ভানুমতীর খেল
চীনের করোনা ভাইরাস আর ভারতে ব্যাঙ্ক
লুঠের ভাইরাস। আইএল অ্যাণ্ড এফএস, ডিএইচএফএল এর মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পর পিএমসি
ব্যাঙ্ক। এবার ইয়েস ব্যাঙ্ক। এই প্রতিষ্ঠানগুলিই শুধু নয়, পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কসহ
আরও বহু সরকারী ব্যাঙ্ক থেকেও হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠ হয়ে গিয়েছে বিগত ছয় বছরে।
বস্তুত ব্যাঙ্ক লুঠের এই ঘটনাগুলি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুপরিকল্পনা প্রসূত সংগঠিত
অপরাধ। আর দেশবাসীর নজরকে এই অপরাধের দিক থেকে সরিয়ে রাখার জন্যই দেশব্যাপি এনআরসি
সহ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ইত্যাদি সামনে নিয়ে আসা। জনতাকে নিরন্তর সরকারী লাইনে দাঁড়
করিয়ে রাখতে পারলে, জনতা কিন্তু সরকারের কাছে তার কাজের কৈফিয়ত দাবি করার অবসর পাবে
না। সরকার সেকথা খুব ভালো ভাবেই জানে। আর সেই ফাঁকে একের পর এক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও
ব্যাঙ্ক থেকে আমানতকারীদের টাকা লুঠ হয়ে যেতেই থাকবে। এটাই এখন এদেশের অধুনিকতম ট্রেণ্ড।
দেশের সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণের ও দেশের সম্পত্তি রক্ষা
করার। সরকার যদি সেই কাজকে প্রধান বলে মনে করে, তাহলে এইভাবে জনসম্পত্তি লুঠের কারবার
চলতে পারে না। সরকারের নানান দপ্তর রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর নজরদারী চালানোর।
সরকারী ব্যাঙ্কগুলির কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের অর্থাৎ জনতার স্বার্থ সুরক্ষিত
রাখা। এরা এদের দায়িত্বগুলি ঠিকমত পালন করলেই কিন্তু কোনভাবে এইরকম অবাধে লুঠপাট চালানো
যেত না। অর্থাৎ সর্ষের ভিতেরই ভুতের অধিষ্ঠান ঘটে গিয়েছে। সেকথা বুঝতে অর্থনীতির ণত্ব
ষত্ব জানার দরকার নাই। সাধারণ জ্ঞান থাকাই যথেষ্ঠ।
এখন দেখে নেওয়া যাক, সাম্প্রতিক ঘটনায় ইয়েস ব্যাঙ্কের আমানতকারীদের
টাকা কার কার ঘরে গিয়ে উঠলো। সংবাদসূত্রে প্রকাশ ইয়েস ব্যাঙ্কের একত্রিশ হাজার কোটি
টাকা উঠেছে অনিল আম্বানী গোষ্ঠীর ঘরে। অর্থাৎ এই পরিমান অর্থ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে
সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সুদসহ আর ফেরত দেয়নি। সাধারণ গৃহস্থ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে না ফেরত
দিলে, ব্যাঙ্ক গৃহস্থের সম্পত্তি ক্রোক করে ঋণ উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। করে বলেই
ব্যাঙ্কে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত থাকে। ব্যাঙ্কের ব্যাবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হতে
হয় না। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ব্যাঙ্ক অন্যান্য ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে যে
যে ব্যবস্থা নেয় অনিল আম্বানী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তার কিছুই গ্রহণ করেনি। ফলে অনাদায়
ঋণের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ৩১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ব্যাঙ্ক কেন এই
অনাদায় ঋণ উদ্ধারের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি?
এই প্রশ্ন করার কোন অর্থই হয় না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে। কারণ ভারতবাসী মাত্রেই
জানে, সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠত রাজনৈতিক দলের নেতা মন্ত্রীদের সাথে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর
আত্মীয়তার কথা। এই প্রসঙ্গে রাফায়েল দূর্নীতির অভিযোগই এই আত্মীয়তার প্রমাণ। ফলে এই
গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা কোন ব্যঙ্কের পক্ষেই নেওয়া সম্ভব নয়। তাতে ব্যাঙ্ক পথে
বসলেও। এরপর আছে এসেল গোষ্ঠী। তার নেওয়া ঋণের পরিমাণ তিনহাজার তিনশো কোটি টাকা। এই
গোষ্ঠীর নামও সরকারী দলের সাথে জড়িয়ে থাকে। এছাড়া অন্যান বড়ো বড়ো যে কোম্পানীগুলি ইয়েস
ব্যাঙ্ক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর শোধ করেনি, তার সামগ্রিক পরিমাণ প্রায়
আরও ১৬ হাজার কোটি টাকা। একথা অনুমান করতে কষ্ট হয় না, বাকি প্রতিষ্ঠানগুলিও সরকারের
গুড বুকে থাকায়, এইভাবে সংগঠিত ভাবে ব্যাঙ্কলুঠ সম্ভব হয়েছে।
না এই লুঠ এখানেই শেষ হয়ে যাবে না। নানান বেশে নানাবিধ উপায়ে
এই লুঠ অবাধে চলতেই থাকবে। থাকবে, কারণ দেশবাসীকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি,
নাগরিকত্ব থাকা না থাকা, হুজুগে জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নানান উপায়ে বশীভুত করে ব্যস্ত
রাখা হয়েছে। আর সংগঠিত ব্যাঙ্ক লুঠের কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত
ভাবে। বিগত ছয় বছরে সরকারী বেসরকারী ব্যাঙ্কসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অবাধে
লুঠপাট চালিয়ে দেশবাসীর আমানত করা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পপতির
পকেটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খবরে প্রকাশ এইরকম আঠাশ জন শিল্পপতির ভিতর সাতাশজনই গুজরাটী।
আর তখনই মূল অঙ্কটা বুঝতে অসুবিধে থাকার কথা নয়। যদি প্রকৃত অর্থেই দেশকে ভালোবাসা
যায়। বা দেশপ্রেমিক হওয়া যায়। দেশব্যাপি দেশপ্রমের হুজুগে সাম্প্রদায়িক স্লোগান তুলে
দিয়ে তলায় তলায় এহেন দেশবিরোধী চক্রান্তগুলি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিণামেই একের পর এক
ব্যাঙ্ক সহ নানান আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পথে বসে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলি ঘটা সম্ভব হচ্ছে।
এবং এই সংগঠিত অপরাধ এই গতিতে চলতে থাকলে, অচিরেই দেশের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ
ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। তার সরাসরি প্রভাবে দেশব্যাপি তুমুল অস্থিরতা ও হাহাকার শুরু হয়ে
যাবে। সাধারণ দৈনন্দিন জীবনে নেমে আসবে সাংঘাতিক বিপর্যয়।
এখানে দেশের সরকারের ভুমিকাই আসল। সরকার এইভাবে অবাধে ব্যাঙ্ক
লুঠের প্রতিকারের বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়নি। উল্টে আমানতকারীদের
সম্পূর্ণ আমানতের জামিনদার হওয়ার দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে দিতে চেয়ে ব্যাঙ্ক লুঠ যজ্ঞে আরও
উৎসাহিত করে তুলছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে। যার জন্যে ইতিমধ্যেই অনেক ব্যাঙ্ক আমানতকারীদের
আমানতের মাত্র এক লক্ষ টাকার জামিনদার থাকার কথা ঘোষণাও করছে। এর বেশি আমানত করা টাকার
বিষয়ে ব্যাঙ্ক আর সুরক্ষা দিতে পারবে না। এমনটাই দিনে দিনে সরকারী বেসরকারী প্রতিটি
ব্যাঙ্কেই নিয়ম হয়ে যাবে নাকি। ফলে কোন ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখা টাকার পরিমাণ এক লক্ষের
বেশি হলে, তার ভিতর মাত্র একলক্ষ টাকাই আমানতকারীকে ফেরত দিতে দায়বদ্ধ থাকবে ব্যাঙ্ক।
যেভাবেই হোক ব্যাঙ্ক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লে, বাকি টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা দেবে না আর
ব্যাঙ্ক। এটাই কিছুদিনের ভিতর ভারতবর্ষের ব্যাঙ্কিং সিস্টেমের প্রকৃতি হয়ে উঠতে চলেছে।
কিন্তু ঋণখেলাপির এই সংগঠিত চক্রান্ত প্রতিরোধে সরকারের কোন
আগ্রহও দেখা যাচ্ছে না। ব্যাঙ্ক লুঠের এই চক্রান্তে একের পর এক গালভরা নাম উঠে এসেছে।
নীরব মোদী, মেহুল চেসস্কি, বিজয় মাল্য, ললিত মোদী। এঁরা অবশ্য সরকারের গুডবুকে থাকার
সৌজন্যে দেশ ছেড়ে নিরাপদে পালিয়ে যেত সক্ষম হয়েছেন সহজেই। এবং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের
বিলাসিতায় মহা সুখেই রয়েছেন বলে শোনা যায়। আইন এদের নাগাল পায় না। পাবে না। কিন্তু
বাকিরা দেশে থেকেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সরকারকে নানা ভাবে প্রভাবিত করে নিজেদের সম্পত্তির
পরিমাণ বৃদ্ধি করে নিচ্ছেন দিনে দিনে। দেশের অর্থনীতির উপর এ এক মহা সুনামি আছড়ে পড়েছে
গত ছয় বছর যাবত। ছয় বছর আগে কোন ব্যাঙ্ক লুঠ হয় নি কোনদিন তা নয়। কিন্তু ব্যাঙ্ক লুঠের
এই মহা সুনামি দেশবাসীকে ছয় বছর আগে কখনো দেখতে হয় নি। এখানেই বিষয়ের গুরুত্ব।
যে কোন অর্থনীতিবিদই বুঝতে পারবেন, বিগত ছয় বছরে সরকারী ব্যাঙ্কিং
সেকটরে সরকার গৃহীত নীতিমালাগুলি কাদের স্বার্থ সুরক্ষিত করে চলেছে। সাধারণ জনগণের
ব্যাঙ্কের আমানতের উপর দিনে দিনে আমানতকারীদের প্রাপ্য সুদের হার কমিয়ে দিয়ে সরকার
কিভাবে জনতার স্বার্থ রক্ষা করছে, সেটিও বিগত ছয় বছরে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলে সরকার
ও সরকারী নীতিমালা কাদের স্বার্থ সুরক্ষায় রক্ষাকবচ হয়ে জনগনের কষ্টের গচ্ছিত টাকা
লুঠে উৎসাহ দিয়ে চলেছে, সেটি বুঝতেও অর্থনীতির ণত্ব ষত্ব জানার বিশেষ দরকার আছে বলে
মনে হয় না। অর্থনৈতিক মন্দার গল্প বলে সরকারও দিব্বি অবস্থা সামাল দিয়ে চলেছে। আর তাতেও
না হলে একদিকে দেশভক্তি ধর্মীয় উন্মাদনা সাম্প্রদায়িক উষ্মা ছড়িয়ে দেশবাসীকে বিচ্ছিন্ন
ও বিভ্রান্ত করে রাখা ও অন্যদিকে জনগণকে নিজের নাগরিকত্ব রক্ষায় লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে
বিপর্যস্ত করে রাখার বন্দোবস্ত তো আছেই। এইভাবে সারাদেশের অর্থ সম্পদ হাতে গোনা মুষ্টিমেয়
জনা কয়েক মানুষের পকেটে এনে ফেলার খেলা চলছে বিগত ছয় বছর। এবং এই খেলা চলতে চলতে জনগণের
উপর নেমে আসবে তুমুল আর্থিক বিপর্যয়। অবধারিত সেই বিপর্যয় থেকে জনগণের পরিত্রাণের কোন
উপায় আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
৭ই মার্চ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
