হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান



হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান

আমরা কি জানি আমাদের আসল পরিচয়? আমাদের জানা উচিত আমরা আগে হিন্দুস্তানী। কেননা আমরা হিন্দুস্তানে বাস করছি। আমরা হিন্দুস্তানের নাগরিক। সেটাই আমাদের প্রথম এবং প্রধান পরিচয়। হতেই পারে আমরা থাকি পশ্চিমবাংলায়। বাংলায় কথা বলি। বলতেই পারি আমাদের বাঙালিদের সাথে। কে মানা করেছে। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আমরা কিন্তু হিন্দুস্তানের অন্যান্য নাগরিকদের সাথেও বাংলায় কথা বলতে পারি না। আমাদেরকে কথা বলতে হবে হিন্দুস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিন্দিতেই। জানতে হবে বইকি হিন্দি। কারণ হিন্দিই আমাদের রাষ্ট্রভাষা। এটা হিন্দুস্তান। হিন্দুস্তানে বাস করে আমরা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা মানবো না, সেটাতো হতে পারে না। মনে রাখতে হবে হিন্দুস্তানের নাগরিকদের একটা দায়িত্ব রয়েছে। হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের প্রতি। আর সেই দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহীতা। রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। না যাঁরা বলছেন, হিন্দি ভারতের রাষ্ট্রভাষা নয়, একদম ভরসা করলে চলবে না তাদের কথায়। করলে সবার আগে পস্তাতে হবে আমাদেরকেই। সংবিধানের বিধান দেখেই আশ্বস্ত হলে সে ভুল আমাদেরই। মনে রাখতে হবে ভারতীয় সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে। ফলে যেটুকু সাংবিধানিক ফাঁক আছে, সেটুকুও আর থাকবে না বেশিদিন।

আমরা নিজেকে বাঙালি বলে গর্ব বোধ করি। করলেও ক্ষতি নাই। কেউ মানা করছে না। আমাদের ঘরে করবো। পাড়ায় করবো। আমাদের রবীন্দ্রসদনে নন্দনে মোহরকুঞ্জে করবো। কিন্তু সর্বভারতীয় চাকরির পরীক্ষায় সেই গর্ব করতে গেলে আমাদেরই ক্ষতি। বুঝতে হবে আমাদেরকে সেটাই। কর্মক্ষেত্রে আমাদেরকে রাষ্ট্রভাষা হিন্দি তো জানতেই হবে। না জানলে পিছিয়ে পড়বো আমরা নিজেরাই। কথায় বলে পাগলেও নিজের ভালো বোঝে। তাই সহজে চাকরী পেতে হলে, কর্মক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি করতে হলে নিজের গরজেই শিখে নতে হবে রাষ্ট্রভাষা হিন্দিটাই। না শারুখ সলমানের সিনেমা দেখে হিন্দি শেখা নয় ভাই। শুধু তো বলতে পারলেই হবে না। আমাদেরকে হিন্দি পড়তে ও লিখতেও হবে। নয়তো চলবে কি করে? তাই সময় থাকতেই শুরু করে দিতে হবে। আজই কাগজের হকারকে বলে রাখা দরকার কাল থেকে একটা করে সনমার্গ দিয়ে যেতে। যদি একেবারেই হিন্দি না পড়তে পারি, তবে আমাদের পাড়ায় আমাদের হিন্দিভাষী ভাইবোনেদের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। সময়ের সাথে চলতে হবে। সময় থাকতে দেওয়াল লিখনও পড়তে হবে।

আমরা বাঙালি হতেই পারি। কোন ক্ষতি নাই তাতে। বাস করতেই পারি আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা হিন্দুস্তান। রাষ্ট্রভাষা হিন্দি। ইংরাজি কিন্তু বিদেশী ভাষা। স্বদেশী ভাষা নয় আদৌ। ইংরাজি জানলে ভালো। দেশ বিদেশের সাথে যোগাযোগ সহজ হবে। কিন্তু আমাদের স্বদেশী ভাইবোনের সাথে যোগাযোগ করতে আমাদেরকে আসতেই হবে সেই হিন্দির কাছেই। তারা তো আর আমাদের আঞ্চলিক ভাষা বাংলা শিখতে যাবে না। আর যাবেই বা কোন দুঃখে? কোন কাজটা আমাদের বাংলায় হয়? কয়েকটা কবিতা লেখা, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া, নাটকফাটক করা এইতো সর্বসাকুল্যে। আমরা নিজেরাই তো এর থেকে বেশি বাংলার ব্যবহার করতে পারি না। এইতো অবস্থা। তাই মনযোগ দিয়ে শিখে নতে হবে হিন্দুস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি। জীবনজীবিকার ভাষা হিন্দি। ব্যবসাবাণিজ্যের ভাষা হিন্দি। অর্থ সম্পদের ভাষা হিন্দি। এবং ক্ষমতাচর্চার ভাষা হিন্দি।

হ্যাঁ আমরা পশ্চিমবঙ্গেই বাস করি। অবশ্যই। কিন্তু আমাদেরকে আগে দেখতে হবে আমরা অনুপ্রবেশকারী নই তো? পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আর কোন অনুপ্রবেশকারীর জায়গা হবে না। যদি আমরা নিজে অনুপ্রবেশকারী না হই খুবই উত্তম কথা। আমরা হিন্দুস্তানী। অনুপ্রবেশকারীদের হিন্দুস্তান থেকে তাড়ানোর লড়াইয়ে সকল হিন্দিভাষীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামিল হতে হবে আমাদের। সেটা তো আমাদের  সকলেরই সামাজিক দায়িত্ব নাকি?

আর হ্যাঁ অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু মোটেই বাঙালিদের নিজস্ব খাসতালুক নয়। আমরা কি জানি পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশিই হিন্দিভাষী হিন্দুস্তানী? আমরা কি জানি তাঁরা এই রাজ্যেরই ভুমিপুত্র। তাই এই রাজ্যের উপর তাদের অধিকার আমাদেরই মতো, আমরা যদি অনুপ্রবেশকারী না হই। ফলে এটা যেন আর কখনো না ভাবি এবং বলার চেষ্টা না করি যে পশ্চিমবঙ্গ বাঙালির রাজ্য। সেটা একেবারেই সত্য কথা নয়। বরং আসল সত্য হলো অচিরেই এই রাজ্যে হিন্দিভাষীদের সংখ্যা বাঙালিদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। এটা তো হিন্দুস্তান। বাঙালিদের জন্য তো বাংলাদেশই আছে। আবার হিন্দুস্তান কেন? এই তো ঠিকঠাক এন আর সি হলেই কয়েক কোটি বাঙালি অনুপ্রবেশকারীকে হিন্দুস্তান থেকে তাড়িয়ে দিলেই বাংলা বাংলা করা বেরিয়ে যাবে। এই রাজ্যে তো বেশিরভাগই বাঙালি অনুপ্রবেশকারী। এরা হিন্দুস্তানে থাকবে, অথচ হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান মানবে না। কি আশ্চর্য্য!

আমাদেরকে আরও একটি বিষয় ভেবে দেখতে হবে। অন্তত দেখাই উচিত। সেটা হলো যেহেতু এই রাজ্যটা আমাদের হিন্দিভাষী ভাইবোনেদেরও, তাই এই রাজ্যের ভালো মন্দ বিষয়ে, রাজ্যের ভবিষ্যতের বিষয়ে তাদের চিন্তা ভাবনার গুরুত্বও সমধিক। আমাদের দেখতে হবে তারা ঠিক কিভাবে দেখতে চান এই রাজ্যকে। কোথায় নিয়ে যেতে চান এই রাজ্যটাকে। অবশ্যই তাদের সেই চাওয়াকে মান্যতা দিতে হবে আমাদেরকেই। এই প্রসঙ্গেই বলা দরকার এই যে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের হিন্দিভাষী স্বদেশী ভাইবোনেদের উৎসব পার্বণগুলিকে আমরা আপন করে নিচ্ছি বলে সমাজের একশ্রেণীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতার গোষ্ঠী গেল গেল বলে রব তুলেছেন, সেটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। শুধু বাঙালির উৎসব পার্বণগুলিই পালন করবো, আর হিন্দিভাষী ভাইবোনদের উৎসব পার্বণগুলি পালন করবো না, এটা কেমন কথা? আমাদের রাজ্যে এই বিষয়ে আরও অনেক আগে থেকেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। দরকার ছিল সরকারী দান অনুদান উৎসাহ প্রদানের। সেগুলি বিগত সরকারগুলির আমলে কিছুই হয় নি। সেটা খুবই পরিতাপের বিষয়। কেন আমরা আমাদের হিন্দুস্তানে বাঙালি অবাঙালি বিভাজন করবো? যেখানে আমরা সকলেই হিন্দুস্তানী। অবশ্যই আমরা হিন্দুস্তানী সংস্কৃতিকেই আরও বেশি করে আপন করে নেবো। নেবো এই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে। সেটাই হিন্দুস্তানী ঐক্যকে দৃঢ় ও মজবুত করে তুলবে। আর উৎসব পার্বণ পালনের মধ্যে দিয়েই যে একে অপরের সংস্কৃতিকে আপন করে নেওয়া সহজ হয়, এই সোজা কথাটা বুঝতে আমদেরই বা দেরি লাগবে কেন আর?


সেদিন কিন্তু আর বেশি দূরে নাই, যেদিন সমাজের সর্বস্তরেই হিন্দিভাষীদের নেতৃত্বেই পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটা শুরু হবে। আমরা কি প্রকৃত সত্যটা ভেবে দেখেছি আদৌ কোনদিন? কেন এই রাজ্য সারা ভারত থেকে পিছিয়ে এত? হিন্দুস্তানের উন্নতির সাথে কেন আমরা আজও সমান তালে পাল্লা দিয়ে চলতে পারিনি? ভেবে দেখলে দেখতে পেতাম, আমাদের পশ্চিমবঙ্গে সমাজের বেশিরভাগ স্তরেই এখনো বাঙালির নেতৃত্ব চলছে। হ্যাঁ অবশ্যই দ্রুত একটা পরিবর্তনও ঘটে চলেছে তলায় তলায়। আর আশার কথা সেটাই। সরকারী কাজকর্মে প্রসাশনিক স্তরে অনেকক্ষেত্রেই হিন্দিভাষী হিন্দুস্তানীদের জয়জয়াকার। আর ব্যাবসা বাণিজ্যে তো কথাই নাই। শুধু বাকি আছে রাজ্যরাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আর শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের ভারটা। প্রধানত এই দুটি ক্ষেত্রে মূল নিয়ন্ত্রণ হিন্দিভাষী ভাইবোনদের হাতে উঠে গেলেই দেখা যাবে প্রকৃত উন্নয়নের চেহাড়াটা। তখন আর উন্নত ভারত দেখতে রাজ্যের বাইরে দৌড়াতে হবে না। বা ভালো চাকরীর আশায় ছুটতে হবে না বোম্বে দিল্লী আমেদাবাদ।

একবার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পেতাম, একদিন সাগরপারের ব্রিটিশ আসায়, আমরা প্রথম গেঁয়ো বাঙালি থেকে মুক্তির একটা দিশা দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু তার জন্যে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ইংরাজি শিখতে হয় রোজ। অথচ তার থেকে অনেক সহজে স্বদেশী ভাষা হিন্দি শিখে নিলে আমরাও আমদের হিন্দিভাষী ভাইবোনের সাথে একসারিতে বসার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি। আর আজ হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের উত্থানে আরও এক স্বর্ণযুগের দ্বার প্রান্তে আমরা। এই সুযোগটা কাজে না লাগাতে পারলে আমাদেরই ক্ষতি। মনে রাখতে হবে সময়ের সাথে চলতে পারাটাই আসল শিক্ষা। আর যে সেটা পারে না, তার পরিণতি সেই প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসারের মতোই হতে বাধ্য। আজ না হয় কাল। তাই বিবর্তনের কথা মাথায় রেখে সময়ের সাথে সঠিক ভাবে বির্বতিত হতে না পারলে আমরাই হারিয়ে যাবো একদিন। তখন বাংলা বাঙালি বাঙালিত্ব নিয়ে বিরল প্রজাতির জীব হিসাবেই ইতিহাসে ঠাঁই হবে আমাদের। তাই সময়ের সাথে চলার বুদ্ধিই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে। সেই সমানের দিকই হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের। জয়হিন্দ।

১লা শ্রাবণ ১৪২৫

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত