পরম শেষের অন্বেষণে

 

পরম শেষের অন্বেষণে

এক


এই যে জীবনটাকে পাওয়া। আর এই যে প্রতিদিনের পথ চলা। কোন একটা নির্দিষ্ট অভিমুখেই তো। কোন কিছু পাওয়ায় আশায়। কোন কিছু হয়ে ওঠার আশায়। কিংবা কোথাও একটা পৌঁছানোর আশায়। পৌঁছানোর তাগিদে। পৌঁছানোর সংবেদনে‌। সেইখানে কিংবা কোন একজনের কাছে আর পৌঁছানোই যদি না হয় এক জীবনে? জীবনটা তো আর সাহেবদের মতো টেস্ট ক্রিকেট খেলা নয়। যে দ্বিতীয় ইনিংস থাকবে। এই জীবনের খেলার মেয়াদ শুধুই ঐ এক ইনিংসের জন্যেই। তার ভিতরেই যা কিছু দেনা পাওনা। যা কিছু চাওয়া পাওয়া। যা কিছু হওয়া না হওয়া। এবং এই সব দেনা পাওনা চাওয়া পাওয়া আশা আকাঙ্খা এবং হওয়া না হওয়ার ভিতর দিয়েই আমরা হয়তো পৌঁছাতে চাই কোন এক পরম ঠিকানায়। কোন একজন পরম আত্মীয়ের আশ্রয়ে। কে সে? চিনি কি তাকে আদৌ? চিনি কি চিনি না। জানিও কি তা ঠিক মতো। কিংবা হয়তো এক একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিয়েও টের পাই না, পৌঁছানোর দরকার ছিল কোন এক সঠিক ঠিকানায়। কোন একজনের কাছে। এক জীবন পূর্ণতার জন্যে। এই যে টের না পাওয়া। এই ঘটনাই প্রতিদিন ঘটে চলে আমাদের জীবনে। অন্তত অধিকাংশ মানুষের জীবনেই। এই এক গল্প। বাকি মানুষদের গল্পটা বোধহয় একটু অন্যরকম। এই এক তাগিদ। পরম শেষের অন্বেষণ। পরম শেষের অন্বেষণে পথ চলা। না, ‘পরম শেষের অন্বেষণে’, শব্দবন্ধটি আমার নয়। স্বয়ং কবিগুরুর। ১২ই অক্টোবর ১৯২৬ সালের লেখা এই গান। যার প্রথম লাইন, ‘কোথায় ফিরিস পরম শেষের অন্বেষণে’। সত্যিই তো আমারা অধিকাংশ মানুষ যে জীবনটা যাপন করি। করতে হয় প্রতিদিনের। সেই জীবনে সত্যিই কি আমরা পরম শেষের অন্বেষণে পথ চলি? নিশ্চয় নয়। তেল আনতে যাদের পান্তা ফুরোয়, তাদের কথা থাক। কিন্তু তেল আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা না হলেও কি আমরা এই এক পরম শেষের অন্বেষণে পথ হাঁটি? আমাদের জীবনে?


আবার এও তো ঠিক। আমাদের সচেতন প্রজ্ঞার অতলে অতলান্ত অবচেতনে কে জানে, হয়তো আমাদের অন্তরাত্মা তার নিজের মতো করে এই পথেরই পথিক হয়ে ওঠেন। আমরা হয়তো টেরও পাই না। আর এই টের না পাওয়া থেকেই হয়তো আমাদের ভিতরে তৈরী হয়ে ওঠে একটা চাপা টেনশন। আমাদের চাওয়া পাওয়া। আমদের দেনা পাওনার হিসেব নিকেশ। আমাদের আশা আকাঙ্খা। আমদের লক্ষ্য ও অভিমুখ এক দিকে এগোতে চায়। যখন হয়তো আমাদের অন্তরাত্মার অন্বেষণ সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ অভিমুখে পা বাড়িয়ে বসে। ফলে নিজের মুখোমুখি হতে পারলেও আমরা কিন্তু স্থির নিশ্চিত করে বলতো পারি না। পরম শেষের অন্বেষণেই আমাদের পথ চলা কিনা। আমাদের প্রতিদিনের চাওয়া পাওয়ার সাথে এই পথের সম্পর্কই বা কতটুকু? কিংবা আদৌ কি রয়েছে সম্পর্ক কোন?


আমাদের প্রিয় কবি কিন্তু একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ইশারা করেছেন। গানটির দ্বিতীয় লাইনেই। যাঁরা সেই পরম শেষের অন্বেষণে পা বাড়িয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশে কবি বলছেন, ‘অশেষ হয়ে সেই তো আছে এই ভুবনে’। রবীন্দ্রনাথের সাথে যাঁদের সত্যিই পরিচয় ঘটেছে এই জীবনে। তাঁরা জানেন, কবি এই কথাই নানান সময় নানান ছল‌ে বলে গিয়েছেন। যিনি রয়েছেন স্থিত হয়ে সেই পরম শেষের দিগন্তজুড়ে। তিনি নিজেই তো এই ভুবনজোড়া জীবন মাঝে অশেষ হয়ে রয়ে গিয়েছেন। কবির এই দর্শন তাঁর সমগ্র জীবন এবং সাধনায় এক জীবন্ত সত্য। কবি তো এই গানটি লেখার আগেই ১৯১০ সালে বঙ্গাব্দ অনুযায়ী ১৩১৭ সালের ২৮শে আষাঢ় লিখে ফেলেছিলেন, ‘তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর তুমি তাই এসেছো নীচে- আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর। তোমার প্রেম হতো যে মিছে”। সত্যিই তো তাই। যে পরমের অন্বেষণে যাত্রা যাঁদের, সেই পরম নিজেই যে অশেষ হয়ে ভুবনজুড়ে রয়ে গিয়েছেন। না রইলে, তাঁর প্রেমই যে মিথ্যে হয়ে যায়। না, তাতো হতে পারে না। কিন্তু সে তো গেল, যাঁরা সেই পরম শেষের অন্বেষণে পথ চলে, তাঁদের কথা। কিন্তু যাঁদের চব্বিশ ঘন্টা কেটে যায় চাল ডাল নুন চিনির অন্বেষণে? কি হবে তাঁদের? যাঁরা পরম শেষের অন্বেষণে নয়। পরম অন্নের অন্বেষণে কালাতিপাতেই জীবন ফুরিয়ে ফেলে? আবারও সেই একই কথা বলতে হয় তাহলে। রবীন্দ্রনাথের সাথে সত্যিই যাঁদের পরিচয় রয়েছে। তাঁরাই জানেন। রবীন্দ্রনাথ জানতেন সেই পরম সকলের জন্যেই পরম। ঠিক যেমন সকালের সূর্য। যে অন্ধ, তারও জন্যে যেমন। যে দেখতে পায়। তারও জন্য ঠিক তেমনই। এতটুকু কম বেশি নয়। ঠিক সেই রকমই কবি জানতেন। কার জ্ঞানচক্ষু খোলা, আর কার জ্ঞানচক্ষু বন্ধ। সেই দেখে পরমাত্মা সকলের দরজায় এসে দাঁড়ান না। সকলের জন্যেই তিনি অশেষ হয়ে রয়ে গিয়েছেন। প্রত্যেকের ‘পরেই তাঁর আনন্দ। প্রত্যেকের জন্যেই তাঁর এসে পৌঁছানো প্রত্যেকের অন্তরে। যিনি টের পান। তিনি সৌভাগ্যবান। যিনি টের পান না। তিনিও দুর্ভাগা নন কোনভাবেই। টের পাওয়ার ভিতর দিয়ে যে পরমানন্দ। তিনি শুধু সেই পরম আনন্দ থেকে সারা জীবন বঞ্চিত থেকে যান। কিন্তু ত্রিভুবনেশ্বরের প্রেম থেকে কেউই বঞ্চিত নয় কোনভাবেই।

 

কোথায় ফিরিস পরম শেষের অন্বেষণে।

অশেষ হয়ে সেই তো আছে এই ভুবনে।

তারি বাণী দু হাত বাড়ায় শিশুর  বেশে,

আধো ভাষায় ডাকে তোমার বুকে এসে,

তারি ছোঁওয়া লেগেছে ওই কুসুমবনে।

 

দুই


তাই যিনি চলেছেন পরম শেষের অন্বেষণে, তাঁকেও আসলে এই ভুবনের পরতে পরতেই সেই পরমকে অনুভব করে নিতে হবে। তার বাইরে তাঁকে পাওয়ার আশা দুরাশা। তাই তো কবি বলছেন, ‘কোথায় ফিরিস ঘরের লোকের অন্বেণে- পর হয়ে সে দেয় যে দেখা ক্ষণে ক্ষণে’। এই যে ঘরের লোক। যাঁকে অনেকেই জীবনদেবতা বলে অনুভব করতে পারেন। সেই জীবনদেবতাকে পেতে হলে জীবন থেকে সন্ন্যাস নিলে তো হবে না। এই জীবনের সাথে প্রতি মুহুর্তের যে মোলাকাত। একদিকে জীবন সংগ্রাম। আর এক দিকে মহাজীবনের সাথে অন্বয়। সেইখানেই আমাদের দেখা হওয়ার কথা সেই পরমের সাথে। যিনি একাধারে জীবনদেবতা একাধারে ত্রিভুবনেশ্বর। একদিকে ব্যক্তি আমির দিকে তাঁর অভিমুখ। অন্যদিকে বিশ্ব আমি’র দিকে তাঁর পথ। এক দিকে তিনি আমার ভিতরে মুক্ত হতে এগিয়ে আসছেন। আর একদিকে তিনি বিশ্ব আমি’র দিকে আমায় টানছেন। বিশ্ব আমিতে আমায় পূর্ণ করে তুলতে। এই যে বিশ্ব আমিতে আমার পূর্ণ হয়ে ওঠা। এই ওঠার ভিতর দিয়েই তাঁকে পাওয়া পরিপূর্ণ করে। যিনি রয়ে গিয়েছেন, আমারই একান্ততায়। এই যে আমারই একান্ততায় তাঁর অস্তিত্বের সারাৎসার। সেই কথাই তো ত্রিভুবনেশ্বরের সকল বাণীতে কলতান তোলে সারাদিন। আমার ভিতরেই তিনি আমায় ডাক দিয়ে চলেছেন। কিন্তু আমার সচেতন প্রজ্ঞায় তা রয়ে যায়, অস্ফূট। আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাপনে। আমাদের আশা আকাঙ্খায়।  রোজকার দেনা পাওনার হিসেব নিকেশে। আমরা এতই থাকি ব্যস্ত। তাঁর সেই ডাক যেন আমাদের নিজস্ব প্রাণের বীণায় ঠিক মতো এসে পৌঁছাতে পারে না। পারলেও আমাদের কাছে সেই ডাকের অর্থ আধো আধো ভাষায় অস্ফূটই রয়ে যায় সারাদিন।


কিন্তু একবার। মানুষের জীবনে অন্তত একটিবার। যদি সেই পরম বাণীর সুর প্রাণের ভিতর তুফান তুলে দিতে সক্ষম হয়ে যায়! তখন সত্যি করেই আমরাও টের পেয়ে যাই। আমাদের এই ব্যক্তি জীবন নয় কেবলই ব্যক্তিগত। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আশা আর আকাঙ্খার। কেবলমাত্র ব্যক্তিগত দেনা আর পাওনার। একমাত্র ব্যক্তিগত চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যেই আমার আমি’র এই অস্তিত্বের সত্যতা নয়। আমারই অন্তরাত্মা সংযুক্ত রয়ে গিয়েছে বিশ্বাত্মার সাথে। এবং প্রতিদিনের জীবনের পরতে পরতে। আর সেই সত্যকে খুঁজে পেতেই আমাদের সংযুক্ত থাকতে হবে সমগ্রের সাথে। সকলের সাথে। বিশ্বমানব আর বিশ্বসত্তার সাথে। পরমাত্মাই যেখানে সকল ঘরের বাহির – দ্বারে বাসা বেঁধে রয়েছেন। তিনিই যেখানে সকল পথের ধারে ধারে আলো ছড়িয়ে চলেছেন। সকলের অন্তরেই যেখানে তিনি গোপনে রয়েছেন সংগোপনে। সেই সকলের সাথেই যদি আমার ব্যক্তিজীবনের কোন সদর্থক সংযোগ গড়ে না ওঠে, তবে কি করে সম্ভব হবে আমার এই এক জীবনের পূর্ণ হয়ে ওঠা? না। তা কখনোই সম্ভব নয়। আর নয় বলেই আমাদের কবি কত বার কত রকম করেই না বলেছেন। ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া। বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া’। সেই সাড়া একবার যে পেয়েছে। সেই জানে একমাত্র। ক্ষুদ্র আমি থেকে মুক্তি পাওয়ার শান্তি! সেই জানে একমাত্র বৃহৎ আমিতে গিয়ে পৌঁছানোর মহানন্দ! এখন এই বৃহৎ আমিতে গিয়ে পৌঁছানোর যে মহা আনন্দ। সেই আনন্দকেই যদি আমরা ধরে নিতে চাই পরম শেষের অন্বেষণ? খুব কি ভুল করে ফেলবো আমরা? না বোধহয়। কারণ কবি গানটির দ্বিতীয় লাইনেই তো বলে দিয়েছেন, সেই পরম শেষ তো অশেষ হয়েই রয়ে গিয়েছেন এই ভুবনে। তাই না? অর্থাৎ আমরা যদি সমগ্র রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাধনা এবং বিশ্বাস ও ভরসার সাথেও গানটিকে মিলিয়ে দেখতে যাই। দেখতে পাবো। সেই ক্ষুদ্র আমি’র থেকে বৃহৎ আমি’র দিকে এক অভিযান। যদি অভিযানই বলি। খুব কি ভুল হবে? সেই অভিযানই তো বৃহৎ আমিতে পৌঁছানোর সেই পরম আনন্দের পরম শেষের অন্বেষণ।


এই যে আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাপন। একান্ত ব্যক্তিস্বার্থের চারিধারে কলুর বলদের মতোন ঘুরপাক খাওয়া। এর বাইরেও নয়। এই জীবনের ভিতরেই এই জীবনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মন্ত্র দিয়ে যান আমাদের প্রিয় কবি। স্বার্থের সেই কেন্দ্রকে যদি আমরা নিজের মাপে আটকিয়ে না রেখে সকলের মাপে বাড়িয়ে নিতে পারি একবার। তাহলেই দেখতে পাবো। আমাদের এই ব্যক্তিজীবন কেবলমাত্রই আমাদের নিজেদের ভিতরে আবদ্ধ নয় আর। সেই ব্যক্তি জীবনই সকলের সাথে সংযোগের বেদীতে সার্থক হয়ে পূর্ণ হয়ে উঠছে নিত্যদিন। নিত্যদিনের অর্ঘ্য গিয়ে পৌঁছাচ্ছে মহাকালের বেদীতে। ক্ষুদ্র আমি’র মোহ মায়া বদ্ধতা কাটিয়ে বৃহৎ আমির দিগন্তে পৌঁছিয়ে পূর্ণ হয়ে উঠতে পারছি এই আমিই। অতি সাধারণ যে আমি। ঠিক যখন সাধারণের ভিতরে গিয়ে সকলের একজন হয়ে উঠতে পারছি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে। তখনই যেন আমার নবজন্ম লাভ। তখনই আর আমি নই একা। সকলের ভিতরে সকলের একজন হয়ে উঠতে পারাই মানুষের জীবনের সেই রাজপথ। যে রাজপথে মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। মানুষের ইতিহাসের থেকে পাঠ নিলেই। আমরা এর সত্যতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে পারি। আর এইখানেই আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথ এক অভিনব সাম্যবাদে পৌঁছিয়ে দিয়ে যান। আমরা একে আধ্যাত্মিক সাম্যবাদ বলতে পারি। একবার এই সাম্যবাদে পৌঁছিয়ে গেলে আর কাউকেই ভিন্ন চোখে দেখা সম্ভব হয় না। সম্ভব হয় না ভিন্নতার দূরত্বে অনুভব করা কাউকে। অভিন্ন মানবিক সত্যে সকল মানবকে প্রত্যক্ষ করার এই এক মন্ত্র। বিছিন্নতার বিভেদ নয়। একাত্মতার অভিন্নতায় সকলের মাঝে সকলের একজন হয়ে ওঠার সেই পরম আনন্দ তখন আমাদের কাছে ধরা দেয়। পরম শেষের অন্বেষণ সার্থক হয়ে ওঠার সেই দিগন্তেই ডাক দিয়ে যান আমাদের কবি। একান্ত রবীন্দ্রনাথ।

 

কোথায ফিরিস ঘরের লোকের অন্বেষণে

পর হয়ে সে দেয় যে দেখা ক্ষণে ক্ষণে।

তার বাসা যে সকল ঘরের বাহির – দ্বারে

তার আলো যে সকল পথের ধারে ধারে,

তাহারি রূপ গোপম রূপে জনে জনে।

 

৫ই জুলাই’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত