শিয়রে নাচছে মৃত্যু:
চায়নাজ ফাইট আগেইন্সট কোভিড-১৯
বাবু যত বলে পারিষদ দল
বলে তার শতগুণ। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। প্রভু জানিয়ে দিয়েছেন আবিশ্ব মহামারীর
কারণ চীন। আর কোন কথা নাই। দশদিক জুড়ে ঢাক ঢোল কাঁসর ঘন্টা বেজে উঠেছে তারস্বরে। চীন
তথ্য গোপন না করলে বাকি দেশগুলিতে এমন মৃত্যমিছিল শুরু হতো না। কেউ আবার তাতেও সন্তুস্ট
নন। তাঁরা ধরে ফেলেছেন করোনা চীনের কোন গবেষণাগারে তৈরী। কিভাবে তা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া
হয়েছে ইত্যাদি। হাতে গরম তথ্যচিত্রও তৈরী হয়ে গিয়েছে। চীনের গবেষকদের নাম ধাম ধরে ধরে
দেখিয়েও দেওয়া হয়েছে কবে কিভাবে করোনা তৈরী করা হয়েছে। আমাদের বয়সীদের বর্তমান প্রজন্মই
সম্ভবত প্রথম প্রজন্ম যাদের শিক্ষার গোড়াপত্তনই হয়েছিল মাষ্টার মশাইদের তৈরী করে দেওয়া
নোট মুখস্থ করে প্রভুত নম্বর সহ পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার সহজ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে।
পরিশ্রম কম। সুবিধা বেশি। এবং মৌলিক চিন্তা করার কষ্ট তথ্য বিচারের পরিশ্রম কোনটিরই
দরকার হয় নি। ফলে সাফল্যও এসেছে হাতে হাতে। যে যেখানে সম্ভব গুছিয়ে নিয়েছে নিজেকে নিজের
মতো। আর তাই এই ধারাই আমরা আমাদের সন্তান সন্ততির জন্যে আরও নিখুঁত ভাবে ছড়িয়ে দিতে
পেরেছি। ফলে নোট মুখস্থের এই সংস্কৃতির ভিতরেই আমাদের যাবতীয় সাচ্ছন্দ। না আজ আর বিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের যেতে হচ্ছে না আমাদের। সেই মাষ্টার মশাইদের অনেকেই আজ আর নাই। কিন্তু
আমাদের চারপাশে সারাদিন নোট সাপ্লাইয়ের কোন অভাব নাই তাই বলে। মাষ্টার মশাইদের জায়গায়
হাতে গরম নোট সাপ্লাই দিয়ে চলেছে আজকের মিডিয়া। মহাগুরু থেকে মন্ত্রী নেতা নেত্রীরা।
আমরাও সেই মুখস্থ করা নোটেই চায়ের কাপে তুফান তুলছি। তাই প্রভুর কথার ভাব সম্প্রসারণ
করে মিডিয়ার ধরিয়ে দেওয়া নোট মুখস্থ করেই আজ আমরা নিশ্চিত আবিশ্ব এই মহামারীর জন্য
দায়ী কোন দেশ। না আর কোন ভুল নাই। এখন শুধু অপেক্ষায় থাকা। প্রভু কখন যুদ্ধের হুঙ্কার
দেন। আমরা প্রস্তুত। সমস্বরে ধূয়ো তুলতে।
আসলে আমরা সম্ভবত খেয়াল
করতে পারছি না, প্রত্যেকের শিয়রেই যে কোন সময় মৃত্যু নেচে উঠতে পারে। আমরা বুঝতে চাইছি
না, প্রভুর কথায় একদিকে দৃষ্টি আটকিয়ে রেখে বোধবুদ্ধির তালায় চাবি লাগিয়ে মিডিয়ার তৈরী
নোট মুখস্থ করতে থাকলেই মৃত্যু ঠেকেই রাখা যাবে না। তার জন্য আমাদের ভাবতে হবে। পথ
খুঁজতে হবে। সেই পথ খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে চীনের মুণ্ডুপাত করতে করতেও
চীনের দিকে একটু চোখ খুলে তাকানো। আমাদের দেখতে হবে চীন সম্পূর্ণ নিজের ভরসায় একা কিভাবে
এই সমস্যার মোকাবিলা করছে। যদি আমরা ধরেই নি, প্রভুর কথা মত চীনে লাখ লাখ মানুষ করোনা
আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে, তবুও চীনের মোকাবিলা পদ্ধতি কতটা কার্যকর আর কতোটা নয়, সেটি
একবার বুঝে নিলে, প্রভু যতই রাগ করুন না কেন, নিজেদের মৃত্যুকে ঠেকাতে যদি একটুও সুবিধে
হয় তবে ক্ষতি কি? কথায় বলে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। আর এতো ঘাড়ের উপর উপবিষ্ট পৃথিবীর
উল্টো পিঠে থাকা প্রভু।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন,
চীনকে চিনতে আর বাকি নাই। চীন সে কথা আমাদের জানাবেই বা কেন? তারা যদি একটু চেখকান
খোলা রাখতেন ,দেখতে পেতেন ২০২০’র জানুয়ারীর ২০ তারিখেই চীন বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল
করোনা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হচ্ছে। তারও আগে জানুয়ারীর সাত তারিখেই চীন করোনার
জেনেটিক কোড উদ্ধার করে গোটা বিশ্বের হাতে তুলেও দিয়েছিল প্রয়োজনীয় গবেষণা শুরু করতে
যাতে দেরি না হয়ে যায়। এবং মূলত চীনের পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে বিশ্বের উপর তার
সরাসরি প্রভাবের গতি প্রকৃতি অনুধাবন করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকে তাদের ৩০শে জানুয়ারীর
বৈঠকেই গোটা বিশ্বে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও আমাদের ঘুম ভাঙেনি।
আমরা বিষয়টা চীনের নিজের ঝামেলা মনে করে কোন রকম প্রস্তুতি নিইনি গোটা ফেব্রুয়ারী মাস
জুড়ে। বরং হিন্দু মুসলমান করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষচর্চায় বেশি মনযোগ দিয়েছি। না, মিডিয়ার
নোট মুখস্থ করতে করতে আজ সেকথা আমাদের আর স্মরণে নাই। না থাক। আজ ২১শে এপ্রিলে এসেও
কি আমাদের ঘুম ভেঙেছে?
আজ এই মূহুর্ত অব্দি আবিশ্ব ২৫ লক্ষ
৫ হাজার ৩৬৭ জন করোনা সংক্রমিত। তার ভিতর ৬ লক্ষ ৫৯ হাজার ৬১৫ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
আর মারা গিয়েছেন, ১ লক্ষ ৭১ হাজার ৮৫০ জন।
ভারতের ক্ষেত্রে এই মুহুর্ত অব্দি
মোট সংক্রমিত ১৮ হাজার ৯৮৫ জন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৩ হাজার ২৭৩ জন। মারা গিয়েছেন ৬০৩
জন। এবার আসুন দেখে নেওযা যাক ইতালীতে প্রায় সম সংখ্যক নাগরিক মারা গিয়েছিলেন কত তারিখ
নাগাদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত প্রতিদিনের সিচ্যুয়েশন রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে
গত ১১ মার্চে ইতালীতে মৃত্যু হয়েছিল ৬৩১ জনের। সেই সময় অব্দি মোট আক্রান্তের সংখ্যা
ছিল ১০ হাজার ১৪৯জন। তুলনামূলক বিচারে ইতালীতে ১১ মার্চের থেকে আমাদের ভারতে ২১শে এপ্রিল
অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত। মৃত্যু প্রায় সমান। সেই ইতালীতেই আজ এই মূহুর্তে মৃত্যুর
মোট সংখ্যা ২৪ হাজার ১১৪ জন। মোট আক্রান্ত ১ লক্ষ ৮১ হাজার ২২৮ জন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন,
৪৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ ইতালীতে ১১ মার্চের পর থেকে গত চল্লিশ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা
বেড়েছে ১ লক্ষ ৭১ হাজার ০৭৯। আর মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৩ হাজার ৮৪৩। আগামী চল্লিশ
দিনে ভারতের পরিসংখ্যান কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, আমরা কেউ জানি না। এদিকে ৭ই ফেব্রুয়ারী
চীনে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৩৭ জন। কিন্তু সেদিন চীনের সামনে অন্য কোন তথ্য ছিল না।
বা ১১ই মার্চ ইতালীর সামনে চীনের পরিসংখ্যান ছাড়া আর কোন তথ্য ছিল না। অনেকেই ভাবছেন
এত সব পরিসংখ্যান দিয়ে কি হবে? না পরিসংখ্যান দিয়ে কিছু সুরাহা হবে না।
তবু এই পরিসংখ্যানগুলির দিকে একটু
নজর দিলে দেখবো, ভারতের হাতে এখনো তবু কিছুটা সময় হয়ত আছে। সেই অতি গুরত্বপূর্ণ সময়
আমরা প্রভুর বাণী শুনে পারিযদবর্গের তৈরী করে দেওয়া নোট মুখস্ত করবো না মৃত্যুকে ঠেকিয়ে
রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবো? মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার সবরকম প্রস্তুতি নেওয়াই বোধহয় বুদ্ধিমানের
কাজ। সেই কাজে আজ ২১শে এপ্রিল আমাদের হাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য এসে পৌঁছিয়েছে।
এযাবৎ করোনা মোকাবিলায় চীন কিভাবে অগ্রসর হয়েছে, বিশিষ্ট গবেষকদের তৈরী করা তার একটি
বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে চায়না ডেইলিতে। না, আমরা সাধারণ নাগরিক। আমরা ভাইরাসের
সংক্রমণ ঠেকানোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের তৈরী রিপোর্ট পড়ে বিশেষ যে কিছু বুঝবো তাও হয়তো
নয়। কিন্তু শিক্ষাকালে নোট মুখস্থ করেই হোক আর না হোক, আজ মধ্য বয়সে এসে বুঝি কি না
বুঝি, একটু চেষ্টা তো করে দেখা যেত? চীন কোন রিপোর্ট পেশ করেছে? আমাদের ভিতর এই বিষয়ে
যাঁরা একটু আধটু জ্ঞানগম্যি রাখেন, তাঁরা হয়তো চেষ্টা করলে দেখতে পেতেন সত্যিই প্রয়োজনীয়
কোন হদিশ রয়েছে কিনা সেই রিপোর্টে? যার থেকে অতি প্রয়োজনীয় কিছু সাহায্য পাওয়া যায়
কিনা যায়। অন্তত এই আপৎকালীন সময়। হতেই পারে প্রভুর কানে গেলে তিনি গোঁসা করতে পারেন।
কিন্তু মৃত্যুকে শিয়রে রেখে খড়কুটো ধরে হলেও মানুষ তো বাঁচতে চাইবে নাকি। হোক না সে
খড় প্রভুর শত্রুরই এগিয়ে দেওয়। আগে তো বাঁচি!
সংশ্লিষ্ট পিডিএফ ফাইলে বিস্তারিত
রিপোর্ট রয়েছে। না চৈনিক ভাষায় নয়। আমার আপনার সাধের ইংরেজি ভাষাতেই। তথ্যসূত্র
২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

