লালসার ললাট: ফেট অফ দ্য লাস্ট
লালসা। সামান্য একটি শব্দ। কিন্তু সামান্য নয় তার
অভিঘাত। যে কোন মানুষই শব্দটিকে এড়িয়ে যেতে চাইবেন। শব্দটির সাথে শুধুই যেন একটি
খারাপ অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে। যে কারণে মানুষ মাত্রেই প্রত্যেকের কাছেই অচ্ছুৎ হয়ে আছে
সে আগাগোড়া। আমরা কেউই মনে করি না, বা করতে চাইই না আমদের কোনো কিছুর উপর
লালাসা আছে। কারণ সমাজ সংসারের সংস্কৃতিতে লালসা
থাকাটা দোষাবহ বলেই জেনে আসি আমরা আশৈশব। ফলে আলোচনার বিষয় হিসেবেও লালসাকে
আমরা এড়িয়ে চলতেই বেশি অভ্যস্ত। যদিও আমরা পরনিন্দায় পরচর্চায় অন্যের সমালোচনায়
প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে লালসাকে আলোচনার পরিসরে নিয়েও আসি আকছাড়। এটা করি আমরা সচেতন
ভাবেই। কাউকে লালসার দায়ে অভিযুক্ত করতে পারলে বেশ এক হাত নিয়ে নেওয়া যায় মনের
সুখে। তখন কে আর খেয়াল রাখে আমাদের অন্তর প্রবৃত্তির এই লালসাটুকুর কথা! কিন্তু লালসা কি নেহাৎই আমাদের অন্তর
প্রবৃত্তির অন্ধকার বলয়? আমরা কম বেশি সকলেই কি এই দোষে দোষী?
কিংবা লালসা কি আমাদেরই এই জীব প্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট নয়? কেনই বা আমরা লালসাকে দোষনীয় বলে প্রচার করে থাকি অহরহ? লালসার উৎপত্তি কি লোভ থেকেই? লোভ মাত্রেই তো আর
খারাপ নয়! যেমন ঈশ্বরের প্রতি ভক্তির লোভ, কোন বিষয়ে নিজের
শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার লোভ, আপন সন্তানকে সুখে সমৃদ্ধিতে
দেখে যাওয়ার লোভ। তবে কেনো লালসাকেই বা
আমরা একটি খারাপ তকমায় অভিহিত করতে চাই? করি। আবার লোভকেও
আমরা যে খুব উচ্চাসনে বসিয়ে রাখি তাও তো নয়। যেমন পরের ধন সম্পদে লোভ, ফাঁকি দিয়ে কার্যসিদ্ধির লোভ, অন্যের দূর্বলতার
সুযোগ নিয়ে তাকে ঠকানোর লোভ। আমরাই তো বলি, লোভে পাপ পাপে
মৃত্যু। তাহলে লোভকেও কিন্তু আমরা পাপের সমগোত্রই মনে করি। কিন্তু আমরা সবাই
স্বীকার করি, কোন না কোনো বিষয়ে আমাদের লোভের কথা। সেই
বিষয়টি আমারা খারাপ বলেও প্রচার করি না। অর্থাৎ বিষয় ভিত্তিক লোভের দোষ গুণ পরিমাপ
করতে অভ্যস্থ আমরা অধিকাংশই। কিন্তু কেউই আমরা স্বীকার করি না কোন বিষয়ের প্রতি
আমাদের লালসার কথা। যেন সে কথা স্বীকার করলেই সর্বনাশ! সকলের চোখে পাপীতাপি মানুষ
হিসেবে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থেকে যায় তাতে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, লোভ আর লালসার মধ্যে একটা বড়ো ফারাক আমরা রক্ষা করে চলি। লালসা মাত্রেই
আমাদের চোখে পাপ। কিন্তু লোভ মাত্রেই আমাদের চোখে পাপ নয়। কেন এই বৈষম্য!
জীবনধারণের জন্যে আমাদের যে কাজগুলি করতে হয়, ঠিক যে কাজগুলি
আমাদেরকে এই জীবজগতে বাঁচিয়ে রাখে,
বা টিকিয়ে রাখে, সেইগুলির পেছনে থাকে বেঁচে থাকার প্রয়োজন বা তাগিদ। সেইখানে জীবজগতের
অন্যান্য জীবের থেকে আমাদের বিশেষ পার্থক্য সামান্যই। কিন্তু সমগ্র জীবকুলের থেকে
মানুষের প্রধান তফাৎ একটি জায়গাতেই, জীবজগতে একমাত্র
মানুষেরই রয়েছে লোভ। আর সেই লোভের কারণেই সে প্রতিনিয়ত শান দিয়ে চলেছে তার
বুদ্ধিতে। এইখান থেকেই কিন্তু শুরু হয়েছে মানব সভ্যতা। অনেকেই মনে করতে চাইবেন
মানব সভ্যতার জন্ম বুঝি প্রেম ভালোবাসা থেকেই। কেউ বা বলবেন, না মানব সভ্যতার জন্ম অজানাকে জানবার অপরিসীম বাসনা বা তাগিদ থেকে। কোন কারণগুলিই ফেলনা নয়। কিন্তু প্রেম ভালোবাসা
জীবজগতে কেবল মানুষেরই আছে, অন্য কোন প্রাণীকুলের নেই,
তেমনটাও নয় আমরা সবাইই জানি সে কথা। তবে এটাও ঠিক যে অজানাকে জানবার
তাগিদ জীবজগতে একমাত্র মানুষের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু সেই তাগিদ কি লোভ থেকেই উঠে
আসেনি? পশু জগতে কোন বিষয়ের উপরেই কোন লোভ নেই কোন পশুর। সে
যা করে, যেটুকু করে সবটাই জীবজগতে টিকে থাকার জন্যেই। তার
বেশি কিছু করার প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে শূন্য। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রেই প্রথম এক
নতুন বৈশিষ্ট দেখা দিল, তা হলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসের
প্রতি লোভ। আর এই লোভের উৎপত্তি সন্তুষ্টির অভাব থেকেই। পশুদের মতো শুধুমাত্র পেট
ভরলেই আর যৌন তারণা মিটলেই সন্তুষ্ট নয় মানুষ। এই যে অসন্তোষ, যা পাচ্ছি, যতটুকু পাচ্ছি তার থেকেও বেশি কিছু চাই,
সেটাকেই আমরা বলতে চাই লোভ। যে প্রবৃত্তি পশুজগতে নেই, কিন্তু মানুষের যা প্রধানতম বৈশিষ্ট। লোভের এই প্রবৃত্তিই মানুষকে এগিয়ে
দিল পশুর থেকে। সুচনা হল জীবজগতে এক নতুন অধ্যায়ের। আর সেটাই মানব সভ্যতার
উন্মমেষের জন্মলগ্ন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের ব্যক্তি জীবনের পরতে
লোভের তাৎপর্য কি অপরিসীম। অল্পতে সন্তুষ্ট হলে আমরা কিন্তু কখনোই সামনে এগতে পারি
না। ‘অল্পেতে খুশি হবে দামোদর শেঠ কি?’ এই কারণেই দেখা যায়, সেই বা তারাই অন্যদের থেকে বেশি এগিয়ে যায় বা বেশি সফল হয়ে ওঠে, যে বা যারা মোটেও অল্পতে সন্তুষ্ট নয়। তাদের অন্তর প্রবৃত্তির লোভই তাদেরকে
অল্পতে সন্তুষ্ট হতে দেয় না। তাই তারা সেই লোভেরই তারণায় বেশি কিছুর দিকে হাত
বাড়ায় তখনই। এই লোভই মানুষকে ছুটিয়ে চলে, আরও থেকে আরওতে।
রেল গাড়ি থেকে এরোপ্লেনে, রেডিও থেকে টিভিতে, টেলিফোন থেকে মোবাইলে, এইভাবেই আজ আমরা এসে পৌছিয়েছি
এই সময়ে। আমাদের ব্যক্তি জীবনেও এই লোভ, আরও কিছু পাওয়ার লোভ
আমাদেরকে সবসময়ে ব্যস্ত করে রাখে। সবসময়ে সামনের দিকে ঠেলতে থাকে। যার লোভ নেই,
সেই ব্যক্তির আর এগোনো হয় না। তাকে থেমে যেতে হয় একটা জায়গায় এসে।
যারা বলবেন অজানাকে জানবার তাগিদের কথা, প্রতিটি ঘটনার পিছনের
আসল কারণটি খুঁজে বার করবার অদম্য উৎসাহের কারণই সভ্যতার এগিয়ে চলার প্রধান চালিকা শক্তি, তাদেরকে
এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, সেই তাগিদ ও উৎসাহের মূল কারণই হলো
আরও কিছুর জন্যে উদগ্র এক লোভ। এই লোভটুকু না থাকলে, অজানাকে
জানবার তাগিদও আসতো না, কিংবা ঘটনার পিছনের আসল কারণ
অনুসন্ধানের উৎসাহেও ভাটা পড়ে যেতে শুরুতেই।
তাই এই কথা অস্বীকার করার কোন অবকাশই নেই যে লোভের তারণাই আমাদেরকে ছুটিয়ে
নিয়ে চলে সবসময়।
কিন্তু সমাজবদ্ধ মানব সভ্যতায় প্রটিটি
ব্যক্তিমানুষের সমস্তরকম লোভকে প্রশ্রয় দিলে, তাকে অনেকটা পরিমাণে নিয়ন্ত্রীত করে না
রাখতে পারলে শুরু হয়ে যাবে মাৎসন্যায়। আর সেই কারণেই সমাজ, সমাজকে
রক্ষা করার প্রয়োজনেই সমস্ত রকম লোভকেই প্রশ্রয় দিতে পারে না সবসময়ে, সবখানে। আর তখনই তাকে আশ্রয় নিতে হয় নতুন একটি পরিভাষার, সেইটিই হল লালসা। অর্থাৎ লোভেরও একটি গণ্ডী কেটে দেওয়া হল। কতটুকু অব্দি
লোভের গ্রহণযোগ্যতা আর কোনখান থেকে নয়। ঠিক যেখান থেকে লোভের গ্রহণযোগ্যতার
বিলুপ্তি সেইখান থকেই জন্ম লালসার। তাই লালসা মাত্রেই খারাপ, পাপাচার এমনই ধারণার মধ্যে দিয়েই সমাজ সংসার আমাদেরকে পারিবারিক ও সামাজিক
করে গড়ে তুলতে স্বচষ্ট হয়। সব দেশেই সব সকালেই। কিন্তু আমরা, আমরা ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কতটুকু সেই লক্ষ্মণরেখা ধরে চলাচল করি? কতক্ষণ মেনে চলি সেই লক্ষ্মরেখা কে? আর কখনই বা
লঙ্ঘণ করতে স্বচেষ্ট হই সেই সীমারেখা? এই সবই নির্ভর করে
ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তি প্রকৃতির উপরেই। এবং নির্ভর করে তার পরিবেশের পরিসরের
উপরেও। নির্ভর করে তার শিক্ষাদীক্ষা সংস্কৃতির উপরেও।
ব্যক্তি জীবনে আমরা যে যেমনই হই না কেন, সমাজ সংসারে
আমাদেরকে নিজের একটি ভাবমূর্ত্তি রক্ষা করে চলতে হয় সবসময়ে। সাধারণতঃ সাধারণ মানুষ
সেই স্বরচিত ভাবমূর্ত্তির বাইরে যেতে পারে না লোকলজ্জার ভয়ে, লোকনিন্দার ভয়ে। সামাজিক রীতিনীতির ভয়ে, রাষ্ট্রীয়
আইনের ভয়ে। কিন্তু এই বাধাগুলি যদি না থাকতো, তবে কে যে
কিরূপে স্বরূপ ধারণ করতো সত্যই বলা মুশকিল। কারণ আমরা স্বীকার করি আর না করি,
আমরা ব্যক্তি মানুষ কেউই লোভ লালসার উর্দ্ধে নই। এখন কোনটা লোভ আর
কোনটা লালসা, সেটা যদিও সমাজ সংসার দেশ কাল নিরপেক্ষ নয়,
তবুও সাধারণ ভাবে আমরা নিজের একান্ত আপন লোভ লালসাগুলিকে সকলের
চোখের আড়ালে লুকিয়েই রাখতে চাই। একমাত্র যখন প্রবৃত্তির তাড়ণায় আত্মনিয়ন্ত্রণ
হারিয়ে ফেলি, তখনই কেবল তা আর পাঁচজনের কাছে ধরা পড়ে যায়।
সাধারণ ভাবে আমাদের সবসময় স্মরণ থাকে না, আমাদের একটি জৈবিক
সত্ত্বা রায়েছে, আমরা কেউই তার উর্দ্ধে নই। আর ঠিক যে
জায়গাতে পশুর সাথে আমাদের প্রাথমিক প্রভেদ, সেই প্রয়োজন
অতিরিক্ত বিষয়ের উপর, পরিমাণের উপর আমাদের লোভ- সেইখানেই
কিন্তু মনুষ্য জীবনের প্রধান নোঙর। আমরা মানি আর নাই মানি।
এই যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিষয়ের উপর পরিমাণের
উপর একান্ত লোভ, সেই লোভের প্রকৃতি আমাদের অস্থিমজ্জায় জায়মান থাকে আমাদের সামাজিক ও
পারিবারিক পরিচয়ের আড়ালে। কিন্তু সেই লোভ যখন আড়ালটুকুর বাইরে বেড়িয়ে আসতে চায়
উদগ্র উদ্যমে, তখনই আমরা তাকে লালসা বলবো। তাই লোভ আর লালসার
মধ্যে তফাত গুণগত নয়, পরিমাণগত। যৌবনের উদ্বোধনে, যৌন আবেগের উন্মেষে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আমাদের চেতনায় গড়ে ওঠা শারীরীক
আকর্ষণ আমাদের জৈবিক প্রবৃত্তি। অন্যান্য জীবকুলের মতোই। বৈবাহিক সম্পর্কের
ঘেরাটোপে যে আকর্ষণ সন্তুষ্টির উপায় খোঁজে। কিন্তু আমাদের শরীর যদি তাতেও সন্তুষ্ট
না হয়ে তাবৎ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে? প্রাথমিক সেই লোভের উৎপত্তি দেখা যায় আমাদের নিজমনের আয়নায়, যে ছবিটি কেবল আমিই দেখতে পাই। যে ছবিটি আমি আর কাউকেই দেখতে দিতে চাই না।
অর্থাৎ সামাজিক পারিবারিক অনুশাসনে আত্মনিয়ন্ত্রণের আওতায় সুরক্ষিত রাখি নিজের
ভাবমূর্ত্তিকেই। কিন্তু লোভের সেই আগুনে
যখন আমি আমার পরিপার্শ্বের রীতিনীতির তোয়াক্কা না করেই অগ্রসর হতে যাই, আমার লোভকে চরিতার্থ করতে, পরকীয়ার ঘেরাটোপে তখনই
প্রকাশিত হয়ে পড়ে আমার অদম্য যৌন লালসাই। লোভ আর লালসার মধ্যে এইটুকুই পার্থক্য মাত্র।
বস্তুত লোভই বলি আর লালসাই বলি আমাদের অন্তর্গত
এই প্রবৃত্তিগুলি আমাদেরই জৈবিক প্রবৃত্তিমাত্র। যে প্রবৃত্তিগুলিই আমাদেরকে
পশুজগৎ থেকে আলাদা করে রাখে। আমরা শুরু
করেছিলাম ঠিক যে জায়গা থেকেই। আরও একটু তলিয়ে দেখলে দেখতে পাবো, আমাদের বেঁচে
থাকার জন্যে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের প্রয়োজনগুলি খুব একটা বেশি কিছু নয়। কিন্তু
আমাদের জীবনে অধিকাংশ প্রয়োজনগুলিই অতিরিক্ত। যেগুলি আমাদের প্রবৃত্তিগত লোভেরই
প্রকাশ। সমাজ সংসার রক্ষার দায়ে সেগুলির নিয়ন্ত্রহীন উদ্বোধনের পায়ে বেড়ি পড়িয়ে
রাখতেই আমরা লালসা বলে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু পারি কি? পরলেও কতটুকু পারি? কি ব্যক্তি পরিসরে কি সমষ্টির
পরিসরে। মূলত যে দুইটি লালসা আমদের জীবনকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে, সে দুইটি হল, এক যৌন লালসা। এবং দুই অর্থসম্পদের
লালসা। পৃথিবীর ইতিহাস, বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলা যায়,
মানুষের ইতিহাস এই দুইটি বিষয়ের সমষ্টিগত গল্পের থেকে খুব বেশি কিছু
নয়।
পশু জগতে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ
প্রজননের প্রয়োজনীয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন কিছুর প্রতিই
আকর্ষণ অনুভব করে না। সেখানেই তাদের প্রবৃত্তির সীমাবদ্ধতা। কিন্তু মানুষের জৈবিক
প্রবৃত্তি ভিন্ন, সে সবসময়েই অতিরিক্তের প্রতি লালায়িত। এই যে অতিরিক্তের প্রতি মানুষের এই
উদগ্র বাসনা, এইটিই আসলে হল লালসা। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি
আমাদের চেতনায় যে আকর্ষণ, তা কিন্তু কখনোই কেবল মাত্র
প্রজননের পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই আপন স্ত্রীর সাথে উদ্ভিন্নযৌবনা শালীর প্রতিও
আমাদের দূ্র্বলতা রয়ে যায়, সেই দূ্র্বলতা শালীর মননশীলতা,
মেধা বা অন্য কোন বৈশিষ্টজাত ততটা নয়, যতটা
যৌন মাদকতাজাত। পুরুষের চেতনায় নারীর শরীরের যৌনমাদকতার উপর যে লোভ, যাকে আমরা লালসা বলে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্মণরেখায় ধরে রাখতে চাই সমাজ সংসারের
সুস্থতার জন্যে, সেই লালসা আমাদের অধিকাংশ পুরুষের চেতনাতেই
জায়মান থাকে বরাবর। সময় সুযোগ বুঝে, প্রবৃত্তির তারণায় তার
বহিঃপ্রকাশ হয় মাত্র কখনো সখনো। কিন্তু কেউ যদি বলে, তিনি এই
লালসার উর্দ্ধে, তখন বুঝতে হবে তিনি যদি সত্যিই তাই, তবে তিনি ভণ্ড না হলেও সুস্থ স্বাভাবিকও নন। কারণ, নারী
শরীরের যৌনমাদকতার প্রতি আকর্ষিত না হওয়া পুরুষের জৈবিক প্রবৃত্তির ধর্মে
স্বাভাবিক নয় আদৌ। নারীর ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু আমাদের
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে আসলেই বন্দীজীবন কাটাতে হয়, তাই তাকে অধিকাংশ সময়েই তার যৌন লালসাকে গলা টিপে মেরে রেখেই জীবন শুরু
করতে হয়। আমাদের সমাজ সভ্যতা সেইভাবেই তৈরী করে তোলে মেয়েদেরকে।
দ্বিতীয় যে লালসাটি আমাদের জীবনকে আদ্যপান্ত
নিয়ন্ত্রণ করে চলে,আমরা সবাই জানি; সেইটিই আমাদের অর্থলিপ্সা। ধন
সম্পদের উপর লোভ! এই লোভ শুধু ব্যক্তিজীবনকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তাই নয়। এক একটি
রাষ্ট্রকে, গোটা
জাতিকেও সময়ে সময়ে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ বিগ্রহ আসলেই পৃথিবীর
ধন সম্পদের উপর উদগ্র লালসারই বহি:প্রকাশ। ব্যক্তি জীবনের পরিসরে আমরা যে যার
সামর্থ্য মতো অর্থের পেছনে ছুটে চলেছি। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যে যতটুটু দরকার,
আমরা অধিকাংশই ততটুকুতে সন্তুষ্ট নই। নই বলেই তার অতিরিক্ত
অর্থসম্পদের জন্যে উদয়াস্ত বুদ্ধিতে শান দিতে হয় আমাদের। কিন্তু সেই ধন সম্পদের
উপর আমাদের অন্তর্গত লালসার কথা কজনই বা মুখ ফুটে স্বীকার করে থাকি? বিবাহ যোগ্যা কন্যার জন্যে ধনবান অর্থবান পাত্রর খোঁজ কিংবা পুত্রের
বিয়েতে পণ বা যৌতুক গ্রহণ আসলেই সেই অর্থলিপ্সা, ধনসম্পদের
উপর লালসারই প্রকাশ মাত্র। আবার রূপকথার গল্পের মতো রাজপুত্রের কল্পনায় বিভোর থাকা
যুবতী নারীর চেতনায় আসলেই ধন সম্পত্তির উপর লালসাই জায়মান হয়ে ওঠে, যার প্রকাশ ঘটে প্রেমের পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে। এইসবই আমাদের চারপাশের
জীবন প্রবাহের চালচিত্র মাত্র। কিন্তু তবু আমরা প্রকাশ্যে কজনই বা সেই কথা স্বীকার
করে থাকি? আসলেই আমরা শিক্ষিত মানুষরা বিশেষত, নিজেদের আসল স্বরূপের উপর একটি সুভদ্র নান্দনিক সংস্কৃতির আস্তরণ সাজিয়ে
রাখতে তৎপর বেশি। কিন্তু সেই আস্তরণের ভিতরে আমরা আমাদের জৈবিক প্রবৃত্তিরই দাসত্ব
করে চলি মানবিক জীবধর্মের বৈশিষ্ট অনুযায়ীই। অথচ বাইরে বকধার্মিক সেজে দিব্যি
চলাফেরা করি নাগরিক নামাবলি গায়ে জড়িয়ে।
আর অন্তরের অন্তর্গূঢ় জৈবিক তারণায় তলায় তলায় যে
যার মতো এগিয়ে চলেছে তার অবগুন্ঠিত লালসাকেই চরিতার্থ করতে, সময় সুযোগ মতো।
যার সেই সুযোগ নেই, সুবিধে নেই, কিংবা
সাহসে কুলায় না সেই নামাবলির তলায় হাত কামড়ায়। আর যে সুযোগ সন্ধানী সময় মতো সাহস
করে এগিয়ে যেতে পারে সবদিক বাঁচিয়ে তার লালসা চরিতার্থ করতে, সমাজে সেই সাফল্যের বরমাল্য গলায় সভাস্থল আলোকিত করে বসে থাকে। তা সে
পঞ্চায়েতের মজলিশই হোক আর রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ কক্ষই হোক।
এইটাই মানুষের সভ্যতার ভিতরের কথা। তাই অপদার্থ বেকুব মানুষরাই কেবল, নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে কখনো লটারীর টিকিট কাটে, কিংবা পর্ণগ্রাফীর সাইটে লুকিয়ে লগইন করে।
এই যে লালসা, যা আমাদের জৈবিক জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলে,
তা আসলেই আমাদেরকে জীবন যাপনের একটি সাধারণ স্তরে আটকিয়ে রাখে
আগাগোড়া। মানুষের সমাজ সভ্যতায় দেশে দেশে কালে কালে স্মরণীয় বরনীয় সব মহামানবরাই
কিন্তু এই সাধারণ স্তর থেকে উত্তরণের ডাক দিয়ে গিয়েছেন। বস্তুত তারা এই জৈবিক
লালসার ঘেরাটোপ থেকেই ব্যক্তি মানুষের জীবনকে উদ্ধার করতেই চেয়েছিলেন। তাঁরা
বুঝেছিলেন লালসার এই চক্র থেকে মুক্তি না পেলে সমাজ সংসার প্রকৃত সুস্থ হয়ে উঠতে
পারবে না কখনোই। কোন সামাজিক রীতিনীতির চোখরাঙানি দিয়ে কিংবা রাষ্ট্রিক আইনের
বিধান দিয়ে লালসার অন্ধকার থেকে মানুষকে বাঁচানোর ব্যর্থ প্রয়াস নয়। একেবারেই গোড়া
থেকে জৈবিক প্রবৃত্তির মূলগত সংশোধন। কয়েক হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে
রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ শ্রীঅরবিন্দ সবাই সেই পথেরই হদিশ দিয়ে গিয়েছেন, যে পথে এগোলে মানুষ তার অন্তর্গত জৈবিক লালসার অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ
আবিষ্কার করতে পারবে। ক্ষুদ্র আমির জাল
কেটে পৌঁছাতে পারবে বৃহৎ আমিতে। এক মাত্র সেই দিনই জ্বলে উঠবে আলো পুবে পশ্চিমে।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

