লকডাউনের বাঙালি বাঙালির
লকডাউন
সামনে করোনা। পেছনে করোনা।
এখানে হাত দিলে করোনা। ওখানে হাত দিলে করোনা। ওদিকে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি
পাচ্ছে। সেদিকে করোনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। টিভি খুললে করোনা। কাগজ জুড়ে করোনা। করোনায়
লকডাউন। করোনায় মৃত্যুমিছিল। অর্থনীতি করোনার থাবায় বিপর্যস্ত। আতঙ্কের নাম করোনা।
যুদ্ধ সেই করোনার বিরুদ্ধেই। সভ্যতার সংকটে দিশাহারা মানুষ এক অসম যুদ্ধে সামিল। একদিকে
মানুষ বাঁচানোর যুদ্ধ। একদিকে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার যুদ্ধ। বিশ্ব জুড়ে এ এক অভুতপূর্ব
অভিনব অবস্থা। জাতি ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায় ভাষা সংস্কৃতি শ্রেণী নির্বিশেষে মানুষ আজ
এক নৌকায়। করোনার বিশাল সমুদ্রে মৃত্যুর ভয়াবহ ঢেউয়ের মাঝে দোদুল্যমান সেই নৌকাকে ভাসিয়ে
রেখে নিরাপদ তীরে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে মানুষ।
কিন্তু বাঙালি? কি করছি
আমরা? লকডাউনের প্রথম দিকে আমাদের মনে ভয়ের
প্রধান কারণ ছিল, যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্যসম্ভার ঠিকমতো মজুত করে নেওয়া যাবে তো? কেউই ভাবতে
চাইনি, করোনার থাবা নিজের বাড়ি অব্দি ধাওয়া করবে। করতে পারে। আমাদের ভাবনার ভরকেন্দ্র
ছিল, যতদিন লকডাউন ততদিন নানা পদে আরামের আহারের বন্দোবস্ত করে নেওয়া। ফলে লকডাউনের
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আমরা সকলেই সকলের আগে খাদ্যসম্ভার মজুতের উপরেই বেশি মনোনিবেশ করেছি।
মানুষের ধর্মই হলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখার প্রচেষ্টা করে যাওয়া। আমরাও সেটিই করার চেষ্টা
করেছি। প্রতিদিনের চারবেলা আহারের স্বাভাবিক ধারাটিকে বজায় রাখা। যাদের অর্থের প্রাচুর্য্য
যথেষ্ঠ, তারা বরং লকডাউনকে ফ্যামিলি পিকনিক বানিয়ে ছেড়েচে। কাজের মধ্যে বাজার রান্না
আর খাওয়া। সকলে মিলে। একসাথে। রকমারি আহার। ফলে বাহারি খাওয়ার আহারি প্রবণতা অনেকটাই
বেড়ে গিয়েছে এই সময়। অন্তত লকডাউনের প্রথম পর্যায়ে।
ভালোমন্দ খেয়ে একটা লম্বা
ঘুম দিয়ে উঠে সোশাল মিডিয়ায় বসে নিজের ঢাক নিজে পেটানোর অফুরন্ত অবসর। ফলে আর আমাদের
পায় কে? যাদের চাকুরী যত বেশি নিশ্চিত, যাদের মাস মহিনা যত বেশি সুরক্ষিত, তাদের আনন্দ
দেখে কে? রোজ সকালে উঠে অফিস যাওয়ার তাড়া নাই। সকাল সকাল বাড়ির কর্তাকে রওনা করিয়ে
দেওয়ার ঝক্কি নাই। বাড়ি বসে দিব্বি মাস মাহিনার থোক টাকা ব্যক্তিগত তহবিলে ঢুকে যাবে।
ভাবনা কি? অতএব নো কর্ম ডু ফুর্তি! না কাজ না করলে থাকবো কি করে? কাজ ঠিক একটা জুটিয়ে
নিতেই হবে। আর সোশাল মিডিয়ার মতো এমন সুন্দর একটা পরিসর থাকতে আর চাই কি? ফলে সারাদিন
আমাদের কাজের কোন অভাব নেই। এবেলা সেল্ফি ওবেলা সেল্ফি। এই রান্নার রেসিপি। ঐ রান্নার
রেসিপি। কেউ ফেসবুক লাইভে গান শোনাচ্ছে। তো কেউ কবিতা পড়ছে। কেউ স্বরচিত গল্প পাঠ করছে
তো কেউ সশরীরে নাচ দেখাচ্ছে। তা সে করোনা যতই অশরীরী করে দেওয়ার ভয় দেখাক না কেন। কথায়
বলে যতক্ষণ শ্বাস তো ততক্ষণ আশ। তাই বাঙালির আশার অন্ত নাই।
আশাবাদী বাঙালি তাই এবারের
চৈত্র সেলের কেনাকাটা মিস হলে কি হবে, এখন থেকেই হয়ত সামনের পূজোর বাজারের ফর্দ্দ করতে
শুরু করে দিয়েছে। কে বলতে পারে এবারের পূজোয় করোনা শাড়ী বাজারে এলে কেনার ধুম পড়ে যাবে
না? কিংবা বুকে করোনা সার্ভাইভার ক্যাপশান লাগানো টিশার্ট পড়ার ফ্যাশন চালু হয়ে যাবে
না? বাঙালি মাত্রেই আশাবাদী। তা সেই ১৯৪৭ সালের মেকি স্বাধীনতাই হোক আর ২০১৪’র ঘরে
ঘরে ব্যাঙ্ক একাউন্টে সুইস ব্যাঙ্কের কালোটাকার ভাণ্ডার ভেঙ্গে পনেরো লক্ষ টাকা ক্যাশ
পাঠানোর গালগল্পই হোক। তাই থালা বাজিয়ে করোনা ঠেঙানোর মিছিলে বাঙালির আনন্দেরও কোন
ঘাটতি ছিল না। আলো নিভিয়ে মোমবাতি জ্বালানোর তিথিতেও বাঙালির করোনা নাশের আশায় কেউই
জল ঢেলে দিতে পারেনি। প্রতিদিন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা যত দ্রুতই হু হু করে বাড়তে থাকুক না কেন। বাঙালি দেখে নিয়েছে, তার
নিজের ঘরে কেউ তো আর করোনায় কাবু হয়ে যায়নি। নিজের ঘরে আগুন না লাগলে কে আর দমকলের
কথা ভাবে?
না, আমাদের তাই অত দুশ্চিন্তার
কিছু নাই। কিছু নাই বলেই আমরা প্রতিদিন নিশ্চিন্তে বাজার দোকানে ভিড় করছি। যেটা না
কিনলেও নয়, সেটাও কিনছি। আর যত কিনছি, ততই আনন্দে ভাসছি। ভাবছি রাজার ঘরে যে ধন আছে,
টুনির ঘরেও সে ধন আছে। এটাই বাঙালির নিশ্চিন্তে থাকার রেসিপি। তাই স্পেনের রাজকুমারীর
করোনায় মৃত্যু কিংবা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর করোনায় ধরাশায়ী হওয়া আমাদের মনের সাহস
আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বই কমাতে পারেনি। আমরা সকলেই নিশ্চিন্ত করোনা আমাদের ধরবে না। তাই
করোনা থেকে বাঁচতে ঠিক কি কি করতে হবে, আমরা সেই বিষয়ে অকাতরে ফেসবুকে ফ্রীতে পরামর্শ
দিয়ে চলেছি। এটা করুন। ওটা করবেন না। এরপর আছে মিডিয়ার পাঠশালায় বসে প্রতিদিন শত্রু
চিনে নেওয়ার হোমটাস্ক। দেখ দেখ, কেন বলে পোশাক দেখে চিনে নেওয়া যায়। এবার প্রমাণ হলো
তো? এদের জন্যেই দেশটা করোনায় ছাড়খাড় হয়ে যাবে। এর পেছনে গভীর চক্রান্ত আছে বুঝেছো!
মিডিয়ার পাঠশালায় দেওয়া সেই হোমটাস্ক তৈরী করে নিয়ে আমরাও তৈরী। যে যার ওয়ালে নিয়মিত
বিষ ছড়িয়ে চলেছি। পোশাক দেখে চেনার দেশব্যাপী কর্মশালায় আমরা সকলেই সকলের গাইড হয়ে
দাঁড়িয়েছি। হোমটাস্কের মুখস্থ করা বুলিতে সবাই সবাইকে তোতাকাহিনী শেখাচ্ছি। দেখলে তো
কেন এনআরসি করার দরকার!
পরদিন সকালে সেই আমরাই
নিজেদের ঔদ্ধত্বের পোশাক পড়েই বাজারে ভিড় জমাচ্ছি। গা ঘেঁসাঘেঁসি করে দরদাম হাঁকাহাঁকি
করছি। টাটকা সবজি কিনে মহানন্দে ঘরে ফিরে ভাবছি, যাক নিশ্চিন্ত। এবার আরাম করে কব্জি
ডুবিয়ে খাওয়া যাবে। প্রতিদিন নিয়ম করে এই হোমটাস্ক করা বাঙালিই করোনার থেকেও ভয়াবহ
ভাইরাস হয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে যাচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি জাতিকে নপুংসক করে
রাখার দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রমকে সফল করার জন্য। করোনা একদিন জব্দ হবে। কিন্তু এই হোমটাস্ক
করা বাঙালির তোতাকাহিনীর মেগাসিরিয়াল শেষ হবে না কোনদিন।
একটা জাতিকে ১৯৪৭ সাল
থেকেই এমন ভাবে লকডাউন করে নীলডাউন করিয়ে রাখার এরকম ইতিহাস মানুষের ইতিহাসে আর নাই।
লকডাউনে নীলডাউন হয়ে বসে থাকা সেই বাঙালিই আজ কাঁটাতারের দুইপারে বসে পোশাক দেখে নতুন
করে মানুষ চিনে নেওয়ার অভিনব হোমটাস্কের সিলেবাস অনুসরণ করে চলেছে। বাধ্য শিক্ষার্থীর
মতোন। তাই করোনার মতো মারণ ভাইরাসও তার কাছে ধর্মের পোশাকে চিহ্নিত হচ্ছে এমন সহজে।
বিশ্বজুড়ে করোনা যেখানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিয়ে নানা জাতি নানা ধর্ম নানা
বর্ণের মানুষকে পাশাপাশি কাছাকাছি এনে দিচ্ছে, আমাদের বাংলায় সেই একই সময় পুরোনো তোতাকাহিনীর
নতুন করে পাঠদান শুরু হয়ে গিয়েছে।
করোনা পরবর্তী বিশ্ব
যে একেবারেই ভিন্ন একটা বাঁকের সম্মুখীন, সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মোটামুটি সকলেই একমত।
যদিও সেই বাঁকের ভালোমন্দ গতিপ্রকৃতি রকম সকম কিরকম হবে, সেই বিষয়ে এখনই বলার সময় আসেনি।
কিন্তু অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই নিশ্চিত করোনা পরবর্তী বিশ্ব করোনা পূর্ববর্তী পৃথিবী থেকে
ভিন্ন হবে। কিন্তু বাঙালি আছে সেই বাংলাতেই। দিব্বি খেয়ে দেয়ে পরিতৃপ্তির ঢেঁকুড় তুলে
করোনা পূর্ববর্তী পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার আশায় দিন গুনছে লকডাউনের সময়সীমার। সময়সীমা
বাড়লে কি হবে সেই নিয়ে আর বিশেষ চিন্তা নাই। ব্যক্তিগত তহবিলে থোক মাসমাহিনা পৌঁছিয়ে
গেলেই হলো। প্রতিদিনের বাজারহাট ঠিকমতো খোলা থাকলেই হলো। আর বাকি সময়ের জন্য ইনটারনেট
চালু থাকলেই যথেষ্ট। আর হ্যাঁ আরও একটা কাজ আছে বই কি। বিশ্বব্যাপী প্রতিদিনের মৃত্যুমিছিলে
ডেডবডির সংখ্যার খবর নেওয়া। প্রতিটি বাঙালি আশাবাদী সেই মৃত্যুমিছিল তার ঘরের তালাচাবি
ভাঙতে পারবে না। সেই বিশ্বাসে আমাদের রাতের ঘুমেরও কোন ব্যাঘাত ঘটছে না।
আমরা জানি না, বাঙালির
চিন্তা চেতনা বুদ্ধিবৃত্তির এই লকডাউনের মেয়াদ আরও কতদিন। আমরা জানি না, করোনা এই লকডাউন
ঘুচিয়ে দিয়ে বাঙালিকে মৃত্যুর চৌকাঠে দাঁড় করিয়ে তার সম্বিত ফেরাতে পারবে কিনা। আমরা
জানি না, বাঙালি লকডাউনে নীলডাউন হয়ে থেকে মৃতবৎ জীবনধারণের এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে
আদৌ কোনদিন নিজে থেকে গর্জে উঠবে কিনা। আমরা শুধু জানি, বাঙালিকে এইভাবে চিন্তা চেতনা
বুদ্ধিবৃত্তির লকডাউনে নীলডাউন করিয়ে রাখার সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক নানবিধ পরিকল্পনার
নীলনকশা বহদিন আগে থেকেই নিয়ে রাখা হয়েছে। দিনে দিনে সেই নকশা অনুসারেই নানাবিধ প্রকল্প
ও পরিকল্পনার সফল রূপায়ন ঘটে চলেছে শুধু। আমরা নিশ্চিন্তে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া
হোমটাস্ক করে চলেছি শুধু বাধ্য দেশপ্রেমীকের মতোন।
১২ই এপ্রিল’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

