অনশন বৃত্তে আটকা পড়ে আন্দোলন? লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনশন বৃত্তে আটকা পড়ে আন্দোলন? লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

অনশন বৃত্তে আটকা পড়ে আন্দোলন?

 

আসল যুদ্ধটা থ্রেট সিণ্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরাসরি জুনিয়র চিকিৎসকদের। সিনিয়র চিকিৎসকরা সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও সাথে রয়েছেন। পিছন থেকে ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য। এদিকে থ্রেট সিণ্ডিকেটের সাথে এক শ্রেণীর সিনিয়র এবং জুনিয়র চিকিৎসকেরাও জড়িত। যাদের মাথার উপের প্রশাসনের বরাভয়। তারাই বর্তমানে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। আর জি করের নির্যাতিতা নিহত জুনিয়র চিকিৎসক তরুণীকে, সেই নিয়ন্ত্রণ মানতে না চাওয়ার কারণেই খুন হতে হয়। বুদ্ধিমানের মতো তিনিও যদি থ্রেট সিণ্ডিকেটের নিয়ম কানুন মেনে সেই সিণ্ডিকেটেরই একজন হয়ে যেতে চাইতেন। হয়তো কেন, নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। তাঁকে এমন নির্মম ভাবে জীবন দিতে হতো না। এমনকি সি্ডিকেটের একজন না হলেও সিণ্ডিকেটের কথায় ওঠবোস করতে থাকলেই প্রাণরক্ষা হতো তাঁর। ঠিক যেভাবে শত শত চিকিৎসক আত্মরক্ষা করে চলছিলেন ৯ই আগস্ট অব্দি। কিন্তু নির্যাতিতার নৃশংস পরিণতি বাকিদের সকল ধৈর্য্য এবং সহিষ্ণুতার বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন। এইভাবে মুখবুজে থ্রেট সিণ্ডিকেটের হুকুমনামা মেনে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকলে কারুরই জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। আর সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁরা এবারে ঘুরে দাঁড়াতেই চাইছেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষের তখন একটাই কাজ করার থাকে। ফোঁস করে ওঠা। ছোবল মারার বিষয়টা অনেক পরের। কিন্তু ফোঁস করতেও না পারলে আর যে নিস্তার নেই। আর জি কর কাণ্ড রাজ্যের আপামর জুনিয়র চিকিৎসকদের সেই শিক্ষাটুকুই দিয়ে গেল। শুধু জুনিয়রদেরই নয়। সিনিয়রদেরও বটে। সেই কারণেই সিনিয়ররা এখন পর্য্যন্ত সর্বতোভাবেই জুনিয়রদের পিছনে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁরাও বুঝতে পেরেছে, নাউ অর নেভার। যে শিরদাঁড়া নিয়ে জুনিয়ররা প্রতিবাদের প্রতিরোধের মিছিলে পথে নেমেছেন। ৯ই আগস্ট অব্দি তাঁদেরকেও সেই শিরদাঁড়া গেটে ঝুলিয়ে রেখেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হতো। না হলে কি হতে পারতো। নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন আর জি করের নির্যাতিতা তরুণী চিকিৎসক। তাঁর মৃত্যুই বাকিদের সম্বিত ফিরিয়ে দিয়েছে। সেই করাণেই তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সেই থ্রেট সিণ্ডিকেটকেই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে শিকড় সমেত উপড়িয়ে ফেলার লক্ষ্যে। তাঁদের এই আমরণ অনশনের পথে যাওয়ার কারণও ঠিক সেটাই। অনেকটা গান্ধীবাদী ‘ডু অর ডাই’ মিশনের মতোন।


এখন মুশকিল হচ্ছে। রাজ্যের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে একটি সিণ্ডিকেট রাজত্ব গড়ে উঠেছে। তার সাথে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন জড়িত। তার সাথে প্রশাসনের হর্তা কর্তা বিধাতা থেকে রাজনীতির বিভিন্ন নাটবল্টু শক্ত করে বাঁধা। এমন একটা প্রায় নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা হটাৎ করে জুনিয়র চিকিৎসকদের আমরণ অনশনে ভেঙ্গে পড়বে। এমন অস্বাভাবিক ঘটনা তো ঘটতে পারে না। কিংবা এই থ্রেট সিণ্ডিকেটের যাঁরা মাথা। আমরণ অনশনের লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে দেখতে হঠাৎ করে চণ্ডাশোক থেকে অশোক হওয়ার মতো কোন জাদুবলে তাঁদের স্বভাব কিংবা প্রকৃতি বদলিয়ে যাবে। এমনটাও আশা করা অন্যায়। এগুলির কোনটিই হবে না। বরং কি করে জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনকে লাইনচ্যুত করে দেওয়া যায়। সেই অপচেষ্টাতেই সেই মাথাদের মস্তিষ্ক যে ক্রিয়াশীল থাকবে, সেটা চোখবুঁজেই বলে দেওয়া যায়। এবং রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় থেকে কেন্দ্রের শাসক গোষ্ঠীর সাথে রাজনৈতিক রফাসূত্রে পৌঁছিয়ে কি করে সেই থ্রেট সিণ্ডিকেটকে এখনো বাঁচিয়ে রাখা যায়। সেটাই যে থ্রেট সিণ্ডিকেটের পাখির চোখ হবে। সেটা অনুধাবন করা এমন কিছু শক্ত কাজ নয়।


ফলে খুব কম বুদ্ধিতেও এটা বোঝা সম্ভব। জুনিয়র চিকিৎসকদের এই আন্দোলনকে একই সাথে দুইটি পক্ষের সম্মিলিত প্রতিরোধের সাথে লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন জনগণ যখন জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তখন জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন সফল হবেই। কারণ জনতার রায়ের উপরে আর কোন কথা থাকে না। কিন্তু জনতাকে চিরকালই রাজনীতির কলাকৌশলে বিভ্রান্ত করা সহজ। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন থেকে জনতাকে বিচ্ছিন্ন করা রাজীনীতিতে খুব একটা কঠিন কাজও নয়। এই কারণেই জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনকে খুব কঠিন একটা লড়াইয়ের সামনে পড়তে হচ্ছে। এবং দিনে দিনে লড়াই আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, তাঁদের আন্দোলন যদি মাঝপথেই দুর্বল না হয়ে যায়। সব রকম দিক থেকে সব রকম ভাবেই চেষ্টা করা হচ্ছে, এই আন্দোলন যাতে দিকভ্রান্ত হয়ে মাঝপথেই বেসামাল হয়ে কার্যত মুখ খুবড়ে পড়ে। যদিও ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের দিক থেকে আন্দোলনের দশ দফা দাবির কিছু কিছু দাবি পুরণের জন্য ধীর পদক্ষেপে হলেও সরকারী স্তরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নিহত তরুণীর ন্যায় বিচারের দাবিটি ছাড়া অন্যতম মূল যে দাবি, চলমান থ্রেট সিণ্ডিকেটের হাতে ভবিষ্যতে যাতে এইভাবে আর কারুর প্রাণ না যায়, সেই দাবির বিষয়েই রাজ্য সরকার কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছে। আর সেখানেই আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররাও আটকিয়ে গিয়েছেন। তাঁরা বারংবার সেই দাবি পুরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে চাইছেন সরকারের কাছে থেকে। জানতে চাইছেন সরকার কি ভাবে এই থ্রেট সিণ্ডিকেটের শিকড় উপড়াবে এবং তার পদ্ধতিগত পদক্ষেপগুলি কি কি নেওয়া হবে। কিভাবে নেওয়া হবে। সেই সকল অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়েই তাঁরা হত্যে দিয়ে বসে রয়েছেন আমরণ অনশন মঞ্চে।। এবং থ্রেট সিণ্ডিকেট বিনাশে জুনিয়র চিকিৎসকরা যে কয়টি পদক্ষেপ সরকারকে নিতে অনুরোধ করেছেন। সেই পদক্ষেপগুলি নিতে সরকার কিছুতেই রাজিই বা হচ্ছে না কেন। সেটাই আন্দোলনরত চিকিৎসকদের প্রশ্ন। না, সরকার এখনও এই বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে রাজি নয়। রাজি নয় বলেই সরকারের তরফ থেকে যতখানি সম্ভব অসংবেদনশীল হওয়া সম্ভব। সরকার ততখানি কঠিন অবস্থান নিয়ে বসে রয়েছে। ফলে আমরণ অনশন প্রায় এক পক্ষকাল অতিবাহিত হওয়ার পরেও এখনো কোন সমাধান সূত্র দেখা যাচ্ছে না। এদিকে একের পর এক জুনিয়র চিকিৎসকের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েই চলেছে। যার ফলে একাধিক জুনিয়র চিকিৎসককে অনশনস্থল থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্ত্তি করতে হয়েছে। সরকার সম্ভবত বুঝে গিয়েছে, অনশনকারীদের ভিতরে কেউই আমরণ অনশন চালিয়ে যেতে পারবে না। স্বাস্থ্যের অবনতি হলেই তাদেরকে যখন হাসপাতালে ভর্ত্তি করে সারিয়ে তোলা যাচ্ছে, তখন সরকারের এই অনশন নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই বা কি? খুব স্বাভাবিক ভাবেই আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকেরাও এই জায়গায় পৌঁছিয়ে দিশা হারিয়ে ফেলার মতোন অবস্থায়। কারণ চোখের সামনে তাঁরা কাউকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেও দিতে পারবেন না। আর সরকারও সেটা বুঝে গিয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় হয়ে বসে থাকবে। ফলে যে অনশনকেই আন্দোলনের তুরুপের তাস হিসাবে কাজে লাগাতে চেয়ে এই আমরণ অনশনের পথে আসা। সেই অনশনই এখন আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের আন্দোলনের অন্যতম দুর্বল জায়গা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটা বুঝেই সরকার তার ঘুটি সাজিয়ে চলেছে।


আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকরা এই যে একটি চক্রব্যূহে আটকিয়ে পড়েছেন। এর থেকে তাঁরাও নিশ্চয় মুক্তির পথ খোঁজার চেষ্টায় রয়েছেন। সরকারকে চাপ দেওয়ার যে পথটা তাঁরা খুলতে চেয়েছেন। সেই পথটাই সরকারের চাপ হালকা করে দিচ্ছে। অন্তত এখন অব্দি। সরকার আশা করছে আন্দোলনকারী অনশনরত চিকিৎসকরাও আমরণ অনশন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। এবং জনতাও অধৈর্য্য হয়ে দিনে দিনে আন্দোলনের পাশ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবে। তখন সেই থ্রেট সিণ্ডিকেটের থ্রেট স্বরূপ জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনও বিফল হতে বাধ্য হবে। উল্টে সরকার তার প্রচারযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি মতো কত শতাংশ সিসিটিভি, কত শতাংশ রেস্ট রুম। কত শতাংশ শৌচালয় নির্মাণ করেছে আর কত সংখ্যায় পুলিশ মোতায়ন করে হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে তার ফিরিস্তি দিয়ে দিয়ে জনতাকে ম্যানেজ করতে থাকবে। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা এখন কোন পথে কিভাবে অগ্রসর হবেন। সেটা সময়ই বলবে। সাধারণ জনগন আরও কতদিন এই আন্দোলনের পাশে থাকবে। সেটা রাজনীতির কারবারীদের কূটকৌশলের সাফল্য ব্যর্থতার উপরে কতখানি নির্ভর করবে, আর জনতার জনশক্তির আবেগ এবং প্রত্যয়ের উপরে কতখানি নির্ভর করবে সেটাও সময়ই বলবে। আপাতত আন্দোলন একটা পর্যায়ে এসে যে আটকিয়ে পড়েছে। সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। এতে সবচেয়ে বেশি স্বস্তিতে কিন্তু সেই হাড়হিম করা থ্রেট সিণ্ডিকেটই। আপাতত ডুব সাঁতারে থেকেও তাদের ডুবে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আমরণ অনশনে বসেও আন্দোলনকারীরা নিজেদের শরীর নিয়ে যতটা না চিন্তিত। থ্রেট সিণ্ডিকেটের বর্তমান অবস্থান স্বভাবতই তাঁদের কপালে তার থেকেও বেশি চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। দিয়েছে সরকারের সৌজন্যেই। সেই কারণেই আন্দোলনকারীদের যাবতীয় অভিমান সেই সরকারের উপরেই। অভিমান জমতে জমতে ক্ষোভের আগুনে ক্রোধে পরিণত হয়ে গেলে সেটা যে সরকারের পক্ষেও সুবিধেজনক হবে না। সেই সোজা কথাটুকু সরকার আদৌ অনুধাবনের শক্তি রাখে কিনা। তার উত্তরও কিন্তু সেই সময়েরই হাতে।


কপিরাইট শ্রীশুভ্র ১৮ই অক্টোবর ২০২৪