কবিতার মুহুর্ত



কবিতার মুহুর্ত

কখন আসে কবিতার মুহুর্ত? কি ভাবে আসে? সব কবিতাই কি কোন না কোন কবিতার মুহূর্তের অনুপম উদ্ভাসন? ফরমায়েশি কবিতার জন্মও কি হয় না? এইসব প্রশ্নগুলিই সম্প্রতি মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এক এক জন কবির কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, নিশ্চিত ভাবেই এক এক জন কবির উত্তর এক এক রকম হবে সন্দেহ নাই। এইখানে আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসতে পারে, এই যে কবিতার মুহুর্ত- সে কি দূর্লভ না সুলভ? যাঁরা প্রচুর কবিতা লেখেন, তাঁরা কি এক প্রবাহমান কবিতার মুহূর্তের মধ্যেই বাস করেন? নয়তো এত বেশি পরিমাণে কবিতার সৃষ্টিই বা হয় কি করে? আবার সঙ্গে সঙ্গেই আরও একটি যুক্তি মনের কোনে শান দিতে থাকে। মুহুর্ত মানেই তো ক্ষণিকের আয়ু। না কি বড়ো বড়ো কবিদের সৃজনশীল মননে ক্রমাগতই উদ্বোধিত হতে থাকে কবিতার এক একটি অম্লান মুহুর্ত?

মনে হয়, যে কবির সংবেদনশীলতার অনুভবের বিস্তার ও গভীরতা যত বেশি, তাঁর ক্ষেত্রেই হয়তো এই অম্লান মুহুর্তগুলি তত বেশি ঘন ঘন আসে। আর আসে বলেই, তাঁর এক একটি লেখনীর প্রত্যয় এত বেশি সংখ্যক মানুষকে এত বেশিবার করে আন্দোলিত করে। আর করে বলেই আমরা বারবার তাঁদের কাছে ছুটে যাই। এইখানেই হয়তো তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের ভিত। অর্থাৎ কবিতার যে মুহুর্ত নিয়ে কথা বলছিলাম, এই অম্লান মুহুর্তগুলির পশ্চাতে অবশ্যই রয়েছে কবির সংবেদনশীল অনুভবের এক একটি মহাদেশ। এই সংবেদনশীলতা ছাড়া কবিতার কোন অম্লান মুহূর্তের উদ্ভাসন সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এবং এইখানেই বড়ো কবি আর সাধারণ কবিদের মধ্যে পার্থক্য। বিশ্বসাহিত্যের পাঠ নিতে গেলেই আমরা মুখোমুখি হই এই সত্যের।

ভাবা যাক সকল মহাকবিদের কাছেই এই আর্জি নিয়ে যাওয়া হল, বলতে হবে তাঁদের; এক একটি বিশ্ববিখ্যাত কবিতার সৃষ্টির অন্তরের সেই কবিতার মুহূর্তের কথাগুলি। যে কবিতাগুলি যুগ যুগ ধরে পাঠককে বিমোহিত করে রেখেছে। এক এক কাল তার নিজস্ব মূল্যবোধে যে কবিতাগুলিকে আবিষ্কার করেছে নিজের মতো করে। যে কবিতাগুলির মধ্যে দিয়ে উদ্বোধিত হয়েছে কোন না কোন বিশ্বসত্যের। যে কবিতাগুলি পরবর্তী সাহিত্যধারার ভিত তৈরী করে দিয়ে গিয়েছে। সেই সব কবিতার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা কবিতার মুহুর্তগুলির গল্প যদি শুনতে পেতাম আমরা? যদি ধরে রাখা যেত সেই গল্পগুলিও কবিতার সাথে সাথে। কবির কবিতাগুলির পাশাপাশি! কেমন অভিজ্ঞতা হতো পাঠকের?

অনেকেই আমরা চমকে যেতাম হয়তো। অতি পরিচিত অতি ব্যবহৃত কবিতার আড়ালের অবগুন্ঠিত সত্যের আচমকা আবির্ভাবে। অনেকেরই হয়তো অসুবিধে হতো নিজের জানার সাথে কবির জানা মিলেই নিতে গিয়েই। অনেকেরই সামনে হয়তো খুলে যেত অতি পরিচিত কবিতারই নতুন এক মহাদিগন্তের অনেকান্ত রূপরেখা। আবার অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলতেন এই বলে যে এতে কবিতার অভ্যন্তরীণ যে শক্তি এক এক জন পাঠকের মননশীলতায় এক এক রকম ভাবে জায়মান হয়ে ওঠে; সেই শক্তিটিই হয়তো হারিয়ে যাবে। কবিতার নেপথ্যের এই অবগুন্ঠিত কবিতার মুহূর্তের প্রকাশ্য আবির্ভাবে। কেননা তখন কবির বলে দেওয়া অনুষঙ্গটিই হয়তো কবিতাকে ছাপিয়েই দাঁড়িয়ে যাবে অটল অনড় হয়ে। আর সেই দৃঢ় কাঠোমোটুকুই পড়ে থাকবে পাঠকের হাতে। হারিয়ে যাবে কবিতার মায়াজাল। যে মায়াজালে পাঠক আশ্রয় পায় তার ভালোলাগা কবিতার কাছে। যে মায়াজালে পাঠক বিশ্রাম পায় তার ভালোবাসার কবিতার কাছে। যে মায়াজালে পাঠক শক্তি পায় তার প্রিয় কবিতার থেকে।

অর্থাৎ সব সত্যটুকুই জানা হয়ে গেলে আর যেমন সেই বিষয়ে নতুন কিছুই আবিষ্কার করার উন্মাদনা অবশিষ্ট থাকে না, ঠিক তেমনই হয়তো কবিতার সাথে কবিতার নেপথ্যে থাকা কবিতার মুহূর্তের এই গল্পগুলিও জানা হয়ে গেলে, সেখানেই হয়তো থেমে যেতে পারে কবিতার চলন। কবিতার গতি। ঠিক এমনটিও ভাবতে পারেন অনেকেই। কবিতার প্রবাহমান কালোত্তীর্ণ ধারায় পড়ে যেতেও পারে অন্তিম যতিচিহ্ন।  কবিতার পাঠকের কাছে সে তো এক গভীর দুঃসময়। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে কবিতার গবেষকের কাছে খুলে যেতে পারে নতুন এক বড়ো দিগন্ত। উন্মোচিত হতে থাকবে কবি আর তার কবিতার মধ্যেকার নিবিড় সম্পর্কের রসায়নগুলি। যে কোন সাহিত্য গবেষকের কাছে সে এক আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের মতই স্বপ্নময়!

কিন্তু এতো গেল পাঠকের কাছে কবিতার মুহূর্তের অভিঘাত কেমন হতে পারে সেই কথা। আবার সব পাঠকের কাছেই যে এক রকম অভিঘাত হবে বিষয়টি আদৌ সেরকম নয়। এক এক জন পাঠক এক এক ভাবে বেজে উঠবেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কি ভাবে সৃষ্টি হয় এই কবিতার মুহুর্তগুলি? যে মুহুর্ত এক এক জন কবির অন্তরে এমন কিছু অভিঘাতের জন্ম দিয়ে যায়, যা থেকে সৃষ্টি হয়ে ওঠে সাহিত্যের এক একটি অম্লান সম্পদের? আগেই দেখানো হয়েছে কবির সংবেদনশীলতার বিস্তার ও গভীরতার উপরেই নির্ভর করে কবিতার মুহূর্তের জন্ম হওয়া। কবি তার পরিপার্শ্বের প্রবাহমান জীবনযাত্রার বিভিন্ন অনুষঙ্গগুলির সাথে কি ভাবে সংলগ্ন থাকবেন, সেটি এক এক জন কবির কাছে এক এক রকম হতেই পারে। কিন্তু সময়ের সাথে এই সংলগ্ন থাকা এবং সেই থাকার মধ্যে মানবিক সংবেদনশীলতার আধারেই তৈরী হয়ে উঠতে পারে কবিতার এক একটি অনুপম মুহূর্তের। যে মুহুর্তগুলি কবির মননশীলতায় সৃজনশীলতার ঢেউ তোলে। যে ঢেউগুলি কবির জীবনবোধে পরিপুষ্ট হয়ে কবির কালচেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে আবহমান জীবনপ্রবাহের সারসত্যে। আর তখনই জন্ম হতে থাকে এক একটি চিরকালীন কবিতার। যে কবিতার মধ্যে আশ্রয় ও বিশ্রাম পাবে পাঠক। যে কবিতার মধ্যে শক্তি অর্জন করতে পারবে পাঠক তার মানবিক মূল্যবোধের দিগন্তে। যে কবিতার মধ্যে স্বাক্ষর রাখবেন কবি বিশ্বসাহিত্যের। এইখানেই কবিতার মুহূর্তের অম্লান মূল্য।

পাঠক হিসাবে আমরা সেই মুহূর্তের খোঁজ করি আর না করি, তাতে কিছুই যায় আসে না। যায় আসে না আমাদের। যায় আসে না বিশ্বসাহিত্যের। যায় আসে না কবির নিজেরই। কেননা ততক্ষণে সেই দুর্মূল্য কবিতার মুহূর্তের অভিঘাতে কবির বীণায় জেগে উঠেছে সেই বাণী, যে বাণী পথ দেখাবে যুগে যুগে। যে বাণী ভিত তৈরী করে দেবে যুগান্তরের। যে বাণীর আশ্রয়ে পাঠক নিশ্চিন্ত হবে কালে কালে। যে বাণীই সাহিত্য হয়ে উঠে ধরে রাখবে সভ্যতার আয়ুধকে। ধারণ করবে মানবিক প্রত্যয়কে সাহিত্যের মূল্যে। সাহিত্যের শ্রীতে।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত