গত
দুই দশকের কবিতার মূল সমস্যা হচ্ছে কে কবি আর কে কবি নয়, সেই বিষয়টিই
সম্পূর্ণ ঘেঁটে ঘ হয়ে গিয়েছে। ফলে কবিতার স্তূপের তলায় চাপা পড়ে যাচ্ছে সাহিত্যই।
এটা শুধু বাংলা সাহিত্যেরই দুঃসময় নয়। বিশ্বের প্রতিটি ভাষার সাহিত্যেই এই সমস্যা
দেখা দিয়েছে। মূল কারণ ইনটারনেট। এবং সোশ্যাল মিডিয়া। বাংলা
সাহিত্যের সমস্যাটা আরও বিরাট আকার ধারণ করেছে কারণ, একদিকে
ইনটারনেটে সকলেই কবি। আর একদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক
সাহিত্যবাজার। ফলে প্রতিষ্ঠান তার প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে যাকে কবি
বলে তুলে ধরছে। তিনিই বড়ো কবি। সাহিত্যবাজারে তিনিই ব্র্যাণ্ড ভ্যালু হয়ে
দাঁড়াচ্ছেন। বাকিরা সেই ব্র্যাণ্ড ভ্যালুর স্তাবকতাকেই সাহিত্যচর্চা বলে মেনে
নিচ্ছে।
এই
যে এক ভয়াবহ সংক্রমণে আক্রান্ত আজকের বাংলা কবিতার ভুবন, গত দুই দশকের কবিতা তার থেকে
মুক্ত নয়। কারণ এই সময়ে মুক্ত কোন পরিসরের অস্তিত্বই আর স্বীকৃত নয়। কাঁটাতারের দুইপার
জুড়ে এই সংক্রমণ পরিব্যাপ্ত হয়ে উঠেছে। এবং এর সাথে আরও একটি বিষয় জড়িয়ে গিয়েছে। বিশ্ব
জুড়ে পুঁজিবাদের অপ্রতিরোধ্য বিশ্বায়নে কবি সাহিত্যিকরাও এমন এক ভয়াবহ জালে আটকা পড়ে
গিয়েছেন যে, আজ আর তারা কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে রাজি নন। আজকের কবি আজকের সাহিত্যিক,
সাহিত্যবাজারের সাথে ক্রমাগত আপোস করে করে নিজের কলমের ধার ভোঁতা করে ফেলেছেন। আর এই
ভোঁতা কলমের কবিতাই গত দুই দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম বড়ো পরিচয়। ক্রমাগত ভাবে চলমান
সময়ের শর্তগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারলে চেতনায় চরা পড়ে যায়। ফলে সেই অসাড় চেতনায়
অন্ধকার যত ঘন হয়েই ঘনিয়ে উঠুক না কেন, নিজেকে আলোকিত দিগন্তের প্রতিনিধি বলেই ভুল
হতে থাকে। বিগত দুই দশকের বাংলা কবিতা সেই ভুলেরই স্বাক্ষর বহন করছে। এই সময়ের কবিতা
ফলত মেকআপ সর্বস্ব রূপসীর মতোই ঝকঝকে হলেও প্রাণহীন। সে মুখস্থ কথা বলে। সে প্রচলিত
ভাবনা ভাবে। সে বাঁধিয়ে দেওয়া রাজপথ ধরে চলে। সে সকলের মাঝে নিজেকে সকলের মতোই সাজিয়ে
রাখার জন্য দিনরাত এক করে ফেলে। তার প্রধানতম ভয়, সে যেন গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন
না হয়ে যায়। পাছে তাকে সকলে ভিন্ন বলে মনে করে, তাই সে নিজস্বতা বিসর্জন দিয়ে বাজারি
হয়ে ওঠার সাধনায় মগ্ন থাকে। ফলে গত দুই দশকের কবিতার যে বাজারদর নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে,
দুই দশকের কবিবৃন্দও সেই বাজারদরেই নিজেদের কবিতার কলমকে বেঁধে ফেলেছেন। যাঁরা পেরেছেন,
তাঁরাই সফল। যাঁরা পারেননি, তাঁরা বিফল। এটাই গত দুই দশকের সাহিত্যের মাপকাঠি। সেই
মাপকাঠিতেই মূল্যায়ন হচ্ছে গত দুই দশকের বাংলা কবিতার। বাংলা কবিতার এত বড়ো দুঃসময়
এর আগে এমন ভয়াবহ এবং সর্বাত্মক ভাবে দেখা দিয়েছে বলে মনে হয় না।
আজকের
বাঙালি কবি এবং পাঠক। কেউই আর বিচলিত নয়। সকলেই বাজারের ণত্ব এবং ষত্ব মেনে নিয়ে নিজেকে
সেইভাবে গড়ে পিটে সময়ের ছাঁচে ঢালাই করে নিচ্ছে। এবং এই প্রক্রিয়াকেই তারা যুগধর্ম
বলে স্বীকার করে নিয়েছে। সেইসাথে এই যুগধর্মকেই আন্তর্জাতিকতার ধুয়ো বলে ধরে নিয়ে এগিয়ে
চলেছে। এখন দেখে নেওয়া যাক, বিগত দুই দশকে দুই বাংলার সময়ের চালচিত্রের গতি ও প্রকৃতি।
উভয় পারেই ক্ষমতা কেন্দ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য-ঘরনা বাংলা সাহিত্যের উপরে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।
সাহিত্যের রথী এবং মহারথী যাঁরা তাঁরা এই সাহিত্য ঘরানারই ফসল। ফলে তাঁদের লক্ষ্য এবং
মোক্ষ ভয়াবহ রকম ভাবেই এক এবং অভিন্ন। ঢাকা কিংবা কলকাতা। লক্ষ্মণচিহ্নের কোন ভিন্নতা
চোখে পড়ে না বিশেষ। ফলে ক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক শিবিরগুলির তল্পি বহনেই এই সময়ের সাহিত্যের
রথী এবং মহারথীদের বুৎপত্তি লক্ষ্য করার মতো। পুঁজিবাদের বিশ্বায়নকে সাদরে বরণ। রাজনৈতিক
ক্ষমতার তল্পি বহন। সাহিত্য বাজারের ব্র্যাণ্ড ভ্যালু হয়ে ওঠা। এই যে এক ত্রিবেণী সঙ্গম।
এটাই বিগত দুই দশকের বাংলা কবিতার ভুবন। এই সময়ের বৃত্তে ঠিক এই কারণেই নির্দিষ্ট করে
কোন একজন কবি বা সাহিত্যিকের ভিন্ন কোন কবিতার ভুবন গড়ে ওঠার অবকাশ পায়নি। সাহিত্যের
বাজারদর যাঁদের বরমাল্য পড়িয়ে দিয়েছে। তারাই সাহিত্যের রথী এবং মহারথী। বাংলা সাহিত্যের
পাঠকও সেইমতই কবি ও কবিতার এই একমাত্রিক বিশেষ অবয়বে অভ্যস্থ হয়ে উঠছে, উঠেছে। ফলে
এই ঘরানার বাইরে যা কিছু। তাই তাদের কাছে বর্জনীয়। তাদের কাছে স্বীকৃত নয়।
মূল ধারার বাংলা কবিতার এই ঘরানার সাথে যোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক ও কমেন্ট সর্বস্ব ‘আমরা সবাই কবি আমাদের এই নেটের রাজত্বে’ মার্কা কবিতার এক সুনামির। মূল ধারার সাথে যার আপাত কোন বিরোধাভাসও নেই। উপরি লাভ। ফেল কড়ি ছাপাও সংকলন। অনলাইন প্রকাশক থেকে অফলাইন প্রকাশক। যার পকেটে অর্থ রয়েছে। তারই কাব্য সংকলন ছেপে দেওয়ার রকমারি লোভনীয় প্যাকেজ সাজিয়ে বসে রয়েছে। পুঁজির বিনিয়োগ নেই। লোকসানের ঝুঁকি নেই। কিন্তু লাভ রয়েছে ষোলআনা। ফলে সম্পাদকের আঁচড় এড়িয়ে ‘আপন হাত জগন্নাথ’ বলে নিজের পয়সায় নিজেই কবি। এবং সেই সাথে ম্যারাপ বেঁধে গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান। এও বিগত দুই দশকের সংস্কৃতি। বস্তা বস্তা কাব্য সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে দুইবেলা। পাঠকের থেকে কবি’র সংখ্যা বেশি। কবিতা পড়ার থেকে কাব্যপাঠের আসরেই ভিড় করছে মানুষ। গোদের উপরে বিষফোঁড়ের মতোন, লকডাউনের হাত ধরে ঘরে বসেই রকমারি সাহিত্যসন্ধ্যায় পরস্পরের পিঠচাপরানির ধুম পড়ে গিয়েছে। কবিতাপাঠের লাইভস্ট্রীম। আজ এ’র ওয়ালে। কাল ওর’ ওয়ালে।
কিন্তু
কি লিখছে সকলে? দুই দশকের কবিতার ভুবনে এই সময়ের যন্ত্রণা থেকে মন্ত্রণার কোন আভাস
প্রতিফলিত হচ্ছে এই সকল কবিতায়? ব্যক্তি মানুষের জীবনসঙ্কটগুলিকে কি ঠিকমত চিহ্নিত
করতে পেরেছে গত দুই দশকের কবিতা? কিংবা সেই বিষয়ে আদৌ কোন আগ্রহ অনুভব করতে পারছে কি
এই সময়ের কবিকুল? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়তো এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কালের সাথে
ন্যূনতম যে দূরত্ব সৃষ্টি হলে এক বিশেষ সময়-পর্বের সাহিত্যের তুলনামূলক বিচার ও বিশ্লেষণ
নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ ভাবে করা সম্ভব, সেই দূরত্ব এখনো সৃষ্টি হয়নি। ফলে এই সময়ে, এই
সময়ের কবিতা নিয়ে যত আলোচনা সমালোচনা করি না কেন। তার ভিতরে নিরপেক্ষতার অভাব থেকে
যেতেই পারে। অন্তত সেটার সম্ভাবনাই সমধিক। পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যাই হোক না কেন। সেই
বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েও কি আমরা নিশ্চিত ভাবে এই সময়ের কবিতার বিষয়ে খুব একটা
আশান্বিত হতে পারছি? মনে হয় না। পারলে তারও কিছু না কিছু লক্ষ্মণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো।
কাঁটাতারের দুই পারেই।
জীবনানন্দ
কথিত যে অদ্ভুত আঁধারের বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিলাম আমরা আজ থেকে প্রায় অর্ধ
শতাব্দীরও বেশি সময়ের আগে। সেই অদ্ভুত আঁধার আজ যে কতটা ভয়াবহ এবং সংক্রমক হয়ে উঠেছে,
তার পরিচয় যে বিগত দুই দশকের কবিতায় ধরা পড়েনি। আশা করি এই বিষয়ে বিতর্কের বিশেষ অবকাশ
নেই আর। গত শতকে জীবনানন্দ যখন সেই অদ্ভুত আঁধারের সাথে বাংলা কবিতার পাঠকের পরিচয়
করিয়ে দিচ্ছিলেন। তখন সেই অন্ধকারকে চেনার ও চেনানোর। জানার ও জানানোর একটা সংস্কৃতি
সচল এবং প্রাণবন্ত ছিল। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ভুবনে। বাংলার সমাজ ও রাজনীতির
ভুবনেও। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরবর্তী বিশ্বে। পুঁজিবাদের বিশ্বায়নের কালে বাংলা সাহিত্য
ও সংস্কৃতির ভুবন এবং বাংলার সমাজ ও রাজনীতির ভুবনে একটা ওলোট পালোট সংঘটিত হয়ে গিয়েছে।
যার ফলে আজকের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি, বাংলার সমাজ ও রাজনীতি। সবই নিয়ন্ত্রীত হচ্ছে
এই গ্লোবালাইজেশনের ণত্ব ও ষত্ব অনুযায়ী। বিগত দুই দশকের বাংলা কবিতা আসলেই সেই ইতিহাসেরই
এক জলন্ত দলিল। আজ সেই অদ্ভুত আঁধার আরও ভয়াবহ হয়ে উঠলেও। আজকের কবিতা সেই অন্ধকারকে
কোন প্রশ্ন করতে পারছে না। প্রশ্ন করার ক্ষমতাই সে হারিয়ে ফেলেছে। সে সেইটুকুই দেখছে,
গ্লোবালাইজেশনের ণত্ব এবং ষত্ব তাকে যেটুকু দেখাচ্ছে এবং দেখতে দিচ্ছে। আজকের কবিতা
সেইটুকুই ভাবছে পুঁজিবাদ তাকে যেভাবে ভাবাচ্ছে এবং যতটুকু ভাবতে দিচ্ছে। বিগত দুই দশকের
বাংলা কবিতা তাই তার স্বকীয়তা হারিয়ে একটা জড়পিণ্ডের মতো অদৃশ্য কিন্তু অমোঘ নির্দেশে
নিয়ন্ত্রীত আচরণ করে চলেছে। এই যে এক দাসত্বের শৃঙ্খল। এটাই একবিংশ শতকের প্রথম দুই
দশকের বাংলা কবিতার চরিত্রলক্ষ্মণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেখানেও নয়। পরিতাপের বিষয়,
এই দাসত্বের যন্ত্রণা অনুভবের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে আজকের কবি ও কবিতার পাঠক। ফলে বাজারের
মাপকাঠিকেই শেষ সত্য ধরে নিয়ে প্রায় কলুর বলদের মতো ঘুরপাক খেয়ে চলেছে বিগত দুই দশকের
কবি ও কবিতা। এবং পাঠক।
২৫শে
ডিসেম্বর’ ২০২১
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত