জনপদের নাম শীতলখুচি। রক্ত যত উষ্ণই
হোক, বুলেটের ধাক্কায় মাটিতে গড়াগড়ি দিলে কিন্তু সেই শীতল। স্বার্থকনামা জনপদ। যাঁরা
নিজের পায়ে হেঁটে সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে এসেছিল। সেই পায়ের উপর ভরসা করে তাদের
আর বাড়ি ফেরা হলো না। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের দাবা খেলায় প্রাণ দিতে হলো রক্তের অক্ষরে।
রাষ্ট্রীয় বুলেটের বনেদী স্বাক্ষরে। সৌজন্যে ভারতসরকার। সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন। সৌজন্যে
সরকারী ফৌজ। সৌজন্যে রাজনীতির লড়াই। কথায় বলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়। উলুখাগড়ার প্রাণ
যায়। এ কোন নতুন ঘটনা নয়। ক্ষমতা দখলের যে যুদ্ধ। তার শাশ্বত ইতিহাস। সাধারণ মানুষের
রক্ত না নিলে। সাধারণে মানুষের প্রাণ বলি না দিলে। নির্বাচনী গণতন্ত্রে ক্ষমতার দখল
নেওয়া যায় নাকি? অন্তত পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সে আর সম্ভব নয়। সৌজন্যে
রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তার উপরে গোদের উপর বিষ ফোঁড়। দিল্লীর সীমানায় মাসাধিককাল
রাজপথ জুড়ে অবস্থানরত কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনকারী কৃষক সমাজ। তাদের আন্দোলনকে প্রতিহত
করে স্তব্ধ করতে পশ্চিমবঙ্গের মতো সেকুলার একটি রাজ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান
অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করছে কেন্দ্রে সরকার গড়া রাজনৈতিক শিবির। ফলে ২০২১এর পশ্চিমবঙ্গ
বিধানসভায় ক্ষমতা দখল তাদের জন্য মরণবাঁচন লড়াই। এই লড়াইয়ে পরাজয় মানে, দিল্লীর সীমানায়
আন্দোলনরত কৃষকদের জব্দ করার পরিকল্পনায় বেশ কয়েক কদম পিছিয়ে যাওয়া। ফলে রাজ্য বিধানসভায়
জয়ী হতে মরণকামড় দিতেই হতো। উল্টো দিকে ঘাসফুল শিবিরের পক্ষে এই নির্বাচনে হার মানে
ঘটি বাটি সব হারানো। এমনিতেই দলের অর্ধেক পদ্মশিবিরে। বাকি অর্ধেক পা বাড়িয়েই বসে রয়েছে।
তারপর নির্বাচনে হার, রাজনীতির ময়দানে সাইনবোর্ড হয়ে যাওয়ার পথ তৈরী করে দেবে। ফলে
একুশের নির্বাচনে জয় ছাড়া অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই সম্ভব নয়। রাজনীতির এই ক্ষমতা দখলের
লড়াই যত বেশি তীব্র। সাধারণ মানুষের প্রাণবলি ততই অবধারিত।
একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ
জনতার লাশের উপরেই আজকের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত। হেভিওয়েট নেতারা রোড শো করবেন।
সরকারী ক্ষমতা দখলের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে। সাধারণ জনতা ভেড়ার পালের মতো সামনে
পিছনে হাঁটতে থাকবে। শীততাপ নিয়ন্ত্রীত সুউচ্চ মঞ্চ কাঁপিয়ে ঝুড়িঝুড়ি মিথ্যে কথার ফুলঝুড়ি
ছড়িয়ে জনতার ভিতরে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর কাজ করে যাবেন। আর সাফল্যের হাত নাড়তে থাকবেন।
বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মুণ্ডুপাতে জনতাকে ক্রমাগত উস্কানি দিতে থাকবেন আর নিজেদেরকে
জনসেবক পরিচয়ে জনতার সামনে তুলে ধরতে যত রকমের অসাধু উপায় সম্ভব, অবলম্বন করবেন। যেভাবেই
হোক জনতার ভোটকে নিজেদের পক্ষে কব্জা করতে হবে। ভয় দেখিয়ে হোক। লোভ দেখিয়ে হোক। সরকারী
ক্ষমতার অপব্যবহার করে হোক। আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে হোক। নগদ অর্থ ছড়িয়ে হোক। মিথ্যা
প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোক। ক্রমাগত গুজব ছড়িয়ে হোক। প্রয়োজনে সহিংস পথে হোক কিংবা সরাসরি
দাঙ্গা লাগিয়ে হোক। ভোটের কব্জা করতে হবেই। সেটাই রাজনীতি। গণতন্ত্রের আসল প্রহসন।
একুশের বিধানসভা নির্বাচন
সেই প্রহসনেরই সাংবিধানিক স্বীকৃতি। ফলে মানুষের লাশ যত পড়বে। ভোটের রাজনীতি তত জমে
উঠবে। ক্ষমতা দখলের লড়াই তত ফলপ্রসু হবে। আট দফার নির্বাচনের লক্ষ্যই হলো অধিকতর লাশের
নিশ্চয়তা। একদফা নির্বাচন হলে স্বভাবতই লাশের পরিমাণ তুলনামূলক ভাবে অনেক কম হতো। কিন্তু
তাতে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সহিংসতা যত বেশি হবে।
ক্ষমতা দখলের পথ তত মসৃণ হয়ে উঠবে। এটা ভারতীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য। একের পর এক নির্বাচন।
একের পর এক লাশ পড়ার ছবি। শীতলখুচি কোন ব্যতিক্রম নয়। সেই লাশের রাজনীতির সর্বশেষ বলি
শীতলখুচি। যে যুবকদের প্রাণ গেল, তাতে রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা কদিন মড়াকান্না জুড়বেন।
সেই ভোট দখলের খেলায় বিপক্ষ দলের থেকে কয়েক কদম এগিয়ে যেতে। কিন্তু সেই পরিবার কয়টি’র
জীবনে যে অন্ধকার নেমে এলো। সেই অন্ধকারে আলোর রেখা দেখানোর কোন উপায় ভারতীয় গণতন্ত্রেরও
নাই। সংবিধানেরও নাই। যদি থাকতো, তবে শীতলখুচির ঘটনা ঘটতো না। শীতলখুচিতে আসলেই কি
হয়েছে। কেন গুলি চালানো হলো। কার নির্দেশে গুলি চালানো হলো। নির্বাচনী ভোট যুদ্ধে এর
সুফল কোন রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষে যাবে। এইসব প্রশ্নই আজকের রাজনীতির বিষয়বস্তু। এবং
রাজনৈতিক শিবিরগুলির পারস্পরিক দোষারোপের পালায় জনতাকে টেনে নিয়ে এসে নির্বাচনী কৌশলে
ভোট কব্জা করার এই খেলা চলতেই থাকবে। নির্বাচনী বলির এই ঐতিহ্য শীতলখুচির হিংসায় শেষও
হবে না। এবং এই ভাবে রাজনীতির কূটকৌশলে সাধারণ জনতাকে তার ন্যায্য অধিকারের বিষয়গুলি
থেকে বিভ্রান্ত করে রাখার প্রক্রিয়া সচল থাকে। সরকারী ক্ষমতার অধিকার দখল করে নিয়ে
মুষ্টিমেয় মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির এই খেলায় জনতা চিরকালই বলির পাঁঠা।
রাজনীতির এই গতিপ্রকৃতিকে
প্রতিরোধ করতে গেলে ঘুমন্ত জনতাকে জাগিয়ে তোলা দরকার। জনগণ ঘুমন্ত বলেই, রাজনৈতিক ক্ষমতা
দখলের লড়াইয়ে জনতাকে রাজনৈতিক পক্ষগুলির কব্জায় ধরে রাখা সহজ। মানুষ এক দলের অপশাসনের
বিরুদ্ধে অন্য দলের হাতে অপশাসনের অধিকার তুলে দিতেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সামিল হয়ে
পড়ে। দুই দল সুবিধাভোগীর ভিতরে জনতা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে রাজনীতি সবসময়ই জনসাধারণের
বিপক্ষে ক্রিয়াশীল থেকে মুষ্টিমেয় মানুষের গোষ্ঠী স্বার্থ পূরণে কাজ করে চলে। ঠিক এইখানে
দেশ ও জাতির স্বার্থকে রাজনীতির উর্ধে তুলে ধরতে জনসচেতনতা তৈরীর এক সামাজিক প্রক্রিয়া
শুরু করার আশু প্রয়োজন রয়েছে। ক্ষমতা দখলের রাজনীতির বাইরে নাগরিক সমাজের অন্দরমহল
থেকে সেই প্রক্রিয়া শুরুর লক্ষ্যে যতদিন না সদর্থক কোন আন্দোলন শুরু হবে, ততদিন কাজের
কাজ কিছুই হবে না। পরিতাপের কথা, বাংলার নাগরিক সমাজ এই বিষয়ে একেবারেই সচেতন নয়। নাগরিক
সমাজ ধরেই রেখে দিয়েছে, সমাজ রাজনীতির নিয়ন্ত্রাধীন। নাগরিক সমাজের আরও একটি বড়ো দুর্বলতা
হলো, নগরজীবনের বাইরে বিস্তৃত যে দেশ। সেই দেশের অনুভব আজকের নাগরিক সমাজের উপলব্ধির
পরিসরে ধরা পড়ে না কোন ভাবেই। ফলে বৃহত্তর জনসমাজের ভালোমন্দের বিষয়ে আজকের নগরকেন্দ্রিক
নগরজীবনে বিশেষ কোন ছায়পাত পড়ে না। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি সেই ফাঁকা জায়গাটিরই সুযোগ
নিয়ে চলেছে বছরের পর বছর। দশকের পর দশক।
এই ফাঁকা স্থান পূরণে
প্রয়োজন সঠিক দিশায় সদর্থক জনসচেতনতা তৈরীর আন্দোলন। আর সেই আন্দোলন গড়ে তুলতে দরকার
একটা শিক্ষিত জনমানস। কিন্তু সমাজটাকে দীর্ঘ দিন ধরে রাজনীতির ঘুণপোকা এমনভাবেই খেয়েছে
যে, সেই শিক্ষিত জনমানস গড়ে তোলার সব পথই আজ বন্ধ। পথ যে বন্ধ সেই উপলব্ধি করার মতো
সক্ষমতাও যেন আজ আশা করা দায়। বাংলার সমাজ জীবন আজ এমন ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছে।
এই ক্ষতিগ্রস্ত পঙ্গু মেরুদণ্ডহীন ঘুণধরা বাঙালি সমাজের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে আজ প্রয়োজন
সামাজিক নবজাগরণের। কিন্তু সেই নবজাগরণ সংঘটনে দরকার নতুন নতুন মনীষীর। যাঁরা জাতিকে
সুস্থ করার কাজে এগিয়ে আসবেন। জাতির ঘুমিয়ে থাকা চেতনাকে জাগিয়ে তুলবেন। জতির গতিপথের
অভিমুখকে ভুল দিশা থেকে ঘুরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। রাজনীতির অভিশপ্ত
করালগ্রাস থেকে বাঙালিকে উদ্ধার করতে এই নবজাগরণের কোন বিকল্প নাই। মানুষের ইতিহাস
বারবার প্রমাণ করেছে, অন্ধকার যত জমাট বাঁধে আলোর রেখা ফুটে ওঠার সম্ভাবনাও তত প্রবল
হয়ে ওঠে। দুই হাজার একুশ সেই অন্ধকার জমাট হওয়ার পথে হয়তো একটা বড়ো মাইলস্টোন হতে চলেছে।
বাঙালি হয়তো এইবার যে অন্ধকারে পা রাখতে চলেছে, তাতে তার অধঃপতন আরও জোরদার গতিতে ত্বরান্বিত
হবে। দিনে দিনে অন্ধকার জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল। ততই আলোর রেখার
জন্য মানুষের হাহাকার তীব্র হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। একমাত্র সেই তীব্র হাহাকারই মানুষের
চেতনার দিকবদল ঘটাতে পারে। মানুষের ইতিহাস সেই দিক বদলের ইতিহাসও বটে।
১১ই এপ্রিল’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

