লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ ও গণতন্ত্রের ক্রিমিনালাইজেশন




লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ ও গণতন্ত্রের ক্রিমিনালাইজেশন


“Government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the Earth”

.- Abraham Lincoln

মহামতী লিংকন আজ ভারতে জন্মগ্রহণ করলে তাঁর বাণীটি নিশ্চয় সংশোধন করে নিতেন এই বলে যে গভর্মেন্ট অফ দ্য ক্রিমিন্যাল বাই দ্য ক্রিমিন্যাল, ফর দ্য ক্রিমিন্যাল শ্যাল নট পেরিশ ফ্রম ইন্ডিয়া। সপ্তদশ লোকসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেশ বিদেশ থেকে আগত সম্মানিত অতিথিদের উপস্থিতিতে সংবিধানকে সাক্ষী রেখে আজ শপথ নেবেন সদ্য নির্বাচিত এমন ২৩৩ জন সাংসদ, যাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ধর্ষণ, খুন জখম রাহাজানি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, আর্থিক কেলেঙ্কারির মতো নানান ধরণের ক্রিমিন্যাল কেস চলছে, বা ঝুলে রয়েছে। ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এবারই সর্বচ্চো সংখ্যায়, ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্তরা সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। এবং মোট আসনের অনুপাতে শতাংশের হিসাবে এই সংখ্যাটি শতকার ৪৩ শতাংশ। অনেকেই জানেন বিগত লোকসভায় শতাংশের হিসাবে এই ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্তদের সংখ্যা ছিল ৩৪%। ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে যে সংখ্যা ছিল ৩০%। অর্থাৎ এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, অত্যন্ত দ্রুত হারে লোকসভায় ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্তরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠছেন। এবং এটাই ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের বর্তমান ধারা। হ্যাঁ পরবর্তী লোকসভায় এই সংখ্যা যে ৫০% ছাড়িয়ে যাবে, সে কথা বলাই বাহুল্য।

কেন বলাই বহুল্য, আসুন সেটাই এবার একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। দিনটা ছিল ১৪ই এপ্রিল ২০১৪। সোমবার। এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী গুজরাটের ভুতপূর্ব মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানালেন, ক্রিমিন্যাল কেস আছে এমন সমস্ত রাজনীতিবীদদের তিনি গারদে পুড়বেন।  তিনি আরও বললেন, “ There is a lot of discussions these days, on how to stop criminals from entering politics. I have a cure and I have vowed to clean Indian politics all I need is people’s support.”  হ্যাঁ তাঁর এই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পনেরোটি রাজ্যের একশটি শহরে সরাসরি দেখানোও হয়েছিল। মোদী আরও বললেন, সুপ্রীমকোর্টের তত্বাবধানে বিশেষ আদালত গঠন করে সমস্ত কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান, বিধায়ক ও সাংসদদের রেকর্ড পরীক্ষা করা হবে এবং যাদের ক্রিমিন্যাল রেকর্ড থাকবে তাদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা হবে নির্দিষ্ট সময়ের ভিতরেই। দেখে নেওয়া যাক মোদী আরও ঠিক কি বলেছিলেন। “The cases will be disposed within a year and I am positive that after five years of our rule the system will be absolutely clean and all criminals will be behind bars.” না শুধু এইটকুই নয়, তিনি আরও বললেন, “I promise there will be no discriminations and I won’t hesitate to punish culprits from my own party.” সাধু সাধু। স্বভাবতই প্রত্যেকের একাউন্টে সুইস ব্যাংকের কলোটাকা উদ্ধার করে ১৫ লক্ষ করে টাকা ভরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মতোই এহেন প্রতিশ্রুতিতেও আসমুদ্রহিমাচল ব্যাপি মোদীঝড় উঠেছিল প্রবল ভাবেই। যে ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল শতাব্দী প্রাচীন পার্টি কংগ্রেসও।

এবং এহেন ভাষণের পরেই সেই নির্বাচনেই বিগত লোকসভায় ৩৪% জনপ্রতিনিধি তথা সংসদ যোগ দিয়েছিলেন হ্যাঁ খুন ধর্ষণ রাহাজানি বাটপারি আর্থিক দুর্নীতি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সহ নানাবিধ ক্রিমিন্যাল কেসসহই। বিগত পাঁচ বছরে সাধারণ জনগণকে নোটবাতিলের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে মাথার উপর জিএসটির বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ভারতবর্ষকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা ছাড়া ক্রিমিন্যাল রেকর্ড থাকা একজন সাংসদেরও কি বিচার হয়েছে? না সাজা হয়েছে? বরং সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনেও সেই বিজেপিই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ক্রিমিন্যাল রেকর্ড থাকা রাজনীতিবীদদেরকেই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার টিকিট দিয়েছে। এখন আসুন দেখে নেওয়া যাক সপ্তদশ লোকসভায় প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির কোন দলের কতজন ক্রিমিন্যাল রেকর্ড থাকা সাংসদ আজ শপথ নিতে চলেছেন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জনসমর্থন নিয়ে জয়ী বিজেপীর সাংসদদের মধ্যে ১১৬ জনের বিরুদ্ধে নানান আদলতে খুন জখম রাহাজানি ধর্ষণ আর্থিক দুর্নীতি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সহ একাধিক মামলা চলছে বা ঝুলে আছে। এই সংখ্যাটি শতাব্দী প্রাচীন কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ২৯ জন। অর্থাৎ কংগ্রেসের মোট নির্বাচিত সাংসদদের অর্ধেকের বেশিই ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত। জনতা দল ইউনাইটেডের ১৩ জন। এসএইচএসের ১১ জন। ডিএমকে ও ওয়াইএসআরসিপির ১০ জন করে। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের ৯ জন। এলজেপির ৬ জন। বিএসপির ৫ জন। টিআরএস-এর ৩ জন। এবং আরও অন্যান্য দলের একাধিক সাংসদ মিলে সপ্তদশ লোকসভায় ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত নির্বাচিত সাংসদদের মোট সংখ্যা ২৩৩ জন। যা বিগত লোকসভার তুলনায় ২৬% বেশি।

এবং মনে রাখতে হবে, এই ২৩৩ জন কিন্তু আইনী পথেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। অর্থাৎ সংবিধানকে মান্যতা দিয়ে ভারতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই এঁরা নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের ভোটই। ধরে নিতে হবে ইভিএম কারচুপি বা বুথ জ্যাম কি ছাপ্পা ভোট দিয়ে কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক সাংসদের নির্বাচন সম্ভব নয়। অন্তত সেরকম অভিযোগও ওঠেনি নির্বাচন পরবর্তী সময়ে। অর্থাৎ এটা ধরেই নেওয়া যায় যে ভারতবর্ষের জনগণ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সচেতন ভাবেই এঁদের নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু কেন? ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত প্রার্থীদের প্রতি ভারতবর্ষের জনগণের এই আস্থার কারণই বা কি? অনেকেই বলবেন, না বিষয়টি অমন সহজ সরল নয়। জনগণ অধিকাংশ সময়েই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করতেই ভোট দেয়। সেই ভোট নির্দিষ্ট প্রার্থীর নামে পড়লেও আসলে সেটি কোন না কোন রাজনৈতিক দলকে জয়যুক্ত করতেই দেওয়া হয়। আবার প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী পদের প্রার্থীর দিকে তাকিয়েও অধিকাংশ সময়ে ভোট দেওয়া হয়। সেসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সাংসদ বা বিধায়কের চরিত্র বা কার্যকলাপের কোন ভুমিকা থাকে না। অনেকেই বলবেন এই কারণেই ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত প্রার্থীরাও নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে যায় নির্বিঘ্নে। আবার সবসময় সর্বত্রই যে এমনটাই ঘটে, তাও কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত প্রার্থী ও তার সাগরেদদের আতঙ্কে আর ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়েই মানুষ তাদেরকে নির্বাচিত করতে বাধ্য হয়। ভারতবর্ষে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে এটাই প্রধানতম কারণ ক্রিমিনিন্যাল কেসে অভিযুক্তদের নির্বাচিত হওয়ার পেছনে।

জনগণের কথার পরেও কথা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলিই বা এইসব দাগী অপরাধী ও বিভিন্ন অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত সমাজবিরোধীদেরকে লোকসভা, বিধানসভার আসনে প্রার্থী করে কেন? ভারতীয় গণতন্ত্রের নির্বাচনী সংস্কৃতির এটাই সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। ১৪ই এপ্রিল ২০১৪ সোমবার নির্বাচনী ভাষণে নরেন্দ্র মোদী যে যে প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন, সেগুলি পুরণ করা তো দূরের কথা, দাগী অপরাধী ও বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্তদেরকে নিজ দলের প্রার্থী ঘোষণা করার মতো অপরাধ না করলেই কিন্তু সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয় যায়। ঐ ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনেই স্বয়ং মোদী যদি তাঁর দলে একজনও অপরাধী বা অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী না করতেন, তাহলেই বিগত লোকসভায় ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত সাংসদদের সংখ্যাটি ৩৪% থেকে একলাফে অনেকটাই নেমে যেত পারতো। ঠিক যেমন সদ্য অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপী যদি এই নীতি গ্রহণ করতো, তবে ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত নির্বাচিত সাংসদদের মোট সংখ্যাটি ২৩৩ থেকে কমে ১১৭-এ নেমে আসতো একলাফে। না বিজেপি অত্যন্ত সচেতন ভাবেই সেটি করেনি। কারণ তারা জানতো, সেটি করলে তাদের মোট প্রাপ্ত আসনও এক লাফে ১১৭টা কমে যেত। অর্থাৎ এইসব ক্রিমিন্যাল বা ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্তরাই রাজনৈতিক ময়দানে দলগুলিকে জিতিয়ে নিয়ে আসতে সবচেয়ে উপযোগী। তাই প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই এদের এমন জামাই আদর। এতো খাতির। এরা জানে কিভাবে জনগণের ঘাড় দরে ভোট দেওয়াতে হয়। তাই যত বেশি সংখ্যক এহেন সমাজবিরোধীদেরকে দলীয় প্রার্থী করা যাবে, নির্বাচনে দলের সাফল্য তত বেশি সুনিশ্চিত হবে। এটাই ভারতীয় রাজনীতির মানদণ্ড। তাই শতাব্দী প্রাচীন পার্টি কংগ্রেসের এহেন ভরাডুবিতেও অর্ধেকের বেশি ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত সাংসদ।

আর তাই সপ্তদশ লোকসভায় ৪৩% সাংসদই ক্রিমিন্যাল কেসে অভিযুক্ত। যে সংখ্যাটি স্বভাবতঃই আগামী লোকসভায় অর্ধেক ছাড়িয়ে যাবে। এবং মনে রাখতে হবে সবটাই ঘটছে ঘটবে ভারতের সংবিধানকে মান্যতা দিয়েই। ভারতবর্ষের আইনের রাজপথ ধরে এগিয়েই। নির্বাচন কমিশনের ছত্রছায়াতেই। রাজনৈতিক দলগুলির নীতিতেই ও ভারতীয় রাজনীতির রীতি মেনেই। এটাই ভারতবর্ষ।

না নরেন্দ্র মোদী তাঁর নিজেরই মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলিকে মান্যতা দেন নি, বরং নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনায় জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন ১১৬ জন বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত সমাজবিরোধীকে, যারা আজই সংবিধানকে সাক্ষী রেখেই শপথ নেবে জনসেবার!  সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আরও ১১৭ জন স্বগোত্রদের সাথে। ধন্য হবে সংসদভবন। সার্থক হবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। শান্তি পাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের মৃত আত্মা। সম্পূর্ণ হবে ভারতীয় গণতন্ত্রের ক্রিমিনালাইজেশন।

৩০শে মে’ ২০১৯

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত