![]() |
বরাৎ জোর তিনি আজ জীবত
নেই। থাকলে চমৎকৃত হতেন খুব। একই মানুষের দুদিন পঁচিশে বৈশাখ। ঠিক। আজ বাংলাদেশে পালিত
হচ্ছে পঁচিশে বৈশাখ। আগামী কাল পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য বঙ্গভাষী অঞ্চলে পালিত হবে সেই
পঁচিশে বৈশাখ। কবি বেঁচে থাকলে তার স্বপ্নের সোনার বাংলার এই হাল দেখে কি লিখতেন জানি
না। কিন্তু খুব কি অবাক হতেন? মনে হয় না। সেই ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কেন্দ্রে
থেকে শতভঙ্গ বাংলা দেশের চিত্র দেখে নিয়ে ছিলেন। দেখে নিয়েছিলেন বংশ পরম্পরায় বাঙালির
সাম্প্রদায়িক মন মনন ও চেতনার প্রকৃতিগত স্বরূপ। হ্যাঁ হিন্দুমুসলিম সম্প্রীতির সমাজ
বাস্তবতাও যেমন সত্য ছিল। ঠিক একই রকম সত্য ছিল জাতপাত ভিত্তিক সামাজিক ভেদাভেদের সমাজ
বাস্তবতা। সেই ভেদাভেদের সমাজ সংস্কৃতির উপরেই ব্রিটিশের আনুকূল্যে গড়ে উঠছিল এক রাজনৈতিক
পরিসর। কবি সেই রাজনৈতিক পরিসরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর নিজের কাজ চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন
নিজের মতোন করে। আর নিজের মতো করে চালাতে হয়েছিল বলেই, নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার
প্রয়াস করেছিলেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’। একলাই চলতে হয়েছিল
কবি কে। তাঁর ডাক হাতে গোনা কয়েকজন নিশ্চয় শুনেছিলেন। কিন্তু জাতি হিসাবে বাঙালি কবি’র
ডাক শোনেনি কোনদিন। আজ পঁচিশে বৈশাখে যদি সত্য অর্থেই কবিকে স্মরণ করতে হয়। তবে স্বীকার
করে নিতে হবে সেই সত্যটুকুও। যদি আজও সেই সত্য স্বীকারে ব্যার্থ হই। তবে বুঝতে হবে
আত্মপ্রবঞ্চনার সকল সীমাই লঙ্ঘন করে ফেলেছি।
কবি নিশ্চয় টের পেয়ে
গিয়েছিলেন। বাঙালিকে আর অখণ্ড জাতিসত্তায় সজীব রাখা যাবে না। কারণ ভিতরে ভিতরে বাঙালি
ভেঙে ভেঙে খান খান হয়েছিল। তাকে ওপর থেকে জোড়া দিয়ে বেশিদিন টিকিয়ে রাখাও যেত না। বুঝতে
তিনি নিশ্চয় পেরেছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে লিখতে হল ‘বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন এক হউক এক
হউক এক হউক হে ভগবান’। ভাইবোন যে ঘরের ভিতরেই আলাদা হয়ে ছিল। এক হয়ে উঠতে পারছিল না,
সেই সত্য কবির’র দৃষ্টিতে সময় মতোই ধরা পরে গিয়েছিল। অসংখ্য লেখায় বক্তৃতায় সেই নিদর্শন
রয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্র গবেষক, পণ্ডিতেরা সেই বিষয়ে আরও গভীরে আলোচনা করতে পারবেন নিশ্চয়।
ঘরের ভিতরেই অর্থাৎ সামাজিক পরিসরেই যে ভাইবোন এক হতে পারছিল না। ঘরের বাইরে অর্থাৎ
রাজনৈতিক পরিসরে যে তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিন্ন দিশায় হাঁটা লাগাবে, সে আর বিচিত্র
কি। ১৯০৫ সালেই তার সুস্পষ্ট লক্ষ্মণগুলি চিহ্নিত করতে পেরে ছিলেন কবি। বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সেই ভিন্ন দিশায় হাঁটারই ইতিহাস। ফলে ১৯৪৭ এ কবি বেঁচে থাকলে
অবাক হতেন ভাবাটাই অবাক করার মতোন বিষয়। কবি যে আমাদেরকে সঠিক অর্থেই চিনতে সমর্থ হয়েছিলেন।
তার প্রমাণ তাঁর নিজের কথাতেই তিনি রেখে গিয়েছেন। বলেছিলেন, বাঙালি আমার আর সব কিছু
অস্বীকার করলেও আমার গানকে অস্বীকার করতে পারবে না। তাঁর কথা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্য
হয়েছে। আমরা ‘বাংলার বায়ু বাংলার জল পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান’ বলে গলা
সেধেছি। কিন্তু বাঙালির পণ বাঙালির আশা বাঙালির কাজ বাঙালির ভাষা সত্য করে তুলতে পারিনি
আজও। কারণ করতেই চাই নি কোনদিন। করতে চাইলে কলজের যে জোর থাকার দরকার। সেটা আমাদের
তৈরী হয় নি। কারণ কবি’র কথা মতোন আমরা বাঙালির প্রাণ বাঙালির মন বাঙালির ঘরে যত ভাউ
বোন’কে এক ও অভিন্ন জাতিসত্তায় এক করে তুলতেই চাইনি। আমাদের ঘরের ভিতরে পারস্পরিক ভেদাভেদ
এতটাই অমোঘ ও অলঙ্ঘণীয়। ছিল আছে ও থাকবে।
এটাই কবির সোনার বাংলা।
কবি তো জানতেন তাঁর সোনার বাংলার স্বরূপ ও স্বাতন্ত্র্যের কথা। কবি জানতেন তাঁর সোনার
বাংলা কবিকল্পনার আবেগের ধন। কবি জানতেন তাঁর সোনার বাংলা অনন্ত সম্ভাবনার একান্ত ব্যর্থতার
এক মহাকাব্য। সম্পূর্ণ সচেতন থেকেই সেই মহা ব্যর্থতার বেদীমূলে বসে আমাদের কবি তাঁর
ক্ষুদ্র একক প্রয়াসে যতটুকু সম্ভব এক মরিয়া প্রয়াস করে গিয়েছিলেন। একটা খোঁড়া জাতিকে
নিজের পায়ে আত্মপ্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে যেতে। নিজের আজীবন সাধনায়। জাতিগত সত্তার সমস্ত
স্খলন পতন নিয়েও বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রক্ষিপ্ত লগ্নে বাঙালি আজও যেটুকু আত্মপরিচয় রাখার
চেষ্টায় সামিল হয় মাঝে মধ্যে। সে’ ঐ কবি’র ঐকান্তিক প্রয়াসেরই উত্তরাধিকারে। ঐটুকু
ছাড়া আমাদের ভাঁড়ার আজও শূন্যই রয়ে গেল। পূর্ণ করলাম না আমরাই। তাই একাত্মতার যে রাখী
তিনি আমাদের হাতে হাতে বেঁধে দিয়ে যেতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। সেই প্রয়াসে আমরাই কেমন অম্লান
বদলে জল ঢেলে দিয়েছিলাম ১৯৪৭ সালেই। যে জলে হাবু ডুবে খেয়েও আমরা আজ পরস্পর বিদেশী
সেজে পরপর দুটি আলাদা দিনকে পঁচিশে বৈশাখ হিসাবে তৈরী করে ফেলেছি। এটাই কি বাঙালিত্ব
নয়? এটাই কি বাঙালিয়ানার নিগূঢ় ধর্ম নয়?
ঠিক এইখানেই নতুন করে
আঘাতটা নামিয়ে আনতে উঠে পড়ে লাগার লক্ষ্যেই এক সুনার বাঙ্গাল গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
নিয়ে হাজির অবাঙালি বেনিয়া সম্প্রদায়। ব্যবসাটা তারা ভালো বোঝে। সেই ব্যবসার স্বার্থেই
এই সুনার বাঙ্গাল প্রকল্প। যেখানে সংখ্যালঘুদের হাতে বিপদের সম্মুখীন নাকি সংখ্যাগুরুরা।
যেখানে বাঙালির দুটি পরিচয়। সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু। এর বাইরে বাঙালির কোন আত্মপরিচয়
আজ আর স্বীকৃত নয় তাদের কাছে। ফলে সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু তাস খেলার ভিতর দিয়েই কাঁটাতারের
এই পারে তাদের শক্তিবৃদ্ধি হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত হারে। দ্রুতহারে শক্তিবৃদ্ধির অন্যতম
প্রধান কারণ বাঙালি আজ আর নিজেকে বাঙালি পরিচয়ে অনুভব করতে পারে না। অনুভব করে সংখ্যাগুরু
সংখ্যালঘু পরিচয়ের গণ্ডীতেই। সেই গণ্ডীতে পাক দিতে দিতেই আজ আমাদের একটা চলন স্থির
হয়ে গিয়েছে। যে চলনের নিয়ন্ত্রণ আজ আর আমাদের হাতে নেই। না, স্বয়ং কবিগুরু বেঁচে থাকলেও
সেই চলনের হাত থেকে আজ আমাদের রক্ষা করতে পারতেন না। কারণ আমরা সেই চলনে এতটাই অভ্যস্ত
হয়ে গিয়েছি যে, তার থেকে বেড়িয়ে আসতে চেষ্টা করলেই আমাদের মাথা ঘুরে মুখ থুবড়ে আছাড়
খাওয়ার মতোন দশা হবে। কবিগুরুর সোনার বাংলাই হোক আর এই অবাঙালি বেনিয়া সম্প্রদায়ের
সুনার বাঙ্গালই হোক। বাঙালির পরিণতির অভিমুখ স্থির হয়ে গিয়েছিল সেই ১৯০৫’এর বঙ্গভঙ্গ
আন্দোলনের গতি প্রকৃতির স্বরূপেই। কবি সেটা টের পেয়ে ছিলেন হাড়ে হাড়ে। তাই সেই আন্দোলনে
টিকতে পারেননি বেশিদিন। ঠিক করে নিতে হয়েছিল একলা চলার দিশা। জাতি সেদিন বঙ্গভঙ্গ রোধে
সমর্থ হলেও কবির পথকে প্রতিহত করেছিল। পরিহার করেছিল। গ্রহণ করা তো দূরের কথা, গ্রহণ
করার মানসিকতাকেই পরাস্ত করেছিল। তার কি মূল্য দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস লেখা রয়েছে দেশভাগের
রক্তক্ষরণের পরতে পরতে।
সেই মূল্য দেওয়ার পালা
আজও শেষ হয়ে যায় নি। যাবেও না। তাই আজ এক বিশেষ অবাঙালি বেনিয়া সম্প্রদায় বাঙালিকে
সুনার বাঙ্গাল গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়ে যেতে পারে। এটাই বাঙালির
পাওনা। বাঙালির অর্জন। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার প্রত্যক্ষ ফলাফল। বাঙালি আজ কাঁটাতারের
এ পারে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু পরিচয়ে বিভক্ত। সেই বিভেদের খাল দিয়ে ঢুকে সামপ্রদায়িক
শক্তি আজ বাংলার বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে গিয়েছে। সংখ্যাগুরু
বাঙালির একটা বড়ো অংশ তাদের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছে ঢাল হয়ে। কবি’র আবেগের সোনার বাংলায়
এটাই হওয়ার কথা। সেটিই হয়েছে। একটা কাঁটাতার একটা জাতিকে সম্পূর্ণ খোঁড়া করে রেখে দিয়েছে।
আজকে সেই ল্যাংরা জাতি’র একটা বড়ো অংশ সুনার বাঙ্গাল গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে আহ্লাদে
আটখানা। অনেকেই ভোটের ফলাফল দেখিয়ে এই কথা খণ্ডণে প্রয়াসী হবেন। খুব স্বাভাবিক। ওপর
ওপর দেখলে তেমনটাই মনে হওয়ারই কথা। কিন্তু রোগের গভীরে ডুব দিলে বোঝা যেত কর্কট রোগের
বিস্তার এখন ঠিক কোন স্টেজে বিদ্যমান। যে স্টেজেই থাকুক আমাদের কবি আজও জীবিত থাকলে
আদৌ অবাক হতেন না। কিংবা হতবাক হয়ে কপালও চাপড়াতেন না। শুধু তিরিশের দশকে সাহিত্যিক
যাযাবরের প্রশ্নের উত্তরে যেমন বলেছিলেন। ঠিক সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করতেন। নতুন করে
লিখতে হলে ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’র লাইনে সার্থক কথাটি কেটে দিয়ে যেতেন।
ঠিক এই কথাই সাহিত্যিক যাযাবরের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন কবি। গত শতকের তিরিশের দশকেই।
টের পেয়ে গিয়েছিলেন এই শতকের কুড়ির দশকে বাঙালি’র সামনে সুনার বাঙ্গালের গাজরই ঝোলানো
থাকবে। সেটাই বাঙালির অর্জন। বাঙালির সঠিক পাওয়া। আজ পঁচিশে বৈশাখে যদি কবিকে সত্যি
স্মরণ করতে হয়। তবে নিজেকে আত্মপ্রবঞ্চনার প্রবোধ না দিয়ে বরং স্বীকার করে নেওয়া অনেক
বেশি ভালো। না, গ্রহণ করি নি আমরা রবীন্দ্রনাথকে। ব্যবহার করে চলেছি শুধু নাম যশ খ্যাতি
প্রতিপত্তির স্বার্থে। সেই স্বার্থের বাইরে বাঙালির জীবনদর্শনে নেই কোন রবীন্দ্রনাথ।
নেই কোন পঁচিশে বৈশাখ। পরপর দুই দিন একই রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করলেও নেই।
৮ই মে’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

