ফেসবুকে কবিতা প্রকাশ
ও আমাদের সীমাহীন সীমাবদ্ধতা
হ্যাঁ নিজের কবিতা সকলকে পড়াতে কার
না আনন্দ হয়। কিন্তু যাদেরকে নিজের কবিতা পড়ানোর জন্য এত ব্যকুলতা।। তাদের কবিতা পড়ার
সময় কজন পায়? কিংবা কজনের সদিচ্ছা থাকে, আজ অমুক বন্ধু তার ওয়ালে কোন কবিতা পোস্ট করলো,
যাই গিয়ে পড়ে আসি? আমরা কজন বন্ধুদের ওয়ালে যাই? বেশির ভাগটাই তো নিউজ ফীডে ফেসবুক
যা পরিবেশন করছে। সেইটুকুই। আর হ্যাঁ। যার সাথে যার মেলে। ইনবক্স আছে তো। বেশির ভাগ
সময়ই কেটে যায় ইনবক্সে। প্রাইভেটে। অবশ্য তার আগে নিজের ওয়াল পোস্টে কজন পড়লো আমার
আজকের লেখাটি। কার কোন মন্তব্য আমার পক্ষে গেল। কিংবা কজনের প্রশংসা জমা হলো পোস্টের
একাউন্টে। তার তত্বতালাশেই কেটে যেতে পারে অনেকটা সময়। অন্তত যার লেখা যত বেশি জনপ্রিয়।
কিন্তু এইভাবে শুধু নিজের লেখার পরিসরেই জনপ্রিয়তার জল মাপতে থাকলে, লাভের ঘরে সমৃদ্ধি
জমা হয় কতটুকু?
হ্যাঁ অনেকেই বলতে পারেন।
বিশ্বাস করতে পারেন। তাঁর হাতের মতো ভালো কবিতা বিশেষ খুঁজে পাওয়া যায় না ফেসবুকে।
তাই বাকিদের লেখা পড়ার আগ্রহ বিশেষ থাকে না। কিংবা অনেকেই হয়তো অনেকের কবিতা পড়েন।
কিন্তু ঐ ওয়ান রিডিং! আচ্ছা, একটি কবিতা কি একবার পড়ে শেষ হয়, পড়া? যদি হয়, বুঝতে হবে।
সেই লেখাটি কবিতাই হয়ে ওঠেনি। যে কবিতা বার বার ফিরে ফিরে ডেকে নিয়ে আসতে না পারে।
পড়ার জন্য। তাকে কি সত্যই কবিতা বলা যায়? কবিতা আসলেই তো অবগুন্ঠনবতী রহস্যময়ী নারীর
মতো। প্রথম আলাপেই জানা যায় না তার কিছুই। দেখা যায় না সবটুকু। আড়ালের আড়ালে রয়ে যায়
তার স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ। বার বার একটা ঘোরের ভিতর দিয়ে সেই কবিতার আকর্ষণ আমাদেরকে
তার কাছে টেনে নিয়ে যায়। প্রায় নিশিতে পাওয়ার মতো আমরা ছুটতে থাকি। বারবার আবারও। একটার
পর একটা সিংহ দরজা পেড়িয়ে যাওয়ার মতোনই যেন আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে দিনে দিনে পৌঁছানোর
অবকাশ তৈরী হয়, একটি কবিতার অন্দরমহলে। হ্যাঁ এটা ঠিকই, কবিতার অন্দরমহলে পৌঁছানোর
ছাড়পত্র সকলের কাছেই থাকে না। কিন্তু যিনি প্রতিনিয়ত কবিতা পোস্ট করছেন তার ওয়ালে।
রোজ জল মাপছেন জনপ্রিয়তার। তাঁর তো সেই ছাড়পত্র থাকার কথা হাতে। আছেও নিশ্চয়। কিন্তু
সেই কবিই কি অন্য কবিদের কবিতার অন্দরমহলে গিয়ে পৌঁছাতে চান? কবিতার আকর্ষণে? ঠিক যে
আকর্ষণটা তিনি প্রত্যাশা করেন তাঁর পোস্ট করা কবিতার ক্ষেত্রে।
যদি সত্যই তেমনটি হতো।
যদি সত্যই কবিরা পরস্পরের কবিতাই শুধু নয়। নয় মুখচেনা পারস্পরিক বোঝাপড়া থেকে কবিতা
পড়া। পরস্পরের। যদি শুধুই ভালো কবিতার টানে। ভালো কবিতার খোঁজে। বন্ধুবৃত্তে বা এমনকি
বন্ধুবৃত্তের বাইরেও ভালো কবিতা খুঁজতে চেষ্টা করতেন। কেমন হতো? নিশ্চয় জমে উঠত কবিতা
নিয়ে কবিদের সাহিত্যিক আলোচনার একটি সজীব ও প্রাণবন্ত পরিবেশ। একটি কবিতা নিয়ে বাকি
কবিদের আলাপ আলোচনা থেকে অন্যান্য কবিতাপ্রেমী পাঠকরাও কবিতার অন্দরমহলে ঢোকার চাবিকাঠিটি
হয়তো হাতে পেয়ে যেতেন অনেক সহজে। শুধু তাই বা কেন? মরমী পাঠকরাও সেই আলোচনাকে বহুদূর
সমৃদ্ধ করে তুলতে পারতেন নিশ্চয়। সাহিত্যের প্রকৃত পাঠক মাত্রেই জানেন। সাহিত্যালোচনার
আনন্দ। এবং গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। ফেসবুকের ওয়ালে জুকারবার্গের কমেন্ট সিস্টেম তো
সেই আলোচনার সহজ একটা আঙিনা প্রস্তুত করেই রেখেছে। তাই না?
না শুধুই পরস্পরের পিঠচাপড়ানি
নয়। নয় জনপ্রিয় ফেসবুক ব্যক্তিত্বের বন্দনা। ভালো কবিতার জন্য সাহিত্যালোচনার এই পরিশ্রমটুকু
নিশ্চয় করতে চাইবেন একজন কবি। একজন মরমী পাঠক। শুধুই নিজের কবিতা নিয়ে নয়। নিজের ওয়াল
পোস্টে। অন্যের ওয়াল পোস্টে। অন্যের কবিতা নিয়েও। আলোচনার এই স্বাভাবিক পরিসর যত বেশি
সম্প্রসারিত হবে, তত বেশি সমৃদ্ধ হতে পারে আমাদের সাহিত্য। এই বোধ থেকেই যদি আমরা লগইন
করি ফেসবুকে। ক্ষতি কি? অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন। অত সময় কই। সময়ের অভাব আসলে একটি
অজুহাত মাত্র। ২৪ ঘণ্টার ভিতরে আমরা শুধুই সাংসারিক ও পেশাগত কাজেই সময় ব্যায় করি না।
অনেক অযথা কাজেও আমাদের সময় যায়। শুধুমাত্র সেই অযথা কাজগুলিতে আমাদের আগ্রহের কারণ।
আরও একটি খুলে বললে বলতে হয়। এই সোশ্যাল মিডিয়ার দিগন্তে, আমরা যতটা সময় ব্যায় করি।
সারা দিনে বা সপ্তাহে। একটু হিসাব নিয়ে দেখলে দেখা যেতে পারে, তার বেশির ভাগটাই সময়ের
অপচয় মাত্র। না, অনেকেই বলতে পারেন অবশ্য, ফেসবুক মানেই সাহিত্যচর্চা নয়। অনেকে আরও
একটু এগিয়ে এও বলতে পারেন, প্রকৃত সাহিত্য চর্চার সাথে যুক্ত যারা। তার আদৌ ফেসবুকে
ঢুকে সময় নষ্ট করেন না। করবেন না। কোন কথাই ফেলে দেওয়ার মতোন নয়। কারুর কথাই ভুল নয়।
কিন্তু তবু, আজ কিন্তু ফেসবুকও ভালো সাহিত্যের আদান প্রদানের একটা মাধ্যম হয়ে উঠছে
দিনে দিনে। কেউ জানে না, আগামী অর্ধশতাব্দী পর ফেসবুকের সাহিত্যচর্চা কতদূরে কোথায়
গিয়ে পৌঁছাবে। অবশ্যই সকলেই ফেসবুকে সাহিত্যচর্চার জন্য বা কবিতা পাঠের জন্য লগইন করেন
না। কিন্তু যে মুষ্টিমেয় মানুষ, ফেসবুককেই নিয়মিত সাহিত্যচর্চার মাধ্যম করে জড়িয়ে ধরেছেন।
আমরা বলতে চাইছি কেবলমাত্র তাদের কথাই। অন্যদের প্রসঙ্গ এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
প্রাসঙ্গিক একটা বিষয়ই।
যে কাজটিই করি না কেন। সেই কাজটির ভিতরেই যেন নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে, নিজের সম্পূর্ণতাকে,
নিজের ডেডিকেশনকে নিবেদন করতে পারি। সাহিত্যের একজন পাঠক হিসাবেই হোক। আর কবি হিসাবেই
হোক। শুধুমাত্র নিজের কবিতার অনলাইন প্রচারের ভিতরে নিজেকে আটকিয়ে রাখলে, আমাদের পৌঁছানো
হবে না বিশেষ কোথাও। নিজেরই সৃষ্টির চারপাশে নিজেই ঘুরপাক খেতে থাকবো অবিরাম। এর ভিতর
অন্তত বুদ্ধিবৃত্তির কোন গৌরব নাই।
তাই অনলাইন বা সোশ্যাল
মিডিয়া বলে অশ্রদ্ধা করারও কিছুই নাই। যে কোন মাধ্যমই কন্টেন্ট নিরপেক্ষ। যে কোন মাধ্যমই
ব্যাবহারকারীর মনোবৃত্তির উপরে নির্ভরশীল। মাধ্যমটি কতটা কার্যকরি হয়ে উঠবে সেই বিষয়ে।
দুঃখের বিষয়, ফেসবুকে যারা সত্যই ভালো কবিতা প্রকাশ করে থাকেন। নিয়মিতই হোক আর অনিয়মিত।
তাদের কবিতার বন্দনা ততটাই হয় যতটা তাদের অনলাইন জনপ্রিয়তা। কিন্তু অধিকাংশ কবিতাই
আসলে অপঠিত থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, সাহিত্যিক আলোচনার কোন পরিসর গড়ে ওঠেই না। না
পাঠক। না অন্য কবি। অন্যকারুর কবিতা নিয়ে নানান দিক থেকে একটা সাহিত্যিক আলোচনার দিগন্তকে
উন্মুক্ত করে তোলার বিপুল সম্ভাবনা মাঠে মারা যায়।
এইভাবে প্রতিদিন আসলেই
ঝরে যেতে থাকে অনেক ভালো কবিতা। হারিয়ে যেতে পারে, প্রকৃতই সম্ভাবনাময় কবিসত্তা। অনেকেই
মনের দুঃখে ফেসবুককে সাহিত্যচর্চার বিষয় থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারেন। আসলে, একটি ভালো
কবিতার খোঁজ করাও সাহিত্যচর্চার একটি মূল্যবান দিক। ভালো কবিতা নিয়ে চর্চা না করতে
পারলে, কবি ও পাঠক এবং কবিতা সকলেই আবর্তিত হতে থাকে বৃত্তাকার পথে। কোন অভিমুখেই এগোতে
পারে না।
আলোচনার শেষ করবো আরও
একটি দুঃখজনক বাস্তব সত্য দিয়ে। ভালো কবিতার আলোচনা মাত্রেই কিন্তু কাব্য ও কবি বন্দনা
নয়। অন্তত অধিকাংশ ফেসবুক ইউজারেরই এই বিষয়টি খেয়াল থাকে না। তারা যে বিষয়টি সম্বন্ধ
ওয়াকিবহাল নন, তাও ঠিক নয়। আরও একটি গভীর সত্য লুকিয়ে রয়েছে এর ভিতরে। আমরা অধিকাংশই
পাবলিক ডোমেনে, নিজের বা নিজের সৃষ্টির ভালোমন্দ বিষয়ে সদর্থক সমালোচনাতেও অভ্যস্ত
নই। আমাদের সাহিত্যবোধ সম্বন্ধে শুধুমাত্র বন্দনা ছাড়াও, তার বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনাও
যে সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়, সে কথা স্বীকার করতে ভয় পাই আমরা অধিকাংশই।
মনের ভিতর সর্বদা একটা আশংকা থাকে। এই বুঝি কেউ এমন কোন মন্তব্য করে বসলো, যেটি ঠিক
লেখক হিসাবে আমার অভিপ্রেত নয়। যাঁরা মন্তব্য করেন আমাদের লেখায়, তাঁরাও বিষয়টি সম্বন্ধে
যথেষ্ঠ ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। তাই কেউই বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটাতে চান না। চান না বলেই পরস্পরের
ওয়ালে কোন সদর্থক আলোচনা সমালোচনার সুযোগ তৈরী হয় না। আসলে আমাদের প্রত্যেকের ভিতর
আত্মপ্রত্যয়ের অনেকটা অভাব রয়েছে। সদর্থক সমালোচনাকেও আমরা মনে করি নেগেটিভ পাবলিসিটি।
যদি তার ফলে আমার লেখার রিডারশীপ কমে যায়? সেই শঙ্কা আমাদের এমন ভাবেই তাড়া করে নিয়ে
বেড়ায় যে, অনেক সময় দেখা যায়। আমরা তার সাথেই বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটিয়ে ফেলি। যে হয়তো প্রকৃতই
অনুভব করতে পেরেছিল আমার কবিতাটি। ধরতে পেরেছিল, কোথায় দরকার রয়ে গিয়েছে আরও ঘষমাজা
করার।
ফলে প্রতিদিন এত কবিতার
প্রকাশ। ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে। এমন একটা দুরন্ত সম্ভাবনা। তা সত্ত্বেও আমরা হারিয়ে ফেলছি
প্রকৃত সাহিত্যচর্চার সীমাহীন এক দিগন্ত।
১৫ই শ্রাবণ’ ১৪২৭
অব্যয়কথা কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত

