মিনি মিডি
স্কার্ট স্কার্ট
কতটা হাঁটু দেখালে তবে
স্বাধীন হওয়া যায়। একটি দুটি তিনটি ছবি বেশ ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এর ওর ওয়ালে।
মিনিস্কার্ট মিডিস্কার্ট আর হিজাব বোরখা পরিহিত আফগান রমনীর ছবি। মিনিস্কার্টের যুগ
গত শতকের ষাটের দশক মিডিস্কার্টের যুগ সত্তর আশির দশক। আর হিজাব বোরখার যুগ তালিবানী
দশক। অর্থাৎ নারীর পায়ের কতটা অংশ উন্মুক্ত তার উপরেই নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতার
নির্ভরশীলতা। যতটা বেশি উন্মুক্ত নারীর পদযুগল। ততটা বেশি নারীমুক্তি। ততটা বেশি নারী
স্বাধীনতা। প্রচারের এরকমই উদ্দেশ্য। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে আমাদের দেশেও নারীর পদযুগল
দর্শনের সৌভাগ্য আমজনতার হয় না। তাহলে তালিবানী যুগের আফগান রমনীদের মতোই আমাদের দেশেরও
নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতার দশা। কিন্তু তাই কি? আমাদের দেশের মহিলাদের পোশাকও তো
হাঁটুর উপরে এসেই থমকিয়ে যায় না। তিনি শাড়ী পরিহিতাই হোন আর সলোয়ার কামিজই পড়ুন। কিংবা
আধুনিক জিন্স। হ্যাঁ স্বদেশী নারীর উন্মুক্ত হাঁটুদর্শনের একটাই রাস্তা। না কোন রাজধানীর
রাজপথে নয়। সে রাস্তা টিভি সিরিয়াল কিংবা সিনেমার দৃশ্য ছাড়া আমজনতার নাগালের বাইরে।
আমজনতার নাগালের বাইরে শীততাপ নিয়ন্ত্রীত যে ধনকুবের ভুবন। সেখানে উন্মুক্ত হাঁটু প্রদর্শন
নতুন কোন বিষয় নয়। হাই সোশাইটির মেয়েদের তথাকথিত নারী স্বাধীনতার বহর অনেকটাই চওড়া।
কিন্তু তার বাইরেও নারীর উন্মুক্ত হাঁটুর সাথে নারী মুক্তি কিংবা নারী স্বাধীনতার বিষয়টি
এমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ফেলা হয় না কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনে।
হঠাৎই তালিবানের হাতে
কাবুলের পতনে আফগান রমনীদের সাম্ভব্য দুর্দশার কথায় শঙ্কিত হয়ে উঠে অনেকেই এই মিনিস্কার্ট
মিডিস্কার্ট আর বোরখার মাপেই নারী স্বাধীনতার পরিসর মাপতে শুরু করে দিয়েছেন। অনেকেই
আমরা ভুলে যাই। সাধারণ ভাবে পোশাক একটি আঞ্চলিক বিষয়। জলবায়ুর সাথে সম্পর্কিত। জলবায়ুই
পোশাকের আকার ও মাপ ঠিক করে দেয়। আমাদের মতো গরমের দেশে ধুতি আর শাড়ীই একদিন যথেষ্ঠ
ছিল পোশাক হিসাবে। দর্জি’র হাতে তৈরী পোশাকের চল এদেশে শুরু হয় বিদেশী শক্তির বদান্যতায়।
দর্জি শব্দের ইতিহাস খুঁজতে বসলেই সেই কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে। ফলে শতকের পর শতক ধরে
নানা জাতি নানা পরিধান নিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশ করে পোশাকের বিস্তার ঘটিয়ে ছিল। এবং
সর্বশেষে আসা ইউরোপীয় দেশগুলি তাদের পোশাকের ভাবধারায় আমাদের ভিতরে একটা আধুনিকতার
জন্ম দিল। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করলাম আধুনিক পোশাক মাত্রেই ইউরোপের পোশাক। আর বাকি
সব মান্ধাতার বাবার আমলের পোশাক। আবার এই বিভিন্ন ধরণের পোশাকও যে যে সম্প্রদায়ের সূত্র
ধরে আমাদের দেশে প্রবেশ করে, সেই সেই সম্প্রদায়ের সূত্র ধরেই পোশাকেরও এক একটি ধর্মীয়
চরিত্র গেঁথে যেতে থাকলো আমাদের মননে। আমরা ভুলে যেতে থাকলাম। পোশাক যে সম্প্রদায়ের
হাত ধরেই আসুক না কেন। সেই সম্প্রদায় মূলত যে জনবায়ুর অঞ্চল থেকে আমাদের দেশে এসেছিল।
সেই জলবায়ুই সেই সেই পোশাকের মাপ ও ধরণের পিছনের আসল কারণ। সেই সেই সম্প্রদায়ের ধর্মের
সাথে তাদের পোশাকের কোন সংযোগ ছিল না। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পোশাক দেখে
মানুষ চেনার ফর্মুলায় বিশ্বাস রাখতে শুরু করেই দিয়েছি, তখন পোশাকের সাথে ধর্মকেই আমরা
ওতপ্রোত করে জড়িয়ে দিয়েছি। ফলে
আমরা ভুলে যেতে চাই মরু অঞ্চলের পোশাকের আলাদা বৈশিষ্টের কারণ। আমরা ভুলে যেতে চাই
ঠাণ্ডার দেশের পোশাকের আলাদা বৈশিষ্টের কারণ। আমরা ভুলে যেতে চাই গরমের দেশের পোশাকের
আলাদা বৈশিষ্টের কারণ। উল্টে আমরা ধর্ম আর আধুনিকতাকে পোশাকের সাথে জড়িয়ে দিই। হ্যাঁ
এটা ঠিক, পোশাকের ধরণ সময়ের সাথে পাল্টিয়ে যেতে থাকে। সেটাকেই ফ্যাশন বলে জানি আমরা।
কিন্তু সেই ফ্যাশনকে ধর্মের সাথে সম্প্রদায়ের সাথে চিহ্নিত করা কতটা যুক্তিযুক্ত। সেটি
আমরা আর খেয়াল করতে চাই না।
আধুনিকতার সাথে ফ্যাশনের
যে সংযোগ। পোশাকের সাথেও আধুনিকতার সেই একই সংযোগ। কিন্তু সেই ফ্যাশনের সাথে নারীমুক্তি
নারী স্বাধীনতার বিষয়টিকে ওতপ্রোত করে জড়িয়ে ফেললে তাতে নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতার বিষয়টিকেই
ছোট করে ফেলা হয়। নারী মুক্তি’র বিষয়টি পিতৃতন্ত্রের সাথে জড়িত। নারী স্বাধীনতার বিষয়টি
অর্থনীতির সাথে জড়িত। কোন পোশাকে কতটুকু পা উন্মুক্ত দেখা যায়, তার উপরে নারী মুক্তি
কিংবা নারী স্বাধীনতা কোনটিই নির্ভর করে না। যে সমাজে নারীর পোশাকের মাপ নিয়ে সমাজের
পুরুষের যত বেশি মাথা ব্যাথা। সেই সমাজে নারী মুক্তও নয় স্বাধীনও নয়। একজন নারী কখন
কি ধরণের পোশাক পড়বে। সেই বিষয়টি নারীর একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। তাঁর ব্যক্তি স্বাধীনতার
বিষয়। তাঁর পছন্দ অপচ্ছন্দ ইচ্ছা অনিচ্ছার বিষয়। কিন্তু সমাজ যখন সেই পোশাকের মাপ আর
ধরণ ঠিক করতে বসে যায়। তখন সেই সমাজ বিশ্বের যে প্রান্তেরই হোক না কেন। সেই সমাজকে
এককথায় তালিবানী সমাজ বলা যেতে পারে। তাই আফগানিস্তানের নারীর কোন দুর্দিন সামনে ভেবে
আকুল হওয়ার থেকেও অনেক বেশি জরুরী নিজ সমাজে নারীর পছন্দ অপছন্দ, ইচ্ছা অনিচ্ছার বিষয়গুলি
নারী’র ব্যক্তি স্বাধীনতায় স্থির হয়ে আসছে কিনা। তার খোঁজ করা।
আফগানিস্তানের রমনীরা
মিনিস্কার্ট পড়লেই স্বাধীন আর বোরখা পড়লেই পরাধীন। তাই যদি হয়। তবে আমাদের সমাজে প্রত্যেক
নারীকে কাল থেকে মিনিস্কার্ট পড়িয়ে দিলেই তো নারীমুক্তি নারী স্বাধীনতার মীমাংসা হয়ে
যেত। আমাদের দেশে নিশ্চয় তালিবানী শাসন চলছে না। তাহলে আমাদের দেশের নারীদের পথে প্রান্তরে
মাঠে ঘাঠে অফিস কাছারীতে সর্বত্র মিনিস্কার্ট পড়ে চলতে দেখা যায় না কেন? উল্টে প্রতিদিন
প্রতি ঘন্টায় যে দেশে নারী ধর্ষণের দায় চাপানো হয় নারীর পোশাকের মাপ ও কাটিং এর উপরে,
সেই দেশে নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতার বিষয়টি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বুঝতে খুব বেশি
গবেষণার প্রয়োজন পড়ে কি? আসলে আফগানিস্তানে মার্কিনশক্তির উপস্থিতির পক্ষে যুক্তি সাজাতে
সেই দেশের ক্ষেত্রে মিনিস্কার্টের সাথে নারী মুক্তির বিষয়টি, নারী স্বাধীনতার বিষয়টি
জুড়ে দেওয়া খুব সহজ কাজ। আর আমাদের দেশে নারী ধর্ষিত হলেই নারীর পোশাকের মাপ নিয়ে মাপামাপি
শুরু হয়ে যায়। এই যে দ্বিচারিতা এটাই ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য। এক দিকে সতীসাদ্ধী
রমনীর বন্দনা অন্যদিকে দেবদাসী প্রথার রমরমা। এমন সহাবস্থান সত্যিই হিপোক্রেসির সর্বত্তম
নিদর্শন। একদিকে বহুবিবাহ প্রথা, অন্যদিকে স্বামী ছাড়াও অন্য পুরুষের দিকে তাকালে কুলটা
অপবাদ। এইতো ছিল সেদিন অব্দিও ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য। আজ বহু বিবাহ প্রথা নাই। কিন্তু
স্বামীর একাধিক নারীসঙ্গ সমাজ মেনে নিলেও স্ত্রী’র একাধিক পুরুষসঙ্গে সমাজ আজও খেপে
ওঠে। সেখানে মিনিস্কার্টের ছবি নিয়ে আফগানিস্তানের নারীমুক্তি নারী স্বাধীনতার আলোচনা
চুড়ান্ত হিপোক্রেসি ছাড়া আর কি হতে পারে? এই সেদিনও কলকাতার এক শ্রেণীর সাহিত্যঠিকাদাররা
এক মহিলা কবিকে হুমকি পর্য্যন্ত দিয়ে রেখেছিল। নন্দন চত্বরে ঢুকলে দেখে নেবে বলে। তাঁর
অপরাধ, তিনি তাঁর পছন্দের পোশাক পড়ে ফেসবুক লাইভে এসে কবিতা পাঠ করেছিলেন। নিজের বাড়িতে
বসে একজন মহিলা কোন পোশাকে ফেসবুক লাইভ করবেন। সেটিও ঠিক করে দেবে সমাজের সঘোষিত মাতব্বরেরা।
এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক পেড়িয়েও। সেই দেশেরই সমাজ আফগানিস্তানের রমনীদের বিষয়ে মিনিস্কার্টের
সাথে নারীমুক্তি নারী স্বাধীনতাকে জড়িয়ে তালিবান বিরোধীতা করতে থাকে। এর থেকে জঘন্য
দ্বিচারিতা আর কি হতে পারে? পৃথিবীর যে প্রান্তই হোক না কেন। পিতৃতন্ত্র সমাজের যতটা
গভীরে শিকড় বিস্তার করে থাকবে। সমাজে নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতা ততটাই অধরা থেকে যাবে।
আজকে ইউরোপ আমেরিকা চীন জাপানের সমাজে পিতৃতন্ত্রের শিকড় প্রভুত পরিমাণে আলগা বলেই,
সেখানে নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতার বিষয়গুলি অনেকটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে। সেদেশের মেয়েদের
স্কার্টের মাপের উপরে সেদেশগুলির নারী মুক্তি নারী স্বাধীনতা নির্ভরশীল নয়। সেখানে
নারীরা যতটা স্বাধীন। ততটাই তারা নিজের পছন্দ অপছন্দ, ইচ্ছা অনিচ্ছা অনুযায়ী চলাফেরা
করতে পারে। জীবন যাপন করতে পারে। মিনিস্কার্ট মিডিস্কার্টের মাপের উপরে তাদের মুক্তি
ও স্বাধীনতা দাঁড়িয়ে নেই। দাঁড়িয়ে থাকে না।
১৯শে আগস্ট’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

