মহাকবির চেয়ার




মহাকবির চেয়ার

কবিজীবন না কবিতা। কোনটির আকর্ষণ আমাদের কাছে বেশি? নিশ্চয়ই এর কোন নির্দিষ্ট উত্তর হয় না। পাঠকের ব্যক্তিগত জীবনবোধ। তার সাহিত্যিক প্রতীতি। মানসিক রুচি। ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় ক্রিয়াশীল থেকে এক একজন পাঠককে এক এক ভাবে পরিচালিত করে। কিন্তু কম বেশি আমরা সকলেই প্রাথমিক ভাবে কবি নয়, কবিতার আকর্ষণের কথাই বেশি করে উল্লেখ করে থাকি। এটা খুবই সত্য যে, কবিতার হাত ধরেই কবির প্রতি আমাদের আকর্ষণ তীব্র হতে থাকে। কবির কবিতাই আমাদেরকে তাঁর জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করে থাকে। অন্তত যে কোন মহৎ কবির ক্ষেত্রেই এটি ঐতিহাসিক ভাবে সত্য। এরপর যে কবি যত বেশি আলোচিত। যত বেশি পুরস্কৃত। সমসাময়িক এবং পরবর্তী সময়ের উপরে যে কবির প্রভাব যত বেশি সংক্রমিত, সেই কবির জীবনের প্রতি আমাদের আকর্ষণ তত বেশি প্রবল হবে। সেটাই স্বাভাবিক। আর সেই কারণেই যত দিন যেতে থাকে, ততই একজন বিখ্যাত কবির জীবন খুঁড়ে দেখার কাজে ভিড় বৃদ্ধি পেতে থাকে। দেশ কাল নিরপেক্ষ ভাবে এমনই হয়ে থাকে।

কবির বাসগৃহ। কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র। তাঁর লেখার টেবিল। বসার চেয়ার। লেখার কলম। পাণ্ডুলিপির চিত্র। ইত্যাদি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। কবি অনুরাগীরা ভিড় করে সেই সব দুর্লভ সামগ্রী চাক্ষুষ করে আসতে। কবি কি খেতে ভালোবাসতেন। কবির ব্যবহৃত জামা কাপড়ের চিত্র। তাঁর আদবকায়দা। হাঁটা চলা। কথা বলা ইত্যাদি নানান ধরণের খুঁটিনাটি বিষয়ে আমাদের কৌতুহল বৃদ্ধি পেতেই থাকে। অর্থাৎ আমাদের প্রিয় কবির কবিতার থেকেও তাঁর ব্যক্তিজীবনের আকর্ষণ তখন আমাদের কাছে আরও বেশি দুর্বার হয়ে ওঠে। সেই অমোঘ আকর্ষণেই আমরা বারবার ছুটে যাই সেই সব সংরক্ষিত জিনিসপত্রের জাদুঘরে। যেখানে কবির বিদেহী আত্মার অতীত স্পর্শ রয়েছে। আমাদের ভালোবাসায় কবি তখন জাদুঘরের সামগ্রী হয়ে ওঠেন। আমরা ভালোলাগার বিস্ময়বোধ নিয়ে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্রে দৃষ্টি বুলাই। পারলে হাতের স্পর্শে আমাদের ভালোবাসার কবিকে অনুভব করতে চেষ্টা করি। অনুভুতির গভীরে। এই যে একজন মহৎ কবিকে চার দেওয়ালের ভিতরে ছুঁয়ে দেখার আকুতি, এটাই আমাদের পরিচালিত করে কবি জীবনের পরতে পরতে কবি নয়, ব্যক্তি মানুষটিকে খুঁজে পেতে।

এবং একটু গভীর ভাবে আত্মসমীক্ষা করে দেখলে দেখতে পাবো। পাঠক হিসাবে আমাদের ভিতর কবি জীবনীর প্রতি যে অমোঘ টান, তার পিছনে কবিতা ও কবিকে অতিক্রম করে সেই ব্যক্তিমানুষটিকে খুঁজে পাওয়ার এক অদম্য উৎসাহই কাজ করে। আমরা জানতে চাই। আমরা দেখতে চাই। কবি জীবনের আড়ালে ব্যক্তি মানুষটির প্রাত্যহিক জীবনের চালচিত্রটুকু। কি কি খেতে ভালোবাসতেন। কেমন ছিল তাঁর ব্যক্তিগত চাহিদা গুলি। সাফল্যের আনন্দ উপভোগ করতে কেমন করে। ব্যক্তিগত হতাশাকে সামাল দিতেন কোন উপায়। কবিও কি আমাদের মতো পরশ্রীকাতর ছিলেন? সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের সাফল্যে হতাশ হয়ে পড়তেন? নতুন করে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন? ব্যক্তিগত দুঃখ যন্ত্রণা থেকে উত্তরণের কোন প্রেরণাদাত্রী ছিল কি কবির জীবনে? কেমন ছিল তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক? কেমন ছিল কবির দাম্পত্য জীবন? কবির দাম্পত্য জীবনে এসেছিল কি কোন তৃতীয় ব্যক্তি? কবির জীবনেও কি কোন পরকীয়ার পর্ব ছিল? থাকলে কিভাবে রক্ষা করতেন কবি ঘর আর বাহির। এই সকল সাধারণ থেকে অতি সাধারণ বিষয়গুলিই কিন্তু তখন আমাদের মতো ভক্তকূলের কাছে অত্যন্ত বেশি কৌতুহল ব্যঞ্জক হয়ে ওঠে। কবি জীবনের পরতে পরতে আমরা কিন্তু কবিকে আর খুঁজে দেখতে যাই না। খুঁজতে থাকি রক্ত মাংসের জীবন্ত এক মানুষকে। সম্ভবত যিনি আমাদেরই মতো সাধারণ একজন দোষে গুণে ভরা সাংসারিক মানুষ। লোভ লালসা কামনা বাসনার ভিতর দিয়ে প্রতিদিনের জীবন যাপনের একটি গল্প। সেই গল্পের খোঁজেই ছুটি আমরা কবি জীবনী হাতে নিয়ে। সেই গল্পের খোঁজেই ছুটি আমরা কবির বাসগৃহের সংরক্ষিত জাদুঘরে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে। চোখ দিয়ে দেখে। ধরতে চাই। অনুভব করতে চাই আমাদের প্রিয় কবির রক্ত মাংসের যাপিত জীবনকে।

অধিকাংশ সময়েই আমাদের খেয়াল থাকে না। কবির ব্যক্তিজীবনকে খুঁজতে গিয়ে আসলেই আমরা যেন আহত করে ফেলি, কবির বিদেহী আত্মাকেই। আমরা যেন একভাবে অপমানিতই করে ফেলি আমাদের প্রিয় কবির সাহিত্যকীর্তিকে। কবি কোন খাটে শুয়ে স্বপ্ন দেখতেন, কখন যৌনমিলনে লিপ্ত হতেন কার সাথে। কোন চেয়ার বসে রচনা করেছিলেন কোন কোন পাণ্ডুলিপি। তার ভিতরে আমাদের কবিকে খুঁজতে গিয়ে আমরা হারিয়ে ফেলতে থাকি, কবিরই কবিতার ভুবনকে। নিশ্চয় একজন মহৎ কবির ব্যক্তিজীবন আর তাঁর কবিতার ভুবন এক ও সমার্থক নয়। এই সহজ সত্যটিকেই গুলিয়ে ফেলি আমরা। আর যদি কবির ব্যক্তিজীবনই তাঁর কবিতার ভুবন হয়। না। কোনভাবেই তখন আর তাঁকে মহৎ কবি বলে ধরে রাখা যাবে না, যুগ থেকে যুগান্তরের দিগন্তে। তিনিও তখন আমাদেরই মতোন হয়তো বা ফেসবুকে ওয়ালের নিত্যদিনের কবি হয়ে থাকবেন। তার বেশি কিছু নয়। তিনিও তখন কেবলই প্রতিদিন লিখতে থাকবেন ব্যক্তিগত আবেগের দিনলিপি। তাঁর মতো করে কবিতার ভাষ্যে। লিখবেন নিজেকেই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। ইনিয়ে বিনিয়ে। আপন ব্যক্তিগত আবেগের উদযাপন, যা কবিতার রূপের খোলসে আটকিয়ে থাকবে। জন্ম নেবে না কবিতা হয়ে। সাহিত্যিক প্রতীতিতে মুক্তি পাবে না অক্ষর বিন্যাসের চৌহদ্দি থেকে। মৃতবৎ শোভা পাবে ওয়ালে ওয়ালে শব্দের কঙ্কাল স্বরূপ।

কেন বলছি এই কথা? একটু খুলে বলি বরং। ১৮৫৭ সাল। মার্চের ১৮ তারিখ। লেখক গুস্তাভ ফ্লবেয়ার। তাঁর এক পত্রবান্ধবীকে নিজের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাদাম বোভারী’-র প্রসঙ্গে একটি পত্রে লিখছেন, “আমার নীতি হলো, একজন লেখক কখনোই নিজেকে লিখবেন না। লেখক তাঁর লেখায় ঠিক সেই ভাবেই থাকবেন, জগৎলীলায় ঠিক যেভাবে থাকেন সৃষ্টিকর্তা। অদৃশ্য কিন্তু অমোঘ। তাঁকে অনুভব করা যাবে। কিন্তু দেখা যাবে না কখনোই”। যেকোন মহৎ শিল্প বা সাহিত্য সম্বন্ধেই এই কথা শাশ্বত সত্য। তাই বলছিলাম, কবির ব্যক্তিজীবন আর তাঁর কবিতার ভুবন কখনোই এক নয়। এক নয়। এক হতে পারে না। যদি বা হয়ও, তবে বুঝতে হবে, তাঁর লেখা কবিতাও নয়। সাহিত্য নয়। তাই একজন প্রকৃত পাঠক ও কবি অনুরাগীকে উপলব্ধি করতে হবে এই এক সত্য। কবির কবিতার ভুবনে পৌঁছাতে গেলে কবির ব্যক্তিজীবন খুঁড়তে গিয়ে কোন লাভ নাই। সে নিতান্তই সময় নষ্টের বেশি কিছু নয়। হ্যাঁ এটা ঠিক। আপনি যদি ব্যক্তি পুজায় বিশ্বাসী হন। আপনি যদি খ্যাতিমানদের অটোগ্রাফ শিকারী হন। আপনি যদি কবিতার থেকে দূরবর্তী হন। তবে অবশ্যই আপনি আপনার পছন্দের কবির চেয়ারে বসে একটা সেল্ফি তুলে পোস্ট করতেই পারেন নিজের সামাজিক দেওয়ালে। তাতে দোষের কিছু নাই। ভক্তি মানুষকে শান্তি দেয় বই কি।

কিন্তু কবির কবিতার একজন নিবিড় পাঠক। তিনি জানেন কবির কবিতার ভুবনের ঠিকানা। সেই ঠিকানায় পৌঁছাতে গিয়ে তাঁকে কবি জীবনীর পাতা উল্টিয়ে সাল তারিখ হিসাব করে কবির ব্যক্তিগত জীবনের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে পড়তে হয় না কবির কবিতাগুলি। জানতে হয় না, কবির খাট পালং চেয়ার টেবিলের কাহিনী। দেখতে যেতে হয় না, কবির বাসগৃহের বিন্যাস সজ্জা। স্পর্শ করে অনুভব করতে হয় না কবির কলম। কবির কলমের শক্তিকে পাঠক উপলব্ধি করে নেন প্রকাশিত ছাপা অক্ষর বিন্যাসের মহাসমুদ্রে অবগাহন করে। সেখান থেকেই তিনি এক জন কবির কবিতার ভুবনে পৌঁছিয়ে যান। আর শুধু যানই না। তিনিও তখন সেই ভুবনের বাসিন্দা হয়ে ওঠেন। সেই ভুবনের মালিক না হলেও। সেই ভুবনের নির্মাতা না হলেও। সেই ভুবনের প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা স্রষ্টা না হলেও। তিনিও হতে পারেন সেই ভুবনের বাসিন্দা। অনুভব করতে পারেন তাঁর প্রিয় কবিকে। কবির দর্শন কে। কবির অন্তরবেদনাকে। কবিরা আশা আকাঙ্খাকে। কবির স্বপ্ন ও কল্পনাকে। কবির প্রত্যয় ও অর্জিত অভিজ্ঞতাকে। কবির সাধনার সাথে অনুভব করতে পারেন এক নিবিড় সখ্যতা। একাত্মতায় মিলতে পারেন প্রিয় কবিরা সত্তার সাথেও। যদি ততদূরই এগোতে চান তিনি। কবির কবিতার ভুবনের দিগন্তে।

৩২শে শ্রাবণ’ ১৪২৭

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত