চাপাতির আড়ালে




চাপাতির আড়ালে

যুদ্ধ! ঠিক, এও তো একটা যুদ্ধই। আলো অন্ধকারের যুদ্ধ। শৃঙ্খলিত অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী বিজ্ঞান মনস্কতার যুদ্ধ। মৌলবাদী চেতনার অবরুদ্ধ বিবেকের বিরুদ্ধে মুক্তমনের শুভবোধের যুদ্ধ। জাতির অগ্রগতিকে পশ্চাৎ-গামী করার বিরুদ্ধে দেশ ও জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধেই সম্প্রতি শহীদ হলেন অভিজিৎ রায়! সেই একই ধারায়, যে ধারায় শহীদ হয়েছিলেন বাঙালি মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ জোতিষ্ক ডঃ হুমায়ুণ আজাদের মতো প্রাতঃস্মরনীয় উজ্জ্বল প্রতিভা! সাম্প্রতিক অতীতে মাত্র দুই বছর আগেই তরুণ ব্লগার রাজীব হায়দার। যে ধারায় নির্বাসিত তসলিমার মাথায় ঝোলে মৌলবাদী হত্যার ফতোয়া। যে ধারায় মরতে মরতেও প্রাণে বেঁচে যান আসিফ মহীউদ্দিন। এই যুদ্ধ তবু সাদা চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ে। কিন্তু এই যুদ্ধের আড়ালে ঘটতে থাকে আরও এক বীভৎস যুদ্ধ, যা সাদা চোখে সহজে ধরা পড়ে না। অন্তত সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাসে। কি সেই যুদ্ধ? বলবো তবে তার আগে দেখে নেওযা যাক অভিজিত রায় হত্যার সরাসরি অভিঘাত আমাদের বাঙালি সমাজের প্রতিক্রিয়ার দর্পণে!

সাধারণ ভাবে ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর দুই বাংলার অভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে পারস্পরিক আগ্রহ বিশেষ দেখা যায় না! মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাতিক্রম ধরলে এইটিই বাস্তব সত্য। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির হাত ধরে সোশাল মিডিয়ার অতি দ্রুতগতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুবাদে অবস্থার কিছু পরিবর্তনও ঘটা শুরু হয়েছে। আর সেই কারণেই অভিজিতের এই বীভৎস হত্যা নাড়িয়ে দিয়েছে অনেককেই। কিন্তু ঠিক এই রকমই বীভৎস মৃত্যু ঘটেছিলো ব্লগার রাজীব হায়দারেরও। কিন্তু এই দুই মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও এক অনাকাঙ্খিত মেরুকরণের প্রতিভাস লক্ষ্মনীয়। রাজীব হায়দারের মৃত্যুকে কাঁটাতারের পশ্চিম পাড়ে, পড়শি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেই মনে করা হয়েছিল। অধিকাংশ জনগণের কাছে পৌঁছায়ও নি সেই সংবাদ। কারণ বাংলাদেশের খবর পশ্চিমবঙ্গের ব্রেকিং নিউজ হওয়া খুবই বিরলতম ঘটনা। যাদের কাছে সে খবর পৌঁছিয়ে ছিলোও, তাদের অধিকাংশের কাছেই সেটি মুসলিম সমাজের মারামারি কাটাকাটি সংস্কৃতিরই নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনার থেকে বেশি কিছু বলে মনে হয়নি সম্ভবত! তাই সোশাল মিডিয়ার স্পেকট্রামেও কাঁটাতারের পশ্চিম পাড় সেসময় উদাসীনই থেকে ছিল কার্যত। আর পূর্ব পাড় বিভক্ত হয়েছিল নাস্তিক বনাম আস্তিকের বাকযুদ্ধে। কিন্তু এইবার একই ঘটনার প্রেক্ষিতেও প্রতিক্রিয়ার অভিমুখ কত ভিন্ন! অভিজিৎ রায়, নিজে নাস্তিক কি আস্তিক সেটি আর তত প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক তার নামের বানানের মধ্যেই যে হিন্দুত্বের ভুত নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। বাঙালি, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিতে নিজ মাতৃভূমিকে দুটুকরো করে পরস্পর বিদেশী সেজে বসে থাকা নিরুদ্বিগ্ন অনুতাপহীন বিরলতম প্রজাতির যে জাতিগোষ্ঠীর গাল ভরা নাম বাঙালি: সে কি করে সেই হিন্দুত্বের ভুতকে ঘাড় থেকে নামাবে? নামায়ও নি। তাই কাঁটাতারের পশ্চিমপাড়ে অভিজিতের মৃত্যুতে প্রতিবাদের একটি ঝড় উঠেছে, সেটির তেজ যতই দূর্বল হোক না কেন। অনেকেই মনে করছে এই হত্যা, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর সাম্প্রদায়িক হিংসারই নামান্তর। আর সেই কারণেই এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সময় এসেছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী শক্তির নবজাগরণের গর্ভদশা চলছে যখন। তারা খেয়াল করতে চাইছে না যে, অভিজিত নিজে কোনো ধর্মমতকেই অন্ধ ভাবে অনুসরণ করতেন না। বিজ্ঞানমনস্কতার আলোকিত পথেরই যিনি পথিক ছিলেন বরাবর! তাই কাঁটাতারের পশ্চিম পাড়ে অভিজিৎ বন্দনা যতটা না অভিজিতের জীবন কর্ম ধর্মকে শ্রদ্ধা করে, তার থেকে অনেক বেশী পরিমাণেই সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় পুষ্ট হয়ে। আর পূর্ব পাড়েও আবারো সেই নামের বানানেই ভূত। অভিজিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাম ব্যবহারকারী বলে তাঁর হত্যা অনেক মুসলিম মানুষের আবেগেই স্থান করে নিতে পারেনি। সোশাল মিডিয়া জুড়েই এই দুই চিত্রের যুগলবন্দীতে আটকা পড়েছে বাঙালির অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভার অকস্মাৎ এই মৃত্যু।

তাই অভিজিতের সমর্থনে ও বিপক্ষে ভাগ হয়ে গিয়েছে বাঙালি মানস। তবু এই দুই পরস্পর বিপ্রতীপ মানসের বলয়ের বাইরেও রয়ে গিযেছে শুভবোধ জাগ্রত বাঙালি মনীষার বিক্ষিপ্ত প্রদীপপুঞ্জু। সেইখানেই রয়েছে জাতির আশার আলো। যারা অভিজিতের হত্যাকে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার অন্ধকার দিয়ে বিচার করছেন না! যাদের কাছে একজন অভিজিতের হত্যা জাতির পিঠেই ছুরি মারার নামান্তর। মুক্তমন, যুক্তিবাদী চেতনার উন্মেষ এবং সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতা, মৌলবাদী শক্তির বিরদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকেই যাঁরা অভিজিতের হত্যার প্রতিবাদে মুখর, তারাই বাংলার শেষ ভরসা। আমরা যেন তাদের নামের বানানের মধ্যে কোনো ধর্মের চিহ্ন না খুঁজতে যাই। না দেখতে যাই তাদের পাসপোর্ট কোন দেশের ছাপ বহন করছে। না বাছতে যাই তাদের কতজন কাঁটাতারের কোন পাড়ের।

অভিজিতের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ডঃ হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু, রাজীব হয়দারের মৃত্যু, তসলিমার নির্বাসন সব একই ঘটনার সূত্রে বাঁধা। আমাদেরকে সেই সূত্রটিই আজ খুঁজে নিতে হবে নির্ভুল ভাবে। আমদের স্পষ্ট বুঝে নিতে হবে, এই মানুষগুলি নিজের জীবন বাজী রেখেও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজ জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই। কূপমণ্ডুকতার অন্ধকার থেকে আপন দেশ ও জাতিকে মানবতার আলোতে তুলে ধরাই ছিল তাঁদের জীবনের ব্রত। আর মূল গণ্ডগোলটা ঠিক সেইখানেই। তাঁদের এই প্রয়াস সারা দেশের শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে পড়লেই তো মুস্কিল! তখন তো আর সারা দেশে মৌলবাদের চাষ করা যাবে না! ফলে মৌলবাদের চর্চার জন্যেই এই হত্যাগুলি জরুরী মৌলবাদী শক্তিগুলির কাছে!

কিন্তু কেন এই মৌলবাদ! কারা এর পশ্চাতে? কি তাদের স্বার্থ? আর এইখানে বিষয়টি পৌঁছিয়ে যায় রাজনীতির কোঠায়। তখন বোঝা যায়, সাম্প্রদায়িক ধর্ম ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে কেন্দ্র করে যে মৌলবাদের চর্চা, তার মূল অভিমুখ আদৌ ধর্মের দিকে নয়, তার অভিমুখ আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঠিকানায়। আমাদের মনে রাখতে হবে ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার লগ্ন থেকেই বাঙালিকে মেধাশূন্য করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র অত্যন্ত সাফল্যের সাথে করা হয়েছিল। যে প্রয়াস বিগত চার দশকেও সমান ভাবেই কার্যকরী। আর সেই প্রয়াসেরই নবতম বলি অভিজিত! বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃতির গতিবিধি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোনো একটি ভূখণ্ডে মৌলবাদের চর্চার বারবাড়ন্ত কার্যত সেই অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের পথকেই সুগম করে তুলেছে। আর তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে মৌলবাদের বারবাড়ন্তের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবা কি ভয়ানক ভাবে ক্রিয়াশীল আজ। সেই কারণেই মৌলবাদের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ালেই পরিণতি এমনই ভয়ানক হবে। সাধারণ মানুষ থেকে দেশের মনীষী সকলকেই মৌলবাদের রক্তমাখা চাপাতি দিয়ে এই বার্তাই দিতে চায় ঘোমটা দেওয়া সাম্রাজ্যবাদ।

২৫শে মার্চ ২০১৫

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত