কবির বাজারদর
সাধারণ ভাবে আমরা ধরেই নিই বা
আশা করে থাকি,
কবি
সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক কর্মী শিল্পী কলাকুশলী বুদ্ধিজীবীরা নিরপেক্ষ হবেন। তাঁরা
সত্য ন্যায় ও নীতির পক্ষে থাকবেন। সাধারণ মানুষ তাঁদের কথাকে প্রায় বেদবাক্য বলেই
মেনে নিতে প্রস্তুত থাকেন ঠিক এই আশা থেকেই। আর এই কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের
কাছে কবি সাহিত্যিক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের এত বেশি কদর। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই জানে
বিখ্যাত এই মানুষগুলি তাঁদের পক্ষে থাকলে তাঁদের দলীয় মতাদর্শ, রাজনৈতিক
কার্যকলাপকে সমর্থন করলেই অনেক বেশি মানুষের ভোট নিশ্চিত হবে তাদের দলীয় স্বার্থে।
তাই কবি সাহিত্যিক শিল্পী কলাকুশলীদেরকে নিজ নিজ দলে টানতে উদগ্রীব থাকে অধিকাংশ
রাজনৈতিক দলই। তাই বলে সকল বিখ্যাত ব্যক্তিই যে কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরে নাম
লিখিয়ে বসে থাকেন তাও নয়। প্রকৃত পক্ষে নিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানে থেকেও নিজেদের
সৃষ্টিশীল সৃজনশীলতায় ব্যাস্ত থাকেন অনেকেই। আবার বর্তমান সময়ে দেখা যায় বহু
বিখ্যাত ব্যক্তিই কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে গিয়ে বিরুদ্ধ রাজনৈতিক পক্ষের
মুণ্ডুপাত করতেই ব্যস্ত থাকেন বেশি।
এখন কবি
সাহিত্যিক শিল্পী কলাকুশলীরা কে কোন রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখাবেন, বা লেখাবেন না সেটা
সম্পূর্ণতই তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। সৃজনশীল সৃষ্টিকর্মের পাশাপাশি সরাসরি রাজনৈতিক
অবস্থান নিয়ে কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ নেওয়া একজন সৃষ্টিশীল মানুষের
মৌলিক অধিকারের বিষয়ও বটে। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। সেই অধিকার নিয়ে বিতর্কও
অপ্রাসঙ্গিক। ব্যক্তি মানুষ তাঁরা মৌলিক অধিকারের আওতায় যা খুশিই করতে পারেন। তাতে
কেউই বাধা দিতে পারে না। সেটা সম্পূর্ণতই অনধিকার চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
একজন সৃষ্ঠিশীল মানুষের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু
রাজনৈতিক মতাদর্শ আর রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখানো এক বিষয় নয়। প্রত্যেক মননশীল
চিন্তাবিদ সৃষ্টিশীল ব্যক্তিরই সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে। থাকবেই। যদিও
রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকলেই যে, কেউ রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে যাবেন বা যান, তাও নয়। কিন্তু
ভিড়তেই পারেন। এই যে রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে যাওয়া, আমরা আগেই বলেছি সেটি একজন কবি
সাহিত্যিকের ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। তাঁর মৌলিক অধিকারের বিষয়। তা নিয়ে কাররই
কিছু বলার থাকতে পারে না।
এখন
প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে যাওয়া একজন কবি বা
সাহিত্যিকের পক্ষে কতটা জরুরী? বাংলার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, বহু বরেণ্যে কবি
সাহিত্যিকই তাঁদের জীবনে কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরের সাথে যুক্ত ছিলেন। বিখ্যাত
কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের সাথে কংগ্রেসের সম্পর্কের কথা কারুরই অজানা নয়। এমনকি
তিনি কংগ্রেসের দায়িত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন বেশ কিছুদিন। স্বাধীনতার পরে বহু
বিখ্যাত মনীষীও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন জীবনের নানা পর্বে।
আবার অনেক কবি সাহিত্যিকই জীবনে কখনো কোনদিন কোন রাজনৈতিক শিবিরের সাথেই যুক্ত
ছিলেন না,
এমন
দৃষ্টান্তও রয়েছে প্রচুর। ফলে কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের রাজনৈতিক শিবিরে সাথে যুক্ত
থাকা নতুন কোন ঘটনা নয়।
নতুন
ঘটনা হলো,
নির্দিষ্ট
রাজনৈতিক মতাদর্শ ছাড়াই কেবল মাত্র নানান সরকারি সুযোগযুবিধা প্রাপ্তি ও উপঢৌকনের
আশায় কোন না কোন রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে যাওয়ার প্রবণতাটুকু। বাংলার রাজনীতিতে
সমাজিক পরিসরে এই প্রবণতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন এক মারাত্মক চেহারা
নিয়েছে। মারাত্মক এই কারণেই যে, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণ নয়, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আখের
গোছানোর ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্যেই রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে যাওয়া যেকোন সমাজের পক্ষেই
একটি সামাজিক ব্যাধিস্বরূপ বিষয়। সমাজের সকলস্তরেই এর প্রভাব পড়ে। পড়বেই। ফলে
সাধারণ মানুষের মনে বিখ্যাত মানুষদের সম্বন্ধে সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার জায়গাটি অনেকটাই
আলাগা হয়ে যায়। একই সাথে সাধারণ মানুষের মনেও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার লোভে
বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। যার সাথে
সমাজসেবা দেশপ্রেম রাজনৈতিক মতাদর্শের কোন সংযোগই থাকে না। একটি সমাজের এই যখন
সার্বিক পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়ায়, বুঝতে হবে, সে বড়ো সুখের সময় নয়। বুঝতে হবে সমাজদেহের
সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বগ্রাসী এক ক্যানসার।
দেশ নয়।
সমাজ নয়। স্বজাতি নয়। শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে নিজের নিজের আখের গোছানোর জন্য
রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়া। সমাজের সকল স্তরেই এটাই যখন সার্বিক প্রবণতা হয়ে
দেখা দেয়,
তখন
পিছনের দিকেই এগোতে থাকে গোটা একটা সমাজ। আর তাতে নেতৃত্ব দিতে থাকে সমাজেরই
মান্যগণ্যরা। বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক থেকে শুরু করে শিল্পী কলাকুশলী বুদ্ধিজীবী
সম্প্রদায়।
একজন
সৃজনশীল মানুষ বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির ভিতরেই। সমাজের উপর তাঁর প্রভাব পড়বে
সদর্থক ভাবে। তিনি সারা জীবনে কয়টি সরকারী খেতাব পেলেন তার হিসাব দিয়ে নয়। ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের কাছে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার কথা আলোকস্তম্ভের মতো। নবীন প্রজন্ম তাঁর কাছে
দীক্ষা নেবে সততা ন্যায় নীতি ও সৃজনশীলতার। কিন্তু কি হচ্ছে আজকের সমাজ বাস্তবতায়? নবীন প্রজন্ম
দৌড়াচ্ছে কাদের কাছে? না যাদের হাতে রয়েছে কিছু পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ সুবিধা। কাদের কাছে
রয়েছে কিছু পাইয়ে দেওয়ার সুযোগসুবিধা? না যাঁরাই তাঁর প্রতিভার দৌলতে কোন না কোন
রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে কোন না কোন ক্ষমতাকেন্দ্রিক চেয়ার দখল করে নিতে পেরেছেন। তা
সে চেয়ারের দর বা রঙ যেমনই হোক না কেন। সকলের কাছেই এই সত্য জলের মতোই সুস্পষ্ট
আজ। অনেকেই জানে কোন সুযোগ পেতে কার কাছে দৌড়াতে হবে। এগুলি আর কোন অজানা কথা নয়।
বরং এটই সমাজ বাস্তবতা।
আর সেই
কারণেই আজকের কবি সাহিত্যিক শিল্পীদেরকেও সামিল হতে হয়েছে এই এক ইঁদুর দৌড়ে।
রাজনৈতিক মতাদর্শকে পাশে সরিয়ে রেখে, রাজনৈতিক শিবিরে ভিড়ে গিয়ে কোন না কোন শক্তিশালী
একটা চেয়ার দখল করে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। লাভ দুই দিক দিয়েই। একদিকে নিজের আখের
গুছিয়ে নিয়ে চৌদ্দ পুরুষের জন্যে ব্যবস্থা করে যাওয়ার হাতছানি। আর এক দিক দিয়ে
নবীন প্রজন্মের কাছে অধিনেতা হয়ে ওঠার হাতছানি। কিছু পাইয়ে দেওয়ার সুযোগে একটা বড়ো
ভক্তবৃন্দ তৈরী করে ফেলার সুবর্ণসুযোগ। ফলে লাভের উপর তস্য লাভ। আর দুঃখের বিষয় হলেও
এটাই কবিসাহিত্যিকদের আজকের বাজারদর। কে কোন রাজনৈতিক শিবিরের সাথে যুক্ত। কে কোন
চেয়ার দখল করতে পেরেছেন, তাই দিয়ে ঠিক হয়ে যাচ্ছে কবি সাহিত্যিক শিল্পী
কলাকুশলীদের বাজারদর।
রাজনৈতিক
নেতা কর্মী সমর্থকদের সমান্তরাল কবি কবিযশপ্রার্থী ভক্তবৃন্দের এই এক শৃঙ্খল সৃষ্টি
হচ্ছে আমাদের বাংলায়। যার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে নিজের নিজের আখের গোছানো। আখোর
গোছানোর এই দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ। হারিয়ে যাচ্ছে সৃষ্টিশীলতার
সামগ্রিক উৎকর্ষতা। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের কাম্য অভিমুখ। এগিয়ে চলেছি আমরা একটি
সর্বগ্রাসী অসুস্থ রোগের শিকার হয়ে। এগিয়ে চলেছি অধঃপতনের দিকে। কবির বাজারদরই যখন
ঠিক করে দিতে থাকে সাহিত্যের মানদণ্ড বুঝতে হবে সেই সমাজের আর বিশেষ কিছুই দেওয়ার
নাই ভাবি কালকে। আগামী সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতির পক্ষে এই এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি
হয়েছে আজ বাংলায়। সাহিত্য সংস্কৃতিরও রাজনীতিকরণ ঘটে গিয়েছে। রাজনৈতিক অক্ষের
বাইরে নিরপেক্ষ কোন অবস্থানই আজ আর সুরক্ষিত নয়। সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত। কোন না কোন
শিবির ছাড়া আত্মরক্ষার উপায় খুঁজে পাওয়া সত্যই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ন্যায্য
কথা বলার পরিসর,
সত্য
সুন্দরের চর্চার পরিসর সর্বপরি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় দিগন্তগুলিও ক্রমশ
ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে এই বাংলা ও বাঙালির জীবনে।
১৩ই
পৌশ ১৪২৫
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

