ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর




ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর

সমারূঢ়

বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা—’
বলিলাম ম্লান হেসে; ছায়াপিণ্ড দিলো না উত্তর;
বুঝিলাম সে তো কবি নয়— সে যে আরূঢ় ভণিতা:
পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ’পর
ব’সে আছে সিংহাসনে— কবি নয়— অজর, অক্ষর
অধ্যাপক; দাঁত নেই— চোখে তার অক্ষম পিঁচুটি;
বেতন হাজার টাকা মাসে— আর হাজার দেড়েক
পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি;
যদিও সে-সব কবি ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক
চেয়েছিলো— হাঙরের ঢেউয়ে খেয়েছিলো লুটোপুটি।


না, জীবনানন্দ অনেক বেদনা সয়েই এই লাইন কয়টি না লিখে পারেন নি। পারেন নি, নিজে একজন সাহিত্যের অধ্যাপক হয়েও। সাহিত্যের অধ্যাপকদের সম্বন্ধে অনেক জমানো অভিমান থেকেই কবির কবিতা এমন ব্যঙ্গাত্মক ব্যঞ্জনা পেয়েছে সন্দেহ নাই। সন্দেহ নাই একজন কবির কাছে কবিতার শবব্যবচ্ছেদকারী অধ্যাপকদের সার্টিফিকেট নেহাতই অসম্মানজনক। যে কোন প্রকৃত কবি অপেক্ষায় থাকেন অন্তত একজন সমাঝদার রসিক পাঠকের। কবিতার চলাচল বোধের সংবেদনশীলতার পথরেখা ধরে। পাঠকের বোধে কবি যখন কবিতার অনুরণন বাজিয়ে তুলতে পারেন, তখনই তো কবিতার সত্য হয়ে ওঠা। তার আগে বীজের ভিতরে থাকা হিমসাগর আমের মতোই কবিতাও অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে পাঠকের বোধ সংবেদনশীল গভীর চেতনা ও হৃদয় রসের। এই তিনের ত্রিবেণী সঙ্গমে জল মাটি বাতাসের সঙ্গমে বীজের অঙ্কুরোদ্গমের মতোই কবিতাও প্রাণ পেয়ে ওঠে পাঠকের চৈতন্যে। বোধিতে। রসবোধের সরস হৃদয়বেত্তায়। সেখানে কবিতার শবব্যবচ্ছেদ করা অধ্যাপকের এসে দাঁড়ানো মানে পূর্ণিমা জ্যোৎস্নায় চন্দ্র বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর লেকচার শোনার মতো ঘটনা।

না, না কবি। না পাঠক। সাহিত্যের সমাঝদার কেউই অধ্যাপকের লেকচারের অপেক্ষায় কবিতার পাতা খুলে বসে থাকেন না। বসে থাকেন না, কবিতার ণত্ব ষত্ব বিচারের সার্টিফিকেটে চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে, কোনটি কবিতা। আর কোনটি নয়। সমাঝদার পাঠক, তাঁর সাহিত্যানুরাগে ও পাঠভ্যাসের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই সংযোগ সাধনের প্রয়াস করেন কবির কবিতার সাথে। যদি কোন কারণে সেই সংযোগের পথটি নাই খোলে, যদি অবরুদ্ধই হয়ে থাকে, তবে পাঠক অন্য কবিতায় চলে যাবেন। এর থেকে কি আর এমন বেশি ক্ষতি হবে কবি ও কবিতার। এবং পাঠকের? আজ না হয় কাল, অন্য কোন পাঠকের বোধের তন্ত্রীতে আবিষ্কৃত হবেন কবি ও তাঁর কবিতা। এমনটাই তো স্বাভাবিক নাকি? অন্তত যে কোন মৌলিক কবির ক্ষেত্রেই তাঁর সমকালে এমনই ঘটনা ঘটতে দেখা যেতে পারে। দেখা যেতে পারে, যদি কবির কবিতা তাঁর সমকালের থেকে অনেকটাই পরিণত ও প্রকরণ বৈচিত্রে নতুনতর এবং সময়ের বিচারে অত্যাধুনিক হয়। এর একটা বাস্তব কারণ রয়েছে। সাধারণত পাঠকের সাহিত্যবোধ ও সাহিত্য অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে তার সময়ের পূর্ববর্তী সাহিত্যসংস্কৃতির পরিমণ্ডলের ভিতর থেকে। সমকালের জায়মান সাহিত্যকীর্তির সম্যক উপলব্ধি করা, একজন পাঠকের অর্জিত অভিজ্ঞতায় ও লালিত সংস্কৃতিতে সম্ভব নাও হতে পারে। সেটা দোষনীয় নয়।

কিন্তু কবি ও তাঁর পাঠকের ভিতর কবিতাই একমাত্র সাঁকো। যে সাঁকোর উপরে দিয়ে পাঠক এসে পৌঁছান কবির কাছাকাছি। একেবারেই যে কাছে এসে পৌঁছিয়ে যাবেন। এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু অবশ্যই কাছাকাছি যে হবেন, তেমনটিই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেখানেই যদি সব কথা শেষ হয়ে যেত। তবে তো ভালোই হতো। কবি কবিতা ও পাঠকের ভিতর সংযোগের পথটা সবসময় এমন সহজও নয়। তার নানাবিধ কারণ থাকে। যেমনটা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করছি কিছুটা। সময়ের অগ্রবর্তী কবি’র কবিতায় পৌঁছানো সমকালের পাঠকের পক্ষে সহজ নাও হতে পারে। স্বয়ং জীবনানন্দের কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসেই যেমনটি ঘটেছিল। অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে পাঠক ও কবির মধ্যবর্তী সংযোগ সেতুতে আরোহণ করা। সমকালের সাহিত্যসংস্কৃতির থেকে অন্যতর ভুবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে সমাগত কবির কবিতার সাথে সংযোগ স্থাপন সম্ভব নাও হতে পারে সমকালের পাঠকের পক্ষে।

এখানে জীবনানন্দেরই একটি বহুচর্চিত লাইন স্মরণে বলা যেতেই পারে, ‘সকলেই পাঠকও নয়। কেউ কেউই পাঠক’। এটা খুবই সত্য। দেশকাল জাতি নিরপেক্ষ ভাবে সকল সময়েই সকল সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একটা অত্যন্ত বাস্তব সত্য। না, সকলেই পাঠক নয়। পাঠক হয়ে উঠতে হয়। সুদীর্ঘ সাধনার ভিতর দিয়েই। সকলের সেই সাধনা থাকে না। সকলের সেই সক্ষমতাও থাকে না। সকলের সেই আগ্রহও থাকে না। কবিতার বই পেলাম। পাতা উল্টালাম। পড়লাম। ভালো লাগল কিংবা ভালো লাগলো না। কিন্তু কবিতার অন্তর্দেশে তার সাহিত্য ভুবনে প্রবেশ করা অত সহজও নয়। অত সর্বজনীনও নয়। এমনকি শুধু কবিতার ক্ষেত্রেই যে এমনটা হয় মাত্র তাও নয়। সাহিত্যের সকল শাখাতেই তাই। এই যে ভালো লাগলো, কয়টি পাতা বেশি উল্টালাম। কিংবা ভালো লাগলো না। মনে হলো কি সব লেখে আজকের কবিরা। এই দুই অনুভবই আসলে বড়ো অগভীর। পাঠকের বোধের যে তন্ত্রীগুলি বেজে উঠলে একটি কবিতার মর্মমূলে প্রবেশ করতে পারেন, একজন পাঠক। অধিকাংশ সময়েই পাঠকের সেই বোধের তন্ত্রী অনভ্যাসের কারণে, চর্চার অভাবে অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। আসলে পাঠক তাঁর নিজ বোধের অন্তরেই অবগাহন করেন নি বা  করতে পারেন নি। আগে থেকেই। তাই তাঁর অসাড় বোধের অনভ্যস্ত তন্ত্রীগুলি কবির কবিতার অনুরণন রিসিভ করতে পারে নি। এই না পারা থেকেই জন্ম নেয় একটা অগভীর চেতনা। যার ভিতরে পাঠকের আপন রুচি অভ্যাস ও অভিজ্ঞতার সংকীর্ণতা শিকড় গেড়ে বসে থাকে। অগভীর সেই চেতনা থেকেই পাঠকের কোন কোন কবির কোন কোন কবিতা ভালো লাগতে পারে। বা নাও লাগতে পারে।

আমাদের উল্লিখিত কবিতায় অভিমানী কবি বলুন আর নাই বলুন, একজন কবি ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে তিনিও জানতেন, এইখানেই একজন প্রকৃত অধ্যাপকের প্রয়োজন হয়। এবং সেখানেও সেই একই সতর্কবাণী প্রযোজ্য। সকলেই অধ্যাপনায় সক্ষম নন। কেউ কেউ সক্ষম। একজন প্রকৃত সাহিত্য অধ্যাপকই পারেন, সাধারণ পাঠকের অনভ্যস্ত চেতনায় কবির কবিতাকেও পৌঁছিয়ে দিতে। পাঠকের অবরূদ্ধ চেতনার আগল খুলে দিয়ে, পাঠকের অনভ্যস্ত বোধের অসাড় তন্ত্রীগুলিকে সচল করে তুলতে। ঠিক যে তন্ত্রীগুলি সক্ষম হবে কবির কবিতার অনুরণনকে গ্রহণ করতে। কিন্তু কিভাবে করবেন অধ্যাপক সেই কাজটি? তাঁর একটিই পথ। কবির কবিতাকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে, কবিতার অন্দরমহলের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে একেবারে গভীর তলদেশে নিয়ে গিয়ে পাঠককে পৌঁছিয়ে দিতে। তখন অনভ্যস্ত পাঠকও আশ্চর্য্য হয়ে অনুভব করতে পারবেন, তাঁর আপন চেতনায় কাব্যবোধের তুমুল আলোড়ন। সেই পথেই তিনি যদি এগোতে থাকেন। দিনে দিনে তিনিও অভ্যস্ত হয়ে যাবেন পাঠকের সংস্কৃতিতে। তখনই একমাত্র তিনি আপন পাঠক সত্তাকে খুঁজে পাবেন। আবিষ্কার করবেন নিজেকেই নতুন করে। কবিতা লেখার থেকে তখন কবিতা পাঠ কোন অংশে কম আনন্দের উৎসব নয়। সেদিনই একজন পাঠকের উৎসবের দিন। তাই অনভ্যস্ত পাঠককে তাঁর পাঠক জীবনের উৎসবের দিনে পৌঁছিয়ে দিতে পারেন, না কোন কবি নন। একজন প্রকৃত অধ্যাপকই।

জীবনানন্দের এই ব্যাথা এই বেদনার মূল অভিমুখ আবার অধ্যাপকই নন শুধু। অভিমুখ অজর অক্ষর সাহিত্য সমালোচকরাই। যাঁদের পেশাই হলো কবিতার শবব্যবচ্ছেদ করা। সেই করেই হয়তো হাজার টাকা বেতনের জীবনধারণ। এই যে পেশাজীবী সমালোচক। এঁরাই কবির বেদনার মূল স্থপতি। এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। পাঠকের মনযোগ আকর্ষণ করতে চাইছি সেই দিকেই। অধ্যাপক মানেই যে সাহিত্যসমালোচক হবেন তা নয়। আবার সাহিত্যসমালোচক মাত্রেই যে অধ্যাপনা করবেন তাও কিন্তু নয়। আবার একই ব্যক্তি এই দুই বিষয়ে পারদর্শী হতেও পারেন নাও পারেন। কিন্তু অধ্যাপক ও সাহিত্যসমালোচক এই দুই জনের অভিমুখ ও পথ এক নয়। একটা সূক্ষ্ম প্রভেদ রয়ে যায়ই। অধ্যাপকের কাজ মূলত পাঠককে তৈরী করে নেওয়া কবির কাছে পৌঁছানোর জন্য। আর সমালোচকের কাজ মূলত কবিকে পাঠকের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া। সূক্ষ্ম প্রভেদটা এই খানেই। অধ্যাপক পাঠককে প্রস্তুত করতে পারেন। সাহিত্যসমালোচক পাঠক তৈরী করতে পারেন না। তিনি কবিকেই পাঠকের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত। পাঠক প্রস্তুত কিনা, তাঁর খোঁজ সাহিত্যসমালোচকের কাছে থাকে না। কিন্তু অধ্যাপকের কাছে থাকে। তাই সাহিত্যের পাঠককে তৈরী করতে অধ্যাপকদের কোন বিকল্প নাই।

কিন্তু কবিতার শবব্যবচ্ছেদকারী সাহিত্যসমালোচক সাহিত্যে অপরিহার্য্য নন। বরং কবি কবিতা ও পাঠকের ভিতরে যে সংযোগের রাজপথ, এই সাহিত্যসমালোচকদের কারণেই সেখানে দুর্ঘটনা বেশি পরিমাণে সংঘটিত হয়। অদক্ষ ট্রাফিক পুলিশের কারণেও যেমন রাজপথে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, এও অনেকটা সেইরকমই। দূরত্বের সৃষ্টি হতে থাকে কবি ও পাঠকের মধ্যে। মাঝখানে পড়ে থাকে সাহিত্যসমালোচনার ভেজাল যন্ত্রপাতি সব। দূরে হারাতে থাকে কবিতার পাণ্ডুলিপি। আমাদের কবি এই সব অদক্ষ সাহিত্যসমালোচকদেরকেই দেখেছেন দিনের পর দিন দুর্ঘটনা ঘটাতে থেকেও মাসে মাসে অধ্যাপকের বেতন নিয়ে যেতে। আর নিজে সাহিত্যের একজন অধ্যাপক হয়ে, সেখানেই তিনি কষ্ট পেয়েছেন সবচাইতে বেশি। অধ্যাপকরূপী এইসব পরজীবী সমালোচকরা আসলেই কবিতাকে ছেড়ে কবিদের উপরে আরোহণ করে বেঁচে থাকে কীটের মতো। সেই সমারূঢ় কীটদের উদ্দেশ্যেই জীবনানন্দের কলম গর্জে উঠেছে এই কবিতায়। আসলে যেকোন ভাষার সাহিত্যেই এই কীটদের দেখা যায়। তাই সাহিত্যকে এই কীটদংশন থেকে রক্ষা করতে না পারলেই নয়। এই বোধেই পৌঁছিয়ে দিয়ে যান প্রিয় কবি আমাদের। যুগান্তরের কবি। কবি জীবনানন্দ।

২৮শে আষাঢ়’ ১৪২৭

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত