ধার্মিক ও ধর্মের পথ
হঠাৎ যদি কাউকে প্রশ্ন করা যায়। আপনার জীবনের লক্ষ্য কি? ধার্মিক হওয়া না সফল মানুষ হওয়া। প্রশ্ন শুনে অনেকেই চটে যেতে পারেন। সফল মানুষরা কি তবে ধার্মিক নয়? অনেকে তর্ক জুড়তে পারেন। সাফল্যের সংগা নিয়েই। অনেকেই পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন। ধার্মিক হওয়া আর সফল হওয়া পরস্পর বিপরীত কোন বিষয় নাকি? যে, ধার্মিক হলে জীবনে সফল হওয়া যাবে না। বা জীবনে সফল হলে ধার্মিক হওয়া যাবে না? কিন্তু সরাসরি সুস্পষ্ট উত্তর দেওয়ার মতো মানুষ বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে প্রথমেই স্পষ্ট করে বলে রাখা ভালো। সফল মানুষ বলতে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সাংসারিক জীবনে অধিষ্ঠত এবং ব্যক্তিজীবনে কর্ম ও পেশায় সফল একজন মানুষের কথাই বলা হচ্ছে। সাফল্যের এই ছবিকে জীবনের সফলতা বলে ধরার পিছনে একটি গূঢ়তর সত্য রয়েছে। সেই সত্য বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন মহামতি ডারুইন সাহেব। বলে গিয়েছিলেন, সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’ এর তত্বকথা। অর্থাৎ জগতে সেই সফল। যে নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারে। এখন জগতসংসারের ইতিহাসই প্রমাণ, অস্তিত্ব রক্ষার জন্য করতে হয় নিরন্তর সংগ্রাম। প্রকৃতিতে প্রাণীজগতের ইতিহাসের মধ্যে এই তত্ব যতটা সত্য। মানুষের সমাজ ও সভ্যতায় প্রতিদিনের সাংসারিক জীবনেও সমান ভাবে সত্য।
নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত রাখতে গেলে অন্যের অস্তিত্ব যদি বিপন্ন হয়ে ওঠে? কি করবেন তবে আপনি? কথায় বলে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। বহুকাল আগে থেকেই আরও একটি কথা প্রচলিত। ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা”। হ্যাঁ মহামতি ডারুইন সাহেবের জন্মের বহু শতক আগে থেকেই কথাটা প্রচলিত। সেই কথারই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট” তত্বে। কিন্তু কাকে আমরা বীর বলি? মানুষের ইতিহাসে কাদের বীর বলা হয়? একটু সন্ধান করলেই দেখতে পাবো, যারা বাহুবলে বুদ্ধিবলে প্রভুত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন বহুজনের জীবন বিপর্যস্ত করে। এমনকি অনেকের প্রাণ সংহার করে। কারুর প্রাণ সংহার করা নিশ্চয় ধার্মিকের ধর্ম হতে পারে না। কিন্তু বীরের ধর্ম হতে পারে। তাই নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত রাখতে গেলে প্রয়োজনে অন্যের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে হলেও সেটাই সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট তত্বের সার কথা। তাই সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট তত্বের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ প্রান্তে অবস্থান একজন প্রকৃত ধার্মিকের। যিনি নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রয়োজন পড়লেও অন্য একজনেরও অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলেন না।
মানুষের ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমাদের সামনে এই সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডারউইন তত্বই সমগ্র জীবজগৎ সহ মানুষের সমাজ ও সভ্যতার সার সত্য। আজ অব্দি এই তত্ব ভুল প্রমাণিত হয় নি। এবার একটু নজর দেওয়া যাক বরং নিজের ঘরের দিকেই। অভিভাবকরূপে আমরা কজন সন্তান সন্ততিদের ধার্মিক হয়ে ওঠার শিক্ষা দিই? এর একটা সহজ উত্তর এই হতে পারে, আমরা অভিভাবকরা নিজেরাই বা কতজন ধার্মিক? যে সন্তানকে ধার্মিক হওয়ার শিক্ষা দেবো? বেশ, তবে প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করা যাক বরং। কতজন অভিভাবক তাদের সন্তান সন্ততিকে ধার্মিক হয়ে ওঠার পরামর্শ বা উপদেশ দিয়ে থাকেন? আর কতজন অভিভাবক, আপন সন্তানসন্ততিকে জীবনে সফল হয়ে ওঠার উপদেশ দিয়ে থাকেন? উত্তর নিয়ে বিশদে আলোচনার প্রয়োজন হওয়ার কথাও নয়। আমরা সকলেই প্রকৃত সত্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। কারণ আমরা জানি, ছেলে মেয়েরা ধার্মিক হলে আপন অস্তিত্ব টিকিয়েই রাখতে পারবে না। সংসার জীবনে এগিয়ে যেতে পারবে না সাফল্যের পথে। সাফল্যের পথ নিরন্তর প্রতিযোগিতার পথ। নিরন্তর সংগ্রামের পথ। নিরন্তর লড়াইয়ের পথ্। কিন্তু লড়াই কার সাথে? আমরা জানি লড়াই জীবন সংগ্রামে অবর্তীর্ণ প্রতিটি প্রতিযোগীর সাথেই। সেই লড়াইয়ে বাকিদের হারিয়ে নিজের জীবনে সাফল্যের সাথে এগিয়ে যেতে পারার শিক্ষাই তো দিয়ে থাকি আমরা। অভিভাবক রূপে নাকি। ফলে জীবনের সফলতা নির্ভর করে সুস্পষ্ট ভাবে নিজের প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে তাকে প্রতিযোগিতায় পরাস্ত করে সাফল্যের সিংহাসনে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার ভিতর দিয়েই। আর সেটাই নিশ্চিত করে আমাদের অস্তিত্বের সুরক্ষার। যে বা যারা সফল ভাবে এই কাজ করতে পারে, তারই বীর। তারাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। মান্য গণ্য ব্যক্তি। এবং ডারুইন তত্বের সফল রূপকার।
কিন্তু একজন ধার্মিক মানুষ? কি তার আসল পরিচয়? পূর্বেই বলা হয়েছে, একজন ধার্মিক মানুষ তিনিই। যিনি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে হলেও অন্য একজনেরও অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারেন না। ঠিক যেমন বাঘ কখনো বাঘ শিকার করে না। সিংহ কখনো সিংহকে খেয়ে ফেলে না। অবশ্য তর্কের খাতিরে একথাও বলা যায়, বাঘ যে বাঘ শিকার করে না বা সিংহ যে সিংহকে খায় না। তার প্রমাণ হয় নি তো আজও। যদি দেখা যেত পৃথিবী জুড়ে বাঘ ছাড়া আর কোন জীব বা প্রাণী নাই। সেদিন প্রমাণ হতো আপন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাঘ, বাঘ শিকার করে কি করে না। তার আগে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না কিছুই। না গেলেও একটা কথা তো সত্যি। জীব বৈচিত্রে ভরা ভরপুর এই পৃথিবীতে আপন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আজও বাঘকে বাঘ শিকার করতে হয় না। বা সিংহকে খেতে হয় না আর একটি সিংহের মাংস। কিন্তু মানুষের সমাজে চিত্রটা ঠিক এর উল্টো। বড়ো মাছ যেমন ছোট মাছ খেয়ে জীবন ধারণ করে। ঠিক তেমনই শক্তিশালী মানুষ দুর্বল মানুষের জীবন বিপন্ন করে নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত রাখে। এমনকি, অন্য মানুষের প্রাণ সংহার করে হলেও নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করে থাকে। কিন্তু যিনি স্বভাবে ধার্মিক। তাঁর পক্ষে তো সম্ভব নয়। অন্যের জীবন বিপন্ন করে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া।
তাই একজন ধার্মিক ব্যক্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নন। তাঁকে হতে হয় সহযোগিতায় বিশ্বাসী। তিনি আগেই কোন প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার লড়াইয়ে নামেন না। উল্টে তিনি চেষ্টা করেন সকলের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন করে সমষ্টিগত ভাবে এগিয়ে চলতে। এই যে সমস্টির স্বার্থের কথা বিবেচনা করা। ব্যক্তিস্বার্থের উর্দ্ধে উঠে। এইটি একজন ধার্মিকের অন্যতম স্বাভাবিক বৈশিষ্ট। আর এর ঠিক উল্টে, বিপরীত অবস্থানে রয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে সমষ্টির স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। একজন ধার্মিকের চেতনায় কেউই তাঁর প্রতিপক্ষ নন। সকলেই তাঁর সহযাত্রী। একজন ধার্মিকের পক্ষে গোষ্ঠীচেতনায় বাঁধা পড়া সম্ভব নয় কখনোই। তিনিই একজন ধার্মিক যিনি কোন একটি বিশেষ সম্প্রদায়, গোষ্ঠী ও ধর্মে বিশ্বাসী নন। যাঁর কাছে সকল ধর্ম সমান। যিনি মানুষকে সম্প্রদায়ে ভাগ করেন না। যাঁর কাছে ধর্ম বর্ণ ভাষা জাতি সম্প্রদায় গোষ্ঠী ধনী নির্ধন নির্বিশেষে সকলেই সমান। সকলেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমান আপন। সকলেই তাঁর আত্মীয়। কেউ তাঁর প্রতিপক্ষ নন। সেই রকম একজন মানুষই ধার্মিক। যিনি ধর্মগ্রন্থের পাতায় ধর্ম খুঁজে বেড়ান না। যিনি ধর্মস্থানে ঈশ্বরের খোঁজে জীবনের মহামূল্যবান সময় নষ্ট করে অপব্যায় করেন না আপন জীবন। যিনি কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের আচার ব্যবহার নকল করে ধর্ম পালনের কর্তব্য করেন না। যিনি সকলের সমান বিকাশ ও উন্নতির জন্য কর্ম করে যান। জীবনভর। সকল ধর্ম সম্প্রদায় জাতি ও বর্ণের উর্দ্ধে উঠে সকল মানুষকে যিনি আপন আত্মীয় জ্ঞানে নিজের বুকে টেনে নিতে পারেন। ঠিক যেমন আপন সন্তানকে নিজের বুকে টেনে নেয় জননী। যিনি ঠিক সেই ভাবে আবিশ্ব মানুষকে আপন করে নিতে পারেন। আবিশ্ব সকলের সমান উন্নতি ও সমৃদ্ধির চেষ্টায় কর্ম ও সাধনায় অবতীর্ণ হন। তিনিই আসলে ধার্মিক। কোন ধার্মিকই কোন বিশেষ ধর্মগ্রন্থ মুখে করে বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মস্থানে বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় আচার আচরণ পালনে জীবন নষ্ট করেন না। কোন ধার্মিকের কাজই নয় তা। একজন ধার্মিক নিজের উন্নতির জন্য ছোটেন না। সকলের উন্নতির জন্য ছোটেন।
মানুষের সমাজ ও সভ্যতায় দেশ জাতি ধর্ম সম্প্রদায় গোষ্ঠী বর্ণ এই সব ধরণের বিভেদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে। এই সকল বিভেদের উর্দ্ধে উঠে যিনি সকল মানবের কল্যাণের জন্য কর্ম ও সাধনার জীবনে এগিয়ে চলেন একান্ত সততার সাথে নিবিষ্ট অধ্যবসায়। তিনিই প্রকৃত ধার্মিক।
না, এমন মানুষ আজও জন্মিয়েছেন কিনা সন্দেহ থাকতেই পারে আমাদের। কিন্তু ধার্মিকরে পথ যে এইটিই। ধার্মিকরে প্রকৃতি যে এইটিই। এই বিষয়ে যেন সন্দেহ থাকে না কোন। আমরা হয়তো একথাও বলতে পারি যে, মানুষের সমাজ সভ্যতায় প্রকৃত ধার্মিকের জন্ম সম্ভব নয়। অন্তত যতদিন ডারুইন তত্ব অটল সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে হিমালয়ের মতো দৃঢ় হয়ে। কিন্তু এই কথা যেন ভুলেও বিশ্বাস করতে বসে না যাই, ধর্মপুস্তক মুখস্থ করতে পারলেই আমরা ধার্মিক। ধর্মস্থানে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলেই আমরা ধার্মিক। দুইবেলা নানাবিধ সাম্প্রদায়িক আচার অনুষ্ঠান পালন করতে পারলেই আমরা ধার্মিক। বিশেষ বিশেষ সম্পদায়ের হয়ে বিশেষ বিশেষ ঈশ্বরের নাম স্মরণ করলেই আমরা ধার্মিক। কিংবা বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের একান্ত অনুগত হলেই আমরা ধার্মিক। না তা কখনোই নয়।
আবার মানুষের সমাজ ও সভ্যতার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই আমরা দেখতে পাই। এক এক সময়ে এক একটি সমাজে এক একজন মানুষ জন্মিয়েছিলেন। যাঁরা সকল মানুষের মুক্তির জন্য কর্ম ও সাধনা করে গিয়েছিলেন। যাঁরা নিজেদেরকে বিশেষ বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়। গোষ্ঠী বা জাতির ভিতরে আবদ্ধ করে রাখেন নি। ইতিহাসের পথে এই রকমই একজন ব্যক্তি গৌতম বুদ্ধ। যিন স্বয়ং, কোন ঈশ্বরেও বিশ্বাসী ছিলেন না। বিশ্বাসী ছিলেন, মানুষের অমেয় শুভবোধে। যিনি সকল ধর্ম সম্প্রদায় জাতি ও বর্ণের উর্দ্ধে উঠে জগতের সকলের জন্য একটা পথ কাটতে চেয়েছিলেন। যে পথে, প্রতিযোগিতায় নয়। সহযোগিতায় মানুষ পরস্পর পরস্পরের হাত ধরে এগিয়ে যাবে মানবিক বিকাশ ও উন্নতির দিকে। গৌতম বুদ্ধ কোন ধর্মের পত্তন করেছিলেন না। তিনি জাতি ধর্ম দেশ কাল বর্ণ সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষকে ধার্মিক হয়ে ওঠার পথে আহ্বান করেছিলেন। মানুষের ব্যর্থতা। সকল মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিতে পারে নি। আজ পারেনি বলে যে আবার ভবিষ্যতেও কোনদিন পারবে না। তেমনটি ভাবার কোন কারণ নাই। হ্যাঁ যতদিন ডারুইন সাহেবের সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট তত্বকে মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের ভিতর দিয়ে উপলব্ধি করতে থাকবে ততদিন পারবে না।
একই সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট তত্বকে মানুষ যদি সমস্টির ভিতর দিয়ে অর্থাৎ সকল মানুষের সমান স্বার্থের ভিতর দিয়ে উপলব্ধি করতে পারতো, বা পারে কোনদিন। তখন দেখা যাবে, প্রকৃত ধার্মিকের পথই সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের আসল পথ। আজ অব্দি আমরা এই তত্বকে ব্যক্তি স্বার্থের প্রেক্ষিতে দেখেই গোড়ায় গণ্ডগোল করে বসে আছি। আর সেই গণ্ডগোল এমনই যে ,ব্যক্তি স্বার্থ ভয়ঙ্কর গোষ্ঠী স্বার্থে পর্যবসিত হয়ে মানুষে মানুষে হানাহানি। যুদ্ধ ও শোষণ এবং নির্যাতনের রূপ নিয়েছে। যাকে সম্পূর্ণ ভ্রান্তি বশত আমরা সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট বলে ধরে নিয়ে বসে আছি। আর ভাবছি। মানুষে মানুষে হানাহানি। জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে দাঙ্গা আর গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়েই পারস্পরিক লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে যে বা যারা নিজের বা নিজ সম্প্রদায়, গোষ্ঠী কিংবা জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে তারাই টিকে থাকবে। একেবারে যদুবংশ ধ্বংসের সার্বিক আয়োজন সম্পূর্ণ। এই পথ মানুষের পথ নয়। এই পথ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীচেতনার পথ। এই পথ ধনতান্ত্রিক শোষণবাদী অর্থনীতির পথ। এই পথ সাম্প্রদায়িক চেতানার পথ। এই তিন মহারোগে আবিশ্ব মানুষ রোগগ্রস্ত আজ। সার্বিক ভাবে আবিশ্ব শিক্ষা ও দীক্ষার অভিমুখ বাস্তব সত্যের সম্পূর্ণ উল্টো মুখে ধাবিত। মনুষ্য প্রজাতির পক্ষে সম্পূর্ণ আত্মঘাতী এই পথের বিরুদ্ধে আধুনিক যুগে যে কয়কজন ধার্মিক ব্যক্তি রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর ভিতর সকলের আগে নাম করতেই হয় কার্ল মার্কসের। মার্কসের পথ বিভেদের বিরুদ্ধে একতার পথ। মার্কসের পথ ধনতান্ত্রিক শোষণবাদী গোষ্ঠী চেতনার বিরুদ্ধে সকল মানুষের সার্বিক মুক্তি ও বিকাশের পথ। মার্কসের পথ অসাম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের পথ। যে সাম্যের পথে সকলের আগে হাঁটা শুরু করেছিলেন সেই নাস্তিক গৌতম বৌদ্ধ। যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না। কাল্পনিক ঈশ্বর নয়। যাঁর কাছে মানুষই সর্বশেষ সত্য। মানুষের সেই সত্যকেই অর্থনীতির এক বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামোয় ধরতে প্রয়াসী ছিলেন আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী কার্ল মার্কস।
আমাদের সৌভাগ্য প্রায় সমসাময়িক সময়ে আমরা পেয়েছিলাম এই পথেরই আরও দুইজন শ্রেষ্ঠ ধার্মিক মনীষীকে। আমাদের অনেকের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ। এবং অনেকের বিশ্বাসের ঋষি অরবিন্দ। এঁদের দুই জনের কর্ম ও সাধনার পথে তাঁরা সমগ্র মনুষ্য প্রজাতিকেই সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের উপযুক্ত করে তুলতে প্রয়াসী ছিলেন। কিন্তু সেই সত্য আমরা অধিকাংশই বুঝতে পারি নি। তাই যে যেমন সম্ভব নিজের ব্যক্তিস্বার্থের সাথে এঁদের সৃষ্টির সমাঞ্জস্যসাধন করে নিয়েছি। এবং নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছি। নিচ্ছি। ব্যক্তি জীবনেও এঁদের পথকে স্বীকার করি নি। সমস্টিগত ভাবেও এঁদেরকে স্বীকার করিনি কোনভাবেই। বরং যে যেমন ভাবে পেরেছি অন্যের জীবন বিপন্ন করে হলেও নিজের অস্তিত্ব সুরক্ষিত করতে নিজেদেরকে শানিয়ে নিয়েছি। নিচ্ছি।
এই পথের এযাবৎ সময়ের শেষ পথিক হিসাবে ধার্মিক যে মানুষটি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির শোষণবাদী যাঁতাকল থেকে বিশ্বের মানুষের মুক্তির স্বপ্নে নিজের জীবন নিবেদন করেছিলেন। তিনি আজও অনেকের স্বপ্নের চরিত্র। চে গুয়েভারা। কিন্তু একা একা ধর্মের পথে কারুর পক্ষেই বেশিদূর এগোনো সম্ভব হয় না। তিনি যত বড়ো মনীষীই হন না কেন। প্রয়োজন যুথবদ্ধ সমষ্টিগত প্রয়াস। বিশ্বব্যাপী সেই প্রয়াস শুরু না হলে একা কয়েকজন ধার্মিক মনীষীর পক্ষেও মানবজাতিকে তার আত্মঘাতী চরিত্র থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয় কোনভাবেই। কারণ যুদ্ধটা তিনটি ভয়ানক শক্তিশালী সংক্রমক রোগের বিরুদ্ধে। পূর্বেই সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী বিদ্বেষমূলক গোষ্ঠীচেতনা। ধনতান্ত্রিক শোষণবাদী অর্থনীতি। এবং ঈশ্বরবাদী সাম্প্রদায়িক আচারবিচার সর্বস্ব বিভেদমূলক চেতানা।
এই তিন সংক্রমক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে পথ একটাই। সেটি পারস্পরিক সহযোগিতার পথ। প্রতিযোগিতার লড়াই মানুষের উন্নতির প্রতিবন্ধক। রবীন্দ্রনাথ কতবার কতভাবে এই সত্য উপলব্ধি করাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমরা কর্ণপাত করি নি। আমরা তাঁকে ব্যবহার করে আখের গোছাবো। কিন্তু তাঁকে নিজের জীবনে পথপ্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করে ধার্মিক হয়ে উঠবো না। যে কোন রোগের নির্মূল করতে হলে, রোগটিকে শিকড়সুদ্ধ উপড়িয়ে ফেলে বিনাশ করা দরকার। শিকড়সুদ্ধ উপড়িয়ে ফেলারই এক বৈজ্ঞানিক পথের সন্ধান দিয়ে গিয়েছিলেন মার্কস। কিন্তু শিকড় সুদ্ধ উপড়িয়ে ফেলার বদলে আমরা রোগটিকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছি মাত্র। বাড়ির বাগানের ঘাস কাটা আর আগাছা পরিস্কারের মতোন। শিকড়টা রয়েই গিয়েছিলো। তাই আবার রোগের ভয়াবহ বিস্তার আরও মারাত্মক সংক্রমণের রূপ নিয়েছে। যে কোন রোগ কোন না কোন ভাইরাস বা ব্যকটেরিয়ার ভিতর দিয়েই সংক্রমিত হয়। তাই সেই ভাইরাস বা ব্যকটেরিয়াকে বিনাশের জন্য ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার করতে হয়। চে গুয়েভারা বিনা টিকায় সেই ভাইরাসকে বিনাশ করতে গিয়েই ভাইরাসের হাতেই মারা পড়লেন। কারণ এই মারণ ভাইরাসের বিনাশ কোন একক মানুষের কাজ নয়। সম্ভবই নয়। এবং মারণ ভাইরাসের বিনাশের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা আবিষ্কারের প্রয়াসেই সাধনায় বসেছিলেন আমাদের ঋষি অরবিন্দ। টিকা আবিষ্কারের এক পরিস্কার পথ তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আমরা রাজি হই নি আজও। সেই পথে এগোনোর চেষ্টা করে দেখতেই। হয়তো আগামী ভবিষ্যতে সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের তলায় চাপা পড়ার পরেই মানুষ প্রকৃত ধার্মিকের পথে পা বাড়ানোর কথা ভাববে। সার্বিক ধ্বংসের আগে যদি না সচেতন হই আমরা। ততদিন ব্যক্তিগত সাফল্যের পথ আঁকড়িয়ে ধরে ঝুলতে গিয়ে পরস্পর কেবলই পরস্পরকে ঠেলে ফেলে দিতে স্বচেষ্ট থাকবো। প্রতিযোগিতার বাইরে। আর কখনোই আপন সন্তানসন্ততিকে ধার্মিক হওয়ার উপদেশ দেবো না। পথ দেখানো তো দূরস্থান। যে পথে নিজেরাই এগোতে রাজি নই। সেই পথে কোন বিশ্বাসে ঠেলবো আত্মজদের? তাই, এই বিশ্বে যত বেশি সফল মানুষের ভিড় বাড়তে থাকবে তত বেশি মুশকিল হবে এক আধজন ধার্মিকরে জন্ম!
১৪ই সেপটেম্বর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

