শৈশবের প্ল্যাটফর্ম



শৈশবের প্ল্যাটফর্ম

আজকের প্রভাতী সংবাদপত্রে একটি খবরের উপর চোখ আটকিয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত শহরের রেলষ্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। সেখানেই মুখেভাত অনুষ্ঠান দুই শিশুর। কিছু ছন্নছাড়া ভবঘুরে মিলে মূল আয়োজক। খবরটির বৈশিষ্ট ঘটনার মানবিক মুখের উদ্ভাসনেই। যাঁরা পড়েছেন তাঁরা বুঝতেই পারবেন। শহরের শিক্ষিত নাগরিক সমাজের অমানবিক মুখ দেখতে দেখতে অভ্যস্থ চোখে বেশ একটা হোঁচোট খাওয়ার মতোই ঘটনা। চোখের সমানে ভেসে উঠল অধিকাংশ বড়ো বড়ো রেল ষ্টেশনগুলির ছবি। অসংখ্য দুধের শিশুর প্ল্যাটফর্ম জুড়ে হানাগুড়ি, দৌড়াদৌড়ি, প্ল্যাটফর্মেই খাওয়া দাওয়া, প্ল্যাটফর্মেই ঘুম। মায়ের কোলে করে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু। এই চিত্র ভারতীয় উপমহাদেশের সকল দেশেই কমবেশি দেখা যায়। আমরা যারা নিত্যদিন ট্রেনে চাপি তাদের কাছে এই চিত্র এতটাই গা সওয়া হয়ে গিয়েছে যে, কোটি কোটি মানবশিশুর এহেন প্ল্যাটফর্ম জীবন আমাদের রোজকার জীবনে কোনরকম রেখাপাত করে না। ট্রেন কামরার মেঝে ঝাঁট দেওয়া শিশুদের হাতে মাঝে সাঝে দুই এক টাকা ছুঁড়ে দিয়েই আমাদের মানবিক মুখগুলি শাটার ডাউন করে দেয়। সমাজ রাজনীতির কোন প্রসঙ্গেই এই কোটি কোটি প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মুখ মনে পড়ে না আমাদের কারুরই।

রাজ্যরাজনীতিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ঢক্কানিনাদে শোনা গিয়েছিল কলকাতা নাকি লণ্ডন হয়ে উঠবে। তা হোক ক্ষতি কি। আমাদের পূর্বতন প্রভুর রাজধানী বলে কথা। আমরা যদি এই বিষয়ে নকল বিশারদ হয়ে উঠি মন্দ কি? দুর্গাপূজায় যেমন বাঁশখুটি প্লাইউড আর কাপড়ে এক একটি হুবহু নকল মন্দির, অট্টালিকা, বিশ্ববিখ্যাত প্রাসাদ গড়ে ওঠে পাড়ায় পাড়ায়, তেমনই যদি নকল লণ্ডনও হয়ে ওঠে কলকাতা, সেও তো মন্দের ভালো। কিন্তু লণ্ডনের রেলষ্টশনগুলিতেও কি কলকাতা ও শহরতলীর প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মতো শৈশবচিত্র দেখা যায়। না কলকাতা মহানগরীর মতো পথশিশুদের ভিড় চোখে পড়ে। জানা গেলে বোঝা যেত। শুধু লণ্ডনই বা কেন ইউরোপ আমেরিকা চীন জাপান কোরীয়ার মতো উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতেও প্ল্যাটফর্ম বোঝাই করে শিশুর শৈশব কাটে কি?

আমাদের দেশ মহান ভারতবর্ষ। সুমহান তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আমরা আবার তারই উত্তরাধিকারী। অনেকেই বলতে পারেন শুধু রেলষ্টশনের প্ল্যাটফর্মই বা কেন? বাস্ট্যাণ্ড থেকে শুরু করে হাটেবাজারে ফুটপাথে, ধর্মস্থানগুলিতেও তো কোটি কোটি শিশুর শৈশব ঠিক এইভাবেই গড়াগড়ি যায়। আচ্ছা, আমরা যখন প্রায়  সোয়াকোটির ভারতবর্ষের কথা চিন্তা করি, সেই সংখ্যাতত্বের হিসাবে এই কোটি কোটি শিশুগুলির কচিমুখের হিসাব থাকে তো? আমাদের এই উন্নতমানের আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজিত ভারতবর্ষের রাস্তা থেকে ধর্মস্থান থেকে রেলষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলিতেই গড়াগড়ি যাওয়া শৈশবের? আমাদের বাড়ির শিশুদের রেশন কার্ড থেকে আধারকার্ড, স্কুলের আইডি কার্ডের শিশুমুখ চিত্রের পাশে এই সব প্ল্যাটফর্মশিশুদের কচিমুখ চিত্রগুলি ভারতীয় মাপেই বা কতটা মানানসই। আন্তর্জাতিক মাপের কথা যদি ছেড়েই দিই।

শোনা যায়, ভারতবর্ষ নাকি এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে অন্যতম এক শক্তি হয়ে উঠছে। শোনা যায়, বিশ্বের ধনকুবেরদের তালিকায়, ভারতীয়রাও এখন নিয়মিত জয়াগা করে নিচ্ছেন। শোনা যায় প্রতিবছর ভারতবর্ষের সামরিক বাজেট বরাদ্দও নাকি অনেক ছোটখাটো দেশের বার্ষিক জিডিপির থেকে কয়েকগুন বেশি। এসবই অবশ্য শোনা কথা। কিন্তু কান না দিয়েও তো উপায় নাই। সরকার ও তার বিশ্বস্ত মুখপাত্রগুলিই শতমুখ করে এমন গালভরা তথ্য সরবরাহ করে থাকে। বেশ কিছু তথ্যের সত্য়তা যাচাই করেও নেওয়া যায় নানান মাধ্যম থেকে। ফলে তথ্য়ের সত্যতা নিয়ে আমাদের সন্দেহ নয়। আমাদের বিস্ময়, এহন শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ভারতবর্ষ তার প্ল্যাটফর্ম শিশু পথশিশুদের অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের বন্দোবস্ত করে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিতে পারে না কেন? এই বিষয়ে রাষ্ট্রের কি কোন দায়িত্বও নাই? নাকি সংবিধানেই কোন ধারা নাই? কোনটা?

বারাসাত রেলষ্টশনের কয়েকটি ভবঘুরে যদি দুটি অনাথ শিশুর মুখে ভাত অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে, তবে এতবড়ো বিশাল ভারতবর্ষ ও তার এহেন শক্তিশালী অর্থনীতি প্ল্যাটফর্ম শিশু পথশিশুদের জন্যে কিছু করছে না কেন? অনেকেই হয়তো বলতে পারেন, কেন করবে না? অনেক সংস্থায়ই পথশিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কাজ করছে। নানান সময়ে ওয়ার্কশপ করে। সরকারী নানান স্কীমের সাথেও এইসব সামাজিক কাজও সংযুক্ত হয়ে ওঠে  সময়ে অসময়ে। ভালো, কিন্তু রেলষ্টশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে, ফুটপাথ থেকে তবে তো এইসব শিশুদের সংখ্যা দ্রুতহারে কমতে দেখাই যেত। কিন্তু কি দেখি আমি আপনি, রোজাকর চলার পথে? যে দেশের বিজ্ঞান প্রযুক্তি অর্থনৈতিক শক্তি মঙ্গল অভিযানের কথা ভাবতে পারে, সেই দেশ তার পথশিশুদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতে অপারগ হয় কোন জাদুতে? আর জাদুর কথাই যদি ভাবা যায়, যে জাদুতে সরকারী সকল রকমের নিয়মকানুন, আইন ও সুরক্ষার বলয়কে কাঁচকলা দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংকলুঠ করে বিদেশে পালিয়ে যায় সরকারী নেতামন্ত্রীদেরই পরিচিত সব কেষ্টবিষ্টুরা, সেই জাদুতে কয়েকটি চোরের মঙ্গল না হয়ে এইরকম ভাবে পথঘাটে প্ল্যাটফর্মে গড়াগড়ি খাওয়া শৈশবের মঙ্গলই বা হয় না কেন?

না আসল কথাই হলো ভারতবর্ষ জাদুরই দেশ। জাদু মানেই ভ্যানিশিং পাওয়ার। তাই দেশের সম্পদ ভ্যানিশ করে দেওয়ার ঐতিহাসিক রীতি ও ঐতিহ্যের নামই ভারতবর্ষ। এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামটিও ১৯৪৭-এ এসে ভ্যানিশ করে দিয়েই ১৫ই আগস্টের সেই কুখ্যাত স্বাধীনতার নামে ক্ষমতা হস্তান্তর। বিদেশী লুঠেদের থেকে স্বদেশী লুঠেদের রাজত্বপ্রপ্তি। এই লুঠতরাজের দেশে পথশিশু থেকে প্ল্যাটফর্ম শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিই একমাত্র পরিণতি। সেটাই স্বাভাবিক। মুশকিল হল এই সমাজবাস্তবতাটিকেই স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া। যে এর কোন পরিবর্তন হয় না। সম্ভবই নয়। একটি গোটা ভুখণ্ডের বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত সকল মানুষই যখন এই স্বতঃসিদ্ধ সত্যকে অপরিবর্তনীয় বলেই বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখনই কপাল পোড়ে সেই ভুখণ্ডের সকল শিশুদেরই। সেই শিশু আমারম আপনার সুরক্ষিত কোলেই থাক কিংবা রাজপথে থেকে দেবস্থান কিংবা ভারতীয় রেলের বারোয়ারী প্ল্যাটফর্মেই থাক।

এই যে আমি আপনি, আমাদের পরিপার্শ্বের রোজকার জীবনে ঘটে চলা সকল বিষয়গুলিকেই অমোঘ ও অপরিবর্তনীয় বলে বিশ্বাস করি, করি একেবারে আমাদের জীবনবোধের গভীর থেকেই, এটাই এক মস্ত বড়ো অভিশাপ। কোন সমাজই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না কোনদিন। সময়ের সাথে সমাজও এগিয়ে চলতে থাকে। কিন্তু সেই এগিয়ে চলার অভিমুখ ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব কাদের? রাষ্ট্রের? রাজনৈতিক দলগুলির? সেরকমটাই তো ভাবি আমরা। সেইভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত মানুষ। অর্থাৎ ব্যক্তি আমির, ও সামাজিক আমাদের এই বিষয়ে কোন ভুমিকা নাই। যা করবে রাষ্ট্র। যা ভাববে রাজনীতির কারবারীরা। আমরা শুধু দেখে যাবো। চোখবুঁজে। আর ঠিক সেইটিই চায় ঠগেরা। যাদের হাতের দেশের সম্পদের ভার। আমাদেরকে চোখবোঁজা অথর্ব সুযোগসন্ধানী করে রাখতে পারলেই তাদের লুঠতরাজের যাবতীয় সুবিধা। সেই সুবিধা নিয়েই সুইসব্যঙ্কে লক্ষ লক্ষ কোটি ভারতীয় টাকার সুদ বাড়তে থাকে লুঠেরাদের তহবিলে। আমার আপনার কষ্টের জমানো হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারী ব্যাংকের কোষাগার থেকে বেমালুম ভ্যানিশ হয়ে যায়। আর আমি আপনি, কাগজ পড়বো। টিভি দেখবো। খবরের বিশ্লেষণ করেই আপিএলে মত্ত হয়ে যাবো। এটাই ভারতীয় সংস্কৃতি। কিংবা হয়তো খেলা দেখতে দেখতে ইনটারনেট অন করবো। সোশ্যাল সাইটে ঢুকে পোস্ট দেবো। আর লাইক আর কমেন্ট গুনবো।

তাই প্রভাতী সংবাপত্রের খবরটা পড়ে চোখ কপালে উঠে গেল। না বিরাট কিছু তো নয়। অসাধরণ কোন খবরও নয়। কজন ভবঘুরে হয়তো বখাটে ছোকড়াই হবে, দুই একজন সুনাগরিকের সাহায্য নিয়ে মাত্র দুটি শিশুর মুখে ভাত দিয়েছে। যে শিশু ভুমিষ্ট হয়েছে রেলষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই। যে শিশুর শৈশবকে জঞ্জালমুক্ত করার শপথ নিয়েছিল কোন এক কালে কোন এক অপরিণত তরুণ তাঁর রঙিন স্বপ্নের বনিয়াদে। না আমরা অতটা ইমম্যাচিওর নই। আমাদের পরিপক্ক বুদ্ধি আর সুপক্ক অভিজ্ঞতায় আমরা জীবনের বাস্তব রঙগুলির বিশ্লেষণে ভুল করতে পারি না। আর পারি না বলেই জঞ্জালমুক্তির শপথ থেকে অনেক দূরে বেঁকে গিয়েছে আমাদের পথ। আমার আপনার। এই বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে, ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায় নির্বিশেষে, শ্রেণীভেদ নির্বিশেষে আমরা এক ও অভিন্ন। তাই এদেশের বুকে আঠারো নেমে আসেনি কোনদিন। নেমে এসেছে ধুলিধুসরিত ফুটপাথ, নেমে এসেছে গড়াগড়ি খাওয়ার ধুলিধুসরিত শৈশব ভারতীয় রেলের প্ল্যাটফ্রমে, দেবস্থানে, হাটেবাজারে।

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত