বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি



বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি

ভারতবর্ষের সংস্কৃতি বহুত্ববাদের সংস্কৃতি। নানা বর্ণ নানা ধর্ম ও বহু জাতির পারস্পরিক সহাবস্থানের এক আবহমান সংস্কৃতি নিয়েই বৃহত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি। ঠিক ইউরোপের মতোই। ইউরোপের সাথে একটাই তফাৎ, সেখানে প্রতিটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। ভারতবর্ষে সেটি নাই। ভারতবর্ষ একটি রাস্ট্র হিসাবেই এতগুলি বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের উপর শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করছে। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি ভারতীয়ই এক ও অভিন্ন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক নয় আদৌ। এটাই ভারতীয় বহুত্ববাদ। যেখানে ভারতীয় নাগরিকরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের বিভিন্নতা নিয়েই পরস্পরের সাথে সহাবস্থানে থাকতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে বিজেপি সরকারের আমলে যে হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের এক জিগির উঠেছে, সেটি এই বহুত্ববাদকেই নস্যাৎ করে দিতে চাইছে। প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এক ভাষা এক ধর্ম এক জাতির রাষ্ট্রীয় রূপকে। যেখানে যার যাই মাতৃভাষা হোক না কেন, হিন্দীই হবে প্রতিটি নাগরিকের জাতীয় ভাষা। যার ধর্ম যাই হোক না কেন, প্রত্যেককেই ভারত মাতা কি জয় বলে ভারতীয় হিন্দুত্বকেই ভারতীয় জীবনশৈলী বলে মেনে নিয়ে চলতে হবে। আর সেই হিন্দুত্বই হবে ভারতীয় জাতীয়তা। যার থেকে বিচ্যুতি মানেই দেশদ্রোহীতার নামান্তর। এই ভাবে বহুত্ববাদকে চুর্ণ করে হিন্দুত্ববাদ চাপিয়ে দেওয়ার একটি সার্বিক পরিকল্পনা নিয়েই বিজেপির ক্ষমতা দখল।

ব্রিটিশের তৈরী করে দিয়ে যাওয়া মানচিত্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিভিন্ন জাতির স্বধীনতা ও সর্বাভৌমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নি। ফলে ভারতীয় নাগরিক হয়েই বিভিন্ন জাতিকে বিসর্জন দিতে হয়েছে আপন জাতীয়তার সার্বভৌমতাকেই। বিজেপির কুশীলবরা হয়তো ঠিক এইসূত্র ধরেই এগোতে চাইছেন বলে মনে হয়। পাঞ্জাবী মারাঠী তামিল তেলেগু কাশ্মীরি বিহারী বাঙালি মনিপুরী প্রভৃতি প্রতিটি জাতিই যদি নিজেদের জাত্যাভিমান বিসর্জন দিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্বকেই তার নাগরিকত্ব বলে মেনে নিতে পারে, তাহলে এরা প্রত্যেইকেই বা নিজ ধর্ম নিজ ভাষা নিজের সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে হিন্দুত্ব ও হিন্দীকে মেনে নেবে না কেন? ভারতীয় জাতিগুলি যদি নিজেদের জাত্যাভিমানের উর্ধেই উঠতে পারে, তবে তারা নিজেদের সাম্প্রদায়িকতার ও সংস্কৃতির উর্ধেই বা উঠতে পারবে না কেন? এটাই হয়তো বিজেপির দর্শনের মূল কথা। ঠিক এইকারণেই বিজেপির ভারত মানেই রামজন্মভুমি। বিজেপির ভারত মানেই দেবনাগরী লিপির হিন্দী। বিজেপির ভারত মানেই সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ব। বিজেপির দেশপ্রেম মানেই হিন্দুত্বের কাছে আত্মসমর্পন।

এখন ভারতবর্ষের জীবনশৈলীতে সাম্প্রদায়িক ধর্মের প্রভাব এমনই সর্বাত্মক যে ধর্মকে হাতিয়ার করতে পারলেই কার্যসিদ্ধির দরজা খুলে দেওয়া সহজ হয়ে ওঠে। জনসংখ্যার ভিত্তিতেই বিজেপির এই হিন্দুত্ব দর্শন এই কারণেই অধিকাংশ ভারতবাসীর সমর্থন পেয়ে যায়। বিশেষত যে মানুষ যত বেশি পরধর্ম বিদ্বেষী সেই মানুষ হিন্দু হলেই তত বেশি করেই বিজেপির চাপিয়ে দেওয়া এই হিন্দুত্ব দর্শনের সমর্থক হয়ে যাবে। এবং হয়েওছে ঠিক তাই। এইটাই বিজেপির রাজনৈতিক লাইন। কংগ্রেসের ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভারতব্যাপী হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার এই ছক নিয়েই ভবিষ্যতের রাজনীতির পাশা খেলায় অবতীর্ণ বিজেপি। না, এটা যে বিজেপির একেবারেই সাম্প্রতিক রূপ তাও নয়। হিন্দুত্বের এই দর্শনের মধ্যেই জন্ম হলেও এটাকেই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে তোলার প্রক্রিয়াটা কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা। আর এইখানেই অটল বিহারী বাজপেয়ী লালকৃষ্ণ আদবানীদের বিজেপি থেকে অমিত শাহ মোদীদের বিজেপির পার্থক্য। 

দেশের জনসাধারণকে ধর্ম ও ধর্মীয় সংঘাতের মধ্যেই ক্রমাগত আবর্তিত করে রাখতে পারলে শাসক ও শিল্পমহলের কাজগুলিকে নিজেদের স্বার্থের অভিমুখে দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত সহজ হয়। ঠিক এই কারণেই বিজেপির এই হিন্দুত্ব দর্শনের পেছনে শিল্পমহলের নিরঙ্কুশ সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত। পারস্পরিক দেওয়া নেওয়ার ভিত্তিতে দেশের সম্পদের অবাধ লুঠপাট অত্যন্ত সহজ হয়ে ওঠে। বিগত চার বছরে ভারতীয় অর্থনীতির রীতিনীতির গতি প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য রাখলেই এই সত্য সুস্পষ্ট ধরা পড়ে। জনসাধারণকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আসল স্বরূপ বুঝতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সবসময়ে জন্যে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে রাখার সব চাইতে কার্যকরি উপায়ই হলো ধর্মের তাসগুলি ঠিকঠাক ফেলতে থাকা। এবং তার সাথে মাঝে মধ্যেই বহির্শত্রুর আক্রমণের সম্ভাবনাগুলিকে রীতিমত খুঁচিয়ে তুলতে পারলে তো আর কথাই নাই।

যে কোন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের যুবশক্তির উপরেই। কিভাবে সেই শক্তিকে মানবসম্পদে পরিণত করা যায়, তার পরিকাঠামোর উৎকর্ষতা কার্যকারিতা ও সঠিক পরিকল্পনার উপরেই নির্ভর করে যুবশক্তির মানবসম্পদে উত্তীর্ণ হওয়া না হওয়া। আমরা যদি ইউরোপ আমেরিকার দিকে তাকাই, চীন জাপান কোরিয়ার দিকে তাকাই, তাহলেই এই সত্য অনুধাবন করতে পারবো। অথচ সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতির দিগন্তে ঠিক এর বিপ্রতীপ চিত্রই কি দেখা যাচ্ছে না? যুবশক্তিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে গোমাতা রক্ষার কাজে। যুবশক্তিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে রামনবমীর অস্ত্র মিছিলের দিকে। যুবশক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে। ভারতবর্ষ ব্যাপি এই বৃহৎ যুবশক্তি দেশের উন্নয়নের কোন কাজে লাগবে? তাদের বিদ্যা নাই, কারণ লেখাপড়ার খরচ কেবলমাত্র ধনী ও উচ্চবিত্তরাই বহন করতে পারবে। সরকার শিক্ষাখাতে দান খয়রাতে রাজি নয়। তাদের চাকরি নাই, কারণ কারিগরী বিদ্যার অভাব। কারণ সরকারী চাকরির ক্ষেত্র দিনে দিনে সঙ্কুচিত করে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে এই বৃহৎ যুবশক্তি করবেটা কি? কেন, তারা গোমাতা রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠবে। কোথায় কোন মূর্তি ভাঙতে হবে সেটা দেখবে। রামনবমীতে দেদার অস্ত্র নিয়ে নাচানাচি করতে করতে মিছিল করে এগিয়ে যাবে। কোথায় কোন সিনেমায় কোন দেবদেবীর অসম্মান হচ্ছে, কি কোনো কল্পনিক চরিত্রের হিন্দুত্ব রক্ষা হচ্ছে না ঠিক মতো, তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে। ধর্ষক বাবজীদের সমর্থনে যানবাহন জ্বালিয়ে দেবে। ধর্ষক নেতাদেরকে আইনের হাত থেকে বাঁচাতে গণতান্ত্রিক মিছিলে প্রতিবাদে সামিল হবে। তাদের হাতেই তো হিন্দুত্ব রক্ষার ভার। সেসব করে সন্ধ্যায় আপিএলে মত্ত হয়ে উঠবে। বাউণ্ডারি ওভার বাউণ্ডারীতে বাজি ফাটাবে। এই যুবশক্তির কাজের কি আর শেষ আছে? অবসর কোথায়? আর নিজের বুদ্ধিমত্তা ও সাহস অনুসারে তোলাবাজি করে রোজগার করবে।

এইভাবেই হিন্দুত্বই সারা ভারতের জীবনশৈলী হয়ে উঠবে একদিন। এটাই বিজেপির নীতি। বহুত্ববাদী ভারতবর্ষ বাঁধা পড়বে হিন্দুত্বের শৃঙ্খলে। বহু ভাষার দেশ দিনে দিনে একভাষার দেশ হয়ে উঠবে হিন্দীকেই আপন ভাষা করে নিয়ে। রামনবমী হনুমান জয়ন্তী গনেশ পুজো দশেরা দেওয়ালি এইগুলিই একমাত্র হিন্দু উৎসব হয়ে উঠবে সারা ভারতব্যাপি। এসবের বাইরে কোন উৎসবই  আর স্বদেশী উৎসব থাকবে না। হিন্দু মাত্রেই এক। কিন্তু জাতপাত থাকবে। দলিত ঠ্যাঙানো থাকবে। শোষণ থাকবে।  মাল্যদের হাতে মোদীদের হাতে সরকারী অর্থ সম্পদের লুঠপাট চলতে থাকবে। আম্বানি আদানিরা বিশ্ব ধনীদের তালিকায় ক্রমাগত উপরের দিকে উঠতে থাকবে। সরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলি জলের দরে বেসরকারী মালিকানাধীন হয়ে যেতে থাকবে ক্রমান্বয়ে। বহুজাতিক সংস্থাগুলি আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে ভারতবর্ষের সম্পদের উপর মালিকানা অর্জন করে। নেতানেত্রীদের সুইস ব্যাঙ্ক ভরতে থাকবে ঠিক আগের সরকারগুলির আমলের মতোই। আর আপনি দিন গুনতে থাকবেন কবে পনেরো লক্ষ টাকার চেক জমা পড়বে আপনার ব্যাংক একাউন্টে। বুদ্ধিমানরা রাজনীতিতে উন্নতি করবে। জনগণের টাকাকে নিজের করে নেবে। যার নাম দেবে জনসেবা। আর দুস্কৃতীরা রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকবে। ওদিকে জনগণ প্রতিদিনের জীবনশৈলীতে হিন্দুত্বের জয়গান গেয়ে দেশপ্রেমী হয়ে উঠবে। এর বাইরে যারা পড়ে থাকবে, তারাই দেশদ্রোহী। বেকুব এবং জনবিচ্ছিন্ন।

ফলে বিজেপির অর্থনীতি আর কংগ্রেসের অর্থনীতির মধ্যে আপনি শত চেষ্টা করেও কোন ফারাক খুঁজে পাবেন না। দুই জামানার শিল্পনীতি বিদেশনীতি শিক্ষানীতি স্বাস্থ্যনীতি পরস্পরের জেরক্স কপি বলেই মনে হবে আপনার। ফারাক খুঁজে পাবেন শুধু নামাবলীতে। কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতার নামাবলী ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া সাম্প্রদায়িক বিজেপির হিন্দুত্বের নগ্ন চেহাড়াটাই দাঁড়িয়ে থাকবে শুধু আপনার দৃষ্টি জুড়ে। বাইরে পড়ে থাকবে উচ্ছৃষ্ট ভারতবর্ষ।

৮ই মে ২০১৮

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত