ক্রান্তদর্শী জীবনানন্দ!




ক্রান্তদর্শী জীবনানন্দ!

মগ্নচৈতন্যে অন্তর্দীপ্ত,ক্রান্তদর্শী কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা কাবসাহিত্যে উত্তর রৈবিক পর্বের প্রধান রূপকার! বস্তুত রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা কাব্যসাহিত্যের সমস্ত প্রকরণ তাঁর কাব্য প্রতিভাস সঞ্জাত বল্লেও খুব একটা ভুল বলা হয় না! তাঁর জীবদ্দশায় তিনি যদিও খ্যাতি পাননি,তবুও মৃত্যুর পর অতিক্রান্ত অর্দ্ধ শতাব্দীর সময় সীমায় বাংলার কবিকূল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে তাঁর কাছেই ঋণী! যিনি বলেছিলেন "সকলেই কবি নয়,কেউ কেউ কবি",মজার কথা তাঁরই লেখার মোহনমায়ায় তাঁর পাঠক মাত্রেই কবিযশপ্রার্থী হবার আশা পোষন করেন অধিকাংশ সময়! হয়তো এখানেই তাঁর কবি কীর্তির সমৃদ্ধি! অনেকেই তাঁকে যে কারণে "কবিদের কবি" বলে থাকেন!

তাঁরই কথার সূত্রে বলতে পারি তাঁর হৃদয়ে কল্পনার ভিতরে যে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তাকে তিনি অর্জন করেছিলেন পরিশীলিত নিরন্তর কাব্য সাধনায়,সেই অর্জনের পশ্চাতে অতীত ও বর্তমান অর্থাৎ তাঁর পূর্ববর্তী মানব ইতিহাস এবং তাঁর সমকালের নাড়ির সংবেদনকে কবি ধরতে পেরেছিলেন তাঁর চেতন অবচেতনের প্রতিভাসে! সেই প্রতিভাসেই জারিত হয়ে উঠেছিল জীবনানন্দীয় কাব্যভূবন! গড়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথ কথিত "চিত্ররূপময়" এক আশ্চর্য্য জগতের রংমহল! যে মহলের মর্মে মর্মে দৃঢ়তর হয়ে বিবর্তিত হতে থাকবে সুস্পষ্ট ইতিহাস চেতনা সময়ের সংহতিতে নিরন্তর—তাঁর কাব্যধারার প্রবাহে!

জীবনবাস্তবতার আঙিনায় সমাজ প্রক্ষিপ্ত সুযোগ ও দূর্যোগের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মানব ব্যাক্তিত্বের অন্তঃস্থলে যে গভীর সংবেদন- ছুঁয়ে থাকে সময়ের অনন্ত প্রবাহকে পরিপার্শ্বের আশা নিরাশার দোদুল্যমানতার সারাৎসারে;তারই অনুপম রূপকার কবি জীবনানন্দ দাশ! বাস্তব জীবনের তীব্রতার দহনদীপ্ত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বলয়ের বাইরেও রয়ে যায় অনাস্বাদিত অনুভবের তরঙ্গায়িত অপরূপ এক অনাদী অনন্ত চেতনাপ্রবাহ! যার সাথে প্রতিদিনের জীবনের কোনো প্রত্যক্ষতা সচারচর গড়ে না উঠলেও রয়ে যায় এক অন্তর্লীন সুপ্ত আত্মীয়তা! সেই অস্পষ্ট কুয়াশাস্পৃষ্ট সম্পর্কের শাশ্বত প্রতিফলনকে তার কবি প্রতিভার ক্যানভাসে ধরতেই যাত্রা শুরু ধুসর পাণ্ডুলিপির লিপিকারের!

সেই ধূসর পাণ্ডুলিপির কবির কাব্যে serenity-র অভাব বোধ করেছিলেন বিশ্বকবি! বিশ্বকবিকে একপত্রে বিনীতভাবে জানিয়ে ছিলেন জীবনানন্দ; অনেক উচুঁ জাতের রচনার মধ্যেই serenity-র অভাব থাকলেও তাতে কাব্য ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করেন না তিনি!

"......সব কাজ তুচ্ছ হয়,- পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা-
প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শুন্য মনে হয়!"

তবুও ধূসর পাণ্ডলিপির এই বোধ থেকে যাত্রা শুরু করলেও,"হাজার বছর ধরে আমি পথহাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে...."র কবিও শেষে দেখেন

"...দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়-
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলই অনন্ত সূর্যোদয়!"

অঘ্রানের প্রান্তর থেকে দারুচিনি দ্বীপের স্বপ্নে সেই serenity.তে তিনিও! যে serenity নিয়ে বিশ্বকবির থেকে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন একদিন,সেই serenity-ই আর এক অনুপম প্রকাশ ঋদ্ধ হয়ে উঠল সাতটি তারার তিমির পেড়িয়ে বেলা অবেলা কালবেলায়।

"....আমি তবু বলি:
এখনো যে কটাদিন
বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি,
দেখা যাক পৃথিবীর ঘাস
সৃষ্টির বিষের বিন্দু আর
নিষ্পেষিত মনুষ্যতার
আধারের থেকে আনে
কী করে যে মহানীলাকাশ,
ভাব যাক- ভাব যাক-
ইতিহাস খুঁড়লেই
রাশি রাশি দুঃখের খনি
ভেদ করে শোনা যায়
শুশ্রূষার মতো শত শত
শত জলঝর্নার ধ্বনি!"

এত হিংসা রিরংসার মধ্যেও মানবসভ্যতা এমনই!

জীবনানন্দের কাব্যও সেই শুশ্রূষার জলঝর্নার মন্ত্রমুগ্ধ ধ্বনি! জীবনানন্দের কাব্য মূলত এই প্রশান্তির এক নির্মেদ অভিজ্ঞান! মহাবিশ্বলোর ইশারা থেকে উৎসারিত সময়চেতনা (consciousness of time as universal) তার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; বলেছিলেন কবি নিজে! এইখানেই ক্ষণিক এই জীবনের প্রতিভাসে সময়ের অনন্ত প্রবাহের মধ্যে আত্মস্থ তাঁর কাব্যবোধ! এরই সমান্তরালে কবিতার অস্থির ভিতর সুস্পষ্ট ইতিহাস চেতনা ও মর্মে পরিচ্ছন্ন কাল জ্ঞান থাকার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি! তাঁর কাব্য প্রবাহের অন্তর প্রকরণ গড়ে উঠেছিল এই বোধ থেকেই! আর সেই কারণেই জীবনানন্দের কবিতা স্থান কালের গণ্ডী ছাড়িয়ে অনাদী অনন্তকে সমসাময়িকতার প্রেক্ষিতে মূর্ত করে তোলে শাশ্বতের মরমী ক্যানভাসে, সংহত আবেগের বিবেকী দৃঢ়তায়! এখানেই তাঁর অনন্যতা!

"যতদিন পৃথিবীতে জীবন রয়েছে
দুই চোখ মেলে রেখে স্থির
মুত্যু আর বঞ্চনার কুয়াশার
পারে
সত্য সেবা শান্তি যুক্তির
নির্দেশের পথ ধরে চলে
হয়ত বা ক্রমে আরো আলো পাওয়া যাবে বাহিরে-
হৃদয়ে;

মানব ক্ষয়িত হয় না
জাতির ব্যক্তির ক্ষয়ে!"

এই সেই সময় প্রতীতি যা সুস্পষ্ট ইতিহাসবোধ সঞ্জাত হয়ে ধরে রেখেছে সমগ্র জীবনানন্দীয় কাব্যধারার অন্তর সত্তাকে!

তাই তো তিনি বলে গেলেন,"এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য;তবু শেষ সত্য নয়!" পৃথিবীর গভীরতর অসুখের নিমজ্জনেও যে আমরা পৃথিবীর কাছেই ঋণী সে সত্য উপলব্ধি করতে পারি ইতিহাস খুঁড়লেই! জীবনানন্দের কাব্য আমাদের সেই খনন কার্যে উদ্বুদ্ধ করে! তার সাথেই সংঘটিত হয় আত্মন্মোচনের প্রক্রিয়াও!

ঊনবিংশ শতকের ঘরানায় অভ্যস্ত বঙ্গজীবনের প্রাত্যহিকতায় বিংশ শতকের প্রারম্ভেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত প্রভাব সারা বিশ্বের সাথে কম বেশি পড়ল! যার ফলে মানবিক শুভবোধের আবহমান প্রত্যয়ে ধরতে থাকে চিরস্থায়ী ফাটল! বিশ্বাসের শিরদাঁড়ায় অবক্ষয়ের ঘূণ ধরা শুরু হয় সেই সময়েই! আবহমান জীবন সংহতির প্রতীতিতে ঘটতে থাকল একের পর এক বিপর্যয়! রাষ্ট্রতন্ত্র থেকে সমাজ বাস্তবতায় শুরু হল নানান পরিবর্তন! সেই পরিবর্তনের ঘূর্ণাবর্তে ব্যক্তি মানসের একাকীত্ব দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাব্য সাহিত্যে প্রদীপ্ত হতে থাকল! সংশয় মন্থনের সেইক্রান্তিকালেই জীবনানন্দ পাঠ নিলেন আবাহমান ইতিহাস চেতনায়! সমকালের সাথে মিলিয়ে দেখলেন মানুষের অভিমুখ!

এই রকম এক সার্বিক ভয়াবহ আরতির মধ্যে থেকেও তিনি মানুষের মনীষার আলোকিত অভিমুখকেই খুঁজে পেয়ে ছিলেন তাঁর সময় চেতনার সুগভীর ও বিস্তৃত পরিসরে! অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত তাঁর "ক্যাম্পে" কবিতার সম্বন্ধে সে অভিযোগ খণ্ডন করে এক জায়গায় লিখছেন, "ক্যাম্পে কবিতায় কবির মনে হয়েছে তবু যে স্থূল হরিণ শিকারীই শুধু প্রলোভনে ভুলিয়ে হিংসার আড়ম্বর জাঁকাচ্ছে না,সৃষ্টিইযেন তেমন এক শিকারী,আমাদের সকলের জীবন নিয়েই যেন তার সকল শিকার চলছে; প্রেম- প্রাণ- স্বপ্নের একটা ওলট পালট ধ্বংসের নিরবচ্ছিন্ন আয়োজন যেন সবদিকে:"

এইখানেই কবি সমকালকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে সেই মহাবিশ্বলোকের ইশারায় অনুভব করলেন! তাই শুরু হল আলোর সন্ধান! জীবনানন্দকে অনেকেই প্রেমিক কবি প্রকৃতির কবিবলেন! তাঁর কবিতা দূর্বোধ্যতার অভিযোগে দূরেও সরিয়ে রাখেন কেউ কেউ! সাররিয়্যালিস্ট কবি হিসেবে অনেকে তাঁকে বিশ্ব কবিসভার উজ্জ্বল নক্ষত্র বলে মনেকরেন! কেউবা তাঁর শেষ পর্বের কাব্যের বিচারে সমাজসচেতন রাজনৈতিক সত্তার উপরই বেশি জোর দেন! তবুও আগাগোড়া মানবিক আলোয় প্রদীপ্ত তাঁর কাব্যধারায় প্রথমাবধি, কবি এই বিশ্ব এই সংসারে মানব অস্তিত্বের অন্তর্লীন ধারাটিকে সমস্ত রকম সামূহিক বিপর্যয়ের মধ্যেও শাশ্বতের সূত্রে প্রজ্জ্বলিত করতে চেয়েছিলেন! আমাদের বিশ্বাস এইখানেই তাঁর কবিকীর্তির মূল সত্য অধিষ্ঠিত! সেই সত্য প্রতিষ্ঠায় জীবনের আলো আঁধারের মধ্যে দিয়েই তাঁর পরিক্রমণ! মানব ইতিহাসের অভিমুখ অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর দিকেই!

সেই আলোকিত অভিমুখেই আধুনিক জীবনের গ্লানির পরিত্রাণের সূত্রটিকে তাঁর কাব্যধারার পরতে পরতে নিপুণ শৈল্পিক মাত্রায় বয়ন করে গেছেন জীবনানন্দ! বিশেষ কোনো মতবাদ বা কোনো দার্শনিক কিংবা বৈজ্ঞানিক তত্বে নোঙর ফেলেনি তাঁর কাব্য! সময় চেতনার ঐতিহাসিকতার মধ্যেই প্রত্যক্ষ করেছেন,

"এশিরিয়া ধুলো আজ--
বেবিলন ছাই হয়ে আছে"
তবু "....চারিদিকে রক্তক্লান্ত
কাজের আহ্বান....
এই পথে আলো জ্বেলে
--এই পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;"

সেইখানেই জীবননান্দের কাব্যকীর্তিরও অভিমুখ! তাই  চরম বিপর্যয়ের নৈরাশ্যেও "....বীজের ভিতর থেকে কি করে অরণ্য জন্ম নেয়!" অনুভব করেন কবি! একেবারে গোড়ার দিকে বিশ্বকবি যে প্রশান্তির আভা প্রত্যক্ষ করতে চেয়ে আশাহত হয়েছিলেন জীবনানন্দের কবিতায়,সমগ্র জীবনানন্দের কবিকীর্তি-- জীবন ও সময়ের সমস্ত আলোড়ন উতরোল অস্থির যন্ত্রণার প্রসবিত ব্যাথার মধ্যেও সেই প্রশান্তিকেই ছুঁয়ে থাকল শেষ অবধি!

"ব্যর্থ উত্তরাধিকারে মাঝে মাঝে তবু
কোথাকার স্পষ্ট সূর্য বিন্দু এসে পড়ে;
কিছু নেই উত্তেজিত হলে;
কিছু নেই স্বার্থের ভিতরে;
ধনের অদেয় কিছু নেই, সেই সবি
জানে এ খণ্ডিত বণিক পৃথিবী, অন্ধকারে সবচেয়ে সে শরণ ভালো;
যে প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো!"

ক্রান্তদর্শী জীবনানন্দসেই জ্ঞানলোকের উচ্চতম শৃঙ্গে উত্তীর্ণ করতে পেরেছিলেন তাঁর প্রেম ও কবি সত্তাকে!

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত