পথের সাথী বিশ্বপথিক
বড়ো বিস্ময় লাগে বলেছিলেন কবি। আকাশ ভরা সূর্য
তারা আর বিশ্বভরা প্রাণের মাঝে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করে। অনাদী অনন্ত এই বিরাট
বিপুল বিশ্বে মানুষের আবির্ভাব এক বড়ো রহস্য। কি বা এর উদ্দেশ্য কিই বা এর শেষ
পরিণাম। বড়ো বিস্ময় লাগে,কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষ ফাগুনের পালায় মানুষের ভালোবাসা তার
আনন্দসরূপে বিশ্বের অভিপ্রায়কেই কেমন সহজ স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণ প্রবাহে সার্থক করে
তোলে। বড়ো বিস্ময় লাগে, জন্মমৃত্যুর মাঝখান দিয়ে জীবনের
অনন্ত পথের আভাসে ইঙ্গিতে হাতছানিতে। বিস্ময়ে কখনো কখনো অভিভূত হই আমরা এই বিশ্বের
অপার রহস্যে। রহস্যের সেই পথে, জীবনের সেই পথে বহুদিন ধরেই
সাথী হয়ে সাথে চলেছেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। কবির কথায়, "কবে
আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে-/ সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়" সত্যিই কোন
অনাদি অতীত থেকে বিশ্বাত্মার গান জীবাত্মার চলার পথে বেজে চলেছে, সে পথেরও শেষ নেই, সে চলারও শেষ নেই; শেষ নেই সে গানেরও। সেই পথেই চলেছি আমরাও। চলেছেন পথের সাথী রবীন্দ্রনাথ,
বিশ্বপথিক কবি। যে পথে স্বয়ং বিশ্বপথিক বিশ্বাত্মা নিজেই জীবাত্মার
পথের সাথী। বড়ো বিস্ময় লাগে। অনুভবের পরতে পরতে সে বিস্ময় রূপ হয়ে অপরূপ হয়ে ওঠে
কবির জীবনবেদে। কবির দর্শনবোধের দ্বান্দ্বিকতায়। কবির সৃজনশীল সৃষ্টি প্রবাহের
উৎসরণের উৎসবে। সেই বিস্ময়ের সংগীত মূর্ছণা রবীন্দ্রজীবনের ভরকেন্দ্রে সতত
ঊর্মিমুখর। সতত আশ্রয় আমাদের মত পরবর্তীদের জন্য।
শান্তিনিকেতন গ্রন্থে কবি বললেন, "আমদের
যথার্থ তাৎপর্য আমাদের নিজেদের মধ্যে নেই, তা জগতে সমস্তের
মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। সেই জন্য আমরা বুদ্ধি দিয়ে, হৃদয় দিয়ে,
ও কর্ম দিয়ে কেবলই সমস্তকে খুঁজছি। কেবলই সমস্তের সাথে যুক্ত হতে
চাচ্ছি; নইলে যে নিজেকে পাইনে। আত্মাকে সর্বত্র উপলব্ধি করব,
এই হচ্ছে আত্মার একমাত্র আকাঙ্খা।" বড়ো গূঢ় কথা বললেন কবি।
সমস্তের সাথে যুক্ত হতে না পারলে জীবাত্মা মিলবে কি করে বিশ্বাত্মার সাথে। সেই
মিলনের অভিসারই তো সেই পথ, যে পথের পথিক মানবাত্মাও। সেই
যাত্রায় জ্ঞানযোগ প্রেমযোগ ও কর্মযোগ আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি। এই সহজ সত্যটিই
ধরিয়ে দেন পথের সাথী রবীন্দ্রনাথ তাঁর আপন জীবনের গতিপথ দিয়ে।
পারিবারিক সূত্রে পিতা দেবেন্দ্রনাথের সান্নিধ্য
কবিকে বেদান্ত দর্শনের অভিমূখী করে তোলে অনেক অল্প বয়সেই। জীবনের প্রথম দিকেই
উন্মেষপর্বে তিনি প্রবল ভাবে প্রভাবিত হলেন বিভিন্ন উপনিষদ দ্বারা। বেদান্ত
দর্শনের মূল আধার এই উপনিষদ গুলির সাহচর্য্যেই কবি উপলব্ধি করলেন বিশ্বপ্রকৃতির
অন্তরস্বরূপকে। এই জগত সংসার ব্যাপী প্রচ্ছন্ন অনাদি অনন্ত বিশ্বসত্ত্বাকে কবি
উপলব্ধি করলেন জ্ঞানযোগে। বড়ো বিস্ময়ে অভিভূত হলেন জগত সত্যের অনন্ত আলোয়। কিন্তু
সেই আলোকিত সত্যকে জ্ঞানযোগে জেনেও পরিতৃপ্ত হল না রবীন্দ্রমনন। নৈর্ব্যক্তিক জানা
বৈজ্ঞানিকের কাম্য হতে পারে। হতে পারে দার্শনিকেরও। কিন্তু কবির পরিতৃপ্তি
নৈর্ব্যক্তিকতায় নয়। কবির কাজ রসতত্ব নিয়ে। দর্শনতত্ব বা তথ্যজ্ঞান নিয়ে নয়। তাই
বিশ্বাত্মাকে জ্ঞানযোগে তাঁর নৈর্ব্যক্তিক সরূপে জেনেই, শুধু জানার
মধ্যেই থেমে গেলেন না রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বসরূপকে ব্যক্তিরূপে প্রেমের শক্তিতে
প্রীতির সূত্রে অন্তরে পেতে চাইলেন রবীন্দ্রনাথ। নৈর্ব্যক্তিক বিশ্বদেবতা তাই দেখা
দিলেন ব্যক্তিরূপী জীবনদেবতা হয়ে ভক্তের মননে। বিশ্বাসে। প্রেমে। যিনি ছিলেন জ্ঞেয়
তিনি হলেন প্রেয়। যাঁকে জেনে ছিলেন জ্ঞানের আলোতে, তাঁকে
কাছে পেলেন বিশ্বস্ত প্রেমের অনুভবে। উপলব্ধির পরিসর থেকে পৌঁছে গেলেন অনুভবের
বাস্তবতায়। এই ভাবেই উপনিষদের সত্যকে কবি জীবনের সত্যে উদ্ভাসিত করে তুললেন তাঁর
স্বকীয় অনন্যতায়। এইখানেই কবি একেবারে নতুন একটি সত্যকে আলোকিত করলেন। তাঁর
জীবনদেবতা বা মানবাত্মার ঈশ্বর ভক্তের আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকেন না। বরং তিনি
নিজেই চলেছেন ভক্তের সাথে মিলনের আকাঙ্খায়। ২৮শে আষাঢ় ১৩১৭-এ লিখলেন অবিস্মরণীয়
সেই গান; "তাই তোমার আনন্দ আমার পর/ তুমি তাই এসেছ
নীচে-/ আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হতো যে
মিছে।" ভক্তের জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে ঈশ্বরেরই আকাঙ্খা বাসনা রূপ নিচ্ছে
ক্রমাগত। ভক্তের অন্তরে যে রসের খেলা, সে তো ঈশ্বরেরই আপন
লীলা। ভক্তের প্রেমে জীবনদেবতার প্রেমের সম্মিলনেই বিশ্বাত্মার পূর্ণ বিকাশ। তাই তো
জীবনদেবতা কবিতায় লিখলেন, "মিটেছে কি তব সকল তিয়াষ আসি
অন্তরে মম?" (২৯শে মাঘ ১৩০২)
একদিন আগে ২৭শে আষাঢ় ১৩১৭, কবি লিখেছিলেন;
"সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর-/ আমার মধ্যে তোমার
প্রকাশ তাই এত মধুর।" এই যে সীমার মধ্যেই অসীমের প্রকাশ এটি শাশ্বত সত্য।
নৈর্ব্যক্তিক সত্ত্বার ব্যক্তিরূপের প্রকাশের মধ্যে যে রসের খেলা, যে মধুর সৌন্দর্য্য, যে অপরূপ পরিতৃপ্তি সেটি
রবীন্দ্রনাথের একান্ত উপলব্ধি। কবির এই উপলব্ধির নেপথ্যে উপনিষদের বৈদান্তিক
দীক্ষার প্রভাব ছিল না, ছিল বৈষ্ণব ধর্মের ভক্তিরসের প্রভাব।
তাই রূপের লীলায় অরূপের মধুর মিলনে বিশ্বসাগর দুলে ওঠে প্রাণের স্পন্দনে। এই পথেই
কবি বিশ্বসত্ত্বার নৈর্ব্যক্তিক সত্যকে জীবনদেবতার ব্যক্তিগত প্রীতির মিলনের মধ্যে
দিয়ে হৃদয়সুধায় আত্মস্থ করলেন। পথের শেষ কোথায়? এখানেই কি
থেমে যাবেন কবি? অন্তরের প্রীতিতে জীবনদেবতার সাথে পরিপূর্ণ
মিলনের তৃপ্তিতেই কি ব্যক্তি জীবনের পূর্ণতা? হয়তো। হয়তো নয়।
কারণ ব্যক্তিগত এই তদাত্মতার মধ্যে এই পরিতৃপ্তির মধ্যে নিজের অন্তরতমের সাথে যোগ
হলেও নিজের অনাদী অনন্ত বিকাশের সিংহ দরজাটা খুলে যায় না। সেটা খুলতে গেলে
বিশ্বজনীন প্রাণের সেবার মধ্যে দিয়ে বিশ্বমানবতায় পৌঁছাতে হবে। অর্থাৎ বিশ্বাত্মার
সাথে জীবনদেবতার সূত্রে অর্জিত একাত্মতাবোধে বিশ্বমানবের প্রেমে বিশ্বজনীন কর্মে
আত্মনিয়োগে যে আনন্দ, সেই আনন্দেই আমাদের ব্যক্তি স্বরূপের
পূর্ণ প্রকাশ। তাই বিশ্বমানবের মধ্যে প্রীতি এবং সেবার মধ্যে দিয়েই আত্মার পূর্ণ
বিকাশ সম্ভব। "বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে
যোগ তোমার সাথে আমারো" বিশ্বমানবের সাথে প্রীতির সম্বন্ধে সেবার আনন্দে তিনি
বিশ্বাত্মার সাথে মিলবেন। নিরালা নির্জন ব্যক্তি জীবনের একান্ত আরাধনায় কেবল
একান্ত নিজের করে নয়, বিশ্বমানবতায় প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে,
নিরন্তর সেবায়, দূর্বার কর্মে সকলের একজন হয়ে।
উপনিষদে যেমন বলা হয়েছে সর্বজীবে ব্রহ্মের উপলব্ধির সত্যে বিশ্বমানবতাবোধের
একাত্মতায় সকলের মধ্যে নিজেকে একবার খুঁজে পেলে পরার্থে স্বার্থত্যাগ সহজ হয়,
আনন্দদায়ক হয়। সেই রকমই পূর্ণজ্ঞান থেকে মানব প্রেমের সঞ্চারে
সর্বজনীন কল্যাণ কর্মে আত্মনিবেদনেই মানুষের পূর্ণ উদ্বোধন। জ্ঞানে প্রেমে এবং
কর্মেই মনুষ্যত্বের প্রকাশ।
এপথেই বিশ্বকবি জ্ঞানযোগে প্রেমযোগে এবং
কর্মযোগের আনন্দে চলেছেন তাঁর পথেরসাথী জীবনদেবতার সাথে। টেনে নিয়েছেন আমাদেরকেও, আমাদের
পথেরসাথী বিশ্বপথিক কবি। এই বিরাট বিপুল বিশ্বের বিশ্বপথিক ঈশ্বর যে পথে সকলেরই
পথেরসাথী, সেই পথই সকলের পথ। শুধুই জ্ঞানযোগ নয়, শুধুই প্রেমযোগ নয়, সেবার যোগে কর্মের যোগে, আনন্দের উৎসরণই সেই পথের ঠিকানা। যে পথে " শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ
পরে ওরা কাজ করে" (ওরা কাজ করে/ ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪১) যেখানে, "যেথায় মাটি ভেঙ্গে করছে চাষা চাষ- / পাথর ভেঙ্গে কাটছে যেথায় পথ, খাটছে বারো মাস।" (ধুলামন্দির/ ২৭শে আষাঢ় ১৩১৭) -- সেখানেই কবি আমাদের
ডাক দিয়েছেন সকলের সেবায় জীবনের পূর্ণ উদ্বোধনে।
"To be truly united in knowledge; love; and
service with all beings; and thus to realise one's self in the all-pervading
God is the essence of goodness; and this is the keynote of the teachigs of the
Upanishads: LIFE IS IMMENSE।" (The Relation of the
Individual to the Universe/ SADHANA)
উপনিষদের এই দীক্ষায় উদ্দিপ্ত করলেন কবি।
আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে জীবনবাস্তবতায় সার্থক করে তোলার পথ দেখালেন পথেরসাথী কবি
তাঁর "ছোট আমি ও বড়ো আমির তত্বে।" আপন ব্যক্তিত্বের সংকীর্ণ পরিসর থেকে
মুক্ত হয়ে বিশ্বমানবের ব্যক্তিত্বে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার পথের, পথেরসাথী কবি।
"When a man does not realise his kinship with the world; he lives
in a prison-house whose walls are alien to him. When he meets the eternal spirit
in all objects; then is he emancipated; for then he discovers the fullest
significance of the world into which he is born; then he finds himself in
perfect truth; and his harmony with the all is established." (The Relation
of the Individual to the Universe./SADHANA)
এই যে ছোট আমির সংকীর্ণতা থেকে বড়ো আমিতে মুক্তি, এই প্রসঙ্গেই
১৩৩৮ এর আষাঢ়ে দার্জিলিং থেকে হেমন্তবালা দেবীকে এক পত্রে নিজের সাধনার দৃষ্টান্ত
দিয়ে লিখছেন কবি:-- "চিরন্তন বিরাট
মানবকে আমি ধ্যানের দ্বারা আপনার মধ্যে গ্রহণ করার চেষ্টা করি- নিজের ব্যক্তিগত
সুখদুঃখ ও স্বার্থকে ডুবিয়ে দিতে চাই তার মধ্যে, অনুভব করতে
চাই,আমার মধ্যে সত্য যা কিছু, জ্ঞানে
প্রেমে কর্ম্মে, তার উৎস তিনি। সেই জ্ঞানে প্রেমে কর্ম্মে
আমি আমার ছোটো আমিকে ছাড়িয়ে যাই, সেই যিনি বড়ো আমি, আমার মহান আত্মা, তাঁর স্পর্শ পেয়ে ধন্য হই, অমৃতকে উপলব্ধি করি। সেই উপলব্ধির যোগে আমার পূজা আমার সেবা সত্য হয়,
আত্মাভিমানের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়। কর্ম্মই বন্ধন হয়ে ওঠে এই
উপলব্ধির সাথে যদি যুক্ত না হয়।" ছোট আমির দাসত্ব থেকে বড়ো আমির উন্মুক্ত পথে
আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার এই হলো পথ। যে পথে তিনিও পথেরসাথী।
এভাবেই কবি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়াসে যে
সাধনাকে সত্য করে তুলেছিলেন, সেই সাধনার পথে তিনি আমাদেরও ডাক দিয়ে গেলেন।
বিশ্বজনীন মঙ্গলের শাশ্বত কল্যাণের সেই কর্মমুখর পথে- জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে
বিশ্বমানবের আহ্বান ব্যক্তি মানুষের কাছে। বিশ্বপথিক ডাক দিয়েছেন পথের সাথী হয়ে।
সেই পথ গিয়েছে চলে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে চিরন্তন প্রেমের বাঁশি বাজিয়ে। আর আমরা
যদি আমাদের অন্তরাত্মায় সেই বাঁশির ডাক একবার শুনতে পাই, তখনি
রমনীয় হয়ে ওঠে ব্যক্তিজীবন বিশ্বজনীন মানবাত্মার আত্মীয়তায়। সেই আত্মীয়তার সূত্রেই
আমাদের জ্ঞানে প্রেমে কর্মে দূর হয়ে ওঠে নিকট। পর হয়ে ওঠে আপন। প্রত্যেকেই তখন
বিশ্বপথিক পথেরসাথীর সাথে।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

