আত্মপ্রবঞ্চনার পঁচিশে বৈশাখ



আত্মপ্রবঞ্চনার পঁচিশে বৈশাখ

রবীন্দ্রনাথ হয়তো ভেবেছিলেন, যাক এবার লকডাউনে বাঙালির বাৎসরিক অত্যাচার থেকে একটু রেহাই পাবেন। মৃত্যুর পর ৮৯ বছর গত হলেও, রবীন্দ্রনাথের বাৎসরিক শেষ হয়নি আজও। জানি না কবি মনে মনে খুশি হয়েছিলেন কিনা এই ভেবে যে এবার লকডাউনে বাঙালি আচ্ছা জব্দ হবে। পাড়ায় পাড়ায় ফটো টাঙিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে তারস্বরে মাইক বাজিয়ে রবীন্দ্রকীর্তন আর করতে হবে না এবার। কিন্তু বিধি বাম। লকডাউন তো কি? জুকারবার্গের আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ যে বাঙালির হাতে হাতে। তাই রবীন্দ্রনাথের আর রেহাই নাই। পাড়ায় পাড়ায় তো কোন ছাড়, এবার যে ঘরে ঘরে রবীন্দ্রকীর্তন শুরু হয়ে গেল। কেউ গেয়ে উদ্ধার করছে তো কেউ নেচে। কেউ নিজে না করলেও অপরকে নাচিয়ে ছাড়ছে। রবীন্দ্রনাথ না থাকলে বাঙালির ঘরে ঘরে এত এত সম্পাদক আর সংগঠকের জন্ম হতো না বোধহয়। যে কোনদিন হাতে কলম ধরেনি, ধরবে না। সম্পাদকের দল তাকেও লিখিয়ে ছাড়ছে। একটা রবীন্দ্রসংখ্যা নামাতে হবে তো। আর জুকারবার্গের ফেসবুক লাইভ হাতে পঁচিশে বৈশাখে কত যে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর জন্ম হলো, তার আর হিসাব নাই। না শুধু সঙ্গীত শিল্পই বা কেন, বাচিক শিল্পীরই কি আর অভাব পড়েছে কোন। কিংবা নৃত্যশিল্পীর? পা চলছে না কোমর ঘুরছে না, শুধু হাত ঘুরিয়েই নাচিয়ে ছাড়ছে কবিকে। রামকৃষ্ণ বেঁচে থাকলে হয়তো বলে উঠতেন যত ঘর তত শিল্পী। বাঙালির শিল্প সাধনা নেট বিপ্লবের হাত ধরে আজকে ভিসুভিয়াসের মতোই জেগে উঠেছে। ফলে পঁচিশে বৈশাখে লকডাউন তো কি, সব বাঙালিকে যতক্ষণ না করোনায় ধরছে, ততক্ষণ কবির মুক্তি নাই। জানি না এই বৈশাখে বেঁচে থাকলে কবি লিখে যেতেন কিনা,

