ভাবাবেগ: ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার

 

কারুর ভাবাবেগে যেন আঘাত না লাগে। না, এমন কোন কথা বলা যাবে না। এমন কোন কথা লেখা যাবে না। যাতে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মনে আঘাত লাগতে পারে। বোমারু বিমানের বোমায় কিংবা দূরসঞ্চারী মিসাইল হানায় এক একটি দেশকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। কোন অসুবিধে নাই। যদি হানাদারদের গুডবুকে থেকে তাদের পন্থার সমর্থক হয়ে ওঠা যায়। কিন্তু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মনে ও ভাবাবেগে যেন এতটুকু আঘাত না লাগে। লাগলেই সেটি নিন্দনীয় এবং আইন মোতাবেক শাস্তিযো‌গ্য অপরাধ বলেই বিবেচিত। অধিকাংশ সাধারণ মানুষের চিন্তা ও চেতনায়। আমার ভাবাবেগ আমার পারিবারিক সামাজিক জাতিগত সম্প্রদায়গত কিংবা ধর্মীয় ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্য নিয়ে কোন সমালোচনার কোন রকম অধিকার কারুর নেই। এমনটাই বিশ্বাস করেন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের পিছিয়ে থাকা সমাজের জনসম্প্রদায়। সেই ভাবাবেগের বশবর্তী হয়েই আবার আমরা অন্যের ভাবাবেগ নিয়ে উপহাস তামাশা ইত্যাদিও করে থাকি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিংবা সমাজের নীচুতলার জনগোষ্ঠী নয়তো অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল শ্রেণীর মানুষের। তখন সেটি আর ভাবাবেগে আঘাত বলে ধরা হয় না। কিন্তু সেই একই সমালোচনা আমার সম্বন্ধে কিংবা আমার পরিবার সমাজ গোষ্ঠী শ্রেণী সম্প্রদায় জাতি সম্বন্ধে করলে সেটি কিন্তু ভাবাবেগে আঘাত। যে আঘাত বরদাস্ত করতে রাজি নই আমরা। তখনই আমরা সমস্বরে রে রে করে তেড়ে উঠি। যাকে সমাজ জনমত বলে প্রচার করে থাকে। যে জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন কাজ করার চেষ্টাই সমাজবিরোধীতার নামান্তর। কারুর ভাবাবেগ আহত হলেই কথক বা লেখককে সমাজবিরোধী বলে দেগেও দেওয়া যায় সহজে। যদি তার কথা আমাদের পছন্দ না হয়। আবার অন্য ধর্মের ভাবাবেগ মানেই তা মৌলবাদ। আর নিজ ধর্মের ভাবাবেগ মানেই তা ঐতিহ্য।


অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়। ভাবাবেগের সাথে ধর্মীয় উন্মাদনা অন্ধ বিশ্বাস সংস্কারের নামে কুসংস্কার এবং ঐতিহ্যের নামে অশিক্ষার উত্তরাধিকার জড়িয়ে থাকে। যে সমাজে শিক্ষার প্রসার যত বেশি সংকোচিত সেই সমাজে ভাবাবেগের চর্চাও তত বেশি পরিমাণে হয়ে থাকে। এবং সেটিই স্বাভাববিক। উল্টো দিকে প্রকৃত শিক্ষাদীক্ষার প্রসার যত বৃদ্ধি পেতে থাকে। সমাজের অভ্যন্তরে ভাবাবেগের চর্চার পরিসরও তত সংকোচিত হতে থাকে। ঠিক এই কারণেই পাশ্চাত্য সমাজ যেদিন থেকে শিক্ষার বিস্তারের উপরে জোর দেওয়া শুরু করেছিল। ধর্মীয় উন্মাদনাকে বাইবেলের ভিতরেই সীমাবদ্ধ রেখে, দৈনন্দিন জীবনযাপনে যুক্তি বুদ্ধি এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চাকেই মুখ্য করে তুলেছিল। সেইদিন থেকেই পাশ্চাত্য সমাজ ভাবাবেগের দাসত্ব থেকে গোটা সমাজকেই মুক্ত করার যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পথে প্রথম পা রেখেছিল। দুঃখের বিষয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অধিকাংশ সমাজই এই পথে এগোনার কথা চিন্তাই করেনি। ফলে আজকে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির সাথে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির যে শক্তি ক্ষমতা ও সম্পদের পার্থক্য। সেই পার্থক্য গড়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না। ভাবাবেগের চর্চা করলে শিক্ষার প্রসার সম্ভব নয়। আবার শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে ফেললে আর ভাবাবেগের চর্চাও সম্ভব নয়। ভাবাবেগ ও শিক্ষার ভিতরে এই যে একটি বিপরীত সম্পর্ক। এর কারণ একটাই। কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস আর সীমাহীন অজ্ঞতা। এই তিন অভিশাপই হলো ভাবাবেগের ভিত। ভাবাবেগের প্রাণভোমরা। এখন স্বভাবতই শিক্ষার বিস্তার যত বেশি হতে থাকে। মানুষের অজ্ঞতা তত বেশি দূর হতে থাকে। অজ্ঞতা দূর হওয়ার সাথে সাথেই যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসও দূর হতে থাকবে। সেটাই স্বাভাবিক। ফলত সমাজের অভ্যন্তরে দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানাবিধ কুসংস্কারগুলি। যেগুলিকে একটি পিছিয়ে থাকা সমাজে সংস্কার বলেই কায়মনোবাক্য মান্যতা দেওয়া হয়। সেই সব কুংস্কারও শিক্ষার প্রসারে অজ্ঞতা দুর হওয়ার প্রক্রিয়ার সাথেই দূর হতে থাকে। ফলে একমাত্র শিক্ষার প্রসার ছাড়া ভাবাবেগের ভিত টলানো সম্ভব নয় কোনমতেই। এই কারণেই প্রথম বিশ্বের আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল অভিমুখ হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে প্রকৃত শিক্ষার বিস্তারে নানা ভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে রাখা। তৃতীয় বিশ্বের দেশের সমাজগুলিতে কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস আর সীমাহীন অজ্ঞতা যত বেশি দৃঢ় হয়ে অবস্থান করতে থাকবে। প্রথম বিশ্বের দেশগুলির পক্ষে তত বেশি পরিমাণে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে অর্থনৈতিক ভাবে শোষণ করা সম্ভব হবে। এবং সেই সাথেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির প্রকৃতিক সম্পদের ভাঁড়ার প্রথম বিশ্বের দেশগুলিই কব্জা করে রেখে দেবে। কারণ উন্নততর প্রযুক্তিই প্রাকৃতিক সম্পদের ভাঁড়ারের মালিকানা নির্ধারণ করে থাকে। আর যে সমাজ যত বেশি করে ভাবাবেগের দাসত্ব করতে থাকবে। সেই সমাজের পক্ষে তত বেশি করেই উন্নত দেশগুলির উপরেই নির্ভর করে বসে থাকতে হবে নানাবিধ প্রযুক্তির জন্যে। ভাবাবগের চর্চা ও দাসত্ব করতে থাকলে তো আর প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবন সম্ভব নয়। ঠিক এইখানেই ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ইউরোপে এই শিল্পবিপ্লবের হাত ধরেই রেনেশাঁর শুরু হয়েছিল। ইউরোপীয়ানরা ভাবাবেগের দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম না হলে সেখানে শিল্পবিপ্লব সম্ভবই হতো না। ইউরোপীয়ান রেনেশাঁও অধরা রয়ে যেত। ফলে প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক শক্তিগুলি ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের বিষয়ে সম্পূ্র্ণ ওয়াকিবহাল বলেই, তারা সবসময়ে লক্ষ্য রাখে। নজরদারী চালিয়ে যায়। যাতে কোনভাবেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সমাজ ভাবাবেগের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ না করে। যদি কোন দেশ সেই পথে পা বাড়ানোর চেষ্টাও শুরু করে। তবে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি নানা ভাবে সেই পথে প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের চেষ্টা শুরু করে দেয়। প্রাথমিক ভাবে সফল হলে ভালো। না হলেই পরবর্তীতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। আর তাতেও কোন কাজ না হলে বোমারু বিমানের হানা। আর মিসাইল নিক্ষেপন করে এক একটি দেশ গুঁড়িয়ে দেওয়া। যে কর্মকাণ্ডেরই গালভরা নাম গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।


প্রথম বিশ্বের দেশগুলির স্বার্থ যাই থাকুক না কেন। আমরা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ ভাবাবেগের চর্চা ও দাসত্ব করে করে নিজেদের পায়েই যে কুড়ুল মারছি। সেই কথাটিই কিন্তু আমরা বুঝতে রাজি নই। আমাদের ভাবাবেগগুলি আমাদের চিন্তা চেতনা মন ও মানসিকতাকে এমন ভাবেই আচ্ছন্ন করে রেখে দেয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভাবাবেগের দাসত্ব করে তো আর শিক্ষিত হয়ে ওঠা যায় না। না, বস্তাভরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ও সার্টিফিকেট থাকলেই কেউ প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে যায় না। আর প্রকৃত শিক্ষিত হয়ে উঠতে না পারলে ভাবাবেগের দাসত্ব থেকে মুক্তি সম্ভব নয় কোনভাবেই। ফলে ভাবাবেগের দাসত্বজনিত বিকারগুলি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। সময়ের সাথে কালে কালে অনেক বিকার অপসারিত হলেও দাসত্বের কবল থেকে গোটা সমাজকে মুক্ত করা আজও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। উল্টে নিত্যদিন নানাবিধ ভাবাবেগের নিয়ন্ত্রণহীন চর্চা জারি থাকছে। একদিকে এক কালের সংস্কার পরবর্তীকালে কুসংস্কার রূপে চিহ্নিত হলেও বাকি কুসংস্কারগুলির নিরন্তর চর্চা সমাজে ভাবাবেগের অবস্থানকে দৃঢ় করে ধরে রেখে দেয়। অন্য সকল দেশ জাতি ও সমাজের কথা বাদ দিয়ে যদি বাংলার সমাজ ও বাঙালি জাতির দিকেই নজর দেওয়া যায়। তাহলে এই বিষয়গুলিই চোখে পড়ে বেশি করে। এককালে বর্ণহিন্দু সমাজে সহমরণ প্রথাই ছিল সমাজের প্রচলিত সংস্কার। সেদিন সমাজের চোখে সেই বীভৎসতম কুসংস্কার সামাজিক ঐতিহ্য রূপেই সমাজের বুকে জাঁকিয়ে বসেছিল। সহমরণ প্রথাই ঘরে ঘরে বর্ণহিন্দুদের ধর্ম রক্ষা করতো। এবং সেই প্রথা পালন না করলে সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ও ছিল প্রবল। সেকালের সমাজের চোখে এই বীভৎস প্রথাটি যদি কুসংস্কার রূপেই চিহ্নিত হতো। তাহলে আর যাই হোক না কেন, একজন রাজা রামমোহনের আবির্ভাব ঘটতো না বাঙালির ইতিহাসে। কিন্তু সেকালের সমাজ সেই কুসংস্কারকেই সমাজিক ঐতিহ্য হিসাবে দেখতে অভ্যস্থ ছিল। ফলে রাজা রামমোহন রায়ের কথায় সমাজে গেল গেল রব উঠেছিল। গোটা বর্ণহিন্দু সমাজের ভাবাবেগেই সেদিন রাজা রামমোহন রায় আঘাত করে ছিলেন। তাঁর ভাগ্য ভালো তিনি পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। না হলে সমাজ তাঁকে হয়তো জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত। সমাজের ভাবাবেগে আঘাত করার দায়ে। মাথার উপরে ব্রিটিশের শাসনদণ্ড ছিল বলেই রামমোহনের জীবনে তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। উল্টে বাংলায় সতীদাহ প্রথা রদ করে সতীদাহ বিরোধী আইন চালু হয়েছিল। প্রাণরক্ষা হয়েছিল কোটি কোটি বাঙালি বধুর। ঠিক তেমনই সম্পূর্ণ একা গোটা সমাজের ভাবাবেগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলেনর পক্ষে সরব হয়েছিলেন। সেদিনও কিন্তু গোটা বাঙালি সমাজের ভাবাবেগের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়াতে হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে। তৈরী হয়েছিল বিধবা বিবাহ আইন। বাংলার সমাজ সেই সময়েও তার ভাবাবেগের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে সব রকমের প্রতিরোধ গড়ে তোলার সব রকমের চেষ্টা করেছিল। যে প্রয়াসে বর্তমান শোভাবাজার রাজবাড়ির তৎকালীন জমিদার রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নেতৃত্বে বর্ণহিন্দু সমাজ বিধবা বিবাহ রুখতে সমাজজুড়ে বিধবা বিবাহের বিপক্ষে আন্দোলন সংগঠিত করে তুলেছিল। যাতে ব্রিটিশ বিধবা বিবাহ আইন পাশ না করতে পারে। কিন্তু সেদিনও বাংলার পরাধীনতাই আসলে শাপে বর হয়েছিল বাঙালির। সাগর পারের ব্রিটিশের শাসনদণ্ড কোটি কোটি বাঙালি বিধবাদের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করেছিল। শুধুমাত্র একজন মানুষ গোটা সমাজের ভাবাবেগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলে। সেকালের সমাজের চোখে যা ছিল সামাজিক সংস্কার ও জাতির ঐতিহ্য। পরবর্তী সময়ের মানুষের চোখে সেই ঐতিহ্য ও সংস্কারই আজ কুসংস্কার বলে চিহ্নিত। কিন্তু সেটি সম্ভব হতো না। যদি না সেকালেই গোটা সমাজের ভাবাবেগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সমাজের কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে সরব হতেন এক আধজন মানুষ। আজ যাঁদেরকে আমরা মহাপুরুষের আসনে বসিয়ে রেখেছি। আমাদেরই পূর্বপুরষের সমাজ তাঁদের দিকেই কিন্তু ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল একদিন। ফলে এই যুগেও যাঁরা প্রচলিত ভাবাবেগুলির পক্ষে সওয়াল করতে থাকেন। প্রচার করতে থাকেন, মানুষের ভাবাবেগে কোনরকম আঘাত দেওয়া উচিৎ নয়, ইত্যাদি বলে। তাঁরা ঠিক সেই অন্যায়টিই চালিয়ে যেতে থাকেন। এককালে যে অন্যায়টি সংঘটিত করতো আমাদেরই পূর্বপুরুষদের তৎকালীন সমাজ। বাল্যবিধবা কন্যাকে সারাদিন নির্জলা উপবাসে রেখেও দুইবেলা পেট ভরে খেতে বাঙালি পিতামাতার ভাবাবেগে আঘাত লাগতো না এককালে। কিন্তু সেই বাল্যবিধবা কন্যার বিবাহ দেওয়ার আইন চালু হতেই বাঙালি পিতামাতার ভাবাবেগে আঘাত লেগেছিল একদিন। সহমরণের চিতা যত দাউ দাউ করে জ্বলতো। বাঙালির ভাবাবেগ তত স্ফীত হয়ে উঠতে একদিন। সেই বাঙালিরই ভাবাবেগে আঘাত দিয়ে আনতে হয়েছিল সহমরণ রদ করার আইন। এটাই বাঙালির ইতিহাস। এটাই মানুষের ভাবাবেগের ইতিহাস।


না, তাই বলে কারুর ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া যাবে না। প্রচার করতে থাকেন তাঁরাই। যাঁরা এই ইতিহাস খুব ভালো করেই জানেন। ভাবাবেগ মানুষকে এমন করেই অশিক্ষিত করে রাখে আসলেই। বইয়ে পড়া ইতিহাসের খুঁটিনাটি জানাই শিক্ষিত হয়ে ওঠা নিশ্চিত করে না। যতক্ষণ না ইতিহাস থেকে আমরা মনুষ্যত্বের শিক্ষা নিতে পারছি। কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীই মনুষ্যত্বের শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে পারে না। সহায়ক হতে পরে বড়ো‌জোর। আসলে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ও বিস্তার সুনিশ্চিত করতে না পারলে কাজের কাজ কিছুই সম্ভব নয়। এককালে কালাপানি পার হলেই বাংলার সমাজে গেল গেল রব উঠত। দেশে ফিরে গোবরজলে প্রায়শ্চিত্য করে তবে সমাজে স্থান হতো। এমনই ছিল সমাজের ভাবাবেগ। তারপরে সমাজ যখন দেখলো কালাপানি পার হওয়া লোকগুলিই ব্রিটিশ শাসনে অর্থ বিত্ত প্রতিপত্তিতে বাকিদের বহুদূরে পিছনে ফেলে দিচ্ছে। তখন বিলাতফেরত না হলে আর সমাজের চোখে বিশেষ স্থান পাওয়া যেত না। সমাজের ভাবাবেগের অভিমুখ ঠিক একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেল। এবং সেও নতুন করে এমনই এক ভাবাবেগের জন্ম দিল যে, বাংলার আর এক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে বলতে হলো বিলাত দেশটাও মাটির। ফলে সমাজের কোন ভাবাবেগের কোন সুদৃঢ় ভিত নাই। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ভাবাবেগের ভিত দাঁড়িয়ে রয়েছে কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস ও সীমাহীন অজ্ঞতার উপরেই। এখন এই তিন অভিশাপ নানান রূপে নানান ভাবে সমাজকে অবরুদ্ধ করে রাখতে সচেষ্ট থাকে। ধর্ম ও রাজনীতি তাদের নিজেদের স্বার্থেই এই তিন অভিশাপকে সজীব ও কার্যকরি করে রাখার জন্য অতন্দ্র প্রহরীর মতোনই সজাগ ও সক্রিয় থাকে। সময় বদলালেও তাদের স্বার্থ এক থেকে যায়। শুধু প্রকরণ বদলিয়ে যায়। বিদ্যাসাগর যে সময়ে নারীশিক্ষার প্রচলনে অবিচল থেকে প্রাণপাত পরিশ্রম করছিলেন। ঠিক সেই সময়ের সমাজ বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে এই একটাই অভিযোগ তুলেছিল। তিনি প্রচলিত ভাবাবেগে আঘাত হেনেছেন। সমাজের চোখে নারীর শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করা সেকালে সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার মতো মস্ত বড়ো অপরাধ বলেই বিবেচিত হয়েছিল। আমার প্রশ্ন আজকের শিক্ষিত আলো‌কপ্রাপ্ত নাগরিকদের কাছে। এবং বিশেষ করে শিক্ষার মৌলিক অধিকার প্রাপ্ত শিক্ষিত নারীদের কাছেও। যাঁরা আজকেও সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার বিপক্ষে মত ব্যক্ত করতে ব্যস্ত থাকেন। যাঁরা বলছেন, কারুর ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার নাকি কোন অধিকার নাই কারুর। যাঁরা বলছেন আপন ভাবাবেগের চর্চা করা প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারের বিষয়। যে অধিকার দেশের সংবিধান স্বীকৃত। ফলে আজকে যদি কেউ সমাজের ভাবাবেগে আঘাত হেনে থাকেন। তাঁর বিচার হওয়া দরকার বলে যাঁরা মনে করেন। সেই শিক্ষিত নাগরিক সম্প্রদায় কি তাহলে আজও মনে করেন একদিন নারীশিক্ষা প্রচলন করে সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া সেই বিদ্যাসগর মহাশয়েরও বিচার হওয়া উচিত ছিল সেদিন? কিংবা বিধবা বিবাহ প্রচলনের উদ্যোগ নিয়ে তৎকালীন সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া সেই বিদ্যাসগর। বিচারের দরকার ছিল তখন।


আশা করা যায়, তেমনটি আজ আর কোন বাঙালিই দাবি করবেন না। কি সুশিক্ষিত কি অশিক্ষিত। আজ আর কোন বাঙালিই তৎকালীন সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া বিদ্যাসাগর কিংবা রামমোহনকে নীতির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার অপরাধী হিসাবে। কারণ সময় বদলিয়ে গিয়েছে ধারে ও ভারে। রামমোহন বিদ্যাসাগরের কর্মের সুফল ভোগ করছে আজ গোটা বঙ্গ সমাজই। ঠিক তেমনই আমাদের সজাগ ও সচেতন থাকা দরকার। আজকেও যাঁরা নিঃস্বার্থ ভাবে সমাজকে যাবতীয় কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস ও সীমাহীন অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে অবিচল দৃঢ়তায়  জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে চলেছেন নিরলস ভাবে। সেই তাঁদেরকেই সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে অপরাধী বলে দেগে দিলে আগামীদিনের ইতিহাসও কিন্তু এই আজকের আমাদেরকেও কোনদিন ক্ষমা করবে না। ঠিক আজকে আমরাই যেমন নবকৃষ্ণ দেব এণ্ড কোম্পানিসহ রামমোহন বিদ্যাসাগরের সময়ের সমাজপতিদের ক্ষমা করার কথা ভাবতেই পারি না কোনভাবে। ফলে প্রকাশ্য দিবালোকে কলকাতার রাজপথে গরুর মাংস খেলে কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে আঘাত লাগবে বলেই, গরুর মাংস খাওয়া যাবে না বলে যারা বিধান দিচ্ছেন। তাঁরা কিন্তু আসলেই সেই একই কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস ও সীমাহীন অজ্ঞতায় গোটা সমাজটাকেই মুড়ে রাখতে চাইছেন। বুঝতে হবে সেই সত্যটুকু। ঠিক যেমন নিজ ধর্মের যুগোপযোগী সংস্কার করার বিষয়ে মত প্রকাশ করার কারণে আপন দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল তসলিমা নাসরিনকেই। সেদিনও কিন্তু সমাজের ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার জন্য তসলিমার মাথার দাম ধার্য্য করা হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যমান সরকার জনসমর্থন টিকিয়ে রাখার জন্য তসলিমার পক্ষে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল। রামমোহনের সময়ে বিদ্যাসাগের সময়ে ব্রিটিশ শাসকদের যে দায় ও ভয় ছিল না বলেই তারা সত্যের পক্ষে ন্যায়ের পক্ষে সেদিন দাঁড়িয়ে ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। কিন্তু আজকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতকে উপেক্ষা করে ন্যায়ের পক্ষে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আর কোন রাষ্ট্রশক্তির নাই। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতই শেষকথা। ঠিক সেই কারণেই ধর্ম ও রাজনীতির যুগলবন্দী সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই সমাজ জুড়ে কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস ও সীমাহীন অজ্ঞতার চাষ করতে থাকে। কাঁটাতারের উভয় পারেই। যে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সে সেখানেই সমাজের ভাবাবেগের পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। সমাজকে ভাবাবেগের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে যাঁরা কাজ করতে চায়, তাঁদের বিরুদ্ধেই সমাজকে খেপিয়ে দেওয়ার কাজ চলতে থাকে। ব্রিটিশ আমলেও বাংলার বর্ণহিন্দু সমাজ সেই কাজই করতে চেয়েছিল। তারা সফলও হতো। যদি শাসনক্ষমতায় দেশীয় শক্তি অধিষ্ঠিত থাকতো সেই সময়ে। কিন্তু সে ছিল ব্রিটিশ শাসনের একেবারে প্রথম দিক। পরে সেই একই ব্রিটিশ শাসকরাই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। একটা সমাজকে ভাবাবেগের দাসত্বে আবদ্ধ করে রাখতে পারলেই শাসন ও শোষণ, অত্যাচার ও লুন্ঠনের সুবিধে হয়। ফলে পরবর্তীতে তারা আর কোনরকম ভাবেই বাংলার সমাজসংস্কারের পক্ষে দাঁড়ায়নি। উল্টে সকল সম্প্রদায়ের ভিতরেই ভাবাবেগের চর্চাকেই প্রশ্রয় ও উৎসাহ দিয়ে গিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে। তারা চলে গেলেও তাদের উত্তরসূরীরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সমাজকে ভাবাবেগের দাসত্বে আটকিয়ে রাখতে দৃঢ়তার সাথে কাজ করে চলেছে। কাঁটাতারের দুই পারেই। এবং সমান ভাবে। সমান দক্ষতায়।


খেয়াল করার প্রয়োজন রয়েছে, যে কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস ও সীমাহীন অজ্ঞতার ভিতের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের ভাবাবেগ। সেই ভাবাবেগের পক্ষে ওকালতি করা আসলেই সমাজের ক্ষতি করার সামিল। একজন সমাজবিরোধীর মতোই সমান অপরাধ ভাবাবেগের পক্ষে সওয়াল করা। কেননা ভাবাবেগের সপক্ষে সমর্থন জানানো মানে আসলে লোকঠকানোর কার্যক্রম। মানুষকে কুসংস্কারে যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসে আর সীমাহীন অজ্ঞতায় বেঁধে রাখা মানুষের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত এক ষড়যন্ত্রের সামিল। অধিকাংশ মানুষই অবশ্য এত কিছু না ভেবেই ভাবাবেগের পক্ষে কথা বলে থাকেন। কিন্তু তাদের কাজ ও কথা সমাজের সর্বনাশই নিশ্চিত করে। না, তারা সকলেই যে সে বিষয়টি টের পান। তাও নয়। শিক্ষা ও দীক্ষার সাথে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী প্রদান কর্মসূচীর যে ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়েই এই ফাঁকির কাজ চলতে থাকে সমাজের পরতে পরতে। টের পান না অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষই। ডিগ্রী আর শিক্ষা ঠিক এক বিষয় নয়। নয় সমার্থক। এই কারণেই দেখা যায়। বিশ্ব জুড়েই যে সমাজে ভাবাবেগের চর্চা যত বেশি। সেই সমাজ তত বেশি পিছিয়ে থাকে। আর তাকে জীবনধারণের জন্য কেবলই উন্নততর সমাজের উদ্ভাবিত জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও প্রডাক্ট ধার করে কাজ চালাতে হয়। ফলে পিছিয়ে থাকা সমাজ যত বেশি ধারে কাজ চালাতে থাকে। এগিয়ে থাকা সমাজের সম্পদবৃদ্ধিও তত দ্রুত নিশ্চিত হতে থাকে। ঠিক এই কারণেই উন্নত বিশ্বের দেশগুলি তৃতীয় বিশ্বের সমাজগুলিতে ভাবাবেগের চর্চায় মদত দিতে থাকে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি যত বেশি করে কুসংস্কার যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস ও সীমাহীন অজ্ঞতায় ডুবে থাকবে। ততই প্রথম বিশ্বের বাণিজ্য জমে উঠবে। ফুলে ফেঁপে উঠবে। খুব সোজা ও সরল ফর্মুলা। সেই ফর্মুলাই বিশ্বরাজনীতির জীয়নকাঠি। যে বিষয়টি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। না, পাশ্চাত্য সমাজ এই ফাঁদে পা দেয়নি। আর দেয়নি বলেই শিল্পবিপ্লব সম্ভব হয়েছিল ইউরোপে। যেকারণে আজও বিশ্বের সকল কর্তৃত্ব সেই পাশ্চাত্যের হাতেই সুরক্ষিত। অর্থাৎ ভাবাবেগের দাসত্ব থেকে মুক্তিই উন্নতির প্রথম শর্ত। এই দাসত্বে আবদ্ধ থেকে যে সমাজ যত বেশি করে ভাবাবেগের চর্চা ও সেই চর্চা জারি রাখার বিষয়ে ওকালতি করতে থাকবে। সেই সমাজকে তত বেশি করে নির্ভর করতে হবে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির উপরেই। ফলে আজকে আমাদের সমাজে যাঁরা বলেন কারুর ভাবাবেগকে আহত করার অধিকার নাই কারুর। তাঁরা আসলেই নিজ জাতি গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়েরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে থাকেন। জ্ঞানে বা অজ্ঞানে। ঠিক যখন যাবতীয় ভাবাবেগ মুক্ত সমাজ গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়ার দরকার। তখনও আমরা ভাবাবেগের পক্ষে ওকালতি করে চলেছি। রামমোহন বিদ্যাসাগররা মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছেন। আজ যদি তাঁদের দেখতে হতো, তাঁদেরই উত্তরসূরীরা আজ ভাবাবেগের পক্ষেই সমাজকে পরিচালিত করে চলেছে। তবে তাঁদের ‘ধরণী দ্বিধা হও’ বলা ছাড়া বুঝি অন্য কোন পথ খোলা থাকতো না।


২৬শে সেপটেম্বর’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত