভালোবাসার খুঁটিতে। শ্রীমতি ভয়ঙ্করীরা কখন যে আপনার অলক্ষে সেই খুঁটির চারধারে কংক্রীটের গাঁথনি তুলে দিয়েছেন, টের পাবেন না। যখন পাবেন। দেখবেন সব কটা খুঁটি হারিয়ে আপনিও প্রায় যিশু খ্রিস্টের মতো একটি খুঁটিতেই বাঁধা পড়ে আছেন।

সে থাকুন। তাতে কার কি। আপনার ভালোবাসা আপনার কাছে। একবার ভালোবেসে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে। সেই ভালোবাসার দেনা শুধতে শুধতে বার্ধক্যের চৌকাঠে যেদিন পৌঁছিয়ে যাবেন। দেখবেন কোথাকার রাগ জল হয়ে কোথায় গিয়ে পড়েছে। অসমর্থ্য শরীরে শ্রীমতি ভয়ঙ্করীই তখন একমাত্র ভরসা। রাগ অনুরাগের পালায় তখন সহাবস্থান পর্ব। পরস্পর পরস্পরের ভরসা। এই একটা খুঁটিই জীবনের উপান্তে এসে খুঁজে পাবেন ফিরে। বাকি গুলির হদিশ কালের অতলে তলিয়ে গিয়েছে ততদিনে।

ততদিনে অস্থিতে মজ্জায় অনুভবে তর্জায়, শুধু আমি আর তুমি। তুমি আর আমি। রাগ নয়। অভিমান নয়। রাত গভীর হলে উচাটন নয়। পরস্পরের ভিতরে পরস্পরের আশ্রয়। জীবনের শুরুতে অথৈ সাগরে যে ভেলা ভাসানের জন্য আমাদের এত প্রেম এত ভালোবাসা। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে পরস্পরের ভিতরেই সেই হারানো ভেলার পুনরাবিস্কার। সেখানে শ্রীমতি ভয়ঙ্করীও আর ভয়ঙ্কর নন ততটা। অকূল দরিয়ার সেই অতলান্ত চোখে আর অনাদী অনন্তের অতল ঢেউ নয়। সেখানে ঘরসংসারের মায়া মমতার স্নেহ ব্যাকুল একান্ত আপন দৃষ্টির নীড়। যে নীড়ে আপনার অধিষ্ঠান রাজসিংহাসনে না হোক। নারীর বুকের সিংহাসনে।

২৩শে আষাঢ়’ ১৪২৭

কপিরাইট  শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত