কবির অভিপ্রায়
কবিতা লেখেন ভালো কথা। কিন্তু
কবিতাই বা কেন? কি হয় কবিতা লিখে? কি পান? আনন্দ!
তৃপ্তি! মুক্তি! অর্থ! খ্যাতি! পুরস্কার! যাই পান না কেন, এইগুলিই
কি তবে একজন কবির কবিতা লেখার মূল অভিপ্রায়? এই সব স্বপ্ন
বলুন আশা বলুন উদ্দেশ্য বলুন, সেগুলির দিকে তাকিয়েই কি কবিতা
লিখবেন একজন কবি? অর্থাৎ কবির অভিপ্রায় বলতে আমরা কি এই সব
বিষয়গুলিই বুঝে নেব? নাকি এইসব কিছুর বাইরেও কবির কোন
অভিপ্রায় থাকতেও পারে? এইসকল বিষয় নিয়েই সম্প্রতি হয়ে গেল
কবিতাউৎসব আয়োজিত পাক্ষিক কবিতাউৎসব লাইভের বিগত অধিবেশন। কানাডা নিবাসী কবি মৌ
মধুবন্তীর সঞ্চালনায় ও প্রধান অতিথি বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং অন্যনিষাদ
কবিতাপত্রের সম্পাদক শ্রী ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে জমে উঠেছিল সমগ্র
আলোচনাচক্র। কবিতার নির্মাণ ও কবির অভিপ্রায় নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর উপস্থাপনায়
যোগ দিয়েছিলেন দুই বাংলার বেশ কয়েকজন তরুণ কবি। নানান মত ও বিতর্ক উঠে এসেছিল
বক্তাদের সুচিন্তিত বক্তব্যে।
অধিকাংশ
বক্তার বক্তব্যে একটি বিষয় খুব সুস্পষ্ট ভাবেই উঠে এলো যে, কবির
অভিপ্রায়ের ধরণ ধারণ সদা পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ বিগত শতকের কবির অভিপ্রায়ের মানদণ্ডে
বর্তমান শতকের কবির অভিপ্রায় বিচার করতে গেলে বিরাট ভুল হয়ে যাব। যুগপরিবর্তনের
সাথেই সমান্তরাল ভাবে সতত পরিবর্তনশীল কবির অভিপ্রায়। এইখানে একটি কথা স্পষ্ট করে
নেওয়ার দরকার আছে, ব্যক্তি বিশেষে কবির অভিপ্রায় যে ভিন্ন
হবে সেকাথা নিয়ে কোন বিতর্ক নাই। বিতর্ক শুধু, এক কালের কবির
অভিপ্রায়ের ধারার সাথে অন্য কালের ধারার প্রকারভেদ নিয়েই। কিন্তু সেখানেও একটি কথা
থেকেই যায়। সতত পরিবর্তনশীল যুগপ্রবণতার মাঝেও যদি শাশ্বত কবিমনের নোঙর না থাকে,
তবে কবির কবিতা, তার সৃষ্টি কি কালোত্তীর্ণ
হয়ে বহু যুগের মানুষকে আশ্রয় দিতে পারে?
আমাদের ভাবতে হবে ঠিক এই জায়গাটি থেকেই।
অনকেই
বলবেন, আজ আর কালোত্তীর্ণ নয় কিছুই। সব কিছুই নগদ মূল্যে নগদ বিদায়। দুই যুগ আগের
কাব্যধারাই আজকের সাহিত্যের মাপকাঠিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছে যেখানে সেখানে শাশ্বত
কবিমন বলে আর কিছু সম্ভবই নয়। সবটাই, সবকিছুই যুগধর্মের
সংঘটন। আজকের কবিতা আজকেরই যুগের। আগামীকালকের কবিতায় থাকবে না আজকের ছায়পাত।
থাকলে সে তো থেমেই যাওয়ার নামান্তর হবে। সাহিত্য কোনদিনই একজায়গায় স্থির নয়।
সাহিত্য গতিশীল। নদীর মতোই এক পার ভেঙ্গে আর এক পার গড়ে নেয়। তাই সাহিত্যের সত্যি
যুগধর্মের সত্যি। সাহিত্যের অভিপ্রায় যুগধর্মের অভিপ্রায়। সাহিত্যের মূল্য
যুগধর্মের মূল্যেই। এমনটাই বলতে চান অনেকে। বলছেন অনেকেই। সেইরকম বিশ্বাস থেকেই
এগিয়ে চলেছেন আজকের কবি সাহিত্যিক এবং পাঠক।
কিন্তু
সেটাই কি শেষ কথা?
ধরে নেওয়াই যাক, সেটাই শেষ কথা। তাহলে এটাই
ধরে নিতে হয়, সেটা শুধুই শেষ কথা নয়। সেটাই শাশ্বত কথা। না
হলে পরবর্তী যুগধর্মের কথাও যদি পাল্টে যায়? তবে তো বেশ
মুস্কিলই! তবে দেখা যেতেই পারে কবি যেমন বলেছিলেন, ‘শেষ কথা
নাই, শেষ কথা কে বলবে’। কিন্তু আজকের কবিকুল যদি যুগধর্মের
দোহাই দিয়ে যুগসত্যকেই শেষ কথা বলে প্রতিপন্ন করতে উঠে পরে লাগে, তবে তাদের সম্মানার্থেই আমাদের ধরে নিতে হয়, সেটাই
শাশ্বত সত্য। আর তখনই আমরা বুঝতে পারবো সাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিটি যুগই তার
যুগধর্মকেই, তার সময়ের যুগসত্যকেই শেষ কথা বলে ভুল করে থাকে।
ব্যতিক্রম কালো্ত্তীর্ণ কবি সাহিত্যিক। তাদের সাহিত্যজীবন পরিক্রমা করলে দেখা যাবে,
তাদের বিশ্বাস ঠিক এই রকম একরৈখিক ছিল না ইতিহাসের কোন পর্বেই।
তারা
বিশ্বাস করতেন, প্রতিযুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য তার যুগধর্মকে ধারণ করেই তার সময়ের যুগসত্যকে
উপলব্ধি করেই আবহমান কালচেতনার প্রতিভাসে জীবন জিজ্ঞাসার নবনব দিগন্ত উন্মোচন করে
তোলাকেই সাহিত্যের সত্য বলে স্বীকার করে এসেছে। এখানেই সাহিত্যের গতি। আবার এখানেই
সাহিত্যের নোঙর। নোঙর এই গতিতেই। নোঙর এই সত্যতেই। নোঙর এই সাহিত্যবোধেই। সেটা
থেমে যাওয়া নয়। অফুরন্ত গতির উন্মাদনায় নিরন্তর এগিয়ে চলার শক্তি। এই বোধটুকু আজ
আমাদের চেতনায় যদি অসার হয়ে যেতে থাকে, তবে সময় এসেছে সেই
বোধকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার। নতুন করে প্রাণসঞ্চার করার।
তেমনই
কবির অভিপ্রায় বিভিন্ন কবিরর কাছে বিভিন্ন হলেও তার মধ্যে একটি আবহমান ধারা আছে।
সেই ধারাটুকু সতত পরিবর্তনশীল যুগধর্মের সাথে কোন না কোন ভাবে সম্পর্ক স্থাপন করেও
আবহমান গতিধারার প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। এটাই তার অন্তর প্রকৃতি। শাশ্বত প্রবণতা। যা
যুগধর্মের সাথে পাল্টিয়ে পাল্টিয়ে যেতে থাকে না কখোনই। আর সেই কারণেই আজও
মহাকাব্যগুলি আমাদের জীবন জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে নিরন্তর প্রাসঙ্গিক। আজও কালোত্তীর্ণ
সাহিত্যিককুল আমাদের চেতনায় সমান ভাবে আধুনিক। আজও কালোত্তীর্ণ সাহিত্য মানেই
যুগচেতনার আঁতুরঘর। এইযে বিভিন্ন যুগের পরিবর্তনশীল যুগপ্রবণতাকে ছুঁয়ে যেতে পারা, এটাই
কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের প্রাণভোমরা। আর আমরা বলতে চেয়েছি, সেটাই
কবির অভিপ্রায়ের অন্যতম এক মহাদিগন্ত।
কবির
অভিপ্রায়। না নেহাৎই আনন্দও নয়, নয় খ্যাতির মোহ, নয় পুরস্কারের
লোভ, নয় ধনোপার্জন; এগুলির কোনটিই কবির
অভিপ্রায় হতে পারে না। হয়ও না কোনদিন। অনেকেই প্রতিবাদ করতে পারেন। নানান
দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। বিশেষ করে বর্তমান যুগের নেট বিপ্লবের হাত ধরে চটজলদী
লাইক ও কমেন্টের জয়মাল্য অর্জনের যুগে। আমরা শুধু বলবো, কবির
কথাই ধার করে, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ
কবি’। হ্যাঁ আমাদের আলোচনার বৃত্ত কবিমানসিকতার দিগন্তেই থাকুক সীমাবদ্ধ। সেখানেই
আমরা বুঝে নিতে চাইবো কবির অভিপ্রায়ের মূল স্বরূপটি। কেন কবিতাই বা লিখতে যান একজন
কবি? ব্যক্তি বিশেষের স্বাতন্ত্রতা ধরে নিয়েও বলা যায়,
মূলত মুক্তির আনন্দ পেতেই প্রাথমিক ভাবে কলম ধরেন একজন কবি। কিন্তু
কিসের মুক্তি? কেনই বা মুক্তি? প্রশ্ন
করলে স্বভাবতঃই মিলতে পারে বিভিন্ন রকম উত্তর। মিলবেও নিশ্চয়ই। আর সেই সব নানান
রকমের উত্তরের বিভিন্নতার মাঝখান থেকেই অনুভবি চেতনায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়ে ওঠে
মুক্তির একটি সাধারণ রূপের। আমার পরিপার্শ্বের নানার বিক্ষুব্ধ উত্তাল তরঙ্গের
মধ্যে থেকে যে আমি প্রতিদিন নিজস্ব ব্যক্তি সত্ত্বার সীমায়িত অস্তিত্বের শৃঙ্খলে
আবদ্ধ থাকি, সেই বদ্ধতা থেকে মুক্তি। আমার আমি’র কবি কথিত
‘ক্ষুদ্র আমির’ থেকে মুক্তি। কবিতাই একজন কবির কাছে সেই মুক্তির রাজপথ হয়ে উঠতে
পারে। আর সেটাই হয়ে উঠতে পারে কবির অভিপ্রায়। প্রতিদিনের অভ্যস্ত ও ব্যতিব্যস্ত
জীবনযাপনের পরতে পরতে যে বদ্ধতা, সেই বদ্ধতা থেকেই কবিতার
হাত ধরে বা শিল্পসাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের হাত ধরে নানান অনুষঙ্গ বা প্রকরণের
রূপরেখায় সৃজনশীল মনন যে মুক্তির দিশা খুঁজে পায়, সেই খুঁজে
পাওয়াটিই হয়ে উঠতে পারে কবির কাছে তার একান্ত অভিপ্রায়। সেটিকেই আমরা ধরে নিতে
পারি কবির অভিপ্রায়। আর তখনই আমরা বুঝতে পারি, যারা সতত
পরিবর্তনশীল যুগধর্মের কথা বলে কবির অভিপ্রায়ের মধ্যে শাশ্বত কোন সত্যরূপ অনুভব
করতে পারেননি, সেটা তাদের দুর্ভাগ্য।
আমরা
আগেই দেখিয়েছি, কবির কথার সূত্র ধরেই; মুক্তির এই আনন্দ বস্তুত
‘ক্ষুদ্র আমি’র’ থেকেই মুক্তি। কিন্তু মুক্তি কোথায়? কবির
কথাতেই আবার বলতে হয়, ‘বৃহৎ আমি”-তে। এইখানেই কবির অভিপ্রায়ের
আরেক দিগন্ত। সকল যুগেই সমান সত্য। বিভিন্ন যুগধর্মের আলোতেও সমান অভীষ্ট। আর
সেটাই হচ্ছে সংয়োগের অভিপ্রায়। নিভৃতচারী কবিমন নিজস্ব নিরালার একান্ত নিজস্ব
সৃষ্টিকেও নিজের কাছে আবদ্ধ করে রাখতে পারেন না। গর্ভবতী নারী যেমন পারে না একান্ত
আত্মজকে আপন গর্ভের নিশ্ছিদ্র আশ্রয়ের নিবিড় আদরে ধরে রাখতে চিরকাল। মুক্তি তো
দিতেই হয়। কবিও তাই মুক্তি না দিয়ে পারেন না, তার সৃজনশীলতায়
সৃষ্টি করা একান্ত আত্মজকে। তার এক একটি কবিতার মধ্যে দিয়েই তাঁকেও ঠিক একই ভাবে
মুক্তি দিতে হয় তাঁর একান্ত কবিমনকে। কারণ কবি চান তাঁর নিজস্ব একান্ততা থেকে
মুক্তি। সেই মুক্তির পথরেখায় তিনি চান সংযুক্ত হতে বিশ্বমানবাত্মার সাথে। আবহমান
কালের ক্যানভাসে। তাঁর কবিতার সৃজনশীলতায় তাই তিনি সংযুক্ত হতে চান বিশ্বচেতনার
সাথে। খ্যাতি নয়, পুরস্কার নয়, ধন নয়
সম্পদ নয়, একজন প্রকৃত কবির এইটিই মূল অভীষ্ট। এই যে সংযোগের
অভিপ্রায়, বিশ্বমানবাত্মার সাথে, বিশ্বচেতনার
আবহমান কালের প্রেক্ষাপটে; হ্যাঁ যে কোন প্রকৃত কবির এইটিই
মূল অভিপ্রায়। এই অভিমুখ থেকেই মূলত তিনি কলম ধরেন। সে তিনি যে যুগধর্মের বা যে
যুগসত্যেরই ধারক বাহক হন না কেন। আবহমান মানবজীবনের এই হলো সাহিত্যের ইতিহাস।
কবিতার ইতিহাস। যুগ আসে যুগ যায়। এক এক যুগসত্য, জীবনসত্যের
নবনব দিগন্তকে উন্মোচিত করে দিয়ে যাবে। কবিতার ধরণ ধারণ রকম ফেরের নানান রকম বদল
হবে, হতেই থাকবে। কিন্তু সব কালেই সব দেশেই কবির অভিপ্রায়ের
মূল সত্য আবহমান কালচেতনায় ঐ মুক্তি ও সংযোগের অভিপ্রায়কেই সার্থক করে তোলার
প্রয়াসে নিবিষ্ট থাকবে। বলতে পারি এটাই কবির ও কবিতারও ধর্ম। একদিকে মুক্তি আর
একদিকে সংযোগ। ব্যক্তিগত তদাত্মতার থেকে নৈর্ব্যক্তিক সত্ত্বায়। সেখানেই কবির
অভিপ্রায়ের নোঙর।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

