সমাজ পরিবর্তনে বাংলা সাহিত্য

 

সাহিত্য সম্বন্ধে কবিগুরু একটি মূল্যবান কথা বলে গিয়ে ছিলেন। বলেছিলেন সহিত থেকে সাহিত্য। সহিত অর্থাৎ সাথে থাকা। সাহিত্যের প্রধান কাজই হলো এই সাথে থাকা। জীবনের সাথে সমাজের সাথে বিশ্বের সাথে এবং সময়ের সাথে সংলগ্ন না থাকলে সাহিত্য হয় না। সংলগ্ন থাকাই সাহিত্যের কাজ। আর সেই সংলগ্ন থাকার ধর্ম থেকেই সাহিত্যের প্রধানতম অভিমুখ হয়ে ওঠে সমাজবদ্ধ মানুষের সাথে থাকা। সাহিত্য যদি মানুষের সাথে না থাকতে পারে, তবে তা অক্ষরের জঞ্জাল শুধু। জীবনানন্দের ভাষায় শব্দের কঙ্কাল। তাই সাহিত্যকে সব কিছুর সাথে সংলগ্ন থেকেই এগিয়ে চলতে হয় মানুষকে নিয়েই।


সাহিত্য মানুষ নিরপেক্ষ নয়। বস্তুত মানুষের হাতেই সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে। বলা চলে যেমন মানুষ। তেমন সাহিত্য। এটা কেবল এই নয় যে, যেমন লেখক তেমনই সাহিত্য। অর্থাৎ শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বিশেষ সাহিত্যিকের উপরেই তার সাহিত্য নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ বিষয়টি তেমন সরলরৈখিকও নয়। সাহিত্য তাই সময় ও জীবনের উপরেই নির্ভরশীল। যিনি লিখছেন, তিনি যেমনই লিখুন। তাঁর লেখা নির্ভর করে তিনি যে ধরণের মানুষের সাথে সংযুক্ত রয়েছেন, যে সময়ের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন, সেই সমাজের মানুষের উপরেও। এই কারণেই বিভিন্ন দেশের সাহিত্য বিভিন্ন রকমের। বিভিন্ন সময়ের সাহিত্যও বিভিন্ন রকমের। আবার তাই বলে একটি দেশের একটি নির্দিষ্ট সময়ের সব সাহিত্যই কিন্তু এক ধরণেরও নয়। নয় একরকমেরও। কিন্তু যতই ভিন্নধর্মী হোক না কেন, সব সাহিত্যই সময়ের সাথে সমাজের সাথে সংলগ্ন থাকে। সেটাই সাহিত্যের ধর্ম।


আজকের যিনি সাহিত্যিক। তিনি স্বভাবতঃই আজকের এই সময়ের সাথে সংযুক্ত। কারণ সময় অর্থাৎ সমকালের সাথে সংযুক্ত না থাকলে, একজন লেখক কখনই তাঁর সময়ের সংকট ও সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন না কিছুতেই। সমকালের সমস্যা ও তার সমাধানকে বুঝতে গেলে সময়ের সংকট ও সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে পারাই একমাত্র পথ। এর কোন সহজ বিকল্প হয় না। এখন অনেকেরই মনে হতে পারে, সময় ও সমাজের সংকট দূর করা তো একজন সাহিত্যিকের কাজ নয়। তার জন্য সমাজসংস্কারক রয়েছেন। একদম যথার্থ্য কথা। সমাজের সংকট দূর করার দায় সাহিত্যিকের নয়। কিন্তু সমাজ ও সময়ের সংকটকে উপলব্ধি করার দায় একজন সাহিত্যিক কখনোই এড়াতে পারেন না। যদি তিনি প্রকৃতই সাহিত্যিক হন। যদি তিনি শৌখীন মজদুরি না করতে থাকেন, তবে তাঁর সময় ও সমাজের সংকট ও সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করার শক্তি ও সামর্থ্য তাঁর থাকতেই হবে। যে করেই হোক। যেমন ভাবেই হোক। এবং সেই শক্তি থেকেই তিনি তাঁর সময়ের সমস্যা ও সমাধানের বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকবেন। একথা যেমন সত্য। ঠিক তেমনই সত্য, সমকাল ও সমাজের সমস্যার সমাধান করতে কেউ সাহিত্যিক হতে আসেন না। সমাজ ও সমকালের সংকট ও সম্ভাবনা, সমস্যা ও সমাধানের বিষয়ে সচেতন প্রজ্ঞাই একজন লেখককে সাহিত্যিক হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। সেটাই সাহিত্যের মূল অভিমুখ।


যে কোন প্রকৃত সাহিত্যিকই তাঁর সময় ও তাঁর সমাজের গতি প্রকৃতিতে ভিতরে ভিতরে আন্দোলিত হয়ে থাকেন। সমকালকে শাশ্বত সময়ের প্রেক্ষিতে অনুধাবন করতে পারেন। উত্তরাধিকারকে ঐতিহ্যের আলোতে উপলব্ধি করে থাকেন। এবং একই সাথে দেশাচারকে মানবতার নিরিখে বিচার করতে পারেন। এই সব গুণাবলীই একজন লেখককে সাহিত্যিক হিসাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাঁর সমাজভাবনাও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সমাজকে দেখার, এবং সমাজবদ্ধ মানুষ কিভাবে সমাজের আবর্তনে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হতে বাধ্য হচ্ছে, সেই সত্যকে উপলব্ধি করার সামর্থ্যও তাঁর গড়ে ওঠে। এবং সেই দেখার সাথে সাথেই তিনি তাঁর সাহিত্যের ভুবনে পাঠককে টেনে এনে তাঁদেরকেও দেখাতে থাকেন। ফলে দেখা ও দেখানো এগিয়ে চলতে থাকে একসাথে। এবং এই যে দেখানো। এটাই সাহিত্যের দায়। সাহিত্যিকের দায়িত্ব। তিনি দেখাবেন। পাঠক দেখবে। তিনি ভাবাবেন। পাঠক ভাবতে শুরু করবে। আর পাঠক ভাবতে শুরু করলেই সাহিত্যিকের কাজ সম্পূর্ণ।


বিশ্ব সাহিত্যের পাঠক মাত্রেই একথা জানেন। সাহিত্যের ইতিহাস একাধারে এই দেখা ও দেখানোরই ইতিহাস। ভাবা ও ভাবানোর ইতিহাস। সময়ের সাথে এই দেখার ধরণ পাল্টিয়ে যেতে পারে। যায়ও। এবং পাঠকের দেখার ধরণও পাল্টিয়ে যেতে থাকে। ও যায়। ফলে ভাবনাক্রমেও ঘটতে থাকে নানা বদল। কিন্তু দেখা ও দেখানো এবং ভাবা ও ভাবানোর সংস্কৃতি চলতেই থাকে। নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। ইউরোপের নবজাগরণে ইউরোপীও সাহিত্যের এই দেখা ও দেখানো এবং ভাবা ও ভাবানোর ধারার অভিঘাত পড়েছিল সদর্থক ভাবে। রুশ বিপ্লবের সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। বর্তমান লাতিন আমেরিকার সমাজ ও সাহিত্যেও কম বেশি এই ছবিই দেখা যাবে। ঠিক একই কথা প্রযোজ্য ঊনবিংশ শতকের বর্ণহিন্দু বাঙালি সমাজের নবজাগরণের ক্ষেত্রেও। বর্ণহিন্দু বাঙালি সমাজের নবজাগরণে বাংলা সাহিত্যের অবদান কম নয়। কম নয় সেসময়ের সাহিত্যিকদের ভুমিকাও।


সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের দায় ঠিক এইখানে। ইতিহাসের পথরেখা ধরে, সামাজিক মানুষকে তার অবস্থা ও পরিস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন করতে সাহিত্যের ভুমিকা সুদূরপ্রসারী। সব সময়েই যে সাহিত্যের হাত ধরে সমাজ পরিবর্তিত হয়ে চলেছে, তা নয়। সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের ভুমিকার পাশাপাশি আরও অনেক ধরণের সংশ্লিষ্ট বিষয়ও জড়িত থাকে। কোন দেশেই কোন কালেই সাহিত্যের একক ভুমিকায় সমাজ পরিবর্তিত হয় না। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে সমাজ পরিবর্তনে সেই দেশ ও সময়ের সাহিত্যের অবদান থেকে যায়। এই অবদান সমাজের ভিতরে প্রছন্ন থেকে কাজ করতে থাকে। দেশাচার ও সময়ের প্রতিরোধের বিরুদ্ধে মানুষকে শিক্ষিত করতে থাকে ভিতরে ভিতরে। মানুষের ঘুমন্ত সত্বাকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে থাকে। মানুষের শিরদঁড়া সোজা করে তুলতে ও মানুষের মুখে সময়ের দাবিকে উচ্চারিত করতে সাহিত্যও বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে। বিগত শতকের রুশ বিপ্লবের ইতিহাসে সমাজ পরিবর্তনের ধারায় রুশ সাহিত্যের অবদান এই বিষয়ে অন্যতম যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।


অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজ পরিবর্তনের দায় সাহিত্যিকের নয়। কিন্তু সাহিত্যিকের কাজ দেখা ও দেখানো। ভাবা ও ভাবানো। একজন সাহিত্যিক ঠিক ততটুকুই দেখাতে ও ভাবাতে পারেন, যতটুকু তিনি নিজে দেখতে ও ভাবতে সক্ষম। এখানে আরও একটি কথা বলে রাখা ভালো। কোন সাহিত্যিকই নিজের সবটুকু দেখা তার পাঠককে আপন সাহিত্যকীর্তির ভিতর দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যেতে পারেন না। ১৮৬৯’র জানুয়ারীতে বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস দ্য ইডিয়ট লেখা শেষ করার পর, ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে দস্তয়েভস্কি তাঁর বিশেষ বন্ধু সোফিয়া ইভানভকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমি উপন্যাসটি নিয়ে অসন্তুষ্ট। আমি যা প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম, এটি তার দশশতাংশও প্রকাশ করতে সক্ষম হয় নি”। একজন প্রকৃত সাহিত্যিকের এই ক্ষোভ থেকেই যায়। একমাত্র তাঁর আত্মাই জানে। তিনি কতটুকু দেখাতে চেয়েছিলেন। আর কতটুকু দেখাতে পারলেন। তাই একজন সাহিত্যিক তাঁর পাঠককে যতটুকুই দেখাতে সক্ষম হন না কেন, অন্তত ততটুকু দেখার শক্তি ও সামর্থ্য আগে তাঁকে নিজে অর্জন করতে হয়। দেখার সেই চোখ তৈরী না হলে সাহিত্যিকের পক্ষে অন্যকে দেখানো সম্ভব হবে কি ভাবে? আবার একজন প্রকৃত সাহিত্যিকই জানেন তিনি নিজে কতটুকু দেখতে সমর্থ্য। আর কতটুকু আপন সাহিত্যকীর্তির ভিতর দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যেতে পারলেন। ঐ একই উপন্যাসের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে স্বয়ং দস্তয়েভস্কিই এম আলেকজান্দ্রভকে বলেছিলেন, লেখাটি পড়তে। লেখাটি মূল্যবান এবং সবকিছুই এই উপন্যাসে রয়েছে। অর্থাৎ তিনি জানতেন, তাঁর সব দেখা উপন্যাসের ভিতর দিয়ে দেখিয়ে না যেতে পারলেও, তিনি যতটুকু দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, সেটাও অনেক মূল্যবান। এই প্রত্যয়ই একজন সাহিত্যিককে অমর করে। আবার সোফিয়া ইভানভের কাছে করা স্বীকাক্তিই একজন সাহিত্যিকের সততার সেরা প্রমাণ। সমাজের কাছে পাঠকের কাছে একজন সাহিত্যিকের দায় এইখানেই। সেই দায় পুরণের ভিতর দিয়ে যদি সমাজ পরিবর্তনের শুভসূচনা হয়, তবে সেটা সমাজের লাভ। সাহিত্যিকের  কৃতিত্ব নয়। সাহিত্যিকের কৃতিত্ব ততটুকুই। যতটুকু তিনি পাঠককে ভাবাতে পারলেন। দেখাতে পারলেন। সামাজিক বিবর্তনের গল্পের শুরু হতে পারে তার পর থেকে। আঠারোশ ও ঊনবিংশ শতকের রুশ সাহিত্য সেই দেখানো ও ভাবানোর কাজটি করতে পেরেছিল চমৎকার ভাবে। মানুষের দেখার চোখ ও ভাবার মস্তিষ্ক গঠনেই সাহিত্যের ভুমিকা। তারপর মানুষ স্বাধীন ভাবে তার সমকাল ও সমাজকে যত স্পষ্ট দেখতে পাবে, তত সে তার আশু কর্তব্যগুলি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। আর সেটাই সমাজ পরিবর্তনের প্রধান ধাপ।


এখন সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের অর্জন বিষয়ে যদি বাংলা সাহিত্যের দিকেই নজর দেওয়া যায়, তবে প্রাথমিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপরে আলোকপাত করা দরকার। প্রভূত বিতর্কিত উপন্যাস আনন্দমঠ পরাধীন বাঙালির চেতনায় সনাতনী হিন্দুত্বের বেদীতে আত্মশক্তি অর্জনের পথরেখা নির্দেশ করেছিল। এর ফল হয়েছিল মারাত্মক। ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের ধারায় মূলত বাঙালি হিন্দু যুবশক্তিই সংহত হয়েছিল। বাদ গিয়েছিল বাঙালি মুসলিম যুবমানস। বাংলায় হিন্দু মুসলিম সংহতির গোড়ায় কোপ পড়েছিল প্রথমেই। বাঙালির আত্মশক্তির উদ্বোধনের বদলে হিন্দুমানসের আত্মশক্তি উদ্বোধনে বঙ্কিম সাহিত্যের বিশেষ ভুমিকা অনস্বীকার্য। এরপর রবীন্দ্রনাথের গোরা। সাম্প্রদায়িক ধর্মের উর্ধে ভারততীর্থের অভিমুখে বাঙালির জনমানসের সামনে নতুন এক পথরেখা সাজিয়ে দিলেন কবি। শিক্ষিত বাঙালি জনমানস বাঙালি হয়ে ওঠার পরিবর্তে অনেক বেশি সদর্থক ভাবে ভারতীয় হয়ে ওঠার রসদ পেয়ে গেল। ফলে সমাজের অগ্রভাগে থেকে যাঁরা জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন, তাঁরা বাঙালিকে ভারতীয় জাতীয়তার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে শুরু করে দিলেন। বঙ্কিম সাহিত্য যেমন বাঙালিকে হিন্দুত্বের বেদীতে আত্মশক্তি অর্জনের দীক্ষা দিয়েছিল। রবীন্দ্রসাহিত্য তেমনই বাঙালিকে ভারততীর্থের বেদীতে বিশ্বমানব হয়ে ওঠার মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিল। বাংলার জনসমাজ স্পষ্টতই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একদিকে হিন্দু ও ভারতীয় বাঙালি। অন্যদিকে মুসলিম ও ভারতীয় বাঙালি। পরবর্তীতে কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিম ও পাকিস্তানী বাঙালি। বাংলার কোন সাহিত্যিকই অখণ্ড বাঙালিয়ানার চেতনার উদ্বোধনে স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেন নি। ফলে একটা সুসংহত জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য জরুরী সমাজ পরিবর্তন অধরাই রয়ে গেল। সমাজ পরিবর্তনের দায় সাহিত্যিকের নয়। সেকথা আমরা পূর্বেই স্বীকার করে নিয়েছি। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের ভুমিকা প্রায় এইরকম ভাবেই কাজ করতে থাকে।


যে রবীন্দ্রসাহিত্য, বাঙালিকে ভারতীয় হয়ে ওঠার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই রবীন্দ্রসাহিত্যই আবার পূর্বপাকিস্তানের বাঙালিকে ধর্মের উর্ধে উঠে বাঙালিয়ানার মন্ত্রের সামিল করতে সমর্থ্য হয়েছিল। ফলে স্থাল কাল পাত্রের বিভিন্নতায় একই সাহিত্য সমাজপরিবর্তনে ভিন্ন রকম স্বাক্ষরও রাখতে পারে। এটা নির্ভর করে সময়ের উপরে। পরিস্থিতির উপরে। মানুষের উপরে। সাহিত্যিকের কাজ দেখানো আর ভাবানো। বাকি কাজ সমাজের হাতে। অনেকেরই মনে যে নামটি উঁকি দিতে পারে, সেই নজরুল সাহিত্যের কোন প্রভাব বাংলার সমাজ জীবনে আদৌ পড়েছিল কিনা, সেটা হয়তো গভীর গবেষণার বিষয়। কিন্তু একথা সত্যি, নজরুল সাহিত্যের স্থায়ী প্রভাব পড়ার আগেই বাংলা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সময়ের সরণীতে যতটুকু সময় পাওয়া দরকার নজরুল সাহিত্য সেই সময়টি হাতেই পায় নি। তার আগেই যা সর্বনাশ তার ষোলকলা পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তাই নজরুলের সাহিত্যকীর্তি আজও বাংলার সমাজ জীবনে বিশেষ কোন স্থায়ী প্রভাব বিস্তারই করতে পারেনি। পারলে বাংলার রাজনৈতিক ও সমাজিক ইতিহাস অন্যধারায় বিবর্তিত হতো।


সমাজ পরিবর্তন নয়, সমাজ বিবর্তনের ধারায় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের ভুমিকাও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পিতৃতান্ত্রিক ঘেরাটপে বন্দী নারীর অব্যক্ত বেদনার অন্যতম কথাকার শরৎচন্দ্র। শরৎ সাহিত্য পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীবাদের জাগরণ নয় কোনভাবেই। বরং পিতৃতন্ত্রকেই স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়ে, নারীর মূল্যকে নতুন ভাবে উপলব্ধির এক নতুন পথরেখা বলা যেতে পারে। বঙ্গসমাজের নারী, শরৎসাহিত্যের আয়নাতেই প্রথম, আপন মহিমা উপলব্ধির শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। এবং এই প্রথম বার, বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সমাজের নারী উভয়ই বাংলার নারীর মাহাত্ম উপলব্ধিতে একই ভাবে উদ্বুদ্ধ হতে পেরেছিল। ফলে বাংলার নারী, ধীরে ধীরে তার পায়ের তলায় আত্মশক্তির একটা শক্ত জমি অনুভব করতে শুরু করেছিল। পুরুষের বিরুদ্ধাচারণে নয়। বরং বাংলার পুরুষসমাজ আসলেই কতটা নারীর স্নেহ ভালোবাসা মায়া মমতার উপরে নির্বরশীল সেই কথা উপলব্ধিতেই বাংলার নারী নিজের ভিতরে সেই প্রথম আত্মনির্ভরতার একটা বিস্তৃত জমি খুঁজে পেয়েছিল। পরবর্তীতে বাংলার সমাজ জীবনে নারী প্রগ্রতির দিগন্তে এর একটা স্থায়ী মূল্য তৈরী হয়ে গিয়েছিল। গত এক শতাব্দীব্যাপী সময় সীমায় সেই প্রভাব কার্যকর থেকেছে বলা যায়।


বস্তুত এত স্বল্প পরিসরে সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের দায় ও অর্জন নিয়ে সম্যক আলোচনা সম্ভব নয়। ফলে আমরা কয়েকটি বিষয় ছুঁয়ে যাচ্ছি মাত্র। বাংলার সমাজ ও সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে, বাংলার সমাজ জীবনে সাহিত্যের প্রভাব যেমন ভাবেই থাকুক না কেন, বস্তুত সমাজ বিবর্তনেই তার কিছুটা ভুমিকা রয়েছে। সমাজ পরিবর্তনে ততটা নয়। কারণ একটাই। সমাজ বিবর্তিত হয় সময়ের সাথে। কিন্তু পরিবর্তিত হয় মূলত মানুষের সার্বিক স্বচেষ্ট প্রয়াসে। বাংলার সমাজ জীবনে যতটুকু পরিবর্তন দেখা যায়, তা মূলত সমাজ বিবর্তনের পথরেখা ধরে সময়ের সাথে সংঘটিত ঘটনাক্রমের ফলাফল। বাংলায় ইসলামী শাসনের প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসন। এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাই মূলত এই ভুখণ্ডে সমাজ পরিবর্তনের মূল কাণ্ডারী। কিন্তু সমাজবদ্ধ মানুষের সার্বিক ও সর্বাত্মক প্রয়াসের ঐতিহাসিকতায় যে সমাজ পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন বাংলায় সংঘটিত হয় নি। ফলে বাংলার সমাজ জীবন চিরকালই জাতপাত সম্প্রদায় ধর্ম বর্ণ গোত্র ভিত্তিক বিভক্ত একদিকে। অন্যদিকে শোষিত ও শোষক, ধনী ও নির্ধনে বিভক্ত। সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন দেওয়ালে ঘেরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন এক একটি গোষ্ঠী ভিত্তিক এই বাংলার সমাজ। সেই সমাজ তার বিচ্ছিন্ন কুয়োগুলির ভিতরেই আবর্তিত হয়ে চলেছে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ভাবে। এর ফলে সার্বিক বাঙালি জাতীয়তাবোধের কোন উদ্বোধনই আজও সম্ভব হয় নি। সম্ভব হয়নি শোষণহীন এবং বাঙলিত্বের গৌরবে উদ্বুদ্ধ এক অখণ্ড বাঙালি সমাজের গঠন। বাংলার জনমানসের সার্বিক উন্নতি ও পরিবর্তন ছাড়া সে সম্ভবও নয়। আর জনমানসের এই পরিবর্তনেই সাহিত্যের আসল ভুমিকা। সাহিত্যই পারে, আসল জায়গায় আলো ফেলতে। সাহিত্যই পারে নতুন করে ভাবাতে।


কিন্তু আক্ষেপের কথা, আজকের বাংলা সাহিত্য সেই দেখা ও দেখানো। ভাবা ও ভাবানোর বিষয়ে দশ কদম পিছিয়ে রয়েছে। এত অসংখ্য ভাগে বিভক্ত একটা জনশক্তি। তার ভিতর থেকে অখণ্ড বাঙালিয়ানায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠে সামগ্রিক জাতীয় চেতনায় সমাজ ও জাতিকে উপলব্ধি করার শক্তি অর্জন কষ্টকর। সেকথা সত্য। তার পরে তো অন্যকে দেখানো ও ভাবানো। বিশ্বের অন্যান্য মহৎ সাহিত্যের সাথে এই একটি জায়গাতে এসেই বাংলা সাহিত্য আজও খোঁড়া হয়ে পড়ে রয়েছে। খণ্ড খণ্ড গোষ্ঠী চেতনায় মহৎ সাহিত্যের সৃষ্টি হয় না। মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির পশ্চাৎভুমি স্বরূপ এক অখণ্ড জাতীয়তার চেতনার বিকাশ জরুরী। এ ইতিহাসের বিধান। এই পথেই রুশ সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, জার্মান সাহিত্য, এমনকি ইংরেজি সাহিত্যের বিকাশ সার্থক হয়েছিল। আর হয়েছিল বলেই, এই প্রত্যেকটি সাহিত্যই বিশ্বসাহিত্যকে এমন নিবিড় ভাবে পুস্ট করতে সক্ষম হয়েছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। যে কাজে বাংলা সাহিত্য আজও কোন স্বাক্ষর রেখে যেতে পারে নি। ফলে সমাজ পরিবর্তনে সাহিত্যের দায় ও অর্জন তখনই একটা সার্বিক রূপ পায়, সমাজ যখন এক অখণ্ড জাতীয়তার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে উঠতে পারে। অখণ্ড জাতীয়তার মন্ত্রই বিশ্বমানবতার দিগন্তে নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সেইটুকু না পারলে বিশ্বমানবতার বেদীতে কোন পুজাই সার্থক হয়ে ওঠে না। উঠতে পারে না।


২৯শে মার্চ’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত