বাঙালির আত্মশ্লাঘার
দুইটি দিন
প্রতি বছরই আমাদের জীবনে
আসে একটি করে পঁচিশে বৈশাখ। একটি করে বাইশে শ্রাবণ। আমরা আমাদের প্রাণের ঠাকুরকে কেন্দ্র
করে নিজেদের সেই রবীন্দ্র উত্তরাধিকারের শ্লাঘাকেই চর্চা করি। চর্চা করি বিশেষ যত্নে।
সুনিপুণ দক্ষতায়। এবং বছরে বছরে আমাদের এই দক্ষতার চর্চা সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে
থাকে। আমাদের পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানির ভিতর দিয়ে সেই বিষয়ে আমরা পরস্পরকে অভিনন্দিত
করতে থাকি। সম্প্রদায় নির্বিশেষে এই পথেই আমাদের রবীন্দ্রচর্চার টাট্টু ঘোড়া ছুটতে
থাকে টগবগ করে। কাঁটাতারের উভয় পারেই। না, শুধু বাংলাতেই নয়। বাংলার বাইরেও। কি ভারতে
কি বিশ্বের অন্যান্য দেশে। যেখানেই বাঙালি সেখানেই রবীন্দ্রনাথ। সেখানেই ২৫শে বৈশাখ।
সেখানেই ২২শে শ্রাবণ। সেখানেই আমরা কবিকে তুলে ধরি। সেখানেই আমরা কবির চারপাশে ঘুরপাক
খেতে খেতে নিজেদেরকে আরও বেশি করে আলোকিত করার বন্দোবস্ত করি সুচারুরূপে। এই বিষয়ে
আমাদের দক্ষতা প্রশাতীত। আমাদের এই রবীন্দ্র পরিক্রমা শিক্ষিত বাঙালি সমাজে আজ একটি
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গিয়েছে। বাঙালির সমাজ ও জীবনে সেই প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে রবীন্দ্রনাথকে
খুঁজে পেতে গেলে অতি আধুনিক দূরবীন যন্ত্রেও কুলাবে না।
না, এই বাংলার সমাজ ও
জীবনে এই প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে রবীন্দ্রনাথের কোন বাস্তব অস্তিত্ব নাই। কবির জীবৎকালেও
ছিল না। কবির মৃত্যুর পরেও গড়ে ওঠেনি। শুধু তাই নয়, আমরা যারা এই প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্রচর্চার
ধারক ও বাহক রূপে আত্মশ্লাঘায় দিন কাটাই, তাদের জীবনেও সেই প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্রচার্চার
বাইরে রবীন্দ্রনাথের কোন অস্তিত্ব গড়ে ওঠেনি। বা আরও সুস্পষ্ট করে বললে, গড়ে উঠতেই
দিই নি আমরা। আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ অর্থ যশ খ্যাতি সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের বিষয়ে
একটি উত্তম মূলধন। একটি ঝুঁকিহীন বিনিয়োগ। সুদে আসলে এক লোভনীয় রিটার্ন। তাই আমরা অত্যন্ত
সচেতন ভাবে রবীন্দ্রচর্চার এই প্রাতিষ্ঠানিকতার স্বরূপটিকে সযত্নে লালন পালন করে চলেছি।
বাঙালির সমাজ ও জীবনের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন এই রবীন্দ্রচর্চার প্রাতিষ্ঠানিকতার
ভিতরেই আমাদের রক্ষাকবচ। সেখানেই আমরা সুরক্ষিত। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের অন্তরতম নিভৃতকোণ
কিংবা আমাদের এই বাংলার বৃহত্তর সামগ্রিক সমাজ জীবন, এই দুইয়ের কোথাও আমরা রবীন্দ্রনাথকে
স্থাপন করি নি। করলে আমাদের রবীন্দ্রচর্চার প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিত টলমল করে উঠতো। শিক্ষিত
বাঙালি মাত্রেই আমরা এই বিষয়ে সচেতন। আর সচেতন বলেই নিজেদের জীবনেও যেমন, সমাজের জীবনেও
ঠিক তেমনই আমরা রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখি নি। বা আরও সুস্পষ্ট করে বললে,
তাঁর অস্তিত্বকে সার্থক করার কোনরকম চেষ্টা করি নি।
আমরা শুরু করেছিলাম সাম্প্রদায়িকতার
প্রশ্ন দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ তো সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। আমরা সকলেই জানি। কিন্তু আমরা?
আমরা শিক্ষিত বাঙালি? বিশেষত শিক্ষিত বাঙালির সেই শ্রেণী, যাঁদের কাছে রবীন্দ্রচর্চা
এক উত্তম মুলধন। সুরক্ষিত বিনিয়োগ? আমরা অসাম্প্রদায়িক তো? এই প্রশ্নটিও কি আহাম্মকের
প্রশ্নের মতো শোনাচ্ছে? না বোধহয়। যদি তাই শোনাতো, তবে কাঁটাতারের উভয় পারেই সাম্প্রদায়িক
রাজনৈতিক শক্তিগুলি সমাজে কোনভাবেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠত না। আমরা যদি সাম্প্রদায়িক না
হতাম, তবে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হলেও কোন শক্তিরই সাধ্য ছিলনা বাংলাকে দুই ভাগ করার।
আমরা যদি সাম্প্রদায়িক না হতাম, তবে এক বাংলা এতদিন দুই ভাগে বিভক্তও থাকতো না। আমরা
যদি সাম্প্রদায়িক না হতাম, তবে বাঙালি হিন্দু বাঙালি মুসলিম সমাজের ভিতর পাত্রপত্রীর
বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে সমাজের কোন বাধা থাকতো না। আমরা যদি সাম্প্রদায়িক না হতাম,
তবে প্রতিটি বিষয়ে আমরা ‘আমরা ওরা’ করে বেড়াতাম না। আমরা যদি সাম্প্রদায়িক না হতাম
তবে নিজেদেরকে সংখ্যাগুরু কিংবা অন্যদেরকে সংখ্যালঘু তকমা দিয়ে বিচার করতাম না। না,
আমরা কেউই অসাম্প্রদায়িক নই। অসাম্প্রদায়িক নই কবির মতো। আমরা যত না বাঙালি, তার থেকে
অনেক বেশি আমরা হিন্দু। আমরা মুসলিম। কবি বলেছিলেন রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নি।
আসলে আমরা রয়ে গিয়েছি সাম্প্রদায়িক হয়ে। রয়ে গিয়েছি হিন্দু হয়ে। রয়ে গিয়েছি মুসলিম
হয়ে। আমরা বাঙালিও হই নি। মানুষও হই নি।
রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার
বহন করে বেড়ানো এই বাঙালি আদ্যপান্ত সাম্প্রদায়িক। আদ্যপান্ত সাম্প্রদায়িক বলেই সে
নিজের পরিচয় বলতে বোঝে সে হিন্দু না মুসলিম। নিজের দেশ দুটুকরো হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও
তার কিছু এসে যায় না। সে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করে, সে তার নিজ সম্প্রদায়ের সুরক্ষা কবচের
ভিতর বাস করছে তো! সেই সুরক্ষার কবচের ভিতর বাস করে, সে সময় ও সুযোগমতো অন্য সম্প্রদায়ের
বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষ উগড়িয়ে চলে। এই বিষ উগড়িয়ে চলার মনোবৃত্তিই আজকের বাংলার প্রধানতম
রাজনৈতিক মূলধন। কম বেশি কাঁটাতারের উভয় পারেই। রবীন্দ্র উত্তরাধিকার বহন করা বাঙালি
তার এই চারিত্রিক প্রকৃতির কারণেই আজও অবাঙালি জাতিসমূহের হাতের পুতুল হয়ে পরস্পর কাদা
ছোঁড়াছুড়ি করে চলেছে। সময় ও সুযোগ বুঝে তার পরিমাণ বাড়ে কমে শুধু। না, এই অবস্থা শুধু
যে বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থানের গণ্ডীর ভিতরেই আবদ্ধ তা নয়। এই অবস্থাই বাংলার সমাজজীবনের
মূল বৈশিষ্ট। মূল বৈশিষ্ট বলেই ১৯৮৯ সালে দুই জার্মান এক হয়ে যাওয়ার পর তিন তিনটি দশক
অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এতবড়ো ঘটনার কোন প্রভাব পড়লো না বাংলার সমাজজীবনে। সেই সমাজ জীবন
বরং বিগত তিন দশকের নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় আরও বেশিরকম সর্বাত্মক ভাবে সাম্প্রদায়িক হয়ে
উঠেছে।
না সাম্প্রদায়িক এই বাঙালির
পক্ষে তাই আর কোনদিনই বলা সম্ভব হলো না, ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত
ভাই বোন- এক হউক, এক হউক….” এরপরেও যখন আমরা ঘটা করে গেয়ে
উঠি, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ তখন বোধকরি রবি ঠাকুরের মৃত আত্মাও আঁৎকিয়ে
ওঠে। সমাজের পরতে পরতে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করতে থাকা একটি জাতি যখন তার শ্রেষ্ঠ
কবির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য কবিরই প্রবর্তিত রাখীবন্ধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে,
তখন তামাশার ষোলকলা পূর্ণ হয়। বাঙালির ভোটের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভরকেন্দ্র সাম্প্রদায়িকতা
চর্চার ভিত। সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু তত্ব। বাঙালির সমাজ জীবনের পরতে পরতে হিন্দু মুসলিম
দুটি আলাদা ধারা। চিরকাল সমান্তরাল বয়ে চলে গেল। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ভক্তি বিশ্বাস ভালোবাসা
সহমর্মিতাকে সযত্নে পাশ কাটিয়ে। উল্টে রাজনৈতিক জমি তৈরী করতে ও তাকে শক্ত পাকাপোক্ত
করে তুলতে পারস্পরিক বিভেদ বিদ্বেষ ও বিচ্ছিন্নতার কোন বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায়নি আজও।
আশ্চর্যের বিষয়, ভারতবর্ষে অন্যান্য বহু জাতিতেই হিন্দু মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের
বাস। এবং তারা শত শত বছর ধরে একসাথে বসবাস করে আসছে। তার জন্য সেই জাতিসমূহের ভৌগলিক
অঞ্চলগুলির প্রত্যেকটিকে বাংলার মতো কেটে দুভাগ করতে হয় নি। পরস্পরিক দূরত্ব থাকলেও
বাঙালির মতো এমন চরম সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস অন্যত্র বিশেষ পাওয়া যায় না। অনেকেই একমত
হবেন না জানি। সাম্প্রতিক কালের ভারতীয় রাজনীতি তার অনেকটাই উল্টো সাক্ষ্য দিচ্ছে।
আমরা জানি। কিন্তু তার পিছনের কারণ যতটা না সামাজিক তার থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক। এবং
অনেক বেশি অর্থ ঢালা হচ্ছে সেই রাজনীতিকে সফল করে তোলার জন্য। যদিও সেসব বর্তমান আলোচনার
বিষয় নয়। এবং আরও একটি বিষয় স্মরণে রাখতে হবে। অন্যান্য ভারতীয় জাতিসমূহের কিন্তু বাঙালির
মতো একজন রবীন্দ্রনাথও নাই। যে জাতির একজন রবীন্দ্রনাথ থাকে, সেই জাতির সমাজের সাম্প্রদায়িক
হয়ে ওঠা মানায় না। এখানেই বাঙালির সবচেয়ে বড়ো পরাজয় ঘটে গিয়েছে।
অনেকেই ভাবতে পারেন কেন
মানায় না? বাংলার সমাজ তো রবি ঠাকুরের জন্মের অনেক আগে থেকেই হিন্দু মুসলিমে বিভক্ত।
মানায় না, এই কারণেই যে, আমরা ঘোষিত ভাবে এই একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষকে আমাদের প্রাণের
ঠাকুর হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছি। আমাদের সেই শিক্ষিত শ্রেণীর জীয়নকাঠিই এই রবীন্দ্রনাথ।
তারপরেও আমরা তার জীবনদর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে বসবাস করি। একটি সাম্প্রদায়িক
জাতি যখন একজন অসাম্প্রদায়িক যুগপুরুষকে নিয়ে গর্ব অনুভব করে, তখন তার মতো দ্বিচারিতা
আর হয় না। বাঙালি তার সাধের ভাষায় আসলেই হিপোক্রীট। হিপোক্রেসি তার রক্তে। হ্যাঁ কাঁটাতারের
উভয় পারেই। সেই কারণেই আদ্যপান্ত সাম্প্রদায়িক হয়েও বাঙালি, বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালি,
রবীন্দ্র উত্তরাধিকার বহনকারী বাঙালি রবীন্দ্রনাথের মতো একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষকেও
অর্থ যশ প্রতিপত্তি লাভের মুলধনে পরিণত করে ফেলতে পেরেছে। হৃদয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ
ধারণ করেও রবীন্দ্রনাথের বাণী মুখস্থ করে হাততালি কুড়াচ্ছে। যেখানে যখন যে রাজনৈতিক
শক্তি বেশি করে সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলছে, সেই শক্তির কাছে গিয়েই ভিড় করছে। আরও বেশি
তীব্র ভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর এক অলিখিত প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। বিদ্বেষেই
বাঙালির আনন্দ। বিভেদেই বাঙালির শক্তি। বিছিন্নতাই বাঙালির স্বধর্ম। সম্প্রদায় নির্বিশেষে।
কি হিন্দু কি মুসলিম।
কি চেয়েছিলেন আমাদের
রবীন্দ্রনাথ? চেয়েছিলেন বাঙালি সবালক হয়ে উঠুক। চেয়েছিলেন তাকে যেন কেউ কোন চুষিকাঠি
হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাঁদর নাচ নাচাতে না পারে। চেয়েছিলেন বাঙালি যেন মানুষ হয়ে উঠতে পারে।
যে কোন মনীষীই নিজের জাতির জন্য এমনটাই চেয়ে থাকেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথ কোন ব্যাতিক্রম
নন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শুধু এইটুকুই চান নি। তিনি চেয়েছিলেন আমরা আমাদের ক্ষুদ্র
‘আমি’র গণ্ডী থেকে বেড়িয়ে এসে যেন বৃহৎ ‘আমি’র দিগন্তে মুক্তি লাভ করি। যে মুক্তি লাভই
হচ্ছে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার প্রধান শর্ত। যে শর্ত আমাদেরকে বিশ্বের নাগরিক সমাজে সম্মানের
সাথে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। আমাদেরকে, আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রতা থেকে, সাম্প্রদায়িক
প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত করে বিশ্ব সমাজে মানুষ হিসাবে অধিষ্ঠত হয়ে ওঠার মন্ত্র দিতেই
এসেছিলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। আমরা কেউই তাঁর সেই মন্ত্র নিজের ব্যক্তিজীবনে গ্রহণই
করি নি। কবি ঠিক এই কারণেই পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি উপলব্ধি
করেছিলেন পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদ আমাদের সাম্প্রদায়িকতার মতোই মানবতা বিরোধী এক শক্তি।
এই শক্তি বিচ্ছিন্নতাকে মদত দেয়। বিদ্বেষকে হাতিয়ার করে তুলে বিভেদকেই সার্থক করে।
ঠিক আমাদের বাঙালির মতোই। বাঙালির গুঁতো গুঁতি নিজ জাতির ভিতর হিন্দু মুসলিমে। উচ্চ
বর্ণ নিম্ন বর্ণে। পাশ্চাত্যের গুঁতোগুঁতি ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তার ভিতরে। যার চুড়ান্ত
পরিণতিই দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ। রবীন্দ্রনাথই সম্ভবত প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতা
ও জাতীয়তাবাদ একই মুদ্রার দুই ভিন্ন পিঠ। তাই এই দুইটি মানবতা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধেই
ছিল তাঁর আমরণ অবস্থান।
রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন
এই দুই অপশক্তিকে দমন করতে না পারলে মানুষের এই পৃথিবী কোনদিনের জন্যেই নবজাতকের বাসযোগ্য
হয়ে উঠবে না। কবির সমস্ত সৃষ্টির ভিতর দিয়ে যদি নিবিড় ভাবে পরিক্রমণ করা যায়, তবে এই
সত্য দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে ওঠার কথা। তিনি এও অনুধাবন করেছিলেন এই দুই অপশক্তির
থেকে মুক্তির একটিই উপায়। মানবতাবাদের শিক্ষাকে সর্বত্র পরিব্যাপ্ত করা। মানবতার এই
শিক্ষা তখনই সম্ভব হবে যখন মানুষকে ব্যক্তি ‘আমির’র ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত করে বৃহৎ
‘আমি’র সামাজিক দিগন্তে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। আর সেটি করতে হবে একেবারে শিশুকাল থেকে।
চার দেওয়াল থেকে মুক্ত করে শিশুকে তার বাল্যকালেই প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে নিয়ে এসে
এই শিক্ষায় দীক্ষিত করার সাধনাই ছিল কবির জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। তিনি একার হাতে
যে কাজ শুরু করে গিয়েছিলেন, আমরা সকলের হাতে সেই কাজ সম্পূর্ণভাবেই ভণ্ডুল করে দিয়েছি।
দিয়েছি যে তার বড়ো প্রমাণ আজকের বিশ্বভারতী। কিন্তু কবির কাজ কবি করে গিয়েছেন। আমাদের
কাজ আমরা করেছি। করছি। এমনটা নয়, আমরা অসতর্ক। তাই তাঁর পথের উল্টো দিকে হাঁটা দিয়েছি।
না, আমরা সম্পূর্ণ সচেতন ভাবেই উল্টো দিশায় এগিয়ে চলেছি। কারণ কবির কাছে যেটি পথ, আমাদের
কাছে সেটি বিপত্তি। কবির কাছে যেটি বিপত্তি, আমাদের কাছে সেটিই একমাত্র পথ। আমাদের
আশ্রয়। বাঙালির সমাজ জীবনে জাতীয়তাবাদের বিষ কোনদিনই ছিল না। সেটি মূলত পাশ্চাত্য সভ্যতার
দান। পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বধর্ম। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা বাঙালির সমাজের প্রধানতম লক্ষ্মণচিহ্ন।
সেই দুর্লক্ষ্মণ থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্তির দিশা দিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার
সৃষ্টি ও কর্মে। জীবন ও সাধনায়। আমরা আমাদের লক্ষ্যে স্থির থেকে তাঁর সেই কর্ম ও সাধনাকে
সাফল্যের সাথে বানচাল করে দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা পেরেছি, আমাদের বাঙালি জাতিকে রবীন্দ্রনাথের
হাত থেকে রক্ষা করতে। আমরা পেরেছি, বাঙালির স্বধর্মে বাঙালিকে ধরে রাখতে। তাকে নিরন্তর
সাম্প্রদায়িকতায় দীক্ষিত করে তুলতে। তাই বাঙালি মাত্রেই মূলত সাম্প্রদায়িক। বাঙালি
মাত্রেই মূলত হিন্দু মুসলিম। বাঙালিও নয় মানুষও নয়।
লজ্জার কথা, রবীন্দ্র
তিরোধানের মাত্র পাঁচ ছয় বছরের ভিতরেই রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বাঙালি তার চিরদিনের
মাতৃভুমিকে দুটুকরো করে বিভক্ত করে স্বাধীনতার জয়োল্লাসে ফেটে পড়েছিল ১৯৪৭ সালে। এই
তো আমাদের রবীন্দ্র উত্তরাধিকার! তার জন্যেই আমাদের যাবতীয় শ্লাঘা! আমাদের শিক্ষিত
বঙ্গসমাজের। সেই আমরাই পরবর্তী আট দশক ব্যাপী ধুমায়িত সেই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পকে
নিয়মিত আঁচ দিয়ে চলেছি। আর বছর ভর ঘটা করে পঁচিশে বৈশাখ থেকে বাইশে শ্রাবণ আমাদের রবীন্দ্রনাথকে
বাঁচিয়ে রেখেছি। ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রনাথকে মূলধন করে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে। শিক্ষিত
বাঙালি সাম্প্রদায়িক বাঙালি। রবীন্দ্র অনুরাগী বাঙালি। যে ব্যক্তি ‘আমি’র ক্ষুদ্রতা
থেকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ব্যাক্তি ‘আমি’র সাম্প্রদায়িক
ক্ষুদ্রতায় আমরা নিজেদেরকে কেমন অবিচল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্ব ইতিহাসে এরকম নজির
আর আছে বলে বলে হয় না।
না আমরা বাঙালিরা না
হয়েছি বাঙালি। না হয়েছি মানুষ। আমরা হিন্দু থেকে আরও বেশি হিন্দু হয়ে উঠেছি। মুসলিম
থেকে আরও বেশি মুসলিম হয়ে উঠেছি। আমাদের মাঝখানে হিপোক্রেসির যে সাঁকোটাকে আমরা সযত্নে
ধরে রেখেছি, তারই নাম পঁচিশে বৈশাখ। বাইশে শ্রাবণ। বাঙালির
আত্লশ্লাঘার দুইটি দিন।
২৯শে এপ্রিল’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