“এসো, এসো, এসো হে করোনা।

আপন নিশ্বাসবায়ে বাঙালিকে দাও উড়ায়ে,
চিরজীবনের আবর্জনা দূর হয়ে যাক্।।


বালাই ষাট, বাঙালিকে আবর্জনা বলে কোন আহাম্মক! বাঙালি আছে বলেই না রবীন্দ্রনাথের ফটোতে আজও মালা পড়ে। বাঙালি না থাকলে নোবেল পুরস্কারের এত মাহাত্ম্য ছড়াতো নাকি? ইউরোপ আমেরিকায় ঘরে ঘরে নোবেল। কিন্তু ওখানে মানুষ নোবেল নিয়ে এত মাতামাতি করেছে কোনদিন? মাতামাতি করা কাকে বলে জানে নাকি ওরা? তাই বাঙালি আছে বলেই আজও রবীন্দ্রনাথ টিকে আছেন। টিকে আছে নোবেল পুরস্কারের মাহাত্ম্যও। বাঙালি আছে বলেই না রাস্তাঘাটে পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রকলোনি রবীন্দ্রপল্লী থেকে রবীন্দ্রসরণী। রবীন্দ্রসদন থেকে রবীন্দ্রভারতী। সবখানেতেই রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে রবীন্দ্র পুস্তকালয়। কোথায় নাই রবীন্দ্রনাথ। কবির আক্ষেপ ছিল, তাঁর কাব্য সর্বত্রগামী হয়নি বলে। না হোক। তাতে ক্ষতি নাই। কিন্তু তাঁর নাম? তাঁর নামের মাহাত্ম্য এমনই যে এমন কোন বিষয় নাই, যা তাঁর নামের সাথে যুক্ত নয়। ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। আমারই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি’ বলে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন কবি একদিন। আজ অবাক হওয়ার পালা তাঁর নিজেরই। ‘সোনার তরী’ কালের গতিপথে কেমন ‘রবীন্দ্রতরী’ হয়ে গিয়েছে। সেখানে ঠাকুরের ছবি আছে। নাম আছে। মালা আছে। ধূপধুনো পুজাআচ্চা আছে। ডিগ্রী ডিপ্লোমা পিএইচডি রবীন্দ্র পুরস্কার পর্যন্ত আছে। কিন্তু কোথায় সেই সোনার ধান? রবীন্দ্ররচনাবলীর মলাটেই বন্দী হয়ে পড়ে থাকলো যে দেওয়াল আলমারি জুড়ে। সেদিনের সেই সোনার ধানে বাঙালির পুষ্টি হলো কই?

একবারেই কি বুঝতে পারেন নি কবি? পেরেছিলেন হয়তো অনেকটাই। না হলে বলে যাবেনই বা কেন, বাঙালি তাঁর সব কিছু ফেলে দিলেও গানকে ফেলতে পারবেন না। শুভ্র দাঁড়ির আড়ালে কি হাসছিলেন তখন কবি? বাঙালিকে এমন বাঁশ বোধহয় আর কেউই দিয়ে যেতে পারেনি। কত মহারথী এলো গেল। বাঙালি সবাইকেই কালের অতলে ডুবিয়ে দিতে পেড়েছে হাসতে হাসতে। রামমোহন বিদ্যাসাগর বিবেকানন্দ ঋষি অরবিন্দ নজরুল মাষ্টারদা সূর্য সেন নেতাজী। আরও কত জন। কে আর তার হিসাব রাখে। কতজনে কতই তো চেষ্টা করেছিল। বাঙালিকে মানুষ করার। রামমোহন নাই বধু পোড়ানো আছে। বিদ্যাসাগর নাই। টুকে মুখস্থ করে ডিগ্রী অর্জনের সুবন্দোবস্ত রয়েছে। বিবেকানন্দ নাই, গেরুয়া জড়িয়ে দলবাজি আছে। অরবিন্দ নাই, দাঁড়ি রেখে ঋষি সেজে বুজরুকি আছে। নজরুল নাই হিন্দু মুসলমান আছে। সূর্য সেন নাই বিপ্লবের নামে বন্দুকবাজি আছে। নেতাজী নাই, পাড়ায় পাড়ায় হাফ নেতা থেকে শুরু করে সেজো নেতা মেজো নেতা বড়ো নেতা আছে। স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে আইন সভায় কচি নেতা থেকে ধেড়ে নেতা আছে। রবীন্দ্রনাথ হয়তো বাঙালির হাতে পড়ে মহাপুরুষদের ঐতিহ্য উত্তরাধিকারের পরিণতির বিষয়ে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহালই ছিলেন। তাই রবীন্দ্রসঙ্গীতের নাম করে এক চিরস্থায়ী বাঁশ দিয়ে গিয়েছেন। অন্নপ্রাশন থেকে শুরু করে শ্রাদ্ধবাসর অব্দি বাঙালিকে এই বাঁশ বহন করতেই হচ্ছে।

আজকে যারা ফেসবুক আলো করে গান শোনাচ্ছেন। রবীন্দ্রকাব্য আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন, তাঁদের ঘরে ঘরে উঁকি দিলে দেখা যাবে ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি অনেকেই ক অক্ষর গো মাংস। এক বর্ণ বাংলা জানে না। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশে থেকে। যে মানুষটি দ্যর্থহীন ভাবে মাতৃভাষায় শিক্ষা অর্জনের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরই গান গেয়ে, তাঁরই গান বাজিয়ে নাচ দেখানোর সময়, তাঁরই কবিতা পড়ে শোনানোর সময় কারুরই খেয়াল থাকে না, সেই মানুষটিকে কি ভাবে দুইবেলা অপমান করে চলেছেন নিজেরাই। বাচ্চা পেটে আসতেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের খোঁজ। ঘুষ নিয়ে হোক, দূর্নীতি করে হোক কিংবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই হোক, ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করতে কাকভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত শিশু কোলে মা বাবা। শিশুর মুখে বুলি ফোটার আগেই, হোয়্যার ইজ ইউর আইজ? ফেসবুক লাইভে এসে রবীন্দ্রনাথের শ্রাদ্ধ করার আগে একবার চোখ খুলে কেউ আয়নায় নিজের মুখ দেখে না ভালো করে। দুইবেলা নোট মুখস্ত করিয়ে বেশি নম্বর তোলার ইঁদুরদৌড়ে নিজের সন্তানকে নামানোর সময় কারুরই খেয়াল থাকে না রবীন্দ্রনাথের কথা। খেয়াল থাকে না এই মানুষটিই অক্ষর মুখস্থ করে পরীক্ষা পাশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ করে গিয়েছেন। এই মানুষটিই শিশুদের ভিতর প্রতিযোগিতার ভাইরাস ঢুকিয়ে দেওয়ার বদলে তাদের মধ্যে সহযোগিতার উন্মেষ ঘটানোর কথা বলে গিয়েছেন। আর আজকের ফেসবুক লাইভে রবীন্দ্রনাথের শ্রাদ্ধ করতে আসা অভিভাবকরা প্রতিদিন সেই রবীন্দ্রনাথকে অতলে ডুবিয়ে দিয়ে সাফল্যের সাথে ছেলেমেয়ে মানুষ করে বিদেশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখতে থাকে।

এবং সেই বাঙালির হাত থেকেই সম্বচ্ছর পঁচিশে বৈশাখ ফুল বেল পাতা নিতে হয় কবির বিদেহী আত্মাকে। এর থেকে বড়ো প্রবঞ্চনা আর কি আছে? রবীন্দ্রনাথের লাইন আউরিয়ে, তাঁর লেখা উল্লেখ করে তাঁর গান গেয়ে নাচ দেখিয়ে তাঁর ছবি দেওয়ালে টাঙিয়ে রবীন্দ্রপুজোর নামে আত্ম প্রবঞ্চনার এ এক মহা যজ্ঞ! সেই যজ্ঞে সামিল আট থেকে আশি। অবোধ শিশুকে লাইন ধরে ধরে মুখস্থ করিয়ে সেল্ফি ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেই হলো। সেই শিশুই স্কুল খুললে বাংলা পড়তে লিখতে শিখতে যাবে না কোনদিন। সেই শিশুর মগজেই তোতা পাখির মত বিদেশী ভাষায় কেবল তথ্যের পর তথ্য ঠেঁসে দেওয়া হতে থাকবে। কার বাচ্চার মগজে কত বেশি তথ্য ঠাঁসা, তার বাপ মায়েরই সাফল্যের হাসি তত বেশি চওড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়বে।

খুব জোর মরে বেঁচেছেন কবি। নাহলে চোখের সামনে এই আত্মপ্রবঞ্চনার যজ্ঞ দেখতে হলে গলায় দঁড়ি দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না মানুষটির। নিজে হাতে রাখী বেঁধে যে বাঙালিকে এক করতে এগিয়েছিলেন। সেই বাঙালিই বাংলার বুক চিরে কাঁটাতার বসিয়ে পরস্পর বিদেশী সেজেছে। আজ সেই বাঙালিকেই আবার পোশাক দেখে মানুষ চেনার পাঠশালায় দুইবেলা ওঠবোস করতে হচ্ছে। সেই পাঠশালার হোমটাস্ক করতে করতে আবার লাইভে আসতে হচ্ছে ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।‘-বলে।

আত্মপ্রবঞ্চনার এই শিখরে বসা বাঙালির চওড়া হাসির বহর দেখলে কবির মনে কি প্রতিক্রিয়া হতো জানি না। কিন্তু এটা বলতে অসুবিধা নাই, তাহলে কবি আর যাই হোক ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ গানটি অন্তত লিখে রেখে যেতেন না। বাঙালিকে গাওয়ার জন্য।

২৬শে বৈশাখ ১৪২৭ অব্যয়কথা

কপিরাইট  শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত