ভয়
আপনি কি ভয় পেয়েছেন? হঠাৎ এমন প্রশ্ন
কানে এলে ভয় লাগারই কথা। প্রাত্যহিক জীবনে বহু বিষয়েই বহু রকমের ভয় আমাদেরকে তাড়া করে
বেড়ায়। কিন্তু আমরা সচেতন ভাবেই সেই সব নানাবিধ ভয় সামলাতে নানান রকমের উপায় অবলম্বন
করি। তার ভিতরে অন্যতম, আমরা কেউই মুখে ভয় পাওয়ার বিষয়টা স্বীকার করি না। করতে চাই
না। অন্তত আচমকা কেউ এমন প্রশ্ন করলে। কিন্তু মনের তলায়, রাতের ঘুমে ভয় আমাদের পিছু
ছাড়ে না। পরীক্ষার আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে ভয় থেকে হয়তো সচেতন ভাবে এই ভয় সামলানোর
সাথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। কিংবা তারও আগে প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন থেকে, মাতৃক্রোড়চ্যুতির
ভয় দিয়ে প্রথম সাক্ষাৎ হয় ভয়ের সাথে। যার অন্তিম পরিণতি মৃত্যভয় দিয়ে। যে ভয় আমাদের
তাড়া করে নিয়ে বেড়ায় সারাটি জীবন। ভয়ের সাথে এই যে আমাদের আমৃত্যু সহবাস, মানবজীবনের
এই এক অমোঘ নিয়তি। যার থেকে মুক্ত নয় কোন একটি স্বাধীন জীবনও।
অবোধ শিশু
কোন কিছুতে ভয় পেলে প্রথমেই মায়ের কোলে ছুটে গিয়ে আশ্রয় খোঁজে। অবোধ মানুষও সেইরকম
ভয় পেলে কাল্পনিক ঈশ্বরের কোলে আশ্রয় নিতে ছুটে যায়। কিন্তু মানুষ যখনই অজ্ঞানতার অন্ধকার
থেকে বেড়িয়ে আসতে চায়, তখনই সে আর ঈশ্বরের কোল আঁকড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে না। সে অনুমান
অনুসন্ধান বিশ্লেষণ গবেষণা করতে শুরু করে দেয়। বোঝার চেষ্টা করে ভয়ের উৎসটা কোথায়।
কারণটা কি। একবার সেই কারণ ও উৎসের খোঁজ পেয়ে গেলেই তার ভয় দূর হতে শুরু হয়। আর এই
খানেই শিশুর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রভেদ। ভয় যতই থাকনা কেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক
মানুষ যুক্তি দিয়ে বিজ্ঞানের সত্য দিয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিশক্তি ও চিন্তাশক্তির মৌলিকত্ব
দিয়ে সেই ভয়কে জয় করার দিকে এগোতে থাকেন। কিন্তু একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সেই পথে
হাঁটেন না। তিনি হাঁটেন অন্ধ বিশ্বাসের পথে। তিনি হাঁটেন মন্দির মসজিদ গীর্জার পথে।
তিনি হাঁটেন তাঁর থেকে অধিকতর শক্তীশালী কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর কাছে বশ্যতা
স্বীকারের দিকে। ঠিক যেমন অবোধ শিশু মায়ের ভিতরেই এই এতগুলি বিষয় খুঁজে পায় বলেই, মায়ের
কোলে ছুটে যায়। ভয় পেলে। কিন্তু মা কি করেন? শিশুর বুঝবার মতো করে ভয় দূর করার চেষ্টা
করেন। শিশুর চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি ও বিচারবুদ্ধি গঠনের দিকে জোর দেন। যাতে শিশুর বড়ো
হয়ে ওঠার সাথে সাথে শিশু নিজেই বুঝতে পারে ভয়ের উৎস ও কারণটা কোথায়। মা কখনোই শিশুকে
আরও বেশি করে ভয় পাইয়ে দিয়ে নিজের আঁচলে বেঁধে রেখে সন্তানকে বশীভুত করার চেষ্টা করেন
না। কারণ মায়ের সাথে শিশুর সম্পর্ক নাড়ীর সম্পর্ক। অথচ অবোধ মানুষ যখন ভয় পেয়ে মন্দির
মসজিদ গীর্জার আশ্রয়ে ছুটে যায়, কিংবা রাজনৈতিক শিবির বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর শরণাপন্ন
হয়, কিংবা অর্থৈনৈতিক মতবাদ বা ব্যবস্থার আশ্রয় খোঁজে, তখন এই প্রতিটি স্তম্ভই ভীত
মানুষকে আরও বেশি করে হতভম্ব করে দিয়ে তাকে অধিকতর সন্ত্রস্ত করে নিজ শক্তির কাছে বশীভুত
রাখতেই উঠেপড়ে লাগে। কারণ তাদের কাজই হলো ক্রমাগত দলভারি করে তোলা। দল বলতে ভেরার পালের
সংখ্যাবৃদ্ধি করা। যার দল যত বেশি বড়ো হবে, ততবেশি ক্ষমতার অধিকারী সে। মন্দির মসজিদ
গীর্জাই হোক। রাজনৈতিক দল বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীই হোক আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হোক।
অবোধ মানুষের ভয়ই তাদের কারবারের মূলধন। আর তারা সেই মূলধনকে সজীব রাখতে ক্রমাগত শান
দিয়ে চলেছে। ভয়কে এইভাবে শান দিয়ে চলার অন্যতম মাধ্যমই হলো মিডিয়া। যার মিডিয়ার নেটওয়ার্ক
যত বেশি সম্প্রসারিত, এবং ভয় দেখানোর ক্ষমতা যার যত বেশি তীব্র, তার দলেই ভেরার পালের
সংখ্যাধিক্য তত বেশি।
প্রাচীনকালে
ধর্ম প্রচারকের ছদ্মবেশে এই ভয় দেখিয়ে অবোধ মানুষকে বশীভুত করে দলে টানার প্রচলন ছিল।
বর্তমানে রাজনীতি ও দেশসেবকের ছদ্মবেশে সেই একই কাজ চলছে আরও মারাত্মক তীব্রতায়। পুরাকালে
মিডিয়া ছিল না। ভয়ের কারবার মূলত ছিল আঞ্চলিক সীমায় গণ্ডিবদ্ধ। এই যুগে মিডিয়ার সর্বগ্রাসী
থাবায় বিশ্বজুড়ে ভয়ের কারবারের নিঃশ্ছিদ্র ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। খুবই আশ্চর্য্য হতে
হয় যখন ভাবা যায়, বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানের এত উন্নতি প্রযুক্তির বৈপ্লবিক অগ্রগতি সত্ত্বেও
মানুষ আজও মূলত অপ্রাপ্তবয়স্কই রয়ে গিয়েছে। কেননা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে তো আর
অযথা ভয় পাওয়ানো সহজ কথা নয়। কিন্তু আজকের দিনে মিডিয়ার একাধিপত্যে এত সহজে এই ভয় পাওয়ানোর
সর্বগ্রাসী খেলা চলছে, তাতে এটি প্রমাণ হয়, এই যুগে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মূলত অপ্রাপ্তবয়স্কই
রয়ে গিয়েছে।
মিডিয়াকে
হাতিয়ার করে ধর্মীয় সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রযন্ত্র,
অর্থনৈতিক শিবির ব্যবসায়িক গোষ্ঠী মানুষকে অবোধ করে বশীভুত করে রাখার উদ্দেশে ঠিক এই
কারণেই ক্রমাগত ফেক নিউজ প্রচারের নিরন্তর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অক্লান্ত ভাবে।
এবং প্রতিটি ফেকনিউজ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সবকয়টির একটিই লক্ষ্য মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত
করে তোলা। ভয়ের গল্প শুনিয়ে নিজেদের বশে বশীভুত করে রাখা।
আর ঠিক এইখানেই
আসল ভয়। ভয় পাইয়ে অবোধ করে রাখার এই চক্র থেকে মানুষ কি আর কোনদিন সত্যিই মুক্ত করতে
পারবে নিজেদেরকে? যে শিক্ষা যে সংস্কৃতির চর্চায় এই ভয় থেকে মুক্তির পথ তৈরী হয়, সেই
পথে ভয়ের কারবারীরা এমন এমন হিমালয় বানিয়ে রেখে দিয়েছে যে, তা সরিয়ে আলোর পথে এগোনো
সত্যিই কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। কঠিন এই কারণে নয় যে বাধাদানকারীরা সর্বশক্তিমান। কঠিন
এই কারণে যে, আমাদের ভিতর ক্ষুদ্র স্বার্থজনিত লোভের তীব্রতা এতো বেশি যে আমরা চোখখুলে
তাকিয়ে দেখার দৃষ্টিশক্তিই হারিয়ে ফেলেছি। আবার এই কাজ অসম্ভবও নয় এই কারণই, আমরা যদি
নতুন করে নিজেদের স্বচ্ছ দৃষ্টিশক্তির পুনরুদ্ধার করতে পারি তবেই আমরা এই বিন্ধ্যাচল
সরিয়ে ফেলতে পারবো। কিন্তু আমাদের সেই হারিয়ে ফেলা দৃষ্টিশক্তি উদ্ধার হতে পারে কোন
পথে? পথ একটাই আমাদের ক্ষুদ্র স্বার্থবোধের তীব্র লোভ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করা। সেটি
কিন্তু আমরা নিজেরাই করতে পারি। তার জন্য অন্য কোন দৈবশক্তির অপেক্ষায় থাকার দরকার
পরে না। অপেক্ষায় থাকার দরকার পরে না আর একজন গৌতম বুদ্ধের জন্মের জন্য। ঘরে ঘরে রামমোহন
বিদ্যাসাগর রবিঠাকুর অরবিন্দ বিবেকানন্দ নেতাজীর জন্মের দরকারও নাই। ঘরে ঘরে ক্ষুদ্র
ব্যক্তি স্বার্থের নিয়ন্ত্রণহীন লোভকে বশীভুত করতে পারলেই আস্তে আস্তে প্রজন্মের পর
প্রজন্ম ধরে আমাদের রুদ্ধ দৃষ্টিশক্তি খুলতে শুরু করবে। যত বেশি মানুষের দৃষ্টিশক্তি
খুলতে থাকবে, তত বেশি করে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠবে তখন ভয়ের কারবারীরাই।
আসলে আমাদের
এই ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের লাগামহীন লোভই আমাদেরকে অন্ধ করে দেয়। যে অন্ধত্ব আমাদেরকে
অবোধ অপ্রাপ্তবয়স্ক করে রেখে দেয়। আর তখনই আমরা ভয়ের কারবারীদের পাতা ফাঁদে নিজেরাই
এগিয়ে গিয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দিই। আমরা শয়তানের কোলে আশ্রয় খুঁজতে ছুটি শয়তানের তৈরী করা
ভয় থেকে রক্ষা পেতেই। কি নিদারুণ এই অন্ধত্ব! বহু দিন আগে কবিগুরু আমাদের একটি মহৎ
মন্ত্র দিয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষুদ্র আমি থেকে মুক্ত হয়ে বৃহৎ আমিতে পৌঁছানোর মন্ত্র। আমরা
তাঁর খ্যাতিটুকু নিয়েছি বাঙালি হিসাবে জাতিগত আত্মশ্লাঘায়। তাঁর কোন মন্ত্রই গ্রহণ
করি নি। এমনকি অমূল্য এই মন্ত্রটি সঠিক সময়ে ঠিক ভাবে গ্রহণ করলেও আজ বাঙালির অনেক
দুর্দশা ঘুঁচে যেত। এই যে ক্ষুদ্র আমি থেকে বৃহৎ আমিতে পৌঁছানোর কথা বললেন রবীন্দ্রনাথ,
এই পথেই আমরা সেই ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের লাগামহীন লোভের খপ্পর থেকে উদ্ধার করতে
পারতাম নিজেদেরকে। আর তখনই খোলা চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি শক্তিতে বৃহৎ আমিকে দেখতে
পেতাম সকল মানুষের সমষ্টির ভিতরে। সকল মানুষের সমষ্টির ভিতরে নিজেকে একবার খুঁজে পেলে
তখন আর কোন রকম ভয় পাওয়ার ভয়ই থাকে না। থাকতে পারে না। ভয়কে জয় করার প্রাপ্তবয়স্ক সত্তা
তৈরী হয় তখনই। আজকের এই মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত ভয়ের ফাঁদ থেকে তখন শুধু নিজেকেই মুক্ত করা
সম্ভব হবে না, সম্ভব হবে গোটা বিশ্বকেই মুক্ত করা। তাই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে
সেদিনই, যেদিন আমরা আমাদের ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের এই লাগামহীন লোভের
হাত থেকে নিজেদের উদ্ধার করতে পারবো। যেদিন সকলের মধ্যে নিজেকে দেখতে পাবো। সেইদিন
বিশ্বব্যপী মিডিয়া নিয়ন্ত্রীত এই ভয়ের পাতা ফাঁদ থেকে জন্ম নেবে নতুন এক সুন্দর পৃথিবী।
যে পৃথিবীর কথা আমাদের বলে গিয়েছেন মনীষীরা যুগে যুগে নানান ভাবে।
২৪শে জুন
২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

