কবিতায়
যৌনতা
কবিতায় যৌনতা তারও আবার কাব্য সংকলন, কালে কালে আরও
কত কি দেখবো। একেবারে ঘোর কলি। ঘোর কলি। তারই আবার ঘোষণা। প্রকাশ্য দিবালোকে।
সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায়। ইনটারনেটের পরিসরে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই
তাথৈ নৃত্যে তাল দিতে ছুটে আসছে, এ আর বিচিত্র কি?
ঠিকই তো, এমনই প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা অনেকেরই। খুবই সত্য কথা, কারণ সমাজের
অধিকাংশ মানুষের চোখে যৌনতা একটি পাশবিক বিষয় বই তো নয়। ফলে কবিতায় যৌনতা দেখলে
আমাদের ভিতর অনেকেরই যে চোখ কপালে উঠে যাবে সে খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। তাও
আবার ভাদ্রমাসেই বেছে নেওয়া হয়েছে এমনই একটি নিষিদ্ধ বিষয়। ফলত অনেকের কাছেই
বিষয়টি যে খুবই একটি গর্হিত কর্ম হিসাবেই প্রতিভাত হবে, সেও খুব স্বাভাবিক।
চারদেওয়ালের ভিতর অন্ধকারের আড়ালে যে বিষয়টিকে লাজলজ্জায় বন্দী করে রাখা হয়ে থাকে,
তাকেই মানুষের হাটে নিয়ে আসলে মনের ভিতরের সংস্কারেই প্রথম ঘা লাগে। ঘা লাগার
কারণ, সাধারণ বুদ্ধিতে আমাদের চেতনায় ও আজন্মলালিত সংস্কারে যৌনতা এমনি একটি বিষয়
যা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলাই পাপ। তাই নিয়েই কাব্যচর্চা! বেশ বেশ।
আসলে এই যে আজন্মলালিত সংস্কার, তার মূলে রয়েছে, আমাদের চেতনায় যৌনতা
মানেই সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়া। চারদেওয়ালের ভিতর নিভৃত রাতের একান্ত
এক্সক্লুসিভ কাহিনী। আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণের এই যে জগৎসংসার, তার
সজীব বেদীতে যৌনতাকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভবের শক্তি ও সামর্থ্য, শিক্ষা ও দীক্ষা
আমাদের গড়ে ওঠে নি আজও। না গড়ে ওঠার বহুবিধ কারণ বর্তমান। রয়েছে সুবিস্তৃত
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
জীবন যৌবন আর যৌনতা যে কখনোই পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোন সত্ত্বা নয়, নয় পরস্পর
বিছিন্ন কোন পর্ব, বরং তিনে মিলেই জীবনের সম্পূর্ণ উদ্বোধন; সেকথা আমরা সকলেই
জানি। জেনেও আমাদের অবচেতনে যৌনতা নিয়ে
সার্বিক যে অস্বস্তি, তার মূলেই রয়েছে আমাদের শিক্ষার অসম্পূর্ণতা। চেতনার
সংকীর্ণতা। যৌনতাকে শুধুমাত্র নারী পুরুষের যৌন সংসর্গের ভিতরেই আবদ্ধ করে রেখে
দিয়েছি আমরা। যৌনতা যে নারী পুরুষের সম্পূর্ণ উদ্বোধনের ভরকেন্দ্র, সেই সত্যটাই
আড়ালে রয়ে গিয়েছে আমাদের মতো অধিকাংশ কেতাবী শিক্ষিত মানুষজনের চেতনায়। এখানেই
আমদের শিক্ষার ফাঁক।
না শিক্ষার এই ফাঁক একদিনে গড়ে ওঠে নি। বস্তুত সুপ্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার
ইতিহাসের নিবিড় পাঠ নিলে দেখা যাবে, প্রাচীন ভারতবর্ষের সমাজবাস্তবতায় যৌনতা নারী পুরুষের সম্পূর্ণ উদ্বোধনের
ভরকেন্দ্ররূপেই প্রতিভাত হতো এক সময়। যৌনতা নিয়ে সেকালে মানুষের ভিতর কোন পাপবোধ,
বা বিকৃত লালসা ছিল বলে মনে হয় না। বরং জীবন ও জগতের সাথে সহজ স্বাভাবিক ছন্দের যে
যোগ, সেই যোগের রাজপথ হিসাবেই সত্য ছিল যৌনতা। কিন্তু কালের অমোঘ নিয়মে সমাজ
সভ্যতায় পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের সার্বিক বিস্তারে নারীর শরীর পুরুষের ভোগ লালসার
সমগ্রী হয়ে উঠতে থাকার ফলে যৌনতার বিষয়টি মানুষের চেতনায় বিকৃত কামের রূপ নিতে
শুরু করে কালে কালে। আর এরই সাথে পরপর দুইটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে ভারতীয় সভ্যতায়।
একদিকে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঠেকাতে মূলত শঙ্কারাচার্য্য পন্থী ব্রাহ্মণ্যবাদের
প্রতিষ্ঠা আর অন্যদিকে পরবর্তী সহস্রাব্দে ইসলামিক সংস্কৃতির সার্বিক প্রভাবে
ভারতীয় সমাজবাস্তবতায় যৌনতার বিষয়টি জীবনের সহজ সরল ছন্দ থেকে নির্বাসিত হয়ে যায়।
তার একমাত্র অভিমুখ হয়ে দাঁড়ায় পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের সূত্রে বংশবিস্তারের
কার্যক্রম।
আমাদের আজকের আধুনিক ভারতবর্ষের মানসপট এই দুই ঐতিহাসিক সত্যের ভিতর দিয়েই
গড়ে উঠেছে। এবং সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে গিয়েছে সুপ্রাচীন ভারতীয় সমাজসভ্যতার আদি
শিকড়। ফলে আজকের মানুষের সংকীর্ণ চেতনায় যৌনতা মানেই যৌন লালসা আর পিতৃতান্ত্রিক
ক্ষমতায়নের সোপান। বংশবিস্তারের নিমিত্ত সন্তান উৎপাদন কার্যক্রম। হ্যাঁ আমাদের
প্রত্যেকের ঘরেই এটাই ভারতীয় সংস্কৃতির গোড়ার কথা। আমাদের জন্মদাতা দাত্রী সকলের
চেতনাই এমন আসাড় হয়ে পড়ে রয়েছে। আর সেই আসাড় চেতনারই সন্তান আমরা সকলেই। ফলে আকাশ
ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণের সজীববেদীতে যৌনতার সৌন্দর্য্য ও ঐকান্তিক
তাৎপর্য্য আজকের জনজীবনের অসাড় চেতনায় ধরা পড়ে না। তা কেবলই চার দেওয়ালের অন্ধকারে
সমায়িক উত্তেজনা প্রশমনের স্বলাজ প্রক্রিয়া মাত্র। যার মুখ্য প্রয়োজন সন্তান
উৎপাদন আর শারীরিক উত্তেজনা প্রশমন।
নারী পুরুষের শরীর আর যৌবনের ছন্দ তাল লয়ের ভিতর বিশ্বছন্দের যে লীলা, যার
ভিতর দিয়েই প্রকৃতি নিরন্তর নিজেকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে নেয়, যৌনতা সেই নেওয়ারই
একমাত্র শক্তি। সেই শক্তির আরাধনাই ছিল সুপ্রাচীন ভারতীয় সমাজ সভ্যতার আদর্শ। মূলত
শঙ্করাচার্য্যপন্থী ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইসলামিক সংস্কৃতির প্রবল ও সার্বিক প্রভাবেই
আমরা সেই আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। ঠিক এই কারণেই আমাদের ঘরে ঘরে যৌনতা
মানেই লজ্জা। সকলের আড়ালে লুকিয়ে চুরিয়ে করার মতো একটি কাজ। যে কাজের জন্য মনের
ভিতর সাময়িক উত্তেজনা প্রশমন ছাড়া কোন আনন্দ জাগে না। বরং জেগে ওঠে চাপা পাপবোধ।
জমতে থাকে গ্লানি। যে কারণে পর্যাপ্ত সংখ্যক সন্তানাদি এসে গেলেই অধিকাংশ সংসারেই
দেখা যায় বাবা মা আর একসাথে শোয় না। এবং যৌনতার চেতনা ঠিক এই একসাথে শোয়ার মতো
চরমতম সংকীর্ণ একটি বিষয়ের ভিতরেই আটকিয়ে থাকে মাত্র। যার ফলে শরীরের খিদে মিটে
গেলেই তাদের ভিতর ক্রমেই শারীরিক দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার অন্তিমে মনের
দূরত্বের পদধ্বনি প্রবল হতে থাকে অনেক ঘরেতেই।
আমাদের ভিতর কজন স্মরণ করতে পারি, নিজের বাবা মাকে পরম মমতায় আদরে পরস্পর
আলিঙ্গরত অবস্থায়? আমাদের অভিজ্ঞতায় চেতনায় আপন পিতামাতার পারস্পরিক আদরের কোন
স্মৃতি না থাকার কারণেই আমাদের ভিতরে যৌনতা মানেই লজ্জা। যৌনতা মানেই নিষিদ্ধ
বিষয়। যৌনতা মানেই আড়াল। যৌনতা মানেই শোওয়ার খাট। কিন্তু এমনটি যদি না হতো? যদি
জীবনের আর পাঁচটি স্বাভাবিক বিষয়ের মতোই যৌনতার ধারণা আমাদের অভিজ্ঞতায়, স্মৃতিতে
সত্য হয়ে উঠতে পারতো, তাহলেই হয়তো যৌনতার বিষয়টি আজকের মতো লালসার সমার্থক হয়ে
উঠতো না। আপন পিতামাতার ভিতর পারস্পরিক আদরের সম্পর্কের স্মৃতি জায়মান থাকলে
যৌনতাকে লালসার ভিতর দিয়ে চরিতার্থতার মতো প্রবৃত্তি হয়তো কারুর ভিতরেই বাসা
বাঁধতে পারতো না। সমাজে নারী অবস্থানও এত অরক্ষিত হতো না। একটা সুস্থ সবল সমাজ
দেখতে পেতাম আমরা।
তাই যৌনতাকে যতই চাপা দিয়ে রাখা হবে, ততই মানসিক বিকার ও অসুস্থতা
সমাজদেহের অঙ্গ হয়ে উঠতে থাকবে। বিগত হাজার দেড়েক বছর ব্যাপি ভারতবর্ষে ঠিক যা
ঘটেছে। এই কারণেই সমাজের সার্বিক পরিসরে যৌনতার সৌন্দর্য্য ও আসল তাৎপর্যের বিষয়ে
জনসচেতনতা বৃদ্ধির আশু প্রয়োজন। এবং সাহিত্যচর্চাও এই প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে উদাসীন
থাকতে পারে না কোন মতেই। সাহিত্যের তাৎপর্য জীবনের সার্বিক উদ্বোধনেই। আর জীবনের
সার্বিক উদ্বোধন যৌনতাকে ধামাচাপ দিয়ে সম্ভব নয় কখনোই।
২৬শে আষাঢ়’ ১৪২৬
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

