কবিতার ভালো মন্দ

 

কবিতার ভালো মন্দ হয় কি? না বোধহয়। কবিতা শুধু কবিতাই। আর কবিতা না হলে তা অকবিতা। স্থান কাল পাত্র এবং জাতি ধর্ম দেশ নিরপেক্ষ ভাবে। চিরকালই কবিতা মুষ্টিমেয় মানুষের চর্চার বিষয়। কবি এবং পাঠক উভয়ই সংখ্যালঘু। আমাদের বাংলায় কবিতার অবস্থানটুকু ঠিক কি রকম? অন্তত প্রচলিত ধারণায়, বাঙালি মাত্রেই প্রায় কবি। শুনতে খটকা লাগলে বরং বলা যেতে পারে, অধিকাংশ বাঙালিই কবিতা প্রেমী। এই যে একটি প্রচলিত ধারণা। বাঙালির কবিতাপ্রেম প্রায় সর্বজনীন। এর বাস্তব সত্যতা ঠিক কতটুকু? এর সঠিক উত্তর দেওয়া নিশ্চয় সহজ কথা নয়। কিন্তু একথাও ঠিক। ‘আপনি কি করেন?’ এরকম প্রশ্নের উত্তরে কোন বাঙালির মুখে যদি শোনা যায়, ‘আমি কবিতা লিখি’। তবে যিনি সেই কথা বলবেন। মানুষের সমাজে তার সম্বন্ধে খুব একটা উঁচু ধারণা হবে কি? আমি কিংবা আপনি, সকলেই কিন্তু এই বিষয়ে একমত। শুধুমাত্র কবিতা লেখা কারুর পরিচিতি হতে পারে না। একটা মানুষ যদি সারাজীবন শুধু কবিতাই লিখে যান, তবে সমাজের চোখে। অন্তত বাংলার সমাজ মানসিকতায় তিনি সোজা ভাষায় ‘নিষ্কর্মা’ বলেই গণ্য হবেন। কিন্তু, নানাবিধ পেশায় দক্ষতার সাথে কর্মজীবন যাপনের সাথে সাথে কবিতার চর্চা করলে। তাঁকে কবি বলে মেনে নিতে আমাদের বাধা নেই। কিন্তু কোন নিষ্কর্মাকে কবি বলে মেনে নিতে বাঙালির অসুবিধে রয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই কবিতার চর্চা, কবিতা লেখা। কারুর পেশা হতে পারে না। শুধুমাত্র কবিতার প্রকাশিত বইয়ের রয়ালটি’র উপর নির্ভর করে একজন কবি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়র উকিল অধ্যাপকের মতো স্বাধীন জীবন যাপন করছেন। এমন ঘটনা বাংলার সমাজে বিরল। এই যে একটি মহাসত্য, এর পিছনের মূল কারণটা কিন্তু আমরাই। দৈন্দিন খরচের খাতায় আমাদের কারুর হিসাবেই কবিতার বই ধরা থাকে না। তাই বলে কি আমরা কবিতার বই কিনি না? কিনি, কদাচিৎ। কিনলেও কয়টি কবিতা পড়ে দেখি? পড়লেও। কতুটুকু সময়ে আমরা কবিতার ভিতরে বসবাস করি? অধিকাংশ বাঙালির কাছেই কবিতার বই কেনা, একটি বাজে খরচ। এবং কবিতার বই পড়া বাজে সময় নষ্ট।

 

আমাদের দৈন্দিন জীবনের ধারে কাছে কোথাও কবিতা নেই। এবং এমন নিদারুণ ভাবেই নেই যে, আমরা জানিই না ‘কবিতা কাকে বলে’। সরাসরি ভাবে তার দুইটি প্রভাব পড়ে সমাজে। এক, কবিতা লেখা কারুর পেশা হতে পারে না। শুধুমাত্র কবিতা লিখে কেউ জীবনধারণ করতে পারে না। আর, কবিতার বদলে ‘অকবিতা’কেই আমরা অধিকাংশ মানুষ কবিতা বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে দিই। এই অবস্থা কেবল মাত্র এই শতকের নয়। এই অবস্থা পূর্ববর্তী সকল শতকেই বিদ্যমান ছিল। ফলে বলা যেতে পারে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কবিতার অবস্থান কোন যুগেই বলার মতো ছিল না। আর ঐতিহাসিক ভাবে সেটাই যদি শেষ সত্য হয়। তবে মানুষের জীবনে কবিতার অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে পরিতাপ করার কোন মানেও হয় না। এমনটাই তো হওয়ার কথা। কবিতা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নয়। যদি হতো। তবে তা এমন মহার্ঘ্য হতো না। কবিতা চিরকালেই মহার্ঘ্য। এমনকি যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের গর্বের কোন শেষ নেই। সেই বিশ্বকবিও বহু অকবিতা লিখে বসে রয়েছেন। ‘দুই বিঘা জমি’, দেবতার গ্রাস’, বীর পুরুষ’র মতো তাঁর অকবিতাগুলিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার কারণ সেই একই। আমরা অধিকাংশ মানুষ জানিই না ‘কবিতা কাকে বলে’। হয়তো বলা ভালো জানতে চাইও না। হয়তো সেই অনীহাতেই আহত হয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ বলেই ফেলেছিলেন। ‘বাঙালি স্বঃভাবতই কবিতা বিমুখ’। হ্যাঁ মাত্র কিছুদিন আগে যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। সেই শঙ্খ ঘোষেরই কথা এইটি। বাঙালির কবিতা প্রেমের মিথকে ভেঙে তছনছ করে দিয়ে, এই অমোঘ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গিয়েছেন, আর কেউ নন। স্বয়ং শঙ্খ ঘোষ। আজীবন কবিতার সাথে বসবাস করে, এই তার বাঙালির কবিতা প্রেম সম্বন্ধে মূল উপলব্ধি।

 

শঙ্খ ঘোষের কন্ঠে এই সত্য যখন উচ্চারিত হচ্ছিল। আশির দশকের সেই সময়। কোথায় ইন্টারনেট। কোথায় সোশ্যাল মিডিয়া। আর কোথায় মুঠোয় মুঠোয় স্মার্ট ফোন! আজকের মতো ভার্চ্যুয়াল ওয়াল জুড়ে অকবিতার এমন সুনামি আছড়িয়ে পড়া শুরু হয়নি তখন। আজকের মতো, কয়েক লাইন মনের কথা, ভাবনার কথা, আবেগের কথা লিখে ফেললেই ওয়ালে ওয়ালে ব্লগে ব্লগে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না তখনো। আজকের মতো ঘরে ঘরে স্বঘোষিত কবির সংক্রমণ ছিল না সেই সময়ে। তখনো পত্রিকার পাতা জুড়ে কবিতার সাথে এমন বন্যার মতো অকবিতার প্লাবন শুরু হয়নি। বহু ঘরেই ডায়রির পাতায় পাতায় অক্ষম হাতের ভালোবাসায় জন্ম হওয়া অকবিতার স্থান হতো নীরবে নিভৃতে। প্রকাশিত কবিতার প্রাঙ্গণ তখন অনেক সমৃদ্ধ ছিল। শুধু ছিল না পাঠকের কাম্য সান্নিধ্য। সেই সান্নিধ্যের অভাবই পীড়িত করেছিল। আমাদের কবিকে। গভীর দুঃখের সাথে। নিদারুণ যন্ত্রণার সাথে। ফলে এইকথা বলার কোন জায়গা নেই। ইন্টারনেট বিপ্লবের সুযোগে আজকের এই অকবিতার সুনামিই বাঙালির কবিতা বিমুখতার কারণ। বাঙালির কবিতা বিমুখতার কারণগুলি কবি শঙ্খ ঘোষ, আশির দশকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া ‘আমাদের কবিতা পড়া’ শীর্ষক তাঁর বক্তৃতায় অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন। যে বক্তৃতাতেই তিনি সেই অমোঘ সত্যকে সকলের সামনে তুলে ধরে ছিলেন, ‘স্বভাবতই বাঙালি কবিতা বিমুখ’।

 

আজকে যাঁরা কবিতা লিখছেন। বলা ভালো তাঁদের কবিতাগুলি হারিয়ে যাচ্ছে অকবিতার সুনামিতে। স্যোশাল মিডিয়া, ব্লগ আর ওয়েবসাইট জুড়ে মূলত অকবিতার প্রাবন। কে কবি আর কে কবি নন। ঘুলিয়ে যাচ্ছে সব সীমারেখা। জনপ্রিয়তাই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। পরিচয়ও নয়। শ্রেষ্ঠত্বের একটিই মাপকাঠি। সেটি সাহিত্যিক উৎকর্ষতা। বহু সাধনায়, সেই উৎকর্ষতার নাগাল পাওয়া যায়। কাগজ কলম কালি, টাচ ফোন, ডেস্কটপ ল্যাপটপ কোলে টেনে নিয়ে বসে পড়লেই সেই উৎকর্ষতায় পৌঁছানো যায় না। অনেকেরই ধারণা, আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশেই কবিতার জন্ম। অনেকেরই ধারণা মনের কথা ছন্দে তালে প্রকাশ করতে পারলেই কবিতা লেখা হয়ে যায়। অনেকেই ভাবেন দশটা পাঁচটা কবিতা পড়ে নিলেই। আর একটি কবিতা লিখে ফেলা যায়। অনেকেই বিশ্বাস করেন। কবিতা ভালোবাসলেই কবিতা লেখা যায়। অনেকেই বলতে পারেন। কবিতা হোক না হোক। এই যদি প্রকৃত চিত্র হয়। তবে বাঙালি নিশ্চয় কবিতা বিমুখ জাতি নয়। বরং এই চিত্রই প্রমাণ করে বাঙালি মাত্রেই কবিতাপ্রেমী। আর এইখানেই মূল সমস্যা। আমরা ভুলে যাই। কবিতা আর অকবিতার সীমারেখা। আমরা ভুলে যাই কবি আর অকবি’র সীমারেখা। আমরা ভুলে যাই, কবিতার চর্চা আর  কবিতার প্রকাশ নিয়ে নাচানাচি এক কথা নয়। আমরা ভুলে যাই, কবিতা চর্চার থেকে আমরা শতমাইল দূরে থাকতেই ভালোবাসি। আমরা ভুলে যাই, সোশ্যালসাইটে প্রতিদিন কবিতা প্রকাশ করার হাত ধরে আসলে আমরা একটা সামাজিক পরিচিতি গড়ে তোলায় মগ্ন। কবিতাচর্চার ভুবনের সাথে যার কোন রকম সংযোগ নেই। সংযোগ নেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের সাথে কবিতাচর্চারও।

 

এইখানে পৌঁছিয়ে কেউ বলতেই পারেন। কবিতা লেখা কবিতা পড়া। কবিতাচর্চার ভুবন সকলের জন্য নয়। খুব সঠিক কথা। সেটাই সামাজিক বাস্তব। এবং সত্য। কিন্তু একথাও সমান সত্য। কবিতাচর্চার ভুবন যত বেশি সংরক্ষিত সীমারেখায় বদ্ধ থাকবে। একটি জাতির সংস্কৃতি কৃষ্টি তত বেশি অপুষ্টির শিকার হবে। ফলে আমরা আসলেই একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতে রয়েছি। একদিকে কবিতাচর্চার ভুবন। সংরক্ষিত সীমারেখায় যা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে অকবিতার ব্যাপক জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি।

 

একথাও ঠিক। আজকে যাঁরা সত্য অর্থেই কবিতাচর্চার সাধনায় মগ্ন। তাঁরা কোনভাবেই সংগঠিত নন। প্রত্যেকেই এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো আপন সাধনায় মগ্ন। উল্টোদিকে অকবিতার কাণ্ডারীরা অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। তাঁরা ক্রমাগত জনপ্রিয়তার একটা নেটওয়ার্ক তৈরী করে চলেছেন। এক একটি গোষ্ঠী। আর নতুন নতুন নেটওয়ার্ক। সেখানে পরস্পর পিঠচাপড়ানি থেকে শুরু করে কখন কাকে কবি থেকে সভাকবি। কবি থেকে মহাকবি হিসাবে তুলে ধরা হবে। সেই রাজনীতির বিস্তৃত প্রসার। এর সাথে আবার, কে শাসকদলের কবি। কে বিরোধী দলের কবি। কারা রাজধানীর কবি। কারা মফঃস্বলের কবি। নানান রকমের হিসাব নিকাশ। নানারকম বিভাজন নিয়েও একটা বৃহত্তর সংঘবদ্ধতা। সকলেরই লক্ষ একটাই। স্পটলাইটের আলোয় থাকতে হবে। ক্যামেরার ফোকাসের বৃত্তে ঘুরতে হবে। তবেই একজন কবি। তবেই না কবিতা লেখার সার্থকতা।

 

না, তাই বলে যাঁরা নিভৃতে নীরবে কবিতাচর্চার সাধনায় মগ্ন। তাঁদেরকেও এমন ভাবেই সংঘবদ্ধ হয়ে অকবিতার সুনামির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দেওয়াল তুলে ধরতে হবে। এমন দাবি করারও বিশেষ কোন অর্থ হয় না। একজন সৃষ্টিশীল সৃজনশীল ব্যক্তি সাংগঠনিক শক্তিরও অধিকারী হবেন। এমন কোন দাবি করাও সঙ্গত নয়। তবুও কিছু কথা তো থেকেই যায়। সাদাকে সাদা। কালো কে কালো বলার মতে সৎসাহসটুকু অন্তত সকলেরই থাকা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমী। আপনার চারপাশে কোথায় অকবিতা নিয়ে নাচানাচি বেশি হচ্ছে। সেই বিষয়টুকু অন্তত সর্বসমক্ষে তুলে ধরাটুকু একজন কবির কাছ থেকেই প্রত্যাশিত। সেই সাথেই এইটুকুও প্রত্যাশিত। কবিতাচর্চার ভুবনটুকুকে আপন সাধ্য মতো বিস্তৃত করাই যে এই সময়ের সবচেযে জরুরী লড়াই। সেই চেতনাটুকুর প্রসার ঘটানোও একজন কবির কাছে বেশি করে প্রত্যাশিত। আর এইটুকু ভুমিকা পালন করতে করতেই হয়তো গড়ে উঠতে পারে একটা সঙ্ঘবদ্ধতা। যে সঙ্ঘবদ্ধতার হাত ধরে একে একে সামিল হতে পারেন, আরও যাঁরা কবিতাচর্চার সাধনায় ব্যাপৃত। এবং এই করেই হয়তো তৈরী হয়ে যেতে পারে প্রকৃত কবিতাচর্চার একটা বৃহত্তর প্রাঙ্গণ। এক এবং একাধিক প্রাঙ্গণ। যেখানে শুধুই যে কবিতার চর্চা বিস্তৃত হতে থাকবে তাই নয়। কবিতা আর অকবিতার ভিতরের সীমারেখাটাও আরও বেশি করে সুস্পষ্ট হতে থাকবে বৃহত্তর সমাজদেহে। আর সেইটুকুই এই সময়ে। এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অধিকতর জরুরী। অকবিতার এবং অকবির সংক্রমণের বিরুদ্ধে একমাত্র জরুরী প্রতিষেধক।

 

২৩শে জুলাই ২০২৩

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত