পরীমনিদের বাংলাদেশ

 

পরীমনিদের বাংলাদেশ


পরীমনি কাণ্ডে আমরা বর্তমান বাংলাদেশের একটা স্পষ্ট ছবি দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশে যে কর্পোরেট শক্তির উদয় হয়েছে। তারাই মূলত রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে। এবং রেখেওছে অনেকটা। সেটা একটা দিক। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অভিমুখে কর্পোরেট শক্তি নিজেদের স্বার্থ বুঝে নিতে চাইবে। সেটা অস্বাভাবিক নয়। এতবড়ো দেশ ভারতবর্ষ। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ঢক্কা নিনাদ বাজতে থাকে নিরন্তর। সেদেশেও বর্তমানে কর্পোরেট শক্তির কব্জায়। এখন আবিশ্ব সকল গণতান্ত্রিক দেশই কম বেশি কর্পোরেট পুঁজির কব্জায় থাকে। সেখানেই গণতন্ত্রের স্বার্থকতা। আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের উদ্ভব কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থেই। এই কারণেই আমরিকা বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সওয়াল করতে থাকে। যাতে গোটা বিশ্বকেই কর্পোরেট পুঁজির কব্জায় রাখা যায়। কিন্তু একটা দেশকে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে কর্পোরেট পুঁজির কব্জায় রাখা একটা বিষয়। আর একটা দেশকে গণতন্ত্র হোক আর স্বৈরতন্ত্রই হোক যে কোনভাবেই কর্পোরেট শক্তির কব্জায় নিয়ে আসা সম্পূর্ণ পৃথক একটি বিষয়। ষাট সত্তর আশির দশকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে ঠিক এই কাণ্ডই ঘটতো। মার্কিন সামরিক শক্তির মদতে এক একটি দেশকে কর্পোরেট শক্তির কব্জায় নিয়ে আসা হতো। নিকারাগুয়ার বিপ্লব কিউবার বিপ্লব সেই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধাচারণ করতেই গড়ে উঠেছিল। অথচ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্স ব্রিটেন জার্মান জাপান দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি গণতান্ত্রিক দেশগুলির ক্ষেত্রে কিন্তু তেমন ঘটনা ঘটতো না। উন্নত বিশ্বের এই ধনতান্ত্রিক দেশগুলি কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কর্পোরেট শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকেনি কোনদিন। একুশ শতকে এসে ভারতীয় উপমহাদেশে বিগত শতকের লাতিন আমেরিকা মডেল চালু হয়ে গিয়েছে। ফলে আজকের ভারত বাংলাদেশ সরাসরি কর্পোরেট শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। বা চলে যাওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। পরীমনি কাণ্ডের প্রেক্ষাপট কিন্তু এইখানেই। যেহেতু আজকের বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি কর্পোরেট শক্তির কব্জায় অবস্থান করছে, তাই সেদেশে গণতন্ত্রের উপরে কর্পোরেট শক্তির স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এখন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যদি সেই কর্পোরেট শক্তির স্বার্থে আঘাত করে। কিংবা কর্পোরেট শক্তির ইগোতে আঘাত করে ফেলে। জেনে বা না জেনে। বুঝে বা না বুঝে। তবে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে সেই ভুলের মাশুল কোন না কোন ভাবে দিতে হবে। রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার থাকলেও কর্পোরেট শক্তির বিরুদ্ধাচারণ করা কোন নির্বাচিত সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়।


পরীমনি কাণ্ডে যাঁরা আওয়ামী লীগ সরকারকে কাঠগড়ায় তুলছেন, তাঁদের এই বাস্তব প্রেক্ষাপটটা আগে ভেবে দেখতে হবে। বর্তমানে খালেদা জিয়ার সরকার কিংবা জামাতের সরকার থাকলেও ঘটনা একই দিকে গড়াতো। পরীমনি নিজের অজ্ঞাতেই এই নব্য বিকশিত কর্পোরেট শক্তির লেজে পা দিয়ে ফেলেছেন। সেটাই তার আসল অপরাধ। তিনি যেভাবেই হোক না কেন। বা যে’কারণেই হোক না কেন। এই কর্পোরেট শক্তির আঁতে ঘা দিয়ে ফেলেছিলেন। এতবড়ো একটা শক্তি। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকার যে শক্তির হাতের মুঠোয়। সেই শক্তির ইচ্ছেপুরণে বাধা দেওয়া মানেই রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল। হ্যাঁ, পরীমনির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছে বলে, ঘটনাক্রম জানান দিচ্ছে। পরীমনিকে আজ বিনা জামিনে লকআপে বন্দী থাকতে হতো না। পরীমনিকে তাঁর বাসা থেকে কর্তৃপক্ষ তুলেও নিয়ে যেত না। যদি না পরীমনি মধ্যরাতে হঠাৎ বোটক্লাবে গিয়ে হাজির হতেন। বোটক্লাব কিন্তু এই সেই কর্পোরেট শক্তির এক প্রতীক। সেই বোটক্লাবে পরীমনি যাবেন। অথচ সেই ক্লাবের অলিখিত নিয়মকানুন মানবেন না। সে কি করে হয়? আসল সমস্যার সূত্রপাত কিন্তু সেইখান থেকেই। বয়সের তারুণ্যে এবং কাঁচা টাকা ও খ্যাতির জোরে পরীমনিও নিজেকে সত্যিই একজন কেউকেটা মনে করতেন অবশ্যই। না, সেটা তাঁর দোষ নয়। জনপ্রিয়তায় অর্জিত খ্যাতি ও ঐশ্বর্য্যে যে কোন সাধারণ মানুষের ভিতরেই সেই মনস্তত্ত্ব কাজ করবে। অন্তত করার কথা। পরীমনিও কোন ব্যাতিক্রম নন। ফলে পরীমনি বোটক্লাবে আবাসন ব্যবসায়ী নাসিরের ইচ্ছাপূরণের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। উল্টে তাকেই ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে লকআপে পাঠিয়েছিলেন। আপন খ্যাতি জনপ্রিয়তা ও কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের দৌলতে। কিন্তু কথায় বলে না, বাপেরও বাপ রয়েছে। পরীমনির ভাগ্যে ঠিক সেটাই ঘটেছে। পরীমনি’র জানার কথাও নয়। একটা দেশ কর্পোরেট শক্তির কব্জায় এগিয়ে যেতে থাকলে, আইন সংবিধান ইত্যাদি এবং বিচারব্যবস্থা কোন তালে কাজ করতে থাকে। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এই কর্পোরেট শক্তি কিন্তু প্রথমেই মিডিয়াকে কব্জা করে নেয়। ভারতবর্ষে বিগত সাত বছরে যেকাজ প্রায় ৯৯% সাফল্যের সাথে সংঘটিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশও নিশ্চয় কর্পোরেট শক্তি মিডিয়াকে স্বাধীন ভাবে চড়ে বেড়াতে দেবে না। তাকেও কর্পোরেট শক্তির স্বার্থের খুঁটিগুলিতে বেঁধে রেখে নিয়মিত দানা খাওয়াতে থাকবে। আর কর্পোরেট বিজ্ঞাপনই মিডিয়ার প্রাণ ভোমরা। ফলে মিডিয়াকে কর্পোরেট শক্তির খুঁটিতে বেঁধে রাখা কোন কঠিম কাজ নয়। আর এই মিডিয়া দিয়েই জনগণের ব্রেনওয়াশ করা যায় নিরন্তর। ফলে পরীমনির ক্ষেত্রেও মূল ঘটনাক্রমগুলি পরপর সাজিয়ে দেখলে এই প্রেক্ষাপটটা পরিস্কার হয়ে ওঠারই কথা। তাই পরীমনির লাইফস্টাইল তার পোশাক পরিচ্ছদ ও তাঁর চরিত্র নিয়ে টানাটানি না হয়ে উপায় আছে কোন? না, তাই বলে পরীমনি নিষ্কলঙ্ক। তার কোন অপরাধ নাই। সেসব বলার মতো পরিস্থিতি এখন নয়। বিচারের ভার আদালতের। আদালতের নিরপেক্ষতা বিচারের ভার দেশবাসীর। কিন্তু সামান্য কয়টি মদের বোতল বাড়িতে রাখার অভিযোগে একটি মেয়েকে যে সমাজ, যে রাষ্ট্র এইভাবে দিনের পর দিন তদন্তের চক্করে বিনা জামিনে লকআপে আটকিয়ে রাখে। সেই সমাজ সেই রাষ্ট্র যে আসলেই কর্পোরেট শক্তির কব্জায় চলে গিয়েছে। কিংবা চলে যাচ্ছে। সেটা বুঝতে পারা কি খুবই শক্ত কোন বিষয়? পরীমনি কাণ্ডের আগেও মুনিয়া নামের একটি মেয়ের হত্যা ঘিরেও এই একই কর্পোরেট শক্তি তার পেশীর আস্ফালন প্রদর্শন করেছিল। না, পরীমনি শুধু নারী বলেই তাঁর এই দশা নয়। নারী বলে হয়তো বোটক্লাবের ঘটনার সূত্রপাত। কিন্তু একটা দেশ যখন কর্পোরেট শক্তির কব্জায় অবস্থান করতে থাকে। তখন সেই শক্তির লেজে যে’ই পা দেবে। তারই এই রকম দশা হবে। সম্ভবত যারা পরীমনিকে জামিন দিতে রাজি নয়। তারা স্পষ্টতঃই জানে। বাংলাদেশের আইনে পরীমনির সঠিক বিচার হলে হাজতবাসের কোন সম্ভাবনাই নাই। ঠিক সেই কারণেই তারা জামিন আটকিয়ে পরীমনিকে সহবৎ শিক্ষা দিচ্ছে। কি করে কর্পোরেট শক্তির ইচ্ছাধীনে নড়াচড়া করতে হয়।


আজকের বাংলাদেশ যে অবস্থায় পৌঁছিয়েছে। সেখানে গণতান্ত্রিক দায়বোধ কিংবা সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক রক্ষাকবচ সাধারণ নাগরিকদের জন্য খুব একটা কর্যকর অবস্থায় নাই। জনগণের ভাগ্যও তাই সেই কর্পোরেট শক্তির ইচ্ছাধীন। আওয়ামী লীগ কি বিএনপি কোন বড়ো বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটা মুখোশ মাত্র। আসল মুখটা সেই কর্পোরেট শক্তি’র। সেই শক্তিই গোটা দেশকে কব্জা করার পথে। হয়তো সম্পূর্ণ পরিমাণে কব্জা করে উঠতে পারেনি এখনো। তাই পরীমনির মুক্তির দাবিতে কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো পথে নামছেন। আর সেটাই কিন্তু একমাত্র আশা। নাক ছেঁচা যতই খান। পরীমনি হয়তো আদালত লকআপ বিচার ইত্যাদির চক্রব্যূহ থেকে একদিন মুক্ত হতে পারবেন। তবে সেইদিন তাঁর মানসিক স্থিতি কোন অবস্থায় থাকবে বলা যায় না। কে বলতে পারে তাঁর মানসিক স্থিতি নষ্টের কোন পরিকল্পনা নেওয়া হয় নি? পরীমনির মানসিক স্থিতি যেমনই থাক। এই পরিস্থিতির চক্রব্যূহ থেকে বেড়োতে পারলেও পরীমনিদের পক্ষে কোনভাবেই কর্পোরেট শক্তির চক্রব্যূহ থেকে মুক্তি নাই। সেই মুক্তি সুদূরপরাহত। তার কারণ একটাই বিশ্বজুড়েই গণবিপ্লবের নটে গাছটি বহুদিন আগেই মুড়িয়ে গিয়েছে। মুড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বায়নের দৈত্য। না। সেসব গূঢ় বিষয় সাধারণের বোঝার বিষয়ও নয় এখন। অন্তত এই একুশ শতকে তো নয়ই। বোঝার শক্তি অর্জন করতে হলে অপেক্ষা করতে হতে পারে আরও কয়েক শতক। ততদিন পরীমনিদের বাংলাদেশ থাকবে কর্পোরেট শক্তির কব্জাতেই।


২৬শে আগস্ট’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত