আনন্দের স্বরূপ সন্ধান ও আমাদের আত্মপ্রতিকৃতি



আনন্দের স্বরূপ সন্ধান ও আমাদের আত্মপ্রতিকৃতি

ভালোবাসার মানুষটিকে বুকে জড়িয়ে ধরার মতো আনন্দ মানুষের জীবনে খুব কমই আছে। আবার আজকের সেই ভালোবাসার মানুষটির সাথে নিজের জীবন জড়িয়ে নিয়ে যদি পদে পদে হোঁচট খেতে হয় কালকে, তবে সব আনন্দই মাটি। আজকে যাকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে মশগুল, বুকের সান্নিধ্যে যার অস্তিত্বে নিজেকে আজ সম্রাট শাহজাহান বলে মনে হচ্ছে। কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কালকেই তার সান্নিধ্য বুকের মাঝে অস্বস্তির কাঁটা হয়ে বিঁধবে না। আর তখন বুকের সেই কাঁটা উপড়িয়ে ফেলার জন্যেই আমাদের যাবতীয় উদ্যোগ। উদ্যোগ সফল হলে সেও এক আনন্দ। মুক্তির আনন্দ। ফলে আজকের আনন্দ আগামী কালকে নিরানন্দ হয়ে দেখা দিতেই পারে। আজ যাকে পেয়ে আনন্দ। কাল তাকে তাড়িয়েই হয়তো আনন্দ লাভ। না, আমাদের সকলের জীবনেই যে ভালোবাসার সম্পর্কগুলিতে অহরহ দিনরাত এমনই হচ্ছে তা নয়। হলে তো সংসার টিকতো না। জীবন হয়ে উঠতো অসহনীয়। কিন্তু তবু অনেকের জীবনেই এই রকম ঘটনা ঘটতে দেখাও যায়। একই মানুষ একদিন আনন্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। আবার একদিন সেই একই মানুষই যাবতীয় নিরানন্দের কারণ।


আমাদের এই আনন্দের অনুভুতির সাথে আমাদের ব্যক্তি স্বার্থের চাওয়া পাওয়ার হিসাব নিকাশ জড়িয়ে গেলেই এই রকম দুর্ঘটনা ঘটার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। ব্যক্তিস্বার্থের চাওয়া পাওয়ার পারস্পরিক হিসাব নিকাশ মিলে গেলে কোন সমস্যা থাকে না। সমস্যা থাকে না ততদিনই, যতদিন হিসাবে গরমিল ধরা পরে না। গরমিল ধরা পড়লেই সমস্যার শুরু। আবার একথাও সত্য। ব্যক্তি স্বার্থের চাওয়া পাওয়ার হিসাব নিকাশ মিলে যাওয়ার সাথেই কিন্তু আনন্দের যোগ। অর্থাৎ আমাদের আনন্দ পাওয়া এবং না পাওয়ার সাথে আমাদের ব্যক্তি স্বার্থ জড়িত ওতোপ্রোতো ভাবে। সব আনন্দের ভিতরে ব্যক্তি স্বার্থের এই সংযোগ আমাদের আনন্দকে একান্ত আমাদের নিজস্ব করে রেখে দেয়। একটা ক্ষুদ্র আমির স্বার্থ ও চেতনার সীমায় ঘুরপাক খেতে থাকে এই আনন্দ। আর সেই কারণেই এই আনন্দের স্থায়িত্ব সম্বন্ধে আগাম নিশ্চিত হওয়া কষ্টকর। এই আছে এই নাই।


শুধু যে প্রিয় মানুষটিকে বুকে জড়িয়ে ধরার মধ্যেই আনন্দের স্থিতি তাও নিশ্চয় নয়। আমরা আমাদের প্রিয়জনদের জন্যে যা কিছু ভালো করার চেষ্টা করি। সেই করার ভিতরেই এক নির্মল আনন্দ পাই। প্রিয়জনের সাথে আমাদের ব্যক্তি স্বার্থের সংযোগ আছে বলেই যে সেই আনন্দ নির্মল হতে পারবে না। না, তেমনটাও নয়। প্রিয়জনের ভালোর জন্য উন্নতির জন্য আমরা অনেক সময় অনেক কষ্ট স্বীকার করি। ত্যাগ করি। সেই কষ্ট স্বীকার করা প্রিয়জনের জন্য কিছু ত্যাগ করার ভিতরেই আনন্দের নির্মলতা। যদিও প্রিয়জন আমাদের ব্যক্তি স্বার্থের সাথেই সমন্বিত। আমাদের পিতামাতা আমাদের জন্য হাসিমুখে যত কষ্ট ক্লেশ স্বীকার করেন। নিজেদের জীবনের নানাবিধ সুখ আহ্লাদ ত্যাগ করেও আমাদের ভালোর জন্য উন্নতির জন্য তাঁদের যে প্রাণান্তকর প্রয়াস। তার ভিতরে ব্যক্তি স্বার্থ নিহিত থাকলেও সেই আনন্দের নির্মলতা কিন্তু চিরকালই অমলিন মানুষের সংসারে।


আবার ব্যক্তি স্বার্থের সম্পর্ক ছাড়াও কোন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভিতরেও অনেকে আনন্দ পেয়ে থাকেন। সেটি তাঁদের চরিত্রের গুণ। তাঁদের মনুষত্বের মাধুর্য্য। তাঁরা তখন যে আনন্দটুকু উপভোগ করেন। তার নির্মলতার কোন তুলনাই হয় না। যদিও আজকের পৃথিবীতে এই রকম মানুষ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছেন। তবুও তাঁদের উপস্থিতি মানুষের সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বিরল ঐতিহ্য।


সমাজ সভ্যতা যত বেশি ভোগবাদ কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, আনন্দের প্রকৃতি তত বেশি করে ব্যক্তি স্বার্থের চাওয়া পাওয়া হিসাব নিকাশ নির্ভর হয়ে পড়ছে। আর তখনই আনন্দের ভিতর বিশেষ কোন নৈতিকতার ভিত্তি থাকছে না। আনন্দ হয়ে উঠছে প্রত্যাশা পুরণের উল্লাস, উদযাপন। এবং বিশেষ করে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে যে যত বেশি সংখ্যক মানুষকে টপকিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য পুরণের অভিমুখে। তার আনন্দ প্রাপ্তি তত বেশি সার্থকতার মুখ দেখবে। এবং স্বভাবতঃই এই আনন্দ নেহাৎই ক্ষণস্থায়ী। চাহিদার কোন অন্ত নাই। একটি লক্ষ্য পুরণ হয়ে গেলেই স্থির হয়ে যায় পরবর্তী লক্ষ্য। যে লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলে আনন্দের সলিল সমাধি। এইভাবে আনন্দ লাভের মোহ আমাদেরকে আসলেই এক নিরানন্দের সাম্রাজ্যের নাগরিক করে তুলতে পারে। প্রতিটি ক্ষণস্থায়ী আনন্দের পিছনে ছুটতে ছুটতে সামগ্রিক এক নিরানন্দের বাসিন্দা হয়ে উঠতে পারি আমরা।


কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সামগ্রিক মানবকল্যাণের লক্ষ্যে নিজেদের চাহিদাকে যদি প্রতিস্থাপিত করা যায়। এবং সেই প্রয়াসেই যদি এগোতে থাকি আমরা। তখন যে আনন্দের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে। সে কিন্তু এক বিরল অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার আনন্দ অপরিসীম। সকলের জীবনে সেই বিরল আনন্দ লাভ ঘটে না সচারচর। কারণ সকলেই ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে বৃহৎ মানবসত্তার প্রতি অন্তরের কোন টান অনুভব করতে পারেন না। সেই না পারার মূলে আমাদের শিক্ষার অভাব। আমাদের সংস্কারের প্রভাব। আমাদের লোভের প্রবৃত্তি বর্তমান। এই বাধাগুলিকে কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্য সকলের থাকবে। এমনটা আশা করাও বাড়াবাড়ি। যাঁরা সেই বাধাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে পারেন। কাটিয়ে উঠে ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের সীমা ডিঙিয়ে সামগ্রিক মানবতার উন্নতির সাধনায় জীবন উৎসর্গ করতে সক্ষম হন। আমরা তাঁদেরকেই বলি মহাপুরুষ। তাঁরা কোন ভিন গ্রহের বাসিন্দা নন। নন কোন অতিমানব। যে সকল অন্ধকারগুলি আমাদের চিন্তা চেতনার চারদিকে অন্ধত্বের পাঁচিল তুলে রাখে, তাঁরা সেই পাঁচিলগুলির প্রত্যেকটিকে ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম হন মাত্র। যেটা আমরা পারি না বললে ঠিক বলা হয় না। আমরা পারতে চাইনা বললেই সঠিক কথা বলা হয়। আমরা একদম জেনে বুঝেই নিজেদেরকে মহাপুরুষদের কাছ থেকে শত যোজন দূরে রাখি। রাখি নেহাৎই সেই ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থেই।


ফলে আমাদের যাবতীয় আনন্দ অনুভব করতে পারা ও না পারাও সেই ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের আঙিনায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এই যে একটা ঘুরপাক খাওয়ার সংস্কৃতি সেই সংস্কৃতিই সময়ে অসময়ে অনেক নোংরা কাজেও আনন্দ পেতে সাহায্য করে। ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ঈর্ষা পরশ্রীকাতরতা হিংসা বিদ্বেষ ক্ষোভ ক্রোধ এবং লোভ আমাদেরকে অনেক অন্যায় কর্মের ভিতর থেকেও আনন্দ পেতে উৎসাহিত করে থাকে। এবং আমরা পেয়েও থাকি। দৃষ্টান্ত দিতে শুরু করলে চিত্রগুপ্তের খাতাও ফুরিয়ে যাবে নিশ্চয়। কিন্তু এটা অনেক বড়ো সত্যি যে, আমরা যে যার ব্যক্তি ক্ষমতায় বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় নানান ধরণের অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে থেকে নিজেদের ইচ্ছাপুরণের হাত ধরে প্রভুত আনন্দ লাভ করে থাকি। এমন অনেক মানুষ রয়েছেন। অন্যের ক্ষতি না করতে পারলে রাতে ভালো ঘুম হয় না। এই ধরণের মানুষই অপরের ক্ষতি করার ভিতর দিয়েই নিজের ক্ষমতা জাহির করার আনন্দ লাভ করে থাকেন। আর মানুষের সমাজে এই প্রবণতা সবচেয়ে মারাত্মাক এবং সর্বাত্মাক সংক্রমক রোগ। একজনের দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে বহুজনের ভিতরেই, অপরের ক্ষতি করে আনন্দ প্রাপ্তির এই রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে। এই সংক্রমণ ঠেকানোর বহু চেষ্টা করে গিয়েছেন বহু সংখ্যক মহাপুরুষ। কিন্তু কাজের কাজ বিশেষ কিছুই হয় নি। হয় নি কারণ অন্যের ক্ষতিজনিত আনন্দলাভের এই রোগের কার্যকর কোন প্রতিষেধক টিকা আজ অব্দি আবিষ্কৃত হয় নি। মানুষের সমাজ ও সভ্যতা এই টিকা আবিষ্কারের বিষয়ে এখনো হামাগুড়ি দেওয়ার পর্যায়েই রয়ে গিয়েছে। সেই কারণেই কোন মহাপুরুষের জীবন ও সাধনা বাণী ও কর্ম আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারে নি আজও। আমরা যে তিমিরে। রয়ে গিয়েছি সেই তিমিরেই।


এবং সেই কারণেই নিঃস্বার্থ ভাবে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে তার উপকার করার প্রয়াসের ভিতর দিয়ে যে নির্মল আনন্দ লাভ হয়। সেই আনন্দ আমাদের সমাজ জীবনে অনেকটাই বিরল ঘটনা। বরং অন্যের ক্ষতিসাধন করার ভিতর দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের ঈর্ষা পরশ্রীকাতরতা হিংসে বিদ্বেষ ক্ষোভ ক্রোধ এবং লোভের চরিতার্থতাজনিত যে আনন্দ লাভ হয়, সেই ঘটনাই আমাদের সমাজ সভ্যতায়, জীবন ও সংসারে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মানব সভ্যতার মূল সংকট ঠিক এইখানেই। আনন্দের মতো একটি শ্রেষ্ঠ মানবিক অনুভুতিও নিদারুণ অমানবিক অনুভুতির ভিতর দিয়েও লাভ করা সম্ভব হয়। মানুষ হিসাবে এখানেই আমাদের পদস্খলন। পশুজগতে এই পদস্খলন নাই। তাই আমাদের প্রতিটি আনন্দ প্রাপ্তির মূলে আমাদের দেখা দরকার সেই আনন্দের গোত্র নির্মল না দুষিত? তার ভিত্তিতেই স্থির হবে আমাদের চরিত্রের স্বরূপ। আমাদের মানসিক প্রকৃতি। আমাদের কর্ম ও সাধনার গতি প্রকৃতি। এবং আমাদের আত্মজীবনী।

১২ই অক্টোবর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত