ট্যাগ দিয়ে যায় চেনা




ট্যাগ দিয়ে যায় চেনা

ফেসবুকের বন্ধুত্ব। অনেকেই মনে করে থাকেন এটি নিছকই ভার্চ্যুয়াল ফ্রেণ্ডশিপ। এর সাথে আন্তরিক বন্ধুত্বের কোন সংযোগ থাকতে পারে না। অনেকে আবার এও মনে করেন, পাড়া প্রতিবেশী সকলের সাথে যেমন নিছক লৌকিকতার সম্পর্ক আমাদের, ফেসবুকের বন্ধুত্বও অনেকটা সেইরকম। তবে অধিকাংশই ফেসবুকের বন্ধুত্বকে আত্মপ্রচারের কাজে লাগিয়ে থাকেন। সহজ জনপ্রিয়তার সোপান হিসাবে ফেসবুক খুবই কার্যকরী মাধ্যম বলেই মনে করেন অনেকে। হ্যাঁ খুব কম মানুষই ফেসবুকের বন্ধুদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। বা গড়ে তোলেন।

ফেসবুক আসলে একটি মুনাফালোভী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। যে কারণে, আমার আপনার ফেসবুকের পোস্ট, ফেসবুক কখনোই আমার আপনার প্রত্যেক বন্ধুর নিউজফীডে পৌঁছিয়ে দেয় না। বরং বিভিন্ন ধরণের বিজ্ঞাপন দিয়েই সেই নিউজ ফীডগুলি ভরিয়ে রাখে। এখন ধরা যাক আমি আপনি এমন কিছু পোস্ট করলাম, যেটি আমার আপনার প্রত্যেক বন্ধুর কাছে পৌঁছিয়ে দিতে চাই আমি বা আপনি। না সেটি কখনোই ফেসবুক আমাকে আপনাকে করতে দেবে না। দিলে ফেসবুকের পোস্ট করা বিজ্ঞাপনগুলি মার খাবে। ফেসবুকের মূল উদ্দেশ্য সেই বিজ্ঞাপনগুলিই আমার আপনার বন্ধুদের ওয়ালে বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে সেখানে আমার আপনার করা পোস্ট ভরে গেলে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমে যাবে।

অর্থাৎ ধরা যাক আপনার মোট ফেসবুক বন্ধু ৩০০০ জন। আপনি আজকে যে কবিতাটি নতুন লিখে নিজের ওয়ালে পোস্ট করলেন, সেটি কখনোই আপনার সেই ৩০০০ জন ফেসবুক বন্ধুর নিউজফীডে দেখা যাবে না। দেখতে দেবে না ফেসবুক। ফেসবুক প্রথমে দেখবে, কোন কোন বন্ধু আপনার প্রোফাইলকে সী ফার্স্ট করে সেট করে রেখেছে। যে সংখ্যাটি সর্বাধিক ৩০০০ জন হতে পারে। যেটি সংখ্যায় সম্ভব হলেও বাস্তবে কখনোই নয়। প্রসঙ্গত ফেসবুক, একজন ফেসবুক ইউজারকে সর্বাধিক মাত্র ৩০ জনের প্রোফাইল সী ফার্স্ট করে সেট করে রাখতে দেয়। ফলে অধিকাংশ ফেসবুক ইউজারই সাধারণত খুব বাছাই করা বন্ধুদের প্রোফাইলকেই সী ফার্স্ট করে রাখে। এরপর আছে কতজন বন্ধু আপনার প্রোফাইলকে ক্লোজড ফ্রেণ্ড করে রেখেছে। তারপর সাধারণত কোন কোন ফেসবুক ফ্রেণ্ডের সাথে আপনার অধিকতর যোগাযোগ রয়েছে। ফেসবুক এইসব হিসাব নিকাশ করেই আপনার বেশ কয়কজন ফেসবুক ফ্রেণ্ডের নিউজফীডে আপনার নতুন কবিতাটি পৌঁছিয়ে দেবে। এবং সেই সংখ্যাটি ৩০০০ জনের থেকে অনেক অনেক অনেক কম হবে। হবেই।

ধরা যাক আপনার এই ৩০০০ জন বন্ধুর ভিতর আপনার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধ ৩০০ জন। এই ৩০০ জন বন্ধুকেই আপনি ক্লোজড ফ্রেণ্ড করে রেখেছেন। যাঁদের ভিতর অনেকেই কবিতা লেখেন বা পড়েন। তাই আপনার ইচ্ছা তাদের সকলের কাছেই আপনার নতুন লেখাটি পৌঁছিয়ে দেওয়ার। না ইচ্ছা থাকলেও আপনার কিন্তু সে উপায় নাই। আপনি বড়োজোর ১০০ জন নির্দিষ্ট বন্ধুর নিউজ ফীডে আপনার পোস্টটি পৌঁছিয়ে দিতে পারেন। আর ফেসবুক সেই জন্যেই ট্যাগ নামক অপশানটি দিয়ে রেখেছে। খুব বেশি হলে একটি পোস্ট ১০০ জন বন্ধুকে কেউ ট্যাগ করতে পারে। এর বেশি ফেসবুক স্বাধীনতা দেয় না।

তাহলে আপনার প্রিয় পোস্টটি আপনি অত্যন্ত প্রিয় নির্দিষ্ট ১০০ জন বন্ধুকেই ট্যাগ করে পাঠাতে পারলেন। আপনিও খুশি। বাঙালি সমাজে বারো মাসে তেরো পার্বণ। ঘরে পুজো দিয়েছেন। ঠাকুরের প্রসাদ নিয়ে পাড়া প্রতিবেশীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই প্রসাদ বিতরণ করে এলেন। এখন সেই সময় কেউ যদি মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলে, আমি এসব পছন্দ করি না? কেমন লাগবে আপনার? ঠিক তেমনই লাগবে, আপনার ট্যাগ করা পোস্টের উত্তরে কেউ যখন বলবে, আর কখনো আমাকে ট্যাগ করবেন না।

বাড়ি বাড়ি পুজোর প্রসাদ পৌঁছিয়ে দিয়ে আসা আর ফেসবুক ফ্রেন্ডদের কোন পোস্টে ট্যাগ করা বিষয়টির ভিতর মিল একটি জায়গাতেই। আপনি সেই মানুষটির বাড়িই প্রসাদ দিতে যাবেন, যাঁকে অন্তর থেকে পছন্দ করেন। ট্যাগও তাই আপনি আপনার অপছন্দের কোন ফেসবুক ফ্রেণ্ডকে করবেন না। কিন্তু সেই পছন্দের মানুষটিই যখন আপনার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার মতো করে বলবেন, আর কখনো আমাকে ট্যাগ করবেন না, কই আমি তো আপনাকে কখনো ট্যাগ করি না! তখন আশা করি বন্ধু চিন্তে আপনার দেরি হবে না। কি দরকার তাকে ফ্রেণ্ডলিস্টে ধরে রাখার? তাতে ফ্রেণ্ডলিস্টের দৈর্ঘ যদি কমে ৩০০০ থেকে ৩০ হয়েও যায়, যাক না। ক্ষতি কি? বরং আপনি সেই ৩০ জনকেই পরমাত্মীয় বলে ভরসা করতে পারবেন।

প্রসঙ্গত অনেকেই অজুহাত খাড়া করেন এই বলে যে, অনেক অপ্রয়োজনীয় ফালতু পোস্ট ট্যাগ করে মানুষে। বেশ তো সেই সব ফালতু পোস্ট ট্যাগ করা মানুষকে নিজের ফ্রেণ্ডলিস্টে না রাখলেই হয়। অনেকের অজুহাত, অপরের ট্যাগে নিজের ওয়াল ঢাকা পড়ে যায়। আমার নিজের ওয়ালে আমার পোস্টই থাকবে। কেন সেখানে পাঁচজনের পোস্ট ভরে থাকবে। অনেকটা আমার ঘরে আমি কি রাখবো সেটি আমার নিজের স্বাধীনতা। সেখানে অন্য কেউ তার মাল রেখে যাবেই বা কেন। অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ কথা। আর সেই জন্যেই ফেসবুক এমন একটি সেটিং প্রত্যেকে উপহার দিয়ে রেখেছে, যাতে যে কেউই আপনাকে ট্যাগ করুক না কেন, সেটি আপনার নিজের ফেসবুক ওয়ালে ততক্ষণ শো করবেই না, যতক্ষন না আপনি সেটি এলাউ করছেন। আপনি ট্যাগ করা সেই পোস্টে লাইক করুন কমেন্ট করুন। আপনার নিজের ওয়ালে ট্যাগ করা পোস্টটি এলাউ না করেই সেসব করা সম্ভব। তাতে আপনার বন্ধুও খুশি। আপনিও নিশ্চিন্ত। আর এরপরেও সত্যই যদি কেউ ট্যাগ করলেই আপনার আমার মাথা গরম হয়ে যায়। সবচেয়ে অনেস্টির কাজ হবে নিজের ফেসবুক একাউন্টটি ডিলিট করে দেওয়া। ফেসবুকে বসে থাকবো। ফ্রেণ্ডলিস্ট লম্বা করবো। নিজের পোস্টে লাইক কমেন্ট গুনবো। অথচ নিজেরই ফেসবুক ফ্রেণ্ডের ট্যাগ করা পোস্ট দেখলেই মাথা গরম হয়ে যাবে। এতো পুরো মগের মুলুক!!!!

৩রা জানুয়ারী ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত