দলবদলের রাজনীতি

 

দলবদলের রাজনীতি


অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে। একুশের বিধানসভায় নব নির্বাচিত বিধায়কদের শপথগ্রহণ পর্বেই ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল। শুরু হয়েছিল অপেক্ষা। একুশের নির্বাচনে ঘাসফুলের বিপুল জয় রাজ্যরাজনীতিতে মুখ্যমন্ত্রীকে অবিসংবাদিত জননেত্রী রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফলে নির্বাচনের আগে তৃণমূলের যে সকল নেতানেত্রী জাহাজ ডুবতে চলেছে মনে করে দল ছেড়েছিলেন। তাঁদের বেশিরভাগই এখন নেত্রীর কোলে ফিরে আসার জন্য ছটফট করতে শুরু করে দিয়েছেন। নি্র্বাচনের আগে তাঁদের অনেকেরই দলে থেকে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। নির্বাচনের পরে সেই তাঁদেরই এখন ডাঙায় তোলা মাছের মতো অবস্থা। দশ বছর তাঁরা ক্ষমতায় থাকার সুযোগ এবং সুবিধে ভোগ করে এখন কি করে বিরোধী দলের পতাকা বহনের ভার টানতে রাজী হবেন আগামী পাঁচ বছর। ক্ষমতার লোভ বড়ো লোভ। ক্ষমতার বৃত্তে থাকা একটা অভ্যাস। সেই অভ্যাস ছাড়তে কে’ই বা পছন্দ করেন। তাই আবার দলে ফেরার পালায় অনেকেই নাম লেখাতে শুরু করে দিয়েছেন। এখন একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে ঘাসফুলের বিপুল জয়ে দলের শীর্ষনেত্রীর অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তাকেই মূল করণ বলে মনে করছেন অনেকেই। উপর থেকে দেখলে বিষয়টা তেমনই মনে হওয়া অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু একুশের নির্বাচনকে আরও একটু গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখারও দরকার রয়েছে। নয়তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে অসুবিধেই হবে।


একুশের বিধানসভা নির্বাচনে সব পক্ষকেই পরাজিত করে দুটি পক্ষ জয়ী হয়েছে। একদিকে প্রায় আটচল্লিশ শতাংশ ভোটসহ গোবলয়ের হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানী সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান করা রাজ্যবাসী। অন্যদিকে আটত্রিশ শতাংশ ভোটসহ হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানী সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে থাকা রাজ্যবাসী। যারা পক্ষান্তরে রাজ্যকে গোবলয়ের সম্প্রসারিত অংশরূপেই দেখতে প্রত্যাশী। এই আটত্রিশ শতাংশ রাজ্যবাসী সংগঠিত ভাবেই পদ্মশিবিরকে ক্ষমতায় আনতে চেয়েছিলেন। তারা সংঘবদ্ধ। কিন্তু যে আটচল্লিশ শতাংশ রাজ্যবাসী ঘাসফুলকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন। তাঁরা যে সংগঠিত ভাবে সকলেই ঘাসফুলপন্থী, তা কিন্তু নয় আদৌ। তাঁদের একটা বড় অংশই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতিকে এই রাজ্যের ক্ষমতা দখল থেকে প্রতিহত করতে গেলে, ঘাসফুলই এই সময়ের যোগ্য বিকল্প শক্তি। সেই বাস্তবতার ভিত্তিতেই তাঁরা ঘাসফুলকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে মরিয়া ছিলেন। এবং সাফল্য লাভও করেছেন। তাঁদের এই প্রয়াসে সবচেয়ে লাভবান হয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। বাংলায় হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে প্রতিহত করতে তিনিই অবিসংবাদিত নেত্রী হয়ে উঠেছেন এই নির্বাচনের ফলাফলে। নির্বাচনের আগে তাঁর দল থেকে প্রায় শতাধিক নেতানেত্রী দলত্যাগ করে পদ্মশিবিরে যোগ দেয়। এই বিপুল পরিমাণ নেতানেত্রীর দলত্যাগে পদ্মশিবিরে যুদ্ধ জয়ের উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনে জেতা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সংবাদ মাধ্যমের নিরন্তর প্রচারে এবং পদ্মশিবিরের শীর্ষ নেতানেত্রীদের সিংহনাদে ঘাসফুলের পরাজয় আর পদ্মশিবিরের জয় সম্বন্ধে সকলের ভিতরেই একটা বদ্ধমূল ধারণা তৈরী করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এই চেষ্টার ফলেই কিন্তু হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যাঁরা ছিলেন। তাঁরা ভিতরে ভিতরে ঘাসফুলের পক্ষেই বুথে বুথে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। পদ্মশিবিরের প্রচারের এই তীব্রতা এমন বিপুল পর্যায়ে না পৌঁছালে হয়তো পদ্মশিবির বিরোধী জনতা বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরেই বিভক্ত হয়ে থাকতেন। সকলেই ঘাসফুলের পক্ষ নিতেন না। সেরকমটি হলে আখেরে লাভ হতো পদ্মশিবিরেরই। কিন্তু সমস্ত প্রচারযন্ত্র নিজেদের হাতে থাকায়। বিপুর পরিমাণের আর্থিক সংগতি থাকায়, এবং বাংলা দখলের উন্মত্ততায় তাদের প্রচারপর্বকে এমন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাওয়াটাই তাদের এবারের মতো বাংলা দখলে কাল হয়ে দাঁড়ালো।


এখন প্রাক নির্বাচনী পর্বের তৃণমূলের দলত্যাগীরা ঘরে ফিরতে মরিয়া। তাঁদের চোখে ক্ষমতার প্রসাদের ভাগ। এঁরা যত বেশি সংখ্যায় ঘরে ফিরতে থাকবেন। তৃণমূল নেত্রীর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। প্রতিষ্ঠিত হতে থাকবে, রাজ্যরাজনীতিতে তিনিই শেষকথা। অপর দিকে, পদ্মশিবিরের হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানী সাম্রাজ্যবাদকে ঠেকাতে মরিয়া জনতাও অন্য কোন বিকল্প না থাকায় মুখ্যমন্ত্রীর অবিসংবাদিত জনপ্রিয়তাকেই আরও শক্তিশালী করে তোলার জনশক্তিতে পরিণত হতে থাকবে। ফলে আখেরে লাভ ঘাসফুল তথা দলের শীর্ষনেত্রীরই। এবং আবারো তাঁর এই বিপুল জনপ্রিয়তাকে ঢাল করে রাজনীতির অঙ্গনে ব্যক্তিস্বার্থের আখের গুছিয়ে নিতেই দলত্যাগীদের অধিকাংশই এখন শীর্ষনেত্রীর অনুকম্পা প্রার্থনা করছেন। দলনেত্রীও জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বিষয়টি সংবেদনশীলতার সাথে বিবেচনা করবেন। তিনি বলেছেন, দলত্যাগী চরমপন্থীদের জন্য ঘরে ফেরার দরজা বন্ধ। নরমপন্থীদের বিষয়টি তাঁর বিবেচনায় থাকবে। জনগণ অধীর আগ্রহে তাই অপেক্ষায়। সেই চরমপন্থী ও নরমপন্থী দলত্যাগীদের নামের তালিকা জানতে। কারা ফিরছেন আর কাদের ফেরা হবে না। যাঁরা ফিরবেন, তাঁদের পুরোধায় থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পরে ঘরে ফিরলেন সপুত্র মুকুল রায়।


মুকুল রায়ের ঘরে ফেরার উৎসবে, দলনেত্রী জানালেন। মুকুলকে নাকি চমকে ধমকে দলত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তাঁর কথায় ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। এতদিন ধরে রাজ্যবাসী যেটি জানতেন। সারদা ও নারদা কেলেঙ্কারি থেকে বাঁচতেই মুকুলের পদ্ম শিবিরে যোগদান। সিবিআই, ইডি, সেবি ইত্যাদি সংস্থাগুলির তদন্তের হাত থেকে রক্ষা পেতে এছাড়া সেই সময়ে মুকুল রায়ের হাতে অন্য কোন বিকল্পও ছিল না। ফলে আজ যখন দলনেত্রী প্রকাশ্যেই স্বীকার করে নিলেন। মুকুলকে চমকে ধমকে দলত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন এটাও স্পষ্ট। দলনেত্রীরও মুকুলের দলত্যাগে নিশ্চয় খুব একটা অমত ছিল না। কারণ হয়তো তিনিও বুঝেছিলেন। সেই মুহুর্তে মুকুলের দলত্যাগই একমাত্র মুকুল এবং মুকুলসহ একাধিক শীর্ষনেতানেত্রীকে সারদা ও নারদা কেলেঙ্কারিতে জেলে যাওযার হাত থেকে বাঁচাতে পারে। এবং বিগত সাড়ে তিন বছরে সত্যিই সারদা নারদা মামলা আজও আদালতে ওঠেনি। শুনানী শুরুই হয় নি। সম্প্রতি ভোটের ফলাফলে পরাজিত হয়ে তৃণমূলের কয়েকজন হেভিওয়েট নেতাকে নারদা মামলায় গ্রেফতার করা হলেও সেটি’র মূল উদ্দেশ্য ছিল দলত্যাগী তৃণমূলীদের আপাতত পদ্মশিবিরে আটকিয়ে রাখার রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। যাতে তারা পুরানো দলে তড়িঘড়ি ফিরে না যান। ফলে দলনেত্রীর কথায় অনুমান করতে অসুবিধে হয় না। সাড়ে তিন বছর আগে মুকুলের দলত্যাগ ও পদ্মশিবিরে যোগদানে তাঁরও সায় থাকতে পারে। অর্থাৎ ঘাসফুল শিবিরের একজন বিশ্বস্ত সৈনিক রূপেই মুকুল রায় পদ্মশিবিরে নাম লেখান। তৃণমূলের অন্যান্য নেতানেত্রীসহ নিজেকে আইনের হাত থেকে বাঁচাতেই। বাংলার রাজনীতিতে নেতানেত্রীদের দলত্যাগও তাহলে রাজনৈতিক দলের রণকৌশলে পরিণত হয়ে উঠেছে। একটা দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেওয়া মানেই পুরানো দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা  করা নয়। বরং দলের একজন বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবেই শত্রুপক্ষে যোগ দিয়ে দলীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার একটা কৌশল মাত্র। মুকুল রায়ের তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান। এবং সাড়ে তিন বছর পরে পুনরায় তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন বাংলা রাজনীতিতে এক নতুন দিকের উন্মোচন সন্দেহ নাই। যদি মুকুলের পদ্মশিবিরে সাড়ে তিন বছর কাটানোর পিছনে দলনেত্রীর কথায়, পদ্মশিবিরের সেই চমকানো ধমকানো তত্ত্বই সত্য এবং সঠিক বলে ধরে নিতে হয়।


সাড়ে তিন বছর আগে যখন অনেকেই মুকুলের দলত্যাগ ও পদ্ম শিবিরে যোগদানকে ঘাসফুল শিবিরের মাস্টার স্ট্রোক বলে মনে করেছিলেন। তখন বেশিরভাগ মানুষই তাঁদের কথায় কর্ণপাত করেন নি। কিন্তু আজ যখন দলনেত্রী নিজেই চমকানো ও ধমকানো তত্ত্বকে নিজ মুখে স্বীকার করে নিলেন। তখন বিষয়টা অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের কাছেই হয়তো পরিস্কার হয়ে উঠছে। রাজনীতির ময়দানের রণকৌশলের পিছনে একটিই নীতি থাকে। আত্মরক্ষা এবং স্বার্থরক্ষা। তার জন্য যতদূর অব্দি যেতে হয়। রাজনীতিবীদদের ততদূর অবধি যেতে কোন অসুবিধে হয় না, হওয়ার কথাও নয়। কারণ যে পেশার যে নিয়ম। রাজনীতি যে একটি পেশা। এই বিষয়ে তো আর কোন ভুল নেই। এর সাথে জনসেবা সমাজসেবা বা দেশসেবার কোন রকম সংযোগ থাকার কথা নয়। সংযোগ নেইও। যেটুকু সংযোগ, সেটুকু রাজকোষের অর্থ ব্যায়ের কার্যক্রম। সেই কার্যক্রমের অধিকার দখল করার যে যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের নামই রাজনীতি। সাংবিধানিক গণতন্ত্র যার রক্ষাকবচ। আর ভোটাররূপী জনতা যার অনুঘটক মাত্র।


১২ই জুন’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত