সাবাশ বাঙালি

 

সাবাশ বাঙালি!


বাঙালির মতো আজব প্রজাতি দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় নাই। রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস পর্য্যন্ত বাংলার যে নবজাগরণ। সেই নবজাগরণের রথী মহারথীরা সকলেই ভারতীয় ছিলেন। কেউই বাঙালি ছিলেন বলে মনে হয় না। ভারতবর্ষই তাদের জন্মভুমি। ভারতীয় সংস্কৃতিই তাদের আরাধ্য। এবং ভারতের মুক্তিই তাদের অভিষ্ট ছিল। ফলে এনাদের কেউই একমাত্র আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ব্যাতীত, কেবলমাত্র বাংলা ও বাঙালির কথা ভাবেন নি। ভাবতে পারেন নি। তাঁরা সকলেই কম বেশি ভারতীয় হিসাবে সমগ্র ভারতকেই আপন স্বদেশ জ্ঞান করে সেই ভারতের জন্যেই জীবনের সব উদ্যোগ ব্যায় করে গিয়েছেন। যে কারণে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ উৎসর্গ করা যতজন বন্দী আন্দমানের সেলুলার জেলে আটক ছিলেন, তার নব্বই শতাংশই ছিলেন বাঙালি। ভারতের অন্যান্য জাতিসমূহ যে সময়ে নিজদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছিল, সেই সময় বাঙালি ভারতের স্বাধীনতার জন্য নিজের আখের তছনছ করে জীবন উৎসর্গ করতেই সময় ব্যায় করেছিল সবচেয়ে বেশি। আর সেই স্বাধীনতাই এলো বাংলাকে কেটে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়ে। সাবাশ বাঙালি। ধন্য তোমার ভারতীয়ত্বের চেতনা ও কর্ম সাধনা। ভারতবর্ষ তোমাকে উপযুক্ত পুরস্কার দিয়েই স্বাধীনতাকে বরণ করে নিয়েছিল ১৯৪৭ সালে। বাঙালির তাতেই কি আনন্দ! সালটি ছিল ১৯৪৭। হিন্দু বাঙালি ভারতের স্বাধীনতায় উল্লসিত! মুসলিম বাঙালি পাকিস্তানের স্বাধীনতায় উল্লসিত। আহা কি জাতীয়তা বোধ! দুই একজন ছাড়া কিন্তু কোন বাঙালিই সেদিন বাংলার স্বাধীনতার কথা ভাবেন নি। বাংলা ভাগে কাঁদেননি! ১৯৪৭ ‘এর সেই বাঙালিরই উত্তর পুরুষ তো আজকের আমরা। সাবাশ বাঙালি। নিজের পিঠ নিজেই চাপড়াই আসুন।


ব্রিটিশ আসার আগে বাঙালির সমগ্র জনপদের অংশ ছিল আজকের ভাগলপুর পূর্ণিয়া রাঁচী ধানবাদ। আহা কি পরম আনন্দ আমাদের বাঙালিদের। ব্রিটিশের কৃপায় সেই জনপদগুলি বিহারে জুড়ে গেল। তা যাক। আমাদেরই ভারতে তো থাকলো। গোটা ভারতই নাকি বাঙালির স্বদেশ। ও মাতৃভুমি। তোবা তোবা! ঠিক যেমন সেই ১৮৭৪ সালে বাংলার শত শত বছরের মাটি রংপুর শ্রীহট্টের একটা বড়ো অংশ আসামে জুড়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ। আজকের শিবসাগর কাছাড় গোয়ালপাড়া বরাক উপত্যাকার হাইকালিন্দী করিমগঞ্জ শিলচরের হাজার হাজার বছরের বাংলার মাটি সেই ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশের কলমের খোঁচায় যখন আসামে ঢুকে গেল, একজন বাঙালিরও তাতে রাতের ঘুম নষ্ট হলো না। সাবাশ বাঙালি! এই না হলে আত্মঘাতী জাতি! তাই ১৯৪৭ -এ যখন এই আধখাওয়া বাংলার ভুখণ্ড হিন্দু মুসলিমে দুই খণ্ডে ভাগ হয়ে গেল। তখন বাঙালির ভারতীয়ত্বে ও পাকিস্তানীত্বে সেই দগদগে ক্ষতের কোন যন্ত্রণাই অনুভুত হলো না। বাঙালি নাকি কোন জাতি নয়। বাঙালির নাকি দুইটি জাতি। একটি হিন্দু। একটি মুসলিম। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। তাই ১৯৪৭ সালের বাঙালি, ভারতীয় আর পাকিস্তানী হয়ে দেশভাগের উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো। বিশ্ব ইতিহাসে পূর্ব নজিরহীন এই রকম ঘটনা দ্বিতীয়বার আর ঘটে নি কোথাও।


এপারে আমরা আজও আমাদের ভারতীয়ত্বে গৌরবান্বিত হয়ে মহানন্দে রয়েছি। কিন্তু ওপারের পাকিস্তানীত্বে গৌরবান্বিত বাঙালির বুদ্ধির গোড়ায় জল ঢুকতে শুরু করেছিল সেই ১৯৫২ সালেই। এবং ১৯৭১ সাল অব্দি পাকিস্তান কাকে বলে সেই সত্য সম্পূর্ণ হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতায় উল্লসিত হয়ে ওঠা বাঙালিরাই। লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে সেই শিক্ষা অর্জন করেই জন্ম নিয়েছিল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু এপারের কথা আলাদা। ওপারে লাহোর করাচীর বাসিন্দারা বাংলাদেশে জমি জায়গা দখল করে পুরুষানুক্রমিক ভাবে গেড়ে বসার চেষ্টা করে নি। ১৯৭১ সালেই পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে বর্তমানে অবাঙালি ভারতীয়দের সংখ্যা প্রায় এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এবং জন্মহার বেশি হওয়ার সুবাদে ও প্রতিদিন পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমানা দিয়ে অনুপ্রবেশের ফলে, সেই সংখ্যা প্রতি বছরেই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। অদূর ভবিষ্যতেই এই রাজ্যে বাঙালি অবাঙালির সংখ্যা সমান হয়ে যাবে। তা যাক। বিহারীরা, পাঞ্জাবীরা, মারাঠীরা, মারওয়ারীরা, গুজরাটিরা, তামিল তেলেগু উড়িয়া আসামীরা বাঙালির স্বদেশী ভাই কিনা। বাংলাদেশীদের মতো বিদেশী তো নয় আর! সাবাশ বাঙালি! তাই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির চেতনায় অবাঙালি ভারতীয় মাত্রেই তার মায়ের পেটের ভাই বোন। আপন স্বজন। তাদের জন্য আমরা সব কিছু ত্যাগ করতে পারি। আমাদের ভাষা ত্যাগ করতে পারি। আমাদের সংস্কৃতি ত্যাগ করতে পারি। আমাদের জমি জায়গা অধিকার সব কিছুই ত্যাগ করতে পারি। তাদের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে আমরা কি না করতে পারি। এ’যে আমাদেরই স্বজন। মায়ের পেটের সহোদর।


সত্যিই তো আসামে বাংলার জমিতেই বাঙালি নিধন করে বাঙালি খেদানোও আমাদের মোটা চামড়ায় কোন অনুভুতির জন্ম দেয় নি কোনদিন। আজও দেয় না, যখন ঊনিশ লক্ষ বাঙালির নাগরিকত্ব হরণ করে নেয় রাষ্ট্র। যে বাঙালিরা তাদের নিজ বাংলার মাটিতেই আসামের বাসিন্দা হয়ে কালাতিপাত করে আসছে সেই ১৮৭৪ সালে থেকেই। তাদের জন্য আমাদের বাঙালিদের প্রাণ না কাঁদলেও আমাদের অসমীয় ভাইবোনদের জন্য নিজের রাজ্যেকে উন্মুক্ত করে দিতে তো আর বাধা নাই। আমরা বরং সেই ১৯ লক্ষ বাঙালিকে রাষ্ট্র প্রচারিত তথ্যে বাংলাদেশী জ্ঞান করে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী করতেই উৎসাহ জুগিয়ে চলবো। সাবাশ বাঙালি!


এই যেমন, গত বছর কোর্টের রায় সত্তেও কলকাতার বিহারী বাসিন্দারা যখন আদালত অবমাননা করে রবীন্দ্র সরোবরের বন্ধ গেটর তালা ভেঙ্গে ছট পুজোর নামে সরোবরের জল দুষিত করে দিয়ে বাজনা বাজিয়ে নাচতে নাচতে চলে গেল! আমাদের বাঙালিদের তাতে কিছুই এসে গেল না। এসে গেল না প্রশাসনের। অপরাধীদের আদালত অবমাননার দায়‌ে গ্রেফতার করা হলো না। রুজু হলো না আদালতের রায় ভঙ্গ করার বিরুদ্ধে কোন মামলা। সরকারের কাছে বিহারীদের ভোটের মূল্য এতই বেশি। সংখ্যা তো আর কম নয়। কয়েক কোটি। কিন্তু একথা বলাই বাহুল্য, সেদিন পুলিশ এবং প্রশাসন যৌথভাবে অপরাধীদের প্রতিরোধ করতে গেলে, বিহারী জনতা ও পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যেত। কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে বিহারীদের দাপট এতটাই। তার আরও একটি বড়ো কারণ রাজ্যে পুলিশের একটা বড়ো অংশই কিন্তু বিহারী। এবং সেই খণ্ডযুদ্ধে যদি একজন বিরাহীরও প্রাণ যেত পরদিন কলকাতায় অনেক বাঙালি পাড়ায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হতো হয়তো। প্রশাসন সেই ভয়েও হয়তো হাত পা গুটিয়ে বসেছিল। রাজ্যে বিহারীদের চটিয়ে দিলে যে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠবে, সেই আগুনে ঝলসে যেতে পারে বর্তমান প্রশাসন। ফলে হাত পা গুটিয়ে বসে থেকে ছট পুজোর নামে পরিবেশ দূষণের তাণ্ডব চালিয়ে যেতে দেওয়া ছাড়া সরকারের উপায়ও বিশেষ ছিল না। না, তাতে আমাদের বাঙালিদের মুখ পোড়ে নি। কারণ পোড়া মুখ নতুন করে আর পুড়বে কি করে?


ঠিক এরই পাশাপাশি সেই গত বছরই দিল্লীতে যমুনায় দুর্গা পুজোর বিসর্জন আদালতের রায়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোন বাঙালির হিম্মত হয় নি সেই রায়ের বিরুদ্ধাচারণ করা বা প্রতিবাদ করা। বরং দিল্লীর প্রশাসনের ব্যবস্থা মতো নকল পুকুরের জলে মাদুর্গাকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তা বিসর্জন দেওয়া বাঙালি। এবারের ঘটনা মুঙ্গেরে। দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রায় বিহারী পুলিশের নির্মম লাঠিপেটা ও গুলিচালনায় একাধিক বাঙালি হতাহত। তাতে আমাদের কি? বিহারীরা যে আমাদের মায়ের পেটের সহোদর। কয়টা বাঙালি মরলে বাঙালির কি যায় আসে! তাই না? এই পারের বাঙালির বড়ো ভয়। বাংলায় গেড়ে বসা অবাঙালি জাতি সমুহকে সমীহ করে তাদের পায়ে তেল না দিলে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে বসবাস করা বাঙালিদের পিটিয়ে ভাগিয়ে দেবে। তাই ছটপুজোয় বিহারীদেরকে আদালতের রায় স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কথা বাঙালি ভুলেও ভাবে নি। পাছে বিহারে বসবাসকারী বাঙালিদের পিটিয়ে বাঙালি খেদানো শুরু হয়ে যায় আসমের মতো। না, বিহারে বসবাসকারী বাঙালিদের জন্য আমাদের দরদে আমরা এমনটা ভাবি তা নয়। সেরকম বাঙালি খেদানো শুরু হলে এই বাংলার উপরেরই না আবার বাঙালি শরণার্থীদের চাপ পড়বে। আমাদের দুশ্চিন্তা তাই নিয়ে। রাজ্যে প্রতিনিয়ত অবাঙালি অনুপ্রবেশ নিয়ে আমাদের চিন্তা নাই। কারণ আমরা তো আর প্রাদেশিক নই। আমরা ভারতীয়। আমাদের দুশ্চিন্তা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাঙালি শরণার্থী আসা শুরু হওয়ার আশঙ্কা নিয়েই। সাবাশ বাঙালি! ধন্য এই চিন্তাধারা। না, তাই পশ্চিমবঙ্গে অবাঙালি মাত্রেই সুরক্ষিত। কিন্তু তবুও দুর্গাপুজোর প্রতিমা নিরঞ্জন শোভাযাত্রায় বিহারী পুলিশের লাঠিপেটা ও গুলিচালনায় একাধিক বাঙালিকে হতাহত হতে হলো। এবং আরও হবে। তা হোক। কিন্তু এই বঙ্গের পুলিশের হাতে ছট পুজোয় বিহারীরা হতাহত হলে কি অবস্থা হতো? বাঙালি মাত্রেই জানে সেকথা। তাই তো বিহারী সহ সব অবাঙালিদের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অক্ষম প্রয়াস। চলছে চলবে।


এদিকে বিহারে ঢুকে থাকা বাংলার জমিতে চৌদ্দো পুরুষের ভিটে মাটিতেই বাঙালি নিজভুমে পরদেশী। বিহারের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের অধিকাংশ বাংলা মাধ্যমের স্কুল এবং লাইব্রেরী উঠে গিয়েছে। সেখানে বাঙালি এখন নিজ উদ্যোগেই বাংলা ছেড়ে হিন্দী ও ইংরেজিতে লেখাপড়া শিখে ভারতীয়ত্ব বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আর আমাদের পশ্চিমবঙ্গে বিহারী সহ অবাঙালি জন জাতির কেউই বাংলায় লেখা পড়া শিখতে যায় নি কোনদিন। তাদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণের কোন দায় নাই। তারা নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিজ নিজ জাতীয়তা বোধের জোরে সদম্ভে পশ্চিমবঙ্গে বাস করে চলেছে পুরুষানুক্রমেই। তাতে তাদেরকে কেউ প্রাদেশিক বলে না। এবং লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, ভারতের অন্যান্য রাজ্যে নিজ নিজ ভাষাই প্রধান ভাষা। ইংরাজির সাথে সেটাই সেই সেই রাজ্যের সরকারী ভাষা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নাকি আটটি সরকারী ভাষা। সাবাশ বাঙালি! একমাত্র আমরাই পেরেছি পশ্চিমবঙ্গকে মিনি ভারত হিসাবে গড়ে তুলতে। কালের পরিহাসে হয়তো একদিন দেখা যাবে, ভারতীয় উপমহাদেশে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ভারতের অস্তিত্ব টিকে রইবে। বাকি সব জাতি স্বাধীন হয়ে সার্বোভৌম জাতিসত্তায় বিকশিত হয়ে উঠবে ইউরোপের মতো। ধন্য বাঙালি ও বাঙালির ভারতীয় হয়ে ওঠার প্রাণান্তকর সাধনা। যে সাধনায় তার নিজ জাতিসত্তা আজ ভুলণ্ঠিত। অপমানিত। অবদমিত। অবলুপ্তির পথে।


২৮শে অক্টোবর’ ২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত