আমাদের সকল কাজের কাণ্ডারী সেই রবীন্দ্রনাথ
তাঁর লেখায় এক জায়গায় বলছেন, “আমি জানি, সুখ প্রতিদিনের সামগ্রী। আনন্দ প্রত্যহের অতীত”।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন এই সুখের অভিমুখেই ছুটছে। কেউ কেউ বলতে পারেন এ যেন সুকুমার
রায়ের সেই খুড়োর কল। সুখের লুচির আশায় যত উদগ্রীব হবে। তত দৌড়াবে। পুঁজিবাদী বিশ্ব
বন্দোবস্ত সেই সুখের লুচি টাঙিয়ে রেখেই কলুর বলদের মতো আমাদের শ্রম নিঙড়িয়ে নিচ্ছে।
এটাই ধনতন্ত্রের জীয়নকাঠি। অর্থনীতির কথা থাক। সে নানা মুনির নানা মত। বিষয়টা আসলেই
পুঁজির কারণে পুঁজির হাতে পুঁজিপতিদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রীত হতে থাকে। সেখানে জনগণের
কোন প্রবেশাধিকার নেই। জনগণ প্রবেশ করতে চাইলেই তাদের কমিউনিস্ট বলে দেগে দেওয়া হয়।
জানি আমরা। সে অন্য প্রসঙ্গ। আমাদের আলোচনা সুখ আর আনন্দ নিয়ে। সেই একই লেখায় কবি আরও
বলছেন, ‘সুখ পাছে কিছু হারায় বলিয়া ভীত। আনন্দ যথা সর্বস্ব বিতরণ করিয়া তৃপ্ত’। অর্থাৎ
সুখ সদা শঙ্কিত। আর আনন্দের হারাবার কিছুই নেই। সুখ আর আনন্দের ভিতর এই এক বড়ো পার্থক্য।
সুখকে অর্জন করতে হয় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। কিন্তু আনন্দকে অর্জন করার দায় থাকে না।
আকাশ ভরা সূর্য-তারা বিশ্বভরা প্রাণের মাঝখানে স্থান পাওয়াতেই আনন্দ। কিন্তু সকলেই
কি সেখানে স্থান পায়? মনে তো হয় না। পেলে গোটা বিশ্ববন্দোবস্তই অন্যধারায় বইতো। অন্তত
ডারউইন ট্র্যাকের ভিতরে এই রকম শৃঙ্খলিত হয়ে ঘুরপাক খেতো না।
সন্তানের মুখের দিকে
চেয়ে মায়ের যে আনন্দ। প্রেয়সীর মুখের দিকে কিংবা প্রেমিকের মুখের দিকে চেয়ে আমাদের
কি সেই আনন্দ হয়? নিশ্চয় নয়। সকলেই বলবেন। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি বাৎসল্যের
আনন্দ। অন্যটি মিলন আকাঙ্খার আনন্দ। কিন্তু আকাঙ্খার ভিতরে সত্যিই কি আনন্দের অংশ থাকে?
কেননা আকাঙ্খার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জুড়ে থাকে অজানা আশঙ্কার ভয়। আর সেটি থাকে বলেই আকাঙ্খার
সাথে সুখের সম্পর্ক অনেক বেশি। আমাদের অধিকাংশ আকাঙ্খাই সুখের সামগ্রী। আনন্দের নয়।
আনন্দের অন্তরে আশঙ্কার কোন জায়গা থাকে কি? মনে হয় না থাকে। সন্তানের জন্য মায়ের যে
আনন্দ তার ভিতরে বাৎসল্যই থাক, আর যাই থাক। সেই আনন্দে মা নিজেকে সম্পূর্ণ উজার করে
তাঁর যথাসর্বস্ব বাজি রাখতে পারেন আত্মজের জন্য। যার ভিতরে চাওয়া পাওয়ার কোন হিসেব
থাকে না। কিন্তু আমরা যখন তথাকথিত প্রেমে পড়ি। তখন আমাদের ভিতরে নানাবিধ হিসেব নিকেশের
পালা চলতে থাকে। আমরা কি প্রেমে পড়ার মুহুর্তে নিজেকে উজার করে সমর্পণ করতে পারি? আমাদের
ভালোবাসার মানুষটিকে? অনেকেই বলবেন। নিশ্চয়, পারি বইকি! এই যে পারি বলে মনে হয় আমাদের।
প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা সেটিকেই মোহ বলে অভিব্যক্ত করে থাকেন। এবং আমরাও আমাদের অভিজ্ঞতা
থেকে দেখতে পাই। সেই মোহ কোন কারণে হঠাৎ কেটে গেলে আজকের ভালোবাসার মানুষটিও কালকের
ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠতে পারে। আমরা শুধু অজুহাত হিসাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি। আমরা ঠকে
গিয়েছি। ঠকানো হয়েছে আমাদের। আসলেই নরনারীর প্রেমের সম্পর্কের মূলে থাকে বিশ্বাস। আর
বিশ্বাস মানেই অজ্ঞানতা। আমরা একজন মানুষকে ঠিক ততটাই বিশ্বাস করি। তাকে যতখানি কম
জানি। আমাদের এই ইগনোরেন্সকেই আমরা বিশ্বাস দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করি। যে মুহুর্তে
সেই ইগনোরেন্স কেটে গিয়ে আমাদের আশা ধরাশায়ী হয়। সেটিই আমাদের ঠকে যাওয়ার মুহুর্ত।
নর নারীর প্রেমের সম্পর্কে প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই উভয় পক্ষেই এই ঠকে যাওয়ার একটা ভয়
থাকে। আর সেই ভয় থেকেই আমাদের ভিতর সুখের প্রতি লালসা উদগ্র হয়ে ওঠে। যে সুখ নির্ভর
করে পারস্পরিক দেওয়া নেওয়া আর চাওয়া পাওয়ার ভারসাম্যের উপরে। আমরা সেই সুখের পিছনে
ছুটতে থাকি। প্রেমের সম্পর্কই হোক আর দম্পত্যের সম্পর্কই হোক।
সত্যি কথা বলতে কি, নর
নারীর ব্যক্তি সম্পর্কের পরিসরে সুখের সীমাহীন গুরুত্বের কাছে আনন্দ প্রায় অপাংতেয়
হয়ে পড়ে থাকে। এবং সুখী হওয়াতেই আমরা আনন্দ পেয়ে থাকি। না, এটা প্রকৃত আনন্দও নয়। এটা
ফলস আনন্দ। এর ভিত্তি ক্ষণিকের। যতক্ষণ সুখ। ততক্ষণ আনন্দ। আমাদের আশা অনুযায়ী প্রাপ্তির
উপরে এই সুখ নির্ভরশীল। ফলে যতক্ষণ আশানুরূপ প্রাপ্তি ঘটতে থাকে। ততক্ষণই আমরা আনন্দ
অনুভব করি। উল্টোরকম হলেই আনন্দের লেশ মাত্র চিহ্ন দেখা যায় না। এই যে সুখপ্রাপ্তির
ভিত্তিতে আনন্দের উৎপত্তি। কবি এই আনন্দের কথা বলেন নি। এই আনন্দ অর্জন করতে হয়। অনেক
কাঠখড় পুড়িয়ে। বিস্তর হিসেব নিকেশ করে। অনেকটাই ফাটকা বাজারে অর্থ লগ্নী করে লাভবান
হওয়ার মতোন। কবি যে আনন্দের কথা বলছেন। সেই আনন্দ পাওয়ার আনন্দ নয়। দেওয়ার আনন্দ। হয়ে
ওঠার আনন্দ। ছড়িয়ে পড়ার আনন্দ। সমগ্রতার আনন্দ। কোন হিসেব নিকেশেই সেই আনন্দের পরিমাপ
করা সম্ভব হয় না।
দুঃখের বিষয়, প্রেমিক
প্রেমিকা কিংবা স্বামী স্ত্রী। কেউই নিজেকে উজার করে দিতেও পারে না। নিজের সবচেয়ে বড়ো
যে বাধাটি। সেই অহং। বাংলা করে বুঝিয়ে বলতে গেলে যাকে ইগো বলা হয়। স্বামী কিংবা স্ত্রী,
প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা কেউই সেই ইগো বিসর্জন দিয়ে নিজের সম্পূর্ণ সত্তাকে ভালোবাসার
মানুষটির হাতে সমর্পণ করতে পারে না। আবার পারলেও যে উল্টো দিকের মানুষটি সেই সমর্পণ
গ্রহণে সক্ষম হবেনই। সে কথাও বলা যায় না জোর দিয়ে। বরং এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতে
দুইজনের ইগোই দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে প্রহরীর মতো। খাজাঞ্চীর মতো। আর কড়ায় গণ্ডায় দেনা
পাওনার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত থাকে। লক্ষ্য তাদের একটিই। সর্বোচ্ছ সুখের সন্ধান। ঠিক
যৌন সঙ্গমের শীর্ষসুখ লাভের মতোন। দেওয়া নয়। সমর্পণ নয়। পাওয়া। পুরোপুরি হিসেব বুঝে
নেওয়ার ভিতরেই সেই সুখের জীয়নকাঠি। না, আনন্দের প্রবেশাধিকার থাকে না সেখানে। কি করেই
বা থাকবে? আনন্দের অস্তিত্ব ব্যক্তি ইগোর বিসর্জনের ভিতরে। আনন্দের প্রকাশ ব্যক্তিসত্তার
সমর্পণের ভিতরে। আনন্দের উদ্বোধন পরস্পরের ভিতর দিয়ে পূর্ণ হয়ে ওঠার ভিতরেই।
কবির লেখায় সুখ ও আনন্দের
আলোচনা জগৎ জীবনের সামগ্রিক পরিসর নিয়েই ছিল। কিন্তু আমরা আমাদের আলোচনায় নর নারীর
পারস্পরিক প্রেম ভালোবাসার সম্পর্কের ভিতরেই সুখ ও আনন্দের অবস্থান বিষয়ে সচেতন হওয়ার
চেষ্টা করছি মাত্র। কবি বলেছিলেন, “সুখ সুধাটুকুর জন্য তাকাইয়া বসিয়া থাকে। আনন্দ দুঃখের
বিষকে আনায়াসে পরিপাক করিয়া ফেলে। এইজন্য কেবল ভালোটুকুর দিকেই সুখের পক্ষপাত। আর আনন্দের
পক্ষে ভালো মন্দ দুইই সমান”। বড়ো অমূল্য কথা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে তবু। নর নারীর ব্যক্তিগত
সম্পর্কের প্রাত্যহিকতায় এই পর্যায়ে উত্তীরণ কি আদৌ সম্ভব কোনদিন? যে সুধাটুকুর দিকে
সুখের তাকিয়ে বসে থাকার কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ। আমরা জানি আমাদের দাম্পত্য জীবনেই হোক
আর প্রেমের সম্পর্কেই হোক। আমরা প্রত্যেকেই সেই সুধার প্রত্যাশী মাত্র। মদের প্রতি
মাতালের যে আসক্তি। নর নারীর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিতরে আমাদেরও ঐ সুধাটুকুর প্রতিই
সেই একই আসক্তি। এই আসক্তিই হয়তো দাম্পত্যের বাঁধন। যদি পূর্ণ হয়। এবং যতক্ষণ বজায়
থাকে। ততক্ষণই সুখের সংসার। না হলেই চিলচীৎকার! অথচ দুঃখের যে বিষকে পরিপাক করে ফেলে
আনন্দ, সেই আনন্দে পৌঁছানোর পথ কি? যে আনন্দের পক্ষে ভালো মন্দ দুইই সমান, সেই আনন্দে
তবে কি আমাদের আর পৌঁছানো হবে না? না কি, আরও সঠিক ভাবে বললে সেই আনন্দে পৌঁছাতেই চাইবো
না আমরা কোনদিন? কেননা পৌঁছাতে গেলে যে প্রথমেই নিজের ইগোকে বিসর্জন দিতে হয়। আর সমর্পণ
করতে হয় আপন সত্তাকেই। না আপন ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়ে নয়। বরং সেই ব্যক্তিত্বকে
সম্পূর্ণ করতেই ইগোর এই বিসর্জন দেওয়া আর সত্তার এই সমর্পণ একান্ত জরুরী। একমাত্র তখনই
সম্পূর্ণ হতে পারে নরনারীর যৌন সঙ্গম। যৌনসঙ্গম দুটি ভিন্ন অঙ্গের নিয়মিত সংযোগ সাধনের
পরিতৃপ্তির বিষয় নয়। দুটি ভিন্ন সত্তার পারস্পরিক সমর্পণ। পরস্পরকে সম্পূর্ণ করে তোলার
একমাত্র উপায় হিসাবে। একমাত্র পথ হিসাবে। সেই পথের পথিক না হলে ভালো মন্দ দুইই সমান
যে আনন্দের। সেই আনন্দের উপলব্ধি হবেই বা কি করে? আর সেই আনন্দে পৌঁছাবোই বা কি করে
আমরা। কিন্তু প্রশ্ন সেখানেও শেষ নয়। মূল প্রশ্ন আমাদের অন্তরেই। আমরা কি সত্যিই চেয়েছি
কোনদিন? আনন্দের সেই স্বর্গে পৌঁছাতে? নিজের অন্তরের দিকে তাকিয়ে দেখলে। দেখতে পাবো।
না, সেই আশা আকাঙ্খা কিংবা স্বপ্ন ও প্রত্যয় আমাদের ভিতরে কোনদিনই নেই। থাকে না। আমরা,
যে ‘আনন্দ দুঃখের বিষকে অনায়াসে পরিপাক করিয়া ফেলে’ সেই আনন্দ অনুভবে রাজি নই। বরং
যে ‘সুখ সুধাটুকুর জন্য তাকাইয়া বসিয়া থাকে’ সেই সুখের মুখাপেক্ষী চিরকাল।
কবিও সেকথা ভালোই জানতেন।
জানতেন বলেই তাঁর অনেক কম বয়সেই বিলাপ করে গিয়ে ছিলেন, ‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,
প্রেম মেলে না’। ‘শুধু সুখ চলে যায়’। আমরা সেই সুখের জন্যেই প্রেমের নাটকে অভিনয় করতে
আসি। প্রেমও নয়। আনন্দও নয়। আমাদের পথ চলা সেই সুখের অভিমুখেই। আমরা সারদিন সেই সুখকে
হাতের মুঠোয় ধরব বলেই সব কাজ করি। আমাদের পারস্পরিক প্রেমালাপ। পারস্পরিক যৌনসঙ্গত।
এবং পারস্পরিক সংসারযাত্রা সব কিছুরই এই একটিই অভিমুখ, সুখ। জাগতিক সুখ। আরামের সুখ।
দেনা পাওয়া চাওয়া পাওয়ার আশা পূরণের সুখ। ঠিক যে সুখকেই পণ্য ও টোপ করে পুঁজিবাদী বিশ্ব
বন্দোবস্ত আমাদেরকে কলুর বলদের মতো বেঁধে রেখেছে। না, আমরা কবি কল্পনার সেই আনন্দের
অভিমুখে পথ হাঁটার পথিক নই। আমরা বরং সুকুমার রায়ের খুড়োর কল কাঁধে চলেছি সকলে। সকলেই
সকলের আগে এগিয়ে যেতে। নরনারীর প্রেমই হোক। আর বিবাহিত দাম্পত্য জীবনের দৈনন্দিন পঞ্জিকাই
হোক। প্রতিদিনের সামগ্রী যে সুখ। সেই সুখই আমাদের অভীষ্ট। প্রত্যহের অতীত যে আনন্দ।
সেই আনন্দের তীর্থযাত্রী নই আমরা কেউই।
১লা জুন’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

