এই সময়ের বাংলা সাহিত্য

 

 

এই সময়ের বাংলা সাহিত্য

 

একথা ঠিক। সাহিত্যচর্চা মূলত এবং একান্তই নিভৃত সাধনার বিষয়। কিন্তু সাহিত্যের সামগ্রীও যদি নিভৃত একান্ততার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাহলেই মুশকিল। সাহিত্যের সূত্রপাত “জগৎ ও জীবন সমাজ ও সময়ের সাথে সহিত্ব” এই বোধ ও বাস্তবতা থেকেই। এইযে পরিপার্শ্বের অনেককিছুর সাথে সংযুক্ত থেকে সময়ের ভাষ্য রচনা। এটাই সাহিত্যের মূল স্বরূপ। অর্থাৎ এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে, আজকের সাহিত্য ভবিষ্যতের ইতিহাসের দলিল। আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ক্রনোলজি সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করি ঠিক। কিন্তু সাহিত্যের পাতা থেকে বিভিন্ন সময় পর্বের মানুষের সংকট ও সম্ভাবনা, সংগ্রাম ও প্রতিরোধ, স্খলন ও অর্জন, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার ধারাবাহিক ইতিহাস জানতে পারি। বিশ্ব ইতিহাসের প্রত্যেকটি ধ্রুপদী রচনা এই একটি কারণেই কালোত্তীর্ণ ও শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রজন্মের প্রজন্ম মানুষের কাছে এত মূল্যবান। এত প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ সাহিত্যের কাজ সেটিই। যেটি সমসাময়িক সময়ের সাথে ও জীবনের সাথে সংযোগ সাধন করতে সক্ষম হয়। ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে গেলেও, যে সময়ের গল্প। সেই সময়ের সাথে সংযোগ স্থাপন অত্যাবশ্যক। সময়ের সাথে ও জীবনের সাথে সংযোগ স্থাপনই তাই সাহিত্য। কিন্তু এই সংযোগ সাধন তখনই সম্ভব। যখন সাহিত্যের রূপকার অর্থাৎ লেখক তাঁর অভিজ্ঞতায় ও প্রজ্ঞায় এবং মননে ও চেতনায় তাঁর পরিপার্শ্বের সমাজ ও জীবনের সাথে নিজে সংযুক্ত থাকবেন। একজন সমাজ মনস্ক মানুষ না হলে ভাষা ও ভাবের উপরে যত বেশি দখলই থাকুক না কেন। প্রকৃত সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব নয়। আবার শুধু যে সমাজমনস্ক মানুষ হলেই হবে তাও নয়। সময় সচেতন মানুষও হতে হবে একজন সৎ সাহিত্যিককে। তাই একজন লেখকের পক্ষে সাহিত্যিক হয়ে উঠতে গেলে সমাজ ও সময় সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরী। এবং এর কিন্তু অন্য কোন বিকল্পও নাই। ভালো লিখলেই লেখক হওয়া যায়। কিন্তু সাহিত্যিক হওয়া যায় না।


দুঃখের বিষয়। আমরা এমন একটি সময় পর্বের ভিতর দিয়ে চলেছি। বিশেষ করে বিগত প্রায় চারটি দশক। কাঁটাতারে ভাগ করে দেওয়া বিচ্ছিন্ন বিভক্ত বাংলার দুই পারেই। যে এই সময়ে ভালো লেখকের কোন অভাব নাই। অভাব একজন সাহিত্যিকের। একজন সাহিত্যিকের অন্যতম কাজ কি? একজন সাহিত্যিকের অন্যতম কাজ হলো সমুদ্র পারের বাতিস্তম্ভের মতো বহুদূর পর্য্যন্ত আলোর দিশা দেখানো। যে দিশায় একটি সমাজ একটি জাতি একটি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের পথচলার দিশা ঠিক করে নিতে পারবে। চলার পথটিকে অর্থবহ করে তুলতে পারবে। যে পথে জাতি ও সমাজের পরবর্তী প্রজন্মের পথ চলা অনেক সহজ কিন্তু সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। একজন সাহিত্যিকের এইটাই প্রধানতম কাজ। সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস নিবিষ্ট মনে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা এই সত্যেই উপনীত হতে পারি। ফলে এ কোন কথার কথা নয়। নয় কোন কল্পনার কথা। কিংবা গাজোয়ারি কোন তত্ব। এটাই সাহিত্যের মূল ইতিহাস।


কিন্তু কেন আমাদেরকে এই কথা বলতে হচ্ছে আজ? নতুন করে? আমাদর বাংলায় ভালো লেখকের কোন অভাব নাই। অভাব রয়েছে সাহিত্যিকের। সেই বাতিস্তম্ভের মতো একজন দুইজন সাহিত্যিক। একজন গ্যেটে। একজন সেক্সপীয়র। একজন ভলতেয়র। একজন বোদলেয়র। একজন পুশকিন গোগোল টলস্টয় ডস্টেয়ভস্কি গোর্কী চেকভ মায়াকোভস্কি। একজন রবীন্দ্রনাথ। একজন নজরুল। একজন জীবনানন্দ। কেন আজ আমরা এমন কোন সাহিত্যিককে খুঁজে পাচ্ছি না আর? আমাদের বাংলায়? সংখ্যাতত্বের বিচারে, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা বাংলায়? এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? গোটা জাতি যে সাহিত্যিকের ডাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে স্বগর্বে? জানি অনেকেরই মনে হবে। একথা সত্য নয় ঠিক। বাংলা সাহিত্যে এখনই সাহিত্যিকের এমন আকাল পড়েনি। এতটা বলা নিতান্তই বাড়াবাড়ি। আসলে বাঙালি মাত্রেই আমরা অত্যন্ত ভাবপ্রবণ জাতি। তাই আমাদের কাছে তথ্য যুক্তি সত্যের থেকেও বড়ো হয়ে দেখা দেয় আবেগ আর ভালোবাসা। আমাদের প্রত্যেকেরই বিশেষ বিশেষ পছন্দের জনপ্রিয় লেখক কবি নাট্যকার কথাসাহিত্যিক রয়েছেন। তাঁরাই আমাদের কাছে এই সময়ের সাহিত্যের এক একজন আইকন। আর বর্তমান সময়ে জনপ্রিয়তার নিরিখ একটা বড়ো মাপকাঠি। ফলে আজ যে বইয়ের কাটতি সবচেয়ে বেশি। কাল সেই সবচেয়ে বড়ো সাহিত্যিক। কিন্তু আমরা পূর্বেই বলেছি। ভালো লেখকের কোন অভাব আমাদের নাই। অভাব রয়েছে সাহিত্যিকের। ভালো লেখক থাকলেই তাঁদের এক একজনের বিপুল ও তুমুল জনপ্রিয়তাও থাকবে। সে’তো খুবই স্বাভাবিক। কাঁটাতারে যতই বিদ্ধস্ত হোক বাংলা ও বাঙালি। এই রকম জনপ্রিয় লেখক লেখিকার কোনদিন অভাব দেখা দেয় নি আমাদের দুই পারের সাহিত্যসমাজেই। তাই অধিকাংশ সাহিত্যমোদী পাঠকই সেই সব জনপ্রিয়তম লেখক লেখিকার দৃষ্টান্ত স্মরণ করে নিজেকে আশস্ত করায় প্রয়াসী হবেন। না, চিন্তার কিছু নাই। বাংলায় সাহিত্যিকের কোন অভাব ঘটেনি।


ভালো লেখক আর সাহিত্যিকের মধ্যে একটা বড়ো তফাৎ এইখানে যে, একজন ভালো লেখক পাঠককে সুন্দর অবসর বিনোদনের সুযোগ করে দিতে পারেন তাঁর লেখার ভিতর দিয়ে। এমনকি অনেক দরকারী তথ্যসামগ্রী উপহার দিয়েও পাঠকের তথ্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারেন। পাঠকের মনে অনাবিল আনন্দ যুগিয়ে যেতে পারেন বছরের পর বছর ধরে। দুই বাংলার বহু লেখক লেখিকা এই কাজে সবিশেষ সফল। তাঁরা অবশ্যই নমস্য। বাংলার সমাজসংস্কৃতিতে তাঁদের অবদান ভোলার নয়। কিন্তু একজন সাহিত্যিক তাঁর পাঠককে শুধুই এইগুলি যুগিয়ে ক্ষান্ত হন না। তিনি তাঁর পাঠকের আত্মাকে নোঙর ফেলার মতো একটা পোতাশ্রয় উপহার দেন। পাঠকের জীবনবোধকে এমন ভাবে পুষ্ট করে তোলেন, যাতে পাঠক সাহিত্যের ভিতরেই তাঁর অস্তিত্বের আশ্রয় খুঁজে নিতে পারে। অধিকাংশ পাঠক যখন সাহিত্যিকের সাহিত্যে তাদের অস্তিত্বের আশ্রয় লাভ করতে সমর্থ হয়, তখনই পাঠক উপলব্ধি করে সাহিত্যিক সেই বাতিস্তম্ভের মতো হয়ে উঠে সমগ্র জাতিকেই শুধু নয়। সমগ্র মানবসমাজকেই আলোয় আলোয় আলোর দিশা দেখিয়ে চলেছেন। এইখানেই একজন ভালো লেখকের সাথে একজন সাহিত্যিকের মূল প্রভেদ। কবির কথাটুকু ধার হিসাবে গ্রহণ করে বলতে পারি। সকলেই সাহিত্যিক নয় কেউ কেউ সাহিত্যিক। এবং ভালো লেখক মাত্রেই সাহিত্যিক নন। কিন্ত সাহিত্যিক মাত্রেই ভালো লেখক।


একজন ভালো লেখক কখন কিভাবে একজন সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারেন। সেই আলোচনা আমরা প্রবন্ধের শুরুতেই সেরে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের কাঁটাতারে ক্ষতবিক্ষত বাংলার দুই পারে সেই সাহিত্যিকের এমন অভাব কেন আজ? একবিংশ শতকের গোড়ায়? একটা কারণ তো এই হতে পারে। তথ্য প্রযুক্তির যুগ মানুষের আবেগ কেড়ে নিয়ে মানুষকে এমন বেশি বেগবান করে তুলেছে যে। সাহিত্যের জন্য অবসর লেখক পাঠক, কারুরই নাই আজ আর। কিন্তু সেটাই আসল কারণ হলে সারা বিশ্বেই সাহিত্যিকের ও সাহিত্যের আকাল শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। আরও অনেক কিছুর সাথেই একটা বড়ো কারণ কিন্তু, আমরা বাঙালিরা আজ একটি বিভক্ত ও বিদ্ধস্ত জাতি। একটি বিভক্ত জাতির পক্ষে বিশ্ব ও মানবজাতিকে দেওয়ার মতো কিছু সৃষ্টিক্ষমতা থাকার কথা নয়। আর তাই সেটি আমাদের আর অবশিষ্ট নাই। আমরা আমাদের সেই সৃষ্টিক্ষমতা হারিয়ে বসে রয়েছি। না, শুধুই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতেই নয়। জ্ঞান বিজ্ঞান অর্থনীতি বাণিজ্য রাজনীতি সর্বত্র আমাদের এখন আর নতুন কিছু সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা নাই। একটি বিভক্ত জাতির তা থাকার কথাও নয়। আমাদেরও নাই। জানি, অধিকাংশ সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বাঙালিই এই সত্যকে অস্বীকার করতে হারে রে রে করে উঠবে। কারণ সাম্প্রদায়িক চেতনার বাঙালি মাত্রেই একটি কথা। আমরাই শ্রেষ্ঠ। ওরা নিকৃষ্ট। আমারা এই করেছি ওই করেছি। ওরা কি করেছে? আমাদের সাহিত্যই শ্রেষ্ঠ। আমাদের সাহিত্যিকরাই জগৎশ্রেষ্ঠ, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা যদি এই সংকীর্ণ গোষ্ঠী ভিত্তিক সাম্প্রদায়িক চেতনার বাইরেও উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করি। তাহলেও দেখতে পাবো অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাঙালিও সমাজবাস্তবতার এমন একটি সত্যকে কখনোই স্বীকার করতে চাইবেন না। জাতি ভাগ হয়ে গেলে তার সাহিত্য খোঁড়া হয়ে যেতে পারে। এমন তত্বে কেউই বিশ্বাসী নয়।


কিন্তু জাতি ভাগ হয় কখন? না, সমাজ ও সময় থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলে জাতীয়তাবোধের জন্মই হয় না। আর জাতীয়তাবোধের জন্ম হওয়া ব্যাতীত জাতির ঐক্য বজায় থাকে না। এই আলোচনার শুরুতেই আমরা দেখিয়েছি একজন সাহিত্যিককে তাঁর জগৎ ও জীবন এবং সমাজ ও সময়ের সাথে কতটা ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু সেই সাহিত্যিকের জন্মই যদি হয় কোন বিভক্ত জাতির গর্ভে? জন্ম থেকেই তখন তাঁর মধ্যে জাতিগত ঐক্য ও জাতীয়তাবোধের উন্মেষই হবে না। যেটা হবে, সেটি হলো ধর্মীয় সম্প্রদায়গত সামাজিক গোষ্ঠীগত এক খন্ড চেতনার বোধ। সেই খণ্ডিত চেতনার আলোক দিয়েই তিনি তাঁর জগৎ ও জীবনকে এবং সমাজ ও সময়কে অবলোকন করবেন। প্রত্যক্ষ করবেন। অনুভব ও উপলব্ধি করবেন অনেকটাই সেই অন্ধের হস্তী দর্শনের মতো করে। ফলে সেই মানুষটি। যত বড়ো লেখকসত্তারই অধিকারী হোন না কেন। মাতৃভাষার উপরে ও লেখার ভাষার উপরে তাঁর যত অনন্য দক্ষতাই থাকুক না কেন। তিনি চেষ্টা করেও সমগ্র জাতির নাড়ীর কোন স্পন্দন অনুভব করতে পারবেন না। পারবেন না তাঁর আপন অস্তিত্বের ভিত্তিতেই। কারণ একটি খণ্ডিত জাতির প্রত্যেকের অস্তিত্বের ভিত্তিই বড়ো নড়বড়ে। খণ্ড বিখণ্ড। টুকরো টুকরো। তার লেখকও সেই অভিশাপের থেকে মুক্ত নন। এইখানেই কাঁটাতারে বিভক্ত ও বিদ্ধস্ত বাঙালির অস্তিত্ব আজ প্রকৃত সাহিত্যিকের আশ্রয়চ্যুত। আজকে যাঁরাই লিখছেন। তাঁরা অন্ধের হস্তীদর্শন করছেন। তাঁরা তাঁদের জগৎ ও জীবন সমাজ ও সময়কে কোনভাবেই সমগ্র সম্পূর্ণতায় ধরতেই পারছেন না। তাই তাঁদের সব প্রয়াসই ভালো লেখার অভিমুখে চলার চেষ্টায়। কোন লেখাই সাহিত্য হয়ে ওঠার দিশায় পৌঁছাতে পারছে না।

২১শে ডিসেম্বর’ ২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত