ভাবাবেগ মৌলবাদ এবং একজন রূপঙ্কর
অন্ধভক্তিজাত গড়ে ওঠা ভাবাবেগ
কোনদিনও কোনরকম যুক্তির ধার ধারে না। এই ভাবাবেগ মানুষের ভিতর থেকে মনুষ্যত্ব মানবিকতা
এবং মননশীলতা কেড়ে নেয়। শুষে নেয়। ভাবাবেগ তাড়িত মানুষকে খুব সহজেই উত্তেজিত এবং ক্ষিপ্ত
করে তোলা যায়। ভাবাবেগ তাড়িত মানুষ নিজের মতের এবং নিজ গোষ্ঠীর মতের বিরুদ্ধে অন্য
কারুর মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকেও স্বীকার করতে চায় না। সাধারণত মানুষ যখন অন্ধভক্তিজাত
ভাবাবেগের দ্বারা চালিত হয়। মানুষ তখন ভিতরে ভিতরে এক স্বৈরতান্ত্রিক মনোবৃত্তির শিকার
হয়ে পড়ে। তাঁর ভাবাবেগই সব কিছুর শেষ কথা। সেই ভাবাবেগকে যে বা যাঁরা স্বীকার করবে
না। তিনি এবং তাঁরাই আসলে শত্রু। ফলে সাধারণ ভাবে একজন ভালো মানুষও যদি এই অন্ধভক্তিজাত
কোন ভাবাবেগের কবলে কিংবা খপ্পরে পড়ে যায়। সেই ভালো মানুষটিরও ভিতরে এক স্বৈরতান্ত্রিক
সত্তা জেগে উঠতে চায়। যে সত্তা কোনরূপ বিরুদ্ধ মত সহ্য করতে পারে না। যে সত্তা কোনরূপ
যুক্তির ধার ধারে না। যে সত্তা কোন কিছুর বিচার এবং বিশ্লেষণ করতে অপারগ হয় পড়ে। যে
সত্তা কোন বিষয়ের গভীরে গিয়ে বিভিন্ন দিক দিয়ে একটি ঘটনা বা বিষয়ের বিচার এবং বিশ্লেষণ
করার মানসিকতা এবং শক্তি ও সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। এই যে এক স্বৈরতান্ত্রিক মনোবৃত্তি।
অন্ধভক্তিজাত ভাবাবেগ মানুষকে এই স্বৈরতান্ত্রিক মনোবৃত্তিতে ঠেলে দিতে থাকে। এরই পরবর্তী
স্তরে জন্ম হতে থাকে মৌলবাদের। যে কোন মৌলবাদের পিছনে অন্ধভক্তিজাত ভাবাবেগ তাড়িত এই
স্বৈরতান্ত্রিক মনোবৃত্তি কাজ করতে থাকে।
আর কে না জানে মৌলবাদই সন্ত্রাসবাদের
জন্মদাতা। এই মৌলবাদই বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদকে পরিচালিত করে একটা সময়ে একের পর এক ব্লগার
নিধন শুরু করেছিল। যে হত্যালীলা শুরু হয়েছিল বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী সাহিত্যিক
হুমায়ুন আজাদের উপরে প্রাণঘাতী হামলা দিয়ে। তারপর একে একে অভিজিৎ ওয়াশিকুর
অনন্তবিজয় নীলয়নীল দীপন টুটুল তারেক রণদীপন…… মিছিল চলেছিল, পা মেলাচ্ছিল একের পর এক
ডেডবডি! খতমের হিট লিস্টের বাকিরা প্রাণরক্ষার্থে একে একে পাড়ি দিয়েছিল ইউরোপ
আমেরিকায়। এই মৌলবাদই বাংলার আরও এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান তসলিমা নাসরিনকে দেশত্যাগে
বাধ্য করেছিল তিন দশক আগে। মৌলবাদ। যেকোন ধরণের মৌলবাদই সময় এবং সুযোগ পেলে এমনই ভয়ঙ্কর
হয়ে ওঠে। উঠতে চায়। মৌলবাদের সেই চুড়ান্ত পর্যায়টিই সন্ত্রাসবাদ। যা মানুষের উপরে সন্ত্রাস
নামিয়ে নিয়ে এসে উল্লসিত হয়ে ওঠে।
কি
দোষ ছিল বাংলাদেশের ব্লগারদের? তসলিমা নাসরিন এবং হুমায়ুন আজাদের? তাঁরা কিছু প্রশ্ন
তুলেছিলেন। তাঁদের জীবন জিজ্ঞাসা নিরন্তর যুক্তির পথে পরিচালিত হয়ে মানুষের অন্ধ ভাবাবেগকে
আলোর পথ দেখাতে চেয়েছিল। এটাই ছিল তাঁদের মূল অপরাধ। যার জন্য জীবন দিতে হলো। যার জন্য
দেশত্যাগে বাধ্য হতে হলো। অর্থাৎ দেওয়াল লিখন স্পষ্ট। মানুষের অন্ধ ভাবাবেগ নিয়ে কোন
কথা বলা যাবে না। এমন কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না। যাতে একটা বড়ো অংশের মানুষের সম্মিলিত
ভাবাবেগে আঘাত লাগতে পারে। এই কারণেই বহু দেশে ব্লাসফেমি এক্ট চালু রয়েছে। স্বভাবতঃই
গণতন্ত্র বিরোধী এক আইন। যে আইন ব্যক্তি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি
দেয় না। এবং খর্ব করে রাখে। কি বলতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা? বিজ্ঞান
এবং যুক্তির আলোতে পুরানো ধ্যান ধারণা বিশ্বাস এবং সংস্কারকে ঝালিয়ে নিয়ে আধুনিক করে
নেওয়ার কথাই তো তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন। না, বাংলাদেশের একটা বড়ো অংশের মানুষ সেই সব
কথা শুনতে রাজি ছিল না। আজও রাজি নয়। তাঁদের মূল কথা, তাঁদের প্রিয় নবী সম্বন্ধে কোনরকম
সমালোচনা বরদাস্ত করা হবে না। যে বা যাঁরা করবেন। তাঁদের ধর থেকে সরাসরি মুণ্ডু নামিয়ে
দেওয়া হবে। তাঁদের মূল কথা কোরান শাশ্বত সত্য। কোরানের বাইরে আর কোন সত্য নেই। থাকতে
পারে না। ফলে সেই কোরান নিয়ে। কোরানের কোন নির্দেশ নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না। কোরানের
নির্দেশই শেষ কথা। প্রতিটি মুসলিম সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য। যিনি কোরানের নির্দেশ মানবেন
না। তাঁর স্থান হবে বধ্যভুমিতে। এবং আল্লাহের অস্তিত্ব নিয়েও কোন বিতর্ক তোলা যাবে
না। তাঁদের মতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম। এবং আল্লাহই একমাত্র ঈশ্বর। যিনি এই বিশ্বজগতের
স্রষ্টা এবং নিয়ন্ত্রক। অন্য সব ধর্মের সব ধরণের ঈশ্বরের থেকে তিনি শ্রেষ্ঠ এবং সর্বশক্তিমান।
একেবারেই
অন্ধভক্তিজনিত এই যে এক ভাবাবেগ। এই ভাবাবেগ থেকেই বাংলাদেশে নাস্তিক মানেই নিধনযোগ্য।
নাস্তিক মানেই ইসলামের শত্রু। নাস্তিক মানেই তাঁর আর বেঁচে থাকার কোন অধিকারই নেই।
এই সেই মৌলবাদ। আর এই মৌলবাদই যে সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়। সেই সন্ত্রাসবাদই একের পর
এক হত্যালীলা সংঘটিত করতে থাকে। প্রাণত্যাগ কিংবা প্রাণরক্ষার্থে দেশত্যাগে বাধ্য হতে
হয়, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আমরা যাঁরা মুসলিম নই। এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগে আহ্লাদিত।
তাঁরা বাংলাদেশের এই ইসলামিক মৌলবাদের তীব্র নিন্দা করে থাকি। এবং আমাদের ভারতবর্ষ
এবং বাংলার সমাজ জীবন এই মৌলবাদ মুক্ত বলে দুইবেলা গর্ব করে থাকি। কিন্তু কি আশ্চর্য্য।
সেই আমরাই আজ গায়ক রূপঙ্করকে বিচারের কাঠগড়ায় তুলে দিয়ে দুই বেলা ছি ছি করে চলেছি।
কারণ তিনি বলেছেন, ‘হু ইজ কে কে?’ তিনি বলেছেন, কে কে নিয়ে বাঙালির এত উত্তেজনা কিসের?
তিনি বলেছেন, কলকাতার শিল্পীরা কে কে’র থেকে ফার ফার বেটার শিল্পী। তিনি বলেছেন ‘আর
কতদিন বোম্বের পিছনে ঘুরবেন’। তিনি বলেছেন, ‘বাঙালি হন বাঙালি হন’। ব্যাস বোম্বে পাগল
এবং হিন্দী ভাষা ও সংস্কৃতি পাগল বাঙালি এবং বিশেষ করে কে কে অনুরাগী প্রজন্মদের অন্ধভক্তিতে
ঘৃতাহূতি পড়ে গেল। একজন আঞ্চলিক বাঙালি শিল্পী’র এত আস্পর্ধা? ভারত বিখ্যাত জাতীয় গায়ক
কে কে’র শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলা? হু ইজ কে কে? একজন মুসলমান যদি বলে হু ইজ নবী?
মুসলিমরা কি তাঁকে ছেড়ে দেবে? তুমি মুসলমান হয়ে নবীকে চেন না? ঠিক সেইরকমই। আপনি রূপঙ্কর
হন আর যেই হন। আপনি কে কে কে চেনেন না? অথচ আপনি বাঙালি বলে দাবি করেন নিজেকে? একজন
মুসলিমের পক্ষে যেমন হু ইজ নবী বলা অপরাধ। ঠিক তেমনই একজন বাঙালির পক্ষেও ‘হু ইজ কে
কে?’ বলাও তেমনই মারাত্মক অপরাধ।
হ্যাঁ
অন্ধভক্তি। এবং অন্ধভক্তি জনিত ভাবাবেগ মানুষকে এই পর্যায় নামিয়ে নিয়ে আসে। সে রূপঙ্করের
ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়। সে রূপঙ্করের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকার
করে না। সে নিজ ভাবাবেগের দোহাই দিয়ে রূপঙ্করকে খলনায়ক বানিয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে। এবং
মানুষ রূপঙ্করের সামাজিক হেনস্তা উপভোগ করতে থাকে। ঠিক বাংলাদেশের সেই সব মৌলবাদীদের
মতো। যাঁরা একের পর এক ব্লগার হত্যা। কিংবা একের পর এক বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দেশত্যাগ
উপভোগ করছিল। দিনের পর দিন। আজ পশ্চিমবঙ্গেও এক শ্রেণীর বাঙালি রূপঙ্করকে বিচারের কাঠগড়ায়
তুলে। তাঁকে সামাজিক ভাবে হেনস্থা করে প্রভুত আনন্দ পাচ্ছে। কারণ তাঁরা মনে করেন। রূপঙ্কর
তাঁদের ভাবাবেগ নিয়ে ছেলেখেলা করেছেন। এই অপরাধের কোন ক্ষমা হয় না। তাঁদের কাছে তাঁদের
প্রিয় শিল্পীর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা, মানুষ খুনের থেকে কম বড়ো অপরাধ নয়।
এই ভাবাবেগই মানুষকে মৌলবাদের দিকে ঠেলে দেয়। মানুষের ভিতরে একটি স্বৈরতান্ত্রিক সত্তার
উত্থান ঘটায়। স্বৈরতান্ত্রিক সেই সত্তাই রূপঙ্করদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করতে
থাকে। রূপঙ্করদেরকে সমাজিক ভাবে হেনস্থা করতে শুরু করে দেয়। রূপঙ্করদের জীবনে চরম দুর্যোগ
নামিয়ে নিয়ে এসে উল্লসিত হয়ে ওঠে। যে উল্লাসের ছবি আমরা নেট জুড়ে সোশ্যাল সাইট জুড়ে
প্রত্যক্ষ করতে বাধ্য হচ্ছি প্রতিদিন। সেই উল্লাস থেকেই মৌলবাদী চেতনার এই স্বৈরতান্ত্রিক
সত্তা রূপঙ্করদের মুখে সেই সব কথাই বসাতে শুরু করে দেয়। রূপঙ্করদের মুখ দিয়ে যেসব কথাই
বার হয় না। ঠিক যেমন। অনেকেই বলছেন। বাঙালি হলে কি অন্য ভাষার গান শোনা যাবে না? আশ্চর্য্য!
একজন সৎ এবং বিচক্ষণ মানুষ রূপঙ্করের ফেসবুক ভিডিয়ো দেখার পরেও কি করে এই রকম মিথ্যা
অভিযোগ তুলতে পারেন। রূপঙ্কর সম্বন্ধে? গোটা ভিডিয়োবার্তায় রূপঙ্কর কোথায় এমন কোন কথা
বলেছেন? যে বাঙালি হলে অন্য ভাষার গান শোনা যাবে না? এই যে মিথ্যাচার। রূপঙ্কর যে কথা
বলেননি। সেই কথাও তাঁর মুখে বসিয়ে দিয়ে তাঁকে অভিযুক্ত করা। এই মিথ্যাচারই মৌলবাদী
মানসিকতা এবং সংস্কৃতির অন্যতম বড়ো আয়ুধ। সমস্ত সন্ত্রাসবাদের জন্ম এই মিথ্যাচারজনিত
প্রচারের ভিতর দিয়েই শুরু হয়। রূপঙ্করের জীবনে বর্তমানে যে সামাজিক সন্ত্রাস নেমে এসেছে।
যে কারণে তাঁকে প্রশাসনের দারস্থ হয়ে পুলিশি প্রহরার সাহায্য নিতে হয়েছে। সেই সামাজিক
সন্ত্রাসের পিছনে এই ধরণের সব মিথ্যাপ্রচারের ভুমিকাই সবেচেয়ে বেশি।
সবচেয়ে
বড়ো কথা। যাঁরা রূপঙ্করের সেই ফেসবুক ভিডিয়োটি দেখেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই জানেন। রূপঙ্কর
তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বিখ্যাত সেই কে কে সম্বন্ধে বলেছিলেন, ওয়াণ্ডারফুল। হি ইজ আ
ওয়াণ্ডারফুল সিঙ্গার। কিন্তু না। অন্ধভক্তির ভাবাবেগের তারণায় মানুষকে যে মিথ্যাচার
করতেই হবে। তাই সেই ভিডিয়োর শ্রোতারাই বেশি করে প্রচার করছেন। রূপঙ্করের অশিল্পীসুলভ
ঔদ্ধত্য। রূপঙ্কর গায়ক কে কে’র প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। জগতবিখ্যাত সেই সঙ্গীতশিল্পীকে
ছোট করেছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ একজনকে ওয়াণ্ডারফুল বলেও যে বলতে পারা যায়, উই আর
ফার বেটার দ্যান হিম। তাতে যে, কাউকে খাটো করা হয় না। এই সামান্য সাধারণ জ্ঞানটাও যে
রূপঙ্কর বিদ্বেষীদের নেই। তেমনটাও নয়। রূপঙ্কর বিদ্বেষী মৌলবাদীরাও খুব ভালো করেই সেকথা
জানেন। কিন্তু জানলে কি হবে। তাঁদের উদ্দেশ্য তো রূপঙ্করের জীবনে বিপর্যয় নামিয়ে নিয়ে
আসা। তাই চালাও মিথ্যাচার। ঢালাও মিথ্যাচার। গোটা ভিডিয়োয় রূপঙ্কর কোথাও পরশ্রীকাতরতার
কোন রকমের ইশারাও করেননি। অথচ নেট জুড়ে এই মিথ্যাবাদীরা সমানে প্রচার করে চলেছে। রূপঙ্কর
পরশ্রীকাতর। রূপঙ্কর হিংসুটে। তার চোখেমুখে হিংসার আগুন। নাহ, এই সবই মিথ্যা অপপ্রচার।
যেটি না করলে। নিজেদের অন্ধভক্তিজনিত ভাবাবেগে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। যেভাবেই হোক সেই
ভাবাবেগকে চরিতার্থ করতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ফলে রূপঙ্কর যে কথা বলেননি। সেই কথাই তাঁর
মুখে বসিয়ে দিয়ে। তাঁকে সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। এটাই সেই মৌলবাদ।
যে মৌলবাদের শিকার বাংলাদেশের নাস্তিক চিন্তাবিদ সাহিত্যিকরা। যে মৌলবাদের শিকার আজকে
গায়ক রূপঙ্কর।
আসলে
রূপঙ্করের উপরে কে কে’র অন্ধভক্তদের সাথে যাঁরা কোনদিন কে কে’র নামও শোনেননি তাঁর জীবৎকালে।
তাঁরাও যে এই রকম হিংস্রভাবে ক্ষেপে উঠেছেন। তার একটি বড়ো কারণ রয়েছে। সেটি রূপঙ্করের
ভিডিয়োবার্তায়, তিনি যেখানে বলেছেন। বোম্বে নিয়ে কিসের এত উত্তেজন? যেখানে তিনি বলেছেন।
আর কতদিন বোম্বের পিছনে ঘুরবেন। নাহ!, বাঙালি এটা আর নিতে পারেনি। না পারার কারণও সেই
অন্ধভক্তিজাত ভাবাবেগ। বাঙালি মাত্রেই এই ভাবাবেগের শিকার। ভারতবর্ষে যা কিছু উন্নত
সংস্কৃতি। তা ঐ বোম্বেতেই। সেই কারণেই লণ্ডন প্যারিস নিউইয়র্কের পর। বাঙালির মক্কা
ঐ বোম্বে। সেই বোম্বের আদব কায়দা সংস্কৃতির নকলনবিশি করেই বাঙালি জাতে উঠতে চায়। বাঙালি
যে রাষ্ট্রের নাগরিক। সেই রাষ্ট্রের সংবিধানের প্রাথমিক ধারাগুলি সম্বন্ধেই বাঙালির
বিশেষ কোন ধারণা নেই। সেই কারণে বাঙালি হিন্দী ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা মানে। আর বাংলাকে
নিতান্ত একটি আঞ্চলিক ভাষা বলে জানে। হিন্দুস্থানী সংস্কৃতি। যার শ্রেষ্ঠতম প্রতিনিধি
ঐ বোম্বে। সেই সংস্কৃতিই বাঙালির ভাবাবেগে জাতীয় সংস্কৃতি। আর আমাদের বঙ্গসংস্কৃতি
নেহাতই একটি ক্ষুদ্র এবং আঞ্চলিক এবং ব্যাকডেটেড সংস্কৃতি। ফলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে
বোম্বাই মার্কা হিন্দী সংস্কৃতির নকলনবিশির ভিতর দিয়েই বাঙালি ভারতবর্ষে জাতে উঠতে
চায়। সেখানেই আত্মপ্রত্যয়হীন বাঙালির আত্মসম্মান রক্ষার মরিয়া প্রয়াস। সেই কারণেই বাঙালি
বাংলা গানের থেকে হিন্দী গানে অধিকতর মোহিত। বাংলার সংস্কৃতির থেকে বোম্বের সংস্কৃতিকে
অধিকতর আপন করে নিতে উদ্যোগী। বাংলার শিল্পীদের থেকে বোম্বের শিল্পীরাও ঠিক সেই কারণেই
এই বাঙালির কাছে অধিকতর প্রিয় মানুষ। কে কে’ সেই প্রিয় মানুষদেরই একজন প্রতিনিধি। ফলে
রূপঙ্কর যখন বলেন। ইউ আর ফার ফার বেটার দ্যান এনি কে কে। তখন আত্মসম্মানবোধহীন বাঙালিদের
কাছে সেটি তাদের প্রাণপ্রিয় বোম্বের সকল শিল্পীদের অসম্মান বলে মনে হয়। অন্ধভক্তিজনিত
ভাবাবেগে তখন যে আঘাতটা লাগে। তাতে মৌলবাদী সংস্কৃতির অন্তরস্থ সেই স্বৈরতন্ত্রিক সত্তাটি
জেগে ওঠে। আর সেটাই তখন রূপঙ্করদেরকে আঘাত করতে উদ্যোত হয়।
ফলে
রূপঙ্কর যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। বাঙালির সামনে সেই প্রশ্নগুলি
তোলা যাবে না। বাঙালির এই মৌলবাদী চেতনার স্বৈরতান্ত্রিক সত্তা সেই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি
হতে রাজি নয়। কোনভাবোই। রূপঙ্করের প্রশ্ন ছিল, বোম্বের শিল্পী ও সংস্কৃতি নিয়ে এত উত্তেজনা
কেন? যে উত্তেজনার উন্মত্ত উন্মাদনার বলি হয়েই প্রাণও হারাতে হলো সেই কে কে’ কে। যাকে
নিয়ে বাঙালি তার নিজের শিল্পীর উপরেই ক্ষেপে উঠেছে। আশ্চর্য্যের বিষয় নয়? না, বাঙালি
জাতি হিসাবে এই প্রশ্নের মুখোমুখই হতে রাজি নয়। কারণ বাঙালির কাছে বোম্বের সংস্কৃতি
জাতীয় সংস্কৃতি। আর বাংলার সংস্কৃতি নেহাতই আঞ্চলিক। যার বিশেষ কোন মূল্যই নেই। কারণ
বাঙালি মাত্রেই জানে। বাঙালি বাদে অন্য কোন জাতি কখনোই বাংলা গান শোনে না। শুনবে না।
বাংলা সিনেমা দেখে না দেখবে না। বাংলা সাহিত্য পড়ে না পড়বে না। তার থেকেও বড়ো কথা।
ভারতের অন্য কোন জাতিই বঙ্গসংস্কৃতির অনুসরণ করে না। অনুকরণ করা তো দূরের কথা। এই সব
কারণেই বাঙালির কাছেই বাংলার সংস্কৃতি আজ অপছন্দের। ভারতবর্ষে যে সংস্কৃতির কানাকড়ি
মূল্য নেই। বাঙালিই বা কেন সেই সংস্কৃতি নিয়ে পড়ে থাকবে? এই কারণেই বাঙালি স্বাধীনতার
পর থেকে বোম্বের পায়ে হত্যে দিয়ে পড়ে রয়েছে। আর সেই বোম্বাই সংস্কৃতির নকলনবিশি করে
ভারতীয় হয়ে ওঠার সাধনায় নেমেছে। এটাই বাঙালির কাছে মানুষ হয়ে ওঠার পথ। ফলে বাঙালির কাছে কেউ যদি প্রশ্ন তোলে। বোম্বের পিছনে
আর কতদিন ঘুরবেন। সে’তো বাঙালির কাছে খলনায়ক হয়েই দেখা দেবে। তাই না?
এখানেই রূপঙ্করের প্রথম অপরাধ। আর সেই অপরাধ ক্ষমাহীন অপরাধে গিয়ে পৌঁছিয়েছে। রূপঙ্কর যখন প্রশ্ন করেছেন, হু ইজ কে কে? অন্ধভক্তি জনিত ভাবাবেগে আঘাত দিয়ে ফেলেছেন রূপঙ্কর। এ হলো সেই বাঙালি মুসলিমের কাছে নবীর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলার মতো ব্যাপার। হিন্দী ভাষা ও হিন্দুস্তানী সংস্কৃতির অন্ধভক্ত এবং অটল স্তাবকদের যে বাঙালি প্রজন্ম। সেই প্রজন্মের হৃদয়ের ধন কে কে’র শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই প্রশ্ন? না, ভাবাবেগ প্লাবিত মৌলবাদী চেতনার পক্ষে এত বড়ো অপরাধের কোন ক্ষমা হয় না। ফলে এই মৌলবাদী চেতনার স্বৈরতান্ত্রিক সত্তাই তখন রূপঙ্করের বিচারসভা বসিয়ে দিয়েছে গোটা সোশ্যাল সাইট জুড়ে। আর এখানেই বাঙালির আসল পরিচয়। রাজা তোর কাপড় কোথায়। এই কথাটুকু বলার মতোও আর কেউ নেই এই বাংলায়। কারণ সকলেরই আজ কাপড় খুলে গিয়েছে। কে কার কাপড়ের খোঁজ করবে? একটা গোটা জাতি’র উলঙ্গ স্বরূপ দেখা যাচ্ছে নেটদুনিয়া জুড়ে। এই উলঙ্গ সত্তার উন্মত্ত উল্লাসের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে যুক্তি বুদ্ধি রুচি শিক্ষা ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই যেকোন ধরণের মৌলবাদী সংস্কৃতির এটাই আশু পরিণাম। কাঁটাতারের এপারে হোক। ওপারে হোক। বাঙালির আজ কাপড় নাই। তার থেকেও বড়ো কথা। কাপড়ের এই অভাবটুকু বোধ করার মতো বোধশক্তিও আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ন্যূনতম লজ্জাবোধই যার নাই। তার আর কিসের ভয়। তখনই সে উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে। হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। যাঁকেই সে তার ভাবাবেগের পথে বাধা স্বরূপ মনে করবে। তার উপরেই নামিয়ে আনবে আক্রোশ আর ঘৃণা। তা সে নাস্তিক ব্লগার হোক। তসলিমা কিংবা হুমায়ুন আজাদ হোক। আর রূপঙ্কর। সাংবাদিক সম্মেলন করে রূপঙ্কর তাই অব্যক্ত যন্ত্রণায় আশ্চর্য্য হয়ে বলতে বাধ্য হলেন। ‘এত ঘৃণা, এত আক্রোশ”!
৬ই
জুন’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

