দিবানিদ্রার দিনগুলি

 

দিবানিদ্রার দিনগুলি

কার স্বার্থে এই লকডাউন? আমরা এদিকে নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করে বসে রয়েছি, আমাদের স্বার্থেই তো লকডাউন। আমরা যাতে আরও কয়টি দিন বেশি বেঁচে থাকি। সেটি নিশ্চিত করতেই না এই লকডাউন। কথায় বলে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু। তর্কে বহুদূর। না, তাই তো আমরা যেমন ঈশ্বর বিশ্বাস নিয়েও তর্ক করতে রাজি নই। ঠিক তেমনই লকডাউন কাদের স্বার্থ পূরণ করছে। সেই তর্কেও আমাদের কোন উৎসাহ নাই। ফলে আমরা, আমাদেরকে যেমন শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দুইবেলা। টিভি আর নেটপাঠশালায়। আমরা ঠিক তেমনই লকডাউনে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছি। বরং অবিশ্বাসীদের সাথেই আমাদের যাবতীয় তর্ক। লকডাউন ছাড়া এই অতিমারী ঠেকানোর আর কোন উপায় নাই বলে। প্রতিদিন যত বেশি মানুষেরই মৃত্যু হোক না কেন। আমরা বিশ্বাস করি। লকডাউন না করলে আরও আরও বেশি মানুষ মারা যেত। মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহ ভাবে না বাড়তে থাকলেও আমাদের বিশ্বাস আরও জোরদার হয়ে ওঠে। লকডাউন করার ফলেই মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছে বলে। ফলে লকডাউন নিয়ে আমাদের কোন মাথাবাথ্যা নেই। মৃত্য যতই বেশি হোক। কিংবা মৃত্যু যতই কম হোক। লকডাউনের যৌক্তিকতাকে আমরা দুই ভিন্ন ফলাফলেই শিরোধার্য্য করে নিয়েছি। ফলে আমরা নিশ্চিত, সরকার আমাদের সাথে রয়েছে। বরং যেখানে যেখানে লকডাউন করতে সরকারের দেরি দেখছি। সেখানেই আমারা অবিলম্বে লকডাউন করার দাবিতে সরব হয়ে উঠছি। আমাদের সামাজিক দেওয়াল জুড়ে।


বিশ্বাস এমনই এক বিষয়। যেটি অধিকাংশ সময়েই আতঙ্কের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আর আতঙ্ক ভয়ের থেকেই সৃষ্টি। ঠিক সেই ভয় ধরিয়ে দেওয়ার কাজটাই সুচারু ভাবে সম্পন্ন করে চলেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় রাষ্ট্র ও প্রচার মাধ্যম। কিভাবে করোনা সংক্রমিত হয়। কি ভাবে সেই সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা উচিৎ। করোনা সংক্রমণ প্রতিহত করতে প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য কি। এবং সেই কর্তব্য কর্মগুলি ঠিক ঠিক ভাবে পালন না করলে পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় হতে পারে। সেই বিভীষিকার নিরন্তর প্রচারে আমাদের ভিতরে মৃত্যভয় জনিত আতঙ্কের সৃষ্টি করে দেওয়া গিয়েছে। অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। ফলে আমাদেরকে যখনই বলা হলো। লকডাউন ছাড়া করোনা সংক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব নয়। আমরাও মাথা নেড়ে বলতে থাকলাম। ঠিক ঠিক। এটাই সঠিক উপায়। আমাদেরকে যখন বলা হলো। দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিতে হবে। আমরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠলাম। মারামারি ঠেলাঠেলি করে হলেও ভিড়ে ঠাসাঠাসি লাইনে দাঁড়িয়ে একডোজ ভ্যাকসিনের জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে রইলাম ঘন্টার পর ঘন্টা। আর শরীরে ভ্যাকসিন ফুটিয়ে বীরদর্পে সেল্ফি তুলে ভ্যাকসিনের প্রচারক হয়ে গেলাম বিনা পারিশ্রমিকে। নাগরিক কর্তব্যে অবিচল থেকে।


স্বভাবতই বিশ্বাসী মানুষ মাত্রেই কোন প্রশ্নের ধার ধারে না। এমনকি যিনি বা যাঁরা বিশ্বাস করেন ঈশ্বর নাই। সেই বিশ্বাসীরাও প্রশ্নের ধার ধারেন না বিশেষ। ফলে আমরাও যে প্রশ্নের ধার ধারি না। সেটা লকডাউনের প্রবক্তরা ভ্যাকসিনের কারবারীরা খুব ভালো করে জানেই বলেই। তাদের কাজটা প্রায় মাখনের ভিতরে ছুরি চলানোর মতো সহজ হয়ে গিয়েছে। আর অল্প বিস্তর কিছু গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ সবখানেই থাকে চিরকাল। প্রশ্ন তোলাই যাদের স্বভাবধর্ম। তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্যেই দেশে দেশে রয়েছে প্যানডেমিক এক্ট। ফলে লকডাউনের প্রবক্তা এবং ভ্যাকসিনের কারবারীদের নো চিন্তা ডু ব্যাবসা। একটা প্ল্যানডেমিককে অনেক সহজেই প্যানডেমিক বলে চালিয়ে দেওয়ার কাজ সাফল্যের সাথে চলছে পুরো দুই বছর হয়ে গেল। এবং এই একই সময়ে বিশ্বের প্রায় এক কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে নেমে গিয়েছে এই লকডাউনের ফলে। আর একদম হাতে গোনা কয়েকটি মাল্টিন্যাশানাল দুই বছরে দুই তিন দশকের ধনদৌলত কামিয়ে নিয়েছে। প্ল্যানডেমিকের মহিমায়।


আমরা যদিও আদার কারবারী। জাহাজের খোঁজে আমাদের কি দরকার। ভাবতেই পারি আমরা। বেশ। তবে দেখা যাক বরং। এই লকডাউনে আমাদের কি লাভ হলো। হচ্ছে। রাষ্ট্র তার প্রশাসনিক দায়বদ্ধতায় আমাদের বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিয়ে আমাদের আস্থাভজন হয়ে উঠেছে। আমরা ভুলে গিয়েছি। রাষ্ট্র কিন্তু অত্যন্ত অগ্নিমূল্যেই এই ভ্যাসকিন কিনে চলেছে মাল্টিন্যাশানাল সংস্থাগুলি থেকে। আবার দেশে প্রস্তুত ভ্যাকসিনের ফর্মুলাও কিন্তু বিদেশের হাতে গোনা দুই একটি ফার্মা কোম্পানী থেকেই আমদানি করা। তাদেরকে ভ্যাকসিনের ফর্মূলার রয়ালটি দিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি ডোজ ভ্যাকসিন প্রস্তুতের উপরে। যার মূল্য দেশীয় ভাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নেয় সুদে আসলে। ফলে মাথাপিছু এবং ডোজপিছু ভ্যাকসিন সরকারকে বেশ চড়া দরেই কিনতে হচ্ছে দিনের পর দিন। আমরা খুব খুশি। আমাদের তো আর পকেটের টাকা খসিয়ে সেই ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে না। একেবারে বিনামূল্যে পেয়ে যাচ্ছি। এখন গোটা দেশের জনগণকে এই বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেওয়র অর্থ সরকার জোগার করছে কি করে? রান্নার গ্যাসের দাম দ্বিগুন করে দিয়ে। পেট্রল ডিজেলের দাম দেড়গুন করে দিয়ে। প্রতিটি জিনিসের উপরে চড়া হারে জিএসটি আদায় করে। ব্যাংকে গচ্ছিত আমাদের সঞ্চয়ের উপরে সুদের হার কমিয়ে দিয়ে। ব্যাংক থেকে আমদেরই গচ্ছিত টাকা তুলতে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায় করে। রেলের টিকিটের উপরে অতিরিক্ত কর বসিয়ে। ইত্যাদি নানান উপায়ে। যতরকম ভাবে  অতিরিক্ত পরিমাণে কর বৃদ্ধি করে আয় বৃদ্ধি করা যায়। স্বভাবতই সরকার সেই পথেই অতিরিক্ত পরিমাণে রাজস্ব সংগ্রহ করছে জনগণেরই পকেট কেটে। সোজা সহজ ভাবে বললে তোলা আদায় করে। সেই অর্থেরই একটা বড় অংশ দিয়ে সরকার ভ্যাকসিন কিনছে। যে অর্থের সিংহভাগই ভ্যাকসিনের ফর্মুলার রয়ালটি বাবদ বিদেশে চলান হয়ে যাচ্ছে। জমা হচ্ছে ভ্যাকসিনের ফর্মুলা আবিষ্কারক ফার্মা কম্পানির কোষাগারে। আমাদরেই পকেট কাটা টাকা। 


তা যাক। আমরা তো বিনামূল্যের ভ্যাকসিনের লাইনে দাঁড়িয়ে করোনার সংক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত করে নিতে পেরেছি। কথায় বলে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। গতবছরেই সরকার তার ঢাক ও ঢোল বাজিয়ে সগর্বে একশো কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। যে সংখ্যাটি এতদিন নিশ্চিত ভাবেই দেড়শো কোটি ডোজের কাছাকাছি পোঁছিয়ে যাওয়ার কথা। তাতে বিদেশী ফার্মালবির কতটা সম্পদ বৃদ্ধি হলো সে খোঁজে আমাদের দরকার কি? আমরা তো নিজেদেরকে সুরক্ষিত মনে করছি। কিন্তু সেই আমরাই কতটা সুরক্ষিত এই দুই ডোজ ভ্যাকসিনে? না, ইতিমধ্যেই ডেলটা জুজুর বাবা ওমিক্রন জুজুর আমদানি করা হয়েছে। আমাদেরকেও পাখি পড়া করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই ডোজ ভ্যাকসিনে ওমিক্রন প্রতিরোধের কোন উপায় নেই। ঠিক কথা। দুই ডোজ ভ্যাকসিনের ফর্মুলা আবিস্কারের সময়ে ওমিক্রন কেন ডেল্টা জুজুই আত্মপ্রকাশ করে ছিল না। ফলে দুই ডোজ ভ্যাকসিনও যথেষ্ঠ নয়। আমরা এতদিন বিশ্বাস করে ফেলেছি, এই দুইডোজ ভ্যাকসিন প্রাথমিক রক্ষা কবচ মাত্র। যার ভ্যালিডিটি খুব বেশি হলে এগারো থেকে তেরো মাস। ফলে সেই অশুভ তেরোর গেরোয় আটকিয়ে যেতে হবে, ফার্মালবির বিধান মতো পরবর্তী বুস্টার ডোজগুলি না নিলেই। আর আমাদের সেই বিশ্বস্ত টিভি আর নেটপাঠশালায় দুইবেলা শেখানো হচ্ছে। এখন তৃতীয় ওয়েভ চলছে। ওমিক্রন অবতারে করোনা সংক্রমণ এখন আরও বেশি মারাত্মক। কোন দেশে কোনদিন সেই সংক্রমণ নতুন কোন বিশ্ব রেকর্ড করলো। সেই খবরও আমাদের মুখস্থ। প্রতিদিনই রেকর্ড ব্রেকের খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রতিবিধান সেই দুইটি। লকডাউন আর ভ্যাকসিন।


একটা ভ্যাকসিনের ভ্যালিডিটি শেষ হয়ে গেলে। নতুন একটা করে বুস্টার ডোজ নিতে হবে। আবার তাতেও গল্পের শেষ হবে না। নতুন ভ্যারিয়েন্ট বাজারে আসা মাত্র আবার সেই ভ্যারিয়েন্ট প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিয়ে আত্মরক্ষার সময়সীমা বাড়িয়ে নিয়ে নিজ আয়ুর ভ্যালিডিটিও বাড়িয়ে নিতে হবে। সেই ডোজ বাজারে না আসা অব্দি লকডাউন আর মুখে মাস্ক। সেই স্কুল পড়ুয়াদের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীলডাউন করে বসিয়ে রাখার মতোই। ফার্মালবির নির্দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রই তার নাগরিকে মুখে মাস্ক পড়িয়ে লকডাউনে বসিয়ে রেখে দিচ্ছে। পরবর্তী বুস্টার ডোজ বাজারে আসার অপেক্ষায়। মধ্যবর্তী সময়ে নাগরিক যেন কোন প্রশ্ন না তোলে। তাই আমরাও কোন প্রশ্ন তুলতে রাজি হইনি। হলে দেখতে পেতাম। প্রথম দুইডোজ ভ্যাকসিন যাঁদের দেওয়া হয়েছিল। সেই চিকিৎসক নার্স ও স্বাস্থকর্মী। তারাই সকলের আগে ওমিক্রন আক্রান্ত। সেটি কি ওমনি ওমনি হয়ে গেল? কলকাতার এক একটি সরকারী হাসপাতালে প্রায় শতাধিক ডাক্তার একসাথে ওমিক্রন আক্রান্ত হয়ে গেল। আর আমাদের ভিতরে ভয় আর আতঙ্কের সাড়া পড়ে গেল হই হই করে। কি সাংঘাতিক। আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হলো। ডাক্তারদের দুই ডোজ ভ্যাকসিন দিয়ে রাখা হয়েছিল বলেই, তারা অল্পদিনেই এই সংক্রমন প্রতিরোধ করে সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন। ফলে আমরাও যারা দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়ে বসে রয়েছি। আমরাও ওমিক্রন সংক্রমণের অপেক্ষায়, আশায় দিন গুনতে শুরু করে দিলাম। কারণ আমাদেরও তো এবার বুস্টার ডোজের প্রথমটা নিতে হবে। বাজারে আসলেই। আমরা প্রশ্ন তুললাম না। এই ওমিক্রন অবতার সকলের আগে ডাক্তরদেরকেই বেশি করে চেপে ধরলো কেন? আমরা প্রশ্ন তুলছি না, ওমিক্রন কেনই বা দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষদেরকেই বেশি করে ভোগাচ্ছে? সাধারণ বুদ্ধিতে তো এই কথাই বলে যে, নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট এখনও যাঁরা ভ্যাকসিন নেননি, তাঁদের ভিতরেই সকলের আগে সংক্রমিত হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁদেরকে সংক্রিমত করার আগে কোন জাদুতে, নাকি কোন ফর্মুলাতে দুইডোজ ভ্যাকসিনধারীদেরকেই আগে জড়িয়ে ধরছে ওমিক্রন?


না না। আমরা টিভি আর নেটপাঠশালার সুবোধ ছাত্র। আমরা ভ্যাকসিনে বিশ্বাসী মানুষ। আমরা কোন দুঃখে এইসব গোঁয়ারগোবিন্দ প্রশ্ন তুলতে যাবো? দুই ডোজ ভ্যাকসিনের ভিতরেই কি ওমিক্রন জাদু লুকিয়ে থাকে? না’কি গল্প অন্য? লকডাউনকে মই বানিয়ে যে যে শিল্পপতিরা দুই তিন দশকের ধনদৌলত দুই বছরেই হাসিল করে নিচ্ছে। আর ভ্যাকসিনকে হাতিয়ার করে যারা মোবাইলের সিম ভ্যালিডিটির মাসিক কিস্তির মতো ষান্মাসিক কিস্তিতে মানুষের পকেট কেটে বছরের পর বছর বাধ্যতামূলক তোলা আদায় করে প্রতিদিন স্ফীত হয়ে ওঠার বন্দোবস্ত ফেঁদে বসেছে। এদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আমাদের মনের ভিতরে যতদিন না কষ্ট শুরু হচ্ছে ততদিন আমরা বরং ঈশ্বরে বিশ্বাসের মতো লকডাউন আর ভ্যাকসিনে বিশ্বাস রাখি। তাতে আর যাই হোক প্রতিদিন রাতের ঘুম বরবাদ হয়ে যাবে না। ওটা বিশেষ করে প্রয়োজন। বিশেষত দিবানিদ্রায় যারা অভ্যস্থ বংশপরম্পরায়।

১৫ই জানুয়ারী’ ২০২২

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত