মুখ আর মুখোশ

 

মুখ আর মুখোশ

সেই একই মানুষ। আমেরিকার আফগানিস্তান ইরাক আক্রমণের দিনগুলিতে মিসাইল বৃষ্টির ছবি দেখতে মহানন্দে টিভির সামনে বসে যেত। যেন কালীপুজোর বাজির উৎসব দেখতে বসেছে। ইরাক আর আফগানিস্তানের রাতের আকাশ ফাটিয়ে মিসাইল আছড়ে পড়ছে মুহুর্মুহ। আর আমরা বসার ঘরের সোফায় বসে বসে আনন্দে লাফিয়ে উঠছি। দোর্দণ্ড প্রতাপ আমেরিকার শৌর্য বীর্যে চমৎকৃত দুনিয়া। সেদিন একবারের জন্যেও কাউকে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেখা যায়নি সাধারণ ইরাকী আর আফগানদের জন্যে। আমরা সেদিন ধরেই নিয়েছিলাম মুসলিম মানেই টেররিস্ট। মুসলিম মানেই মৌলবাদী। ইসলাম মানেই মানুষের মহাবিপদ। তাই সেই ইসলামের নিপাত দেখতে। সাহেবদের হাতে মুসলিম নিধন দেখতে দেখতে আমাদের রাতের ঘুমও সেই সময় খুব নিশ্চিন্তের হতো। এইবার দুনিয়া থেকে সন্ত্রাসবাদ দূর হবে। ইসলাম কোনঠাসা হবে। মুসলিমদের দাবিয়ে রাখা যাবে। সেদিন গোটা ইউরোপ, আমেরিকার হানাদার বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছিল। ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্রশক্তিগুলি ইরাক ও আফগানিস্তানে সৈন্য ও অস্ত্র সরবরাহ করে আমেরিকার হাত শক্ত করেছিল। ইউরোপ সেদিন সাম্রাজ্যবাদী হানাদার মার্কিন মেরিনের নিন্দেয় মুখর হয়নি। সেই একই ইউরোপ জুড়ে আজ নিন্দের ঝড় উঠেছে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ঘটনায়। রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে। সেই একই মুখগুলি। যে মুখগুলি ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণের সমর্থনে যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে চলতো। আজ সেই মুখগুলিই যুদ্ধ বিরোধী মানবতার বাণী শোনাচ্ছে।


সাহেব মেম দেখলেই যারা হাত কচলাতে শুরু করে। সেই বাঙালির অবস্থাও তদ্রুপ। ইউরোপ জুড়ে আজ যখন রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে নিন্দের ঝড় উঠেছে। বাঙালিকেও অতি অবশ্যই সেই নিন্দের ঝড়ে সামিল হতে হবে। বিশেষ করে মার্কিনপন্থী বাঙালিদের তো কথাই নাই। আগে শুধু দেখে নিতে হবে বাইডেন কোন পক্ষে। সিএনএন কি বলছে। বিবিসি কোন বাণী প্রচার করছে। ব্যাস, আমরা বুঝে যাবো। আমারা এই যুদ্ধে কোন পক্ষে। না, বাঙালি যুদ্ধবাজ জাত নয়। কস্মিনকালেও ছিল না। অতি বড় শত্রুও বাঙালিকে এমন অপবাদ দিতে পারবে না। কিন্তু ইংরেজি জানা বাঙালি একটা বড় অংশ বরাবরই ইঙ্গমার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষে। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ যে দেশে নিশ্চিত। সেই দেশের পক্ষ তো নিতেই হয়। ফলে বাঙালিও পাতালরেলের স্টেশনে ইউক্রেনবাসীদের আশ্রয় নেওয়ার ছবি দেখে ঘোর যুদ্ধ বিরোধী বাণী শোনাতে শুরু করে দিয়েছে। না, ইরাক আর আফগানিস্তানে মার্কিন মেরিনের মিসাইল বর্ষণের সময় ইরাক বা আফগানিস্তানে নাগরিকরা পাতালরেলের স্টেশনে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পায়নি। আমরাও সেই ছবি দেখে চোখের জল ফেলার অজুহাত পায়নি। কিন্তু এবারে আমাদের সুযোগ হয়েছে চোখের জল ফেলার। আমেরিকা এই যুদ্ধের বিপক্ষে। ইউরোপ এই যুদ্ধের বিপক্ষে। ফলে আমরাও আজকে যুদ্ধ বিরোধী মুখোশ পড়ে নিয়েছি। আগামীতে ইউরোপ আমেরিকা ইরান আক্রমণ করলেই আমরা আবার যুদ্ধের পক্ষে সওয়াল করতে শুরু করবো।


মুখ একই থাকে। সময় সুযোগ ও প্রয়োজন বুঝে শুধু মুখোশে মুখ ঢেকে নিতে হয়। হানাদার বাহিনীর নাম ও নিশান দেখে নিয়ে। কখনো যুদ্ধের সমর্থনে টিভির সামনে সোল্লাসে মিসাইল বৃষ্টির অত্যাধুনিক শৌর্যে আর বীর্যে মুগ্ধ হতে হয়। কখনো যুদ্ধ বিরোধী মুখোশ টেনে নিয়ে মিসাইল বৃষ্টির খবরে কেঁদে ভাসাতে হয়। কখনো সাধরণ মানুষের উপরে মিসাইল বৃষ্টিতে আমাদের উৎসাহ আর উদ্দীপনার শেষ থাকে না। কখনো সাধারণ মানুষকে পাতালরেলের স্টেশনে আশ্রয় নিতে দেখলে আমদের ভিতরে কষ্টের আর শোকের সুনামি উথলে ওঠে। আসলে আমাদের যাবতীয় নীতি আদর্শের কথাগুলি আমাদের স্বার্থবোধের পরিমিতিতে বাঁধা। এই ইউক্রেনেই আজ যদি ইঙ্গমার্কিন শক্তি মিসাইল নিয়ে হানা দিতো। আমাদের অবস্থান ঠিক একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে যেত। অবশ্য তখন সেই একই বিবিসি সিএনএন আলজাজিরার বদান্যতায় ইউক্রেনবাসীদের পাতাল রেলের স্টেশনে আশ্রয় নেওয়ার ছবি দেখতে হতো না আমাদের। তখন আমরা ইঙ্গমার্কিন শক্তির মিসাইলের শৌর্য আর বীর্যের ছবি দেখতাম টিভি জুড়ে। এখনকার মতো মিসাইলের বর্বরতার ছবি দেখানো হতো না।


এটাই আমাদের আসল মুখ। এইভাবেই আমরা ঘটনার বিচার করি। এইভাবেই আমরা কোন একটি পক্ষের হয়ে নিরন্তর ওকালতি করতে বাকি পক্ষগুলির মুণ্ডুপাত করতে থাকি। ফলে আমরা কোনভাবেই যুদ্ধ বিরোধী নই। আমরা বন্দুক নিয়ে যুদ্ধে না নামলেও। আমরা প্রতিনিয়ত, যেখানে আমাদের টিকি বাঁধা। সেই পক্ষের হয়ে ওকালতি করতে থাকি। তাই বিবিসি কি সিএনএন। জানসন কি বাইডেন। যখন যা বলবে। যখন যা শোনাবে। আমরাও তখন সেইভাবেই ডনবৈঠক দেবো। দিতে থাকবো। এই ডনবৈঠক দেওয়াটাই আমাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এই সুযোগ আমরা ছাড়তে রাজি নই। ফলে ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ করে আমেরিকা কোন অপরাধ করেনি। কিন্তু ইউক্রেন আক্রমণ করে রাশিয়া মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে কয়েক কোটি মানুষ খুন করেও বাবা বুশ ও ছেলে বুশ হিটলার হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু ইউক্রেন আক্রমণের তিন দিনের ভিতরেই পুতিন ঠিক হিটলার হয়ে উঠেছে। আমেরিকা নিজ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সুরক্ষিত করতেই ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল। না হলে সাদ্দাম আর তালিবানরা আমেরিকার দখল নিয়ে নিত। না, আমরা সকলেই জানি। এইগুলি অম্লানবদনের ঢপ। আমরা সকলেই জানি। সাদ্দাম কি তালিবান। কারুর পক্ষেই আমেরিকার ভুখণ্ডের কয়েক হাজার কিলোমিটারের কাছাকাছি গিয়েও একটা পটকা কি দোদোমা ফাটানোর ক্ষমতা ছিল না। আমরা খুব ভালো করেই জানি। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আলকায়দা আক্রমণ করেনি। কারণ, সাধারণ যাত্রীবাহী একটি বিমানের পক্ষে একশতলা বাড়ি ঐরকম অভুতপূর্ব ভাবে ধ্বংস করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কয়েকটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে মাত্র। কিন্তু তাতে একশতলা বাড়ি মোমের পুতুলের মতো গলে পড়তে পারে না। অন্তত পদার্থ বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ যাঁদের রয়েছে। তাঁরা সকলেই সেকথা  জানেন। আমাদের যেমনটা দেখানো আর বোঝানো হয়েছিল। বিজ্ঞানে সেটি অসম্ভব। যদি না একশতলার একাধিক তলায় আগে থেকেই অত্যাধুনিক এবং অতি শক্তিশালী বিস্ফোরক মজুত করে রেখে নিখুঁত টাইমিংয়ে তা ফাটানো হয়। ফলে আমরাও জানি। এইসবই ছিল ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণের অজুহাত সৃষ্টির কৌশল। তাতে প্রায় চার হাজার নিরপরাধ মার্কিন নাগরিক হত্যাও কোন অপরাধ নয়। কারণ আমাদের অবস্থান সবসময়ে ইঙ্গমার্কিন শক্তির পক্ষে। সেটাই আমাদের মুখ।


ফলে আমরা আজকেও যখন বুঝতে পারছি। পুতিন তার দেশের ঘাড়ের কাছে নেটোর প্রবেশ আটকাতেই ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। তখন কিন্তু সেই আমরাই আর রাশিয়ার অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার অজুহাত শুনতে রাজি নই। সেটি একটি বিদেশী রাষ্ট্রের নিজস্ব বিষয়। আমরা কেন সেই অজুহাত শুনতে যাবো। কিন্তু আমেরিকার নিরাপত্তা বিঘ্নের ভুয়ো অজুহাতে আমরা ইরাক আফগানিস্তান ধ্বংসের সমর্থক। তাই আজকে আমাদের ইউক্রেনবাসীর জন্য চোখের জল ফেলতেই হচ্ছে। নয়তো মান থাকে না। কবে ইউক্রেন নেটোর সদস্য হবে। কবে নেটোর পোশাকে মার্কিন মেরিন রাশিয়ার সীমান্তে অত্যাধুনিক মিসাইল বসিয়ে দিয়ে মস্কোকে দুইবেলা ডন বৈঠক দেওয়াবে নিজের স্বার্থে। সেই অজুহাতে পুতিন নিশ্চয় ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জীবনে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে পারে না। সেই অধিকার তাকে কে দিল? যে অধিকার চর্চা করা আমেরিকার শোভা পায়। সেই একই অধিকার চর্চা নিশ্চয় পুতিনের শোভা পায় না। সেই চেষ্টা করা মানেই তো আমেরিকাকে খাটো করার অপপ্রয়াস। সেটি আমরা মেনে নিই কি করে? তখন আর কিছু করতে না পারি। অন্তত যুদ্ধ বিরোধী মানবতার মুখোশ পড়ে নিজেদের মুখটা ঢাকার চেষ্টা তো করতে পারি। যে প্রয়াসে বাবা বুশ ছেলে বুশকে না ধরে আমরা পুতিনকেই হিটলারের চেয়ারে বসিয়ে দিতে পেরেছি। মাত্র তিনদিনের ভিতরে। ফলে আজকে যখন গোটা ইউরোপ পথে নেমেছে। রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে। আমরাও ঘরে ঘরে সরব হয়ে উঠছি। যুদ্ধ বিরোধী মানবতার স্লোগানে। আমরাও আশা করছি নেটো কিংবা মার্কিন মেরিন যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে রাশিয়ার উপরে। অন্তত সাধারণ ইউক্রেনবাসীর কথা চিন্তা করে। সাদ্দামের হাত থেকে, তালিবানদের হাত থেকে যেমন ইরাকী ও আফগানদের রক্ষা করেছে আমেরিকা। আমাদের আশা তেমন করেই ইউক্রেনবাসীদেরকেও রক্ষা করবে সেই মহাশক্তিধর আমেরিকা। নাহলে আমরা মার্কিনপন্থী যুদ্ধবিরোধী মানবতার পুজারীরা মুখ দেখাবো নতুন কোন মুখো‌শে? আমরা তো আর বলতে পারি না, অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাই মানবতা বিরোধী অপরাধ। আমরা তো আর বলতে পারি না, হিরোশিমা নাগাসাকিতে বোমা ফেলেছে যারা। তারাই মানব সভ্যতার পয়লা নম্বর শত্রু। আমরা তো আর বলতে পারি না নেটোজোট ইউরোপ জুড়ে সামরিক অস্ত্র বাণিজ্যের যে রাজনীতি করে। তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। আমরা তো আর বলতে পারি না, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের কাণ্ডারীদের হাতে বিশ্ব কোনদিনই নিরাপদ নয়। আমরা তো আর বলতে পারি না, বিশ্বের পয়লা নম্বর যুদ্ধবাজ দেশের ধোপা নাপিত বন্ধ না করলে পুতিনদের সমৃদ্ধিও আটকানো অসম্ভব। আমরা তো আর বলতে পারি না, গোটা ইউরোপ আজ মার্কিন বশংবদে পরিণত না হলে, পুতিনের ক্ষমতাও ছিল না ইউক্রেন আক্রমণ করে। আমরা তো আর বলতে পারি না। যুদ্ধ নিয়েই বাণিজ্য করার যে অর্থনীতি। সেই অর্থনৈতিক মডেলই আজ মানুষকে উন্মাদ করে রেখেছে।

 ২৭শে ফেব্রুয়ারী’ ২০২২

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত