কবিতার বাজারদর ও কাব্যসংকলন
প্রকাশচক্র
বিশেষ ঘোষণা বিশেষ ঘোষণা। সুবর্ণ
সুযোগ। সুবর্ণ সুযোগ। হাজার কবির কাব্যসংকলন। আপনিও যোগ দিতে পারেন। যত খুশি কবিতা
পাঠাতে পারেন। কবিতা পিছু মাত্র হাজার টাকার চেক পাঠাতে হবে। প্রকাশিত হলে দুই কপি
বই কিনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। প্রকাশিত হবে আগামী বইমেলায়। হয়তো ঠিক এইরকমই কোন
বিজ্ঞাপন আপনিও দেখে থাকবেন। পকেট ভারী থাকলে প্রলুব্ধও হতে পারেন। অনেকেই দৌড়াবে।
বিশেষ করে যাদের গাঁটের পয়সা খসাতে হয় না। কাটমানি কালোমানি ঘুষমানি পণমানি সারদামানি
নারদামানির দৌলতে খাসা সুখের দিন যাচ্ছে। আর নয়তো গাঁটমানির উপর ভরসা করেও বহুদিনের
বাসনা পূরণের এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না মনে করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতেই
পারেন। ছাপার অক্ষরে নিজেকে দেখার সুখ, কম কথা নয়। তারপরে ফেসবুক পোস্ট আর লাইকের বন্যা।
বাংলাসাহিত্যে আপনারও অবদান রয়ে গেল ভেবে সংসারও গর্বিত!
ঠিক, অনেকেই
অসন্তুষ্ট হবেন জানি। হতেই পারেন। কে কোথায় পকেটের টাকা খসিয়ে কবিতা ছাপালো তাতে আপনার
কি মশাই? বলতেই পারেন আপনিও। সত্যই তো আপনার অর্থ, তাই নিয়ে আপনি কি করবেন তাতে নাক
গলানোর আমি কে? না, সে বিষয়ে কিছু বলাও ধৃষ্টতা। বলতে চাইছিও না কিছু। কিন্তু একবার
একটু ভেবে দেখুন তো, এই যে অর্থের বিনিময়ে অর্থাৎ কবিতা পিছু টাকা নিয়ে যারা আপনার
আমার কবিতা ছাপছে, ছাপাচ্ছে, লেখক বা কবি হিসাবে তাদের কাছে আমার আপনার কোন সম্মানটা
বজায় রইল? বজায় থাকছে কি?
আজকের
দিনে যেখানে প্রতিটি দ্রব্য চড়া দড়ে বিকোচ্ছে, সেখানে কবিতার এই হাল কেন হবে? কেন কবিতা
ছাপাতে হবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পয়সা খসিয়ে? কেন কবিতাসংকলনে কবিতা প্রকাশ হলে আমাকেই
পয়সা দিয়ে একাধিক খণ্ড সংগ্রহ করতে হবে? নিজের আত্মসম্মানেও কি আঘাত লাগে না আর আমাদের?
অনেকেই
বলবেন, কবিতার কোন বাজার দর নাই, তাই এমন অবস্থা। কবিতার বই বাজারে বিক্রী হয় কম। হলেও
কবির জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে কিছু বই বিক্রী হয়ে থাকে। তা সে কবি যে কারণেই জনপ্রিয় হন
না কেন। সে অন্য প্রসঙ্গ। বেশ, তাই না হয় হলো। কবিতার যখন বাজার দরই নাই, তাহলে এত
এত কাব্যসংকলন প্রকাশই বা করতে যাওয়ার দরকার কি? কবিরা তো আর রাস্তাজুড়ে কাব্যসংকলন
প্রকাশের দাবিতে ধর্মঘট করতে বসে পরেন নি। তাহলে? কিসের তাড়নায় এই কাব্যসংকলন প্রকাশের
এত ধুম?
সাহিত্যচর্চা?
সত্যি করে সাহিত্যচর্চার জন্যই কি লেখকের কাছ থেকে কবিতা পিছু অর্থ আদায় করে কাব্যসংকলন
প্রকাশ? না অন্য কিছু? কারণ যাই হোক, আমরা বরং একটু অন্য সুরে বাঁশি বাজাই আসুন।
অনেকেই
জানেন কবিতার বাজারদর শূন্য। তাই কাব্যসংকলন প্রকাশ করলেও তার বিক্রী হওয়ার সম্ভাবনাও
খুব কম। ফলে একটি সংকলন প্রকাশ করতে যে টাকা ব্যায় হয়, তা ফেরৎ পাওয়াই সমস্যা। মুনাফার
কথা তো দূরস্ত। অনেকেই বলবেন সেই কারণেই কবিদের কাছ থেকেই টাকা নিয়ে সংকলন প্রকাশ।
এটাকে টাকা নেওয়া না বলে বলুন অর্থ সাহায্য। কেন? ধরা যাক আমি হরিদাস পাল, কালকে ঠিক
করলাম একটি কাব্যসংকলন প্রকাশ করবো। ভালো কথা। দেখলাম আমার পকেট গড়ের মাঠ। খুব ভালো
কথা। তাহলে আমি বই প্রকাশের স্বপ্নই বা দেখতে যাবো কোন দুঃখে? যেখানে নিজের ক্যাপিটালই
নাই? জানি অনেকেই বলবেন, আজকের যুগে কজন আর নিজের ক্যাপিটাল খসিয়ে ব্যাবসা করে বলুন?
দেখছেন না চারদিকে এত রমরমিয়ে চলছে প্রোমটারি ব্যবসা। সে কি আর নিজের টাকায়? বেশ। তাও
না হয় মানা গেল। কিন্তু যিনি ফেল কড়ি মাখো তেল মেনে ফ্ল্যাট কিনছেন, এডভান্সই দিন আর
নাই দিন, তিনি তো তাঁর টাকার বিনিময়ে একটি সম্পত্তি ক্রয় করছেন। কিন্তু আমার কবিতা
ছাপাতে গিয়ে আমাকেই কেন অর্থদণ্ড দিতে হবে? বিষয়টি তো সম্পূর্ণই আলাদা।
এরপরেও
আপনি বলতে পারেন, কি আর করবে বলুন। কবিতার বইয়ের যে কোন বজারদর নাই আজকের যুগে। প্রকাশক
বই বেচবে কাকে বলুন? আর বেচবেনই বা কি ভাবে? ঠিক কথা। অকাট্য যুক্তি। বেশ তাই যদি হয়,
তবে দুটো কথা বলি শুনুন। প্রথম কথা, সেক্ষেত্রে এই কবিতাসংকলন ছাপাতে যাওয়ার দরকারই
বা কি? কে মাথার দিব্যি দিয়েছে প্রকাশক বা সম্পাদককে বই ছাপানোর? জানি, আপনি তো বলবেন,
সাহিত্যচর্চা মশাই। সাহিত্যচর্চা। কজন আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারে বলুন। তাই
তো কবির কাছেই হাত পাততে হয় প্রকাশককে। না, বন্ধু। বিষয়টি অত সরলও নয়। ঘরের খেয়ে বনের
মোষ তাড়ানোর দিব্যি তো কেউ দেয় নি? তাহলে বই প্রকাশের জন্য এড চুলাকানি কেন? হ্যাঁ
হতে পারে, সংগৃহীত অর্থ থেকে হয়তো একটা সমান্য মার্জিন থাকলেও থাকতে পারে। হয়তো সেই
কারণেই এতো চুলকানি। আপনি বলতেই পারেন, থাকলে আমার আপনার কি? ক্ষতি কি?
না ক্ষতি
সেখানে নয়। বিষয়টা আত্মসম্মানের। কবির সম্মান। লেখকের সম্মান নিয়ে। আর এইখানেই আমি
দ্বিতীয় যে কথাটি বলতে চাইবো সেটি হল এই, বেশ তো মার্জিন কেন, মোটা মুনাফাই হোক না
কেনো একটা কাব্যসংকলন করে। তাতে তো সকলেরই লাভ। না না, মাথা নেড়ে লাভ নাই বন্ধু। কবিতার
বাজারদর নাই বললে চিড়ে ভিজবে না। কবিতা মানুষের জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও নয়। লাক্সারি
আইটেমও নয়। মানুষ কবিতা না পড়ে, সারাজীবন একটিও কবিতার বই না কিনেও সুস্থ সুন্দর সুখের
জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। জানি আমরা সকলেই। এটাই বাস্তব। কিন্তু আসুন তো চোখ খুলে একটু
স্পষ্ট করে তাকিয়ে দেখি। আজকের বাজারে কি শুধুই নিত্যপ্রয়োজনীয় থেকে প্রয়োজনীয়, শখের
থেকে লাক্সারি দ্রব্যই শুধু বেচাকেন হয়? নিতান্ত অপ্রয়োজনীয়, শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর
জিনিসও কি হু হু করে বিক্রী হয় না?
ধরা যাক
নেল পালিশের কথা। এই বস্তুটির কোন প্রয়োজন রয়েছে মানুষের জীবনে? মানুষ মাত্রেই নখের
রং একরকম এবং সুন্দর। তাকে অযথা রাঙিয়ে কোন লাভটা হতে পারে? না এতে করে নাকি নারীর
সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায়। তাই এটি মেয়দের অত্যন্ত শখের একটি দ্রব্য। বা ঠাণ্ডা পানীয়?
কোনো উপকার তো করেই না, বরং শরীরের বারোটা বাজানোর পক্ষে যথেষ্ট। তারপর ফাস্টফুড। দেখলে
দেখতে পাবেন এইরকমই হাজারটা অপ্রয়োজনীয় কখনো কখনো যথেষ্ট ক্ষতিকর দ্রব্যেরও আকাশ ছোঁয়া
বাজারদর।
না এই
বাজারদরটা আপনার আমার চাহিদা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে নি। এটাকে সুচতুর ভাবে গড়ে
তোলা হয়েছে। সোজা কথায় বললে আমাদের ব্রেনওয়াশ করেই। আর মানুষের ব্রেনওয়াশ করে তাকে
আমার প্রডাক্টের কাস্টমার অর্থাৎ খদ্দের বানানোটাই বিপণন বাণিজ্য। এবং এটা একটা আর্ট
ও বিজ্ঞান। তাই বলছিলাম, যে নেল পালিশে নখের কোন লাভই হয় না, সেই নেল পালিশও যদি হু
হু করে বিক্রী করা যায়, তবে সঠিক মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির প্রয়োগে, কাব্যসংকলনই বা
হু হু করে বিকোবে না কেন বলুন তো? অর্থাৎ ঠিকমত মানুষের ব্রেনওয়াশ করতে পারলেই কেল্লাফতে।
দরকার শুধু সঠিক মার্কেটিং স্ট্র্যটেজির সুদক্ষ প্রয়োগ। যে কোন দ্রব্য উৎপাদনের গোড়ার
কথাই এটি। এই মার্কেটিং বাদ দিয়ে দ্রব্য উৎপাদন করতে যাওয়াটাই তো ভুল।
অর্থাৎ,
যেহেতু আমি মার্কেটিং করতে জানি না, বা অপারগ; সেইহেতু আমার দ্রব্য বিক্রী হবে না ধরে
নিয়েই আমি কবির কাছে তার কবিতা ছাপানোর লোভ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছি। না বন্ধু এটা
কোন সুস্থ সংস্কৃতি নয়। এটা ওপর চালাকি মাত্র। আমি একটিও কাব্যসংকলন বিক্রীর ভার নেবো
না, অথচ কবির টাকাতেই সংকলন ছাপানোর খরচটুকু তুলে নেবো, পারলে তার থেকে একটা মার্জিন
রাখার চেষ্টা করবো- এই যে মনোবৃত্তি- এটি একধরণের প্রতারণা। প্রতারণা নিজের সাথেই।
মুখে বলছি সাহিত্যচর্চা, আসলে তলায় তলায় চুড়ান্ত ফাঁকিবাজির চর্চা। এতে সত্যি করে সাহিত্যচর্চারও
কোন লাভ হচ্ছে না। তা নিয়ে সঠিক ভাবে বাণিজ্যও হচ্ছে না। লেখক এবং সম্পাদক বা প্রকাশক
কেউ এতে একচুলও এগোতে পারছে না। এটাই এখন আমাদের আসল চিত্র। এবং চুড়ান্ত হাতাশ জনক
ও একান্ত দুঃখের।
আসুন না
একবার গোড়া থেকে আগাগোড়া ভেবে দেখি, আছে নাকি কোন মুক্তির পথ এই চক্রব্যূহ থেকে?
১৭ই
শ্রাবণ’ ১৪২৬
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

