রুপনারানের কূলে এ কোন রবীন্দ্রনাথ?




রুপনারানের কূলে এ কোন রবীন্দ্রনাথ?

রূপনারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।
আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন,
সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,
মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে।


উদয়ন  শান্তিনিকেতন  ১৩ মে ১৯৪১ রাত্রি ৩-১৫ মিঃ

একজন রোমান্টিক কবি যখন বলেন, এ জগৎ স্বপ্ন নয়, তখন বেশ চমক লাগে। রোমান্টিক ভাববিলাসের যে আবহতে কবির বেড়ে ওঠা, সেই আবহে একথা যথেষ্ঠই ভাবার মতো বিষয়ে। আবার কবির সমগ্র জীবনের চালচিত্রকে সমানে রাখলে, চমক লাগার কথাও নয়। আঠারোশ শতকের রোমান্টিক ভাববিলাসের ভিতর জন্ম নেওয়া ঊনবিংশ শতকের রবীন্দ্রনাথ বিংশ শতকে পৌঁছিয়ে যে জীবনকে রক্তের অক্ষরে চিনেছিলেন, সে সত্য তাঁর সৃষ্টিকর্মের ক্রম উন্মোচনের পথরেখা ধরে তাঁর সৃজনশীল চেতনার পরতে পরতে স্বাক্ষর রেখে গিয়েছে। যে কোন নিবিষ্ট রবীন্দ্রপাঠকের জানা সেকথা। এবং এই ক্রম উন্মোচনের অন্যতম কবির রক্তকরবী। আধুনিক বিশ্বের ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির স্বরূপ উদ্ঘাটন করে দিয়েছিলেন কবি। আবার সেই রক্তকরবীতেই তাঁর রোমান্টিক স্বপ্নবিলাসের ঐতিহ্য দিয়েই সৃষ্টি করেছিলেন নন্দিনীকে। বাস্তব আর রোমান্টিক স্বপ্নবিলাসের এক অত্যশ্চার্য্য মেলবন্ধন ঘটিয়ে ছিলেন কবি এই নাটকেই। কিন্তু সেই রক্তকরবী নাটকের সৃষ্টি পর্ব ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্বে। সে সময়ের সমসাময়িক বিশ্বপরিস্থিতিতেও কবি চেতনার আশাবাদের জয়ধ্বজা পতপত করেই উড়ছিল। উড়ছিলো বলেই নাটকে নন্দিনীর প্রবেশ। নয়তো তারজালের ভিতর থেকে অন্ধকারের রাজা তার আপন রাজত্বের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করতো না নাটকের অন্তিম পর্বে। কিন্তু তারপর কবিজীবনের একেবারে অন্তিম পর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বগ্রাসী রূপ রবীন্দ্রনাথের চেতনায় বিপুল এক আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। লক্ষ্য করার বিষয়, এই পর্বেই তাঁকে লিখতে হয়েছিল সভ্যতার সঙ্কট। রোমান্টিক স্বপ্নবাস্তবতার ভগ্নস্তুপে দাঁড়িয়ে প্রায় দিশাহারা এক রবীন্দ্রনাথের সম্মুখীন হতে হয় আমাদেরকে ঠিক এই পর্বেই। যদিও হিরোশিমা নাগাসাকি দেখে যেতে পারেন নি কবি। সত্যি করে বলতে কি, অশীতিপর কবিকে নিয়তি রেহাই দিয়েছিল সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার হাত থেকে।

মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে লেখা এই কবিতাটিকে যদি আমরা কবির আত্মজীবনীর অন্তিম পর্ব বলেই ধরে নিই, তবে আজীবন আশাবাদী একজন মানুষ আর স্বপ্নের ক্যানভাসে নিজেকে দেখতে চাইছেন না আর। চাইছেন না কেন না, তিনি ততক্ষণে রক্তের অক্ষরে আপন স্বরূপকে আবিষ্কার করে ফেলেছেন। অন্তত সেটিই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। এবং চিনতে পেরেছেন নিজেকে। সত্যমূল্যে। আর ঠিক এইখানেই যেকোন রবীন্দ্রপাঠকেরই মনে প্রথম যে প্রশ্নটি জাগবে, সেটি হলো, তবে কি এই প্রথম কবি চিনতে পারলেন তাঁর আপন সত্ত্বাকে? এই যে তিনি বলছেন, রক্তের অক্ষরে নিজের রূপ দেখতে পাওয়ার কথা, বলছেন সেই স্বরূপেই নিজেকে চেনার কথা; এতো অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য বিষয়। নিতান্ত বিচ্ছিন্ন একটি কবিতা বলে একে বিচার করার কোন পথই যেন আর খোলা রাখলেন না কবি।

কবির পূর্ববর্তী লেখাগুলোয় তবে কি নিজেকে পুরোপুরি চিনতে পারেন নি কবি? ফাঁক রয়ে গিয়েছিল কোন? নাকি বয়োঃবৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের মুখশ্রীর যেমন বদল হয়, এও তেমনি বিষয়। প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন মুখশ্রীর ভিতরেই যে আমির অভিন্ন সত্য, এও কি ঠিক তেমনই? কবি যেমন বলেছিলেন, নানা রবীন্দ্রনাথের মালা! আসলে হয়তো তাও নয়। জীবনের পর্বে পর্বে আমরা ক্রমেই সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে থাকি। এই যে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠার পথরেখা, সেই পথেই আমাদের প্রকৃত আত্মজীবনী রচিত হতে থাকে। এক একটি পর্বের ভিতর যে বিভিন্নতা, এমনকি বৈপরীত্য থাকলেও অন্তিম পর্বের আমিতে পৌঁছিয়ে যেন একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত তৈরী হয়ে ওঠে।

এখানে দুইটি প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহল কোনটি আমাদের সঠিক আত্মপরিচয়? এই ভিন্ন ভিন্ন পর্বগুলির এক একটি খণ্ড চিত্রের এক এক রকম পরিচয়ের পথরেখায় ক্রমাগত ভিন্ন ভিন্ন এক একটি আমির বহমান সত্য। সেইটিই, নাকি একেবারে অন্তিমে পৌঁছিয়ে প্রস্ফূটিত অন্তিম চিত্রটুকুই আমার একমাত্র সত্য? অবশ্যই এর স্বতঃসিদ্ধ কোন শেষকথা হয়তো হয় না। যাঁর কাছে বিষয়টি যেভাবে ধরা দেয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন জীবনের একেবারে অন্তিম পর্বে এসে দ্ব্যর্থহীন ভাবেই বলেন, ঘুম থেকে জেগে ওঠার কথা। বলেন জেগে উঠে এই কথা জানা গেল যে, এই জগৎ স্বপ্ন নয়। তখন পাঠক হিসাবে আমাদের নড়েচড়ে বসতে হয় বইকি। তবে কি কবি সত্যই ভাবছেন, তিনি এতদিন জাগ্রত ছিলেন না? ছিলেন সেই রোমান্টিক ভাববিলাসের অন্তরে স্বপ্নদ্রষ্টা হয়েই? আর তাই যদি ধরে নিতেই হয়, তবে তো সমগ্র রবীন্দ্রসৃষ্টির বিষয়েই আমাদেরকে ভাবতে হবে নতুন করে। আগাগোড়া একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। তাতে যদি আমাদের এতদিনের চেনার জগতটা তোলপাড় হয়ে যায়, তাতেও আর পিছিয়ে আসার উপায় থাকবে না।

এবং সেই রক্তের অক্ষরে বেদনায় বেদনায় আঘাতে আঘাতে নিজেকে চেনার মধ্যে দিয়েই কবি বুঝতে পারছেন সত্য বড়ো কঠিন। রবীন্দ্রসাহিত্যের যে কোন নিবিষ্ট পাঠকের মনেই তখন একটি কথাই কিন্তু উঁকি দেবে, তবে কি কবি এতদিন সত্যেকে অন্যভাবে জানতেন? সেই রোমান্টিক স্বপ্নবিলাসের সত্যেই কি তবে এতদিন আটকিয়ে পড়েছিলেন কবি? যে কবিকে আমরা ভরসা করে এসেছি সত্যদ্রষ্টা হিসাবেই। সেই তিনি জীবনের একেবারে অন্তিম পর্বে এসে মৃত্যুর মাত্র মাস দুয়েক আগে দেখা পেলেন সত্যের? উপলব্ধি করতে পারলেন সত্য কত কঠিন? আর এতদিন যে সত্যকে আঁকড়িয়ে পথ কেটে চলেছিলেন, সেই সত্য কি তবে রোমান্টিক স্বপ্নবিলাসেরই কবিকল্পনার সত্য? যার সাথে যোগ ছিল না বাস্তব সত্যের?

আমাদের রবীন্দ্রনাথ, যিনি আজীবন মানবতার পুজারী। সত্য ও সুন্দরের জয়গান করে এসেছেন। বিশ্বাস করে এসেছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। ভরসা করে এসেছেন, মানুষ তার ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র আমির অহমিকার অন্ধকার থেকে তাঁর অন্তরস্থ বৃহৎ আমিতে মুক্ত হবে একদিন। যেদিন সে বলতে পারবে ‘তুমি সুন্দর, আমি ভালোবাসি’। সেই দিনের অভিমুখে আজীবন এবং নিরন্তর যিনি আমাদেরকে চালনা করে এসেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথেরও কি তবে মোহভঙ্গ হলো শেষে? বুঝতে পারলেন, সেসবই মানুষের শুভবোধজাত কষ্টকল্পনা শুধু। আসল সত্য, সে বড়ো কঠিন। সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি আজ পরিণত রবীন্দ্রনাথ। আজ আর কোন স্বপ্ন নয়। নয় কল্পনার রঙে রঙ মেলানো। আজ সরাসরি সত্যের সাথে মুখোমুখি মোকাবিলা। কিন্তু কোন সত্য? দু দুটি বিশ্বযুদ্ধে মানবতার নিদারুণ পরাজয়ের সত্য? মানুষের নগ্ন চৈতন্যে বিবস্ত্র লোভের চিত্র? যে চিত্রের নিকৃষ্টতম নিদর্শন হিরোসিমা নাগাসাকি হতে তখনো বছর তিনেক বাকি। কিন্তু সত্যদ্রাষ্টা কবি কি তারই পদধ্বনিতে জেগে ওঠেন নি? উঠেছেন নিশ্চয়। আর উঠেছিলেন বলেই, এই শেষ স্বীকারক্তি। সত্য যে কঠিন। সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়ে কিই বা করতে পারেন আজ অশীতিপর বৃদ্ধ অসমর্থ রবীন্দ্রনাথ? ঢাল তোলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার কবির তখন অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া আর করার কিই বা থাকতে পারে।

ঠিক সেই কারণেই কি কবি বলছেন না, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম। রোমান্টিক স্বপ্নবিলাসী মনে সত্যকে একদিন সুন্দর বলেই ভরসা করেছিলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। সে তাঁর যৌবনের কাল। সমুদ্র পারের কবি কীটসের সুরে সুর মিলিয়ে কবিও ভুলে ছিলেন সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য মনে করে। তারপর কবির জীবনের উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গিয়েছে। আবিশ্ব কত পট পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আজ জীবনের অন্তিমে এসে কবি উপলব্ধি করছেন সত্য যে কঠিন। এই উপলব্ধির হাহাকার বড়ো মর্মান্তিক। একথা রবীন্দ্রনাথের নিবিষ্ট পাঠক মাত্রেই অনুভব করতে পারবেন। ঠিক সেই হাহাকারেই কবির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ সত্যের চরম বাস্তবতার কাছে। যে বাস্তবতায় সত্যকে কবি আর সুন্দর বলতে পারছেন না। বলছেন কঠিন। এবং তারপরেই সেই চরম ক্লাইম্যাক্স। কবিকে বলতে হচ্ছে, ‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’। এই সেই রবীন্দ্রনাথ, একদিন যিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছো ভালো?

সেই রবীন্দ্রনাথই আজ মৃত্যুর কয়েক পা অদূরে জানাচ্ছেন সত্য বড়ো কঠিন, বলছেন না আর সত্য সুন্দর। বরং রলছেন, কঠিন সত্যকে ভালোবাসার কথা। এবং আরও বলছেন, এই কঠিন সত্য কখনো বঞ্চনা করে না। করবেই বা কি করে, এই কঠিন সত্য তো প্রায় সম্পূর্ণ নাস্তির মতো। তার তো আর দেওয়ার কিছুই নাই। তাই তার কাছ থেকে আশা করার কিছুই নাই। তাকে ভরসা করারও কোন প্রয়োজন নাই। ফলে তার কাছ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না।

এ কোন রবীন্দ্রনাথ? আমাদের চেনা জানা সেই রবীন্দ্রনাথ কি? যিনি মেঘ দেখে ভয় না করার অভয় বাণী শুনিয়ে থাকেন মেঘের আড়ালে দীপ্ত সূর্যের উপস্থিতির সংবাদ জানিয়ে। তাঁর বিচিত্র সৃষ্টিকাণ্ডের প্রতিটি সৃজনলীলায়! সেই রবীন্দ্রনাথের, সত্যের নিদারুণ কঠিন বাস্তবতার কাছে এইভাবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আমাদের হতবাক করে দেয়। এবং আমাদেরকে আরও হতবাক করে দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন আমৃত্যু দুঃখের তপস্যার জীবনে সত্যের দারুণ মূল্য (পাঠককে এখানে পড়তে হবে সত্যের কঠিন মূল্য) লাভ করতে মৃত্যুতেই সকল দেনা শোধ করে দিয়ে যেতে হবে। হাতে যে আর কিছুই থাকবে না। ওয়ার্ডসওয়ার্থ কীটস শেলীর স্বপ্নবিলাসে থেকে যাত্রা শুরু করে আমাদের রবীন্দ্রনাথ এসে পৌঁছালেন প্রায় নাস্তিক্যের শূন্যতেই।

১০ই অগ্রহায়ণ

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত