চন্দ্রবোস: দ্য আনটোল্ড স্টোরি
"A true revolutionary is one who never
acknowledges defeat, ..... A true revolutionary believes in the justice of his
cause and is confident that his cause is bound to prevail in the long
run."
(Netaji)
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস। একটি নাম। এক কিংবদন্তী। এক ইতিহাস। এবং এক বিস্মৃত অধ্যায়। ১৯৪৫, ১৮ই আগস্ট। তাইহোকু বিমানবন্দর। বিমান দুর্ঘটনার কথিত
কাহিনী। এবং এক কিংবদন্তীর অন্তর্ধান। তারপর কেটে গেছে প্রায় সাত
দশকেরও বেশী সময়। আজও কিনারা হয়নি সেই রহস্যের। আজও লেখা হয়নি পুরো ইতিহাস। আজও ধামাচাপা পড়ে আছে
ভারতীয় স্বাধীনতা অর্জনের নেপথ্য কাহিনী। আজও সারা ভারত জুড়ে একঘরে করে
রাখা হয়েছে নেতাজীর অবদান। তাইহোকু বিমানবন্দরের ঘটনার পর
জল অনেকদূর গড়িয়েছে। ঘটনার দুই বছরের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর করে মুখ রক্ষা
করতে হয়েছে বৃটিশকে। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রিক কাঠামোয় ব্রাত্য করা হয়েছে সুভাষ
বোসকে। তথাকথিত স্বাধীনতার ইতিহাসে সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে নেতাজীর
ভূমিকাকে। আর একদিকে ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি পঁয়তাল্লিশের আগস্ট থেকে হন্যে হয়ে
খুঁজে বেড়িছে নেতাজীকে। এই একমাত্র একজন, যিনি বৃটিশকে বৃটিশের ভাষাতেই পাল্টা
জবাব দিতে পেরেছিলেন। আর সেখানেই বৃটিশের অহং এ চোট
লেগেছিল মারাত্মক। তাই নেতাজীকে ধরতে না পারার আক্ষেপে বিমান দুর্ঘটনার কথিত কাহিনীর
পর থেকেই তাদের প্রধান টার্গেট হয়ে ওঠেন চন্দ্রবোস। প্রধান আতঙ্কও বটে।
"He has again escaped; if Subhas Chandra Bose
comes again we will lose whole..of..Asia"….বক্তা..বিখ্যাত..মার্কিণসেনাপতি..ম্যাকআর্থারঅ্য। কত বড়ো দূরদৃষ্টি
সম্পন্ন ক্ষুরধার বুদ্ধির সমর নায়ক ছিলেন এই ম্যাকআর্থার। তিনি সেদিনই বুঝতে
পেরেছিলেন, নেতাজী ফিরে এলে শুধু ভারত নয় গোটা এশিয়াটাকেই ইঙ্গমার্কীণ পুঁজিবাদী
স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না আর। আজকের দিনে সমগ্র এশিয়ার আর্থ-সামাজিক-রাজনীতির
উপর মার্কীণ প্রভুত্বের বাস্তবতার দিকে চোখ রাখলেই সেদিনের ইঙ্গমার্কীন শক্তির
সুভাষ আতঙ্কের ছবিটি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। হ্যাঁ, সেদিন
ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিল নেতাজী সম্বন্ধে। আর সেই আতঙ্ক থেকেই
সেই ১৮ই আগস্টের তাইহোকু বিমান বন্দরের বিমান দুর্ঘটনার মাত্র দুই বছরের মধ্যে
তড়িঘড়ি ভারতীয় বৃটিশভক্তদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে বাধ্য হল প্রবল
পরাক্রান্ত সেই বৃটিশ। নয়ত কোনো ভাবে নেতাজী দেশে ফিরে এলে তাদের যে আম ও
বস্তা দুইই যাবে, এ বিষয়ে বৃটিশের কোনো সন্দেহ ছিল না। আর এই সত্যই স্পষ্ট
করে নেতাজী মারা যাননি সেই দিন। স্পষ্ট করে তথাকথিত ভারতীয়
স্বাধীনতা এসেছিল ঠিক কোন পথে। ম্যাক আর্থারের এই বক্তব্যটির
ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। মনে রাখতে হবে এই বক্তব্যের
আগে ইউরোপে জার্মানী বিধ্বস্ত। হিটলার আত্মহত্যা করেছেন। জাপান
হিরোশিম-নাগাসাকির ক্ষত নিয়ে, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে মার্কিণদের শক্তির কাছে। তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে
চূর্ণবিচূর্ণ অক্ষশক্তি। এই রকম নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরেও নতুন আবিষ্কৃত পারমানবিক
শক্তিতে বলিয়ান মদমত্ত প্রবল শক্তিধর মার্কিণরা কিনা আতঙ্কিত বঙ্গসন্তান
চন্দ্রবোসকে নিয়ে?
হ্যাঁ ঠিক তাই। নেতাজীকে নিয়ে
ইঙ্গমার্কিণ শক্তির এই আতঙ্কের মূল কারণ দুটি। তারা নেতাজীকে চিনতে
একটুকুও ভুল করেনি। আর তাইহোকুর বিমানদুর্ঘটনাকে বিশ্বাস করার মতো নির্বোধও তারা ছিল না। এটাই ইতিহাস। এই প্রসঙ্গে দেখা যাক "The Last Years of British
India" গ্রন্থে
লেখক Michael
Edwards ঠিক কি বলছেন ; "....British had
not feared Gandhi; the reducer of violence; they no longer feared Nehru; who
was rapidly assuming the lineaments of civilized statesmanship....The British
however; still feared Subhas Bose...." তাই স্বভাবতঃই ইঙ্গ-মার্কিণ শক্তি
সেদিন আতঙ্কে ভুগছিল শুধুমাত্র নেতাজীর ফিরে আসার সম্ভাবনায়। তাই একদিকে পাগলের মতো
তারা খুঁজে গেছে চন্দ্রবোসকে। আর একদিকে কংগ্রেস ও লীগ
নেতৃত্বকে নিজেদের সমস্ত শর্তে রাজী করিয়ে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনায়
এগোতে..হল..অকল্পনীয়..দ্রুততায়। তাইহোকু বিমানকাণ্ডের পর
নেতাজীর অন্তর্ধানের সাথেই শেষ হল আজাদ হিন্দ ফৌজের স্বাধীনতা যুদ্ধ। কিন্তু সেখানেই শেষ হল
না আইএনএর প্রভাব। সেই প্রভাবের স্বরূপ বোঝা গেল, লালকেল্লায় শুরু হওয়া আজাদ হিন্দ
বাহিনীর বিচার পর্বে। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তখন আজাদ
হিন্দ ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবিতে সরব সমস্ত রাজনৈতিক পক্ষ। তাই দেশের জনমত
অনুধাবন করে বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়োর পর প্রায় নেতিয়ে পরা জাতীয় কংগ্রেস এগিয়ে এল
বন্দীমুক্তির দাবিতে। বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের ভাষায়, "....As a political
weapon the I.N.A. had been of the greatest use to the Congress in India." এই সুযোগে
দেশবাসীকে নিজের দিকে টেনে আনা সহজ হল কংগ্রেসের। ঠিক এই কথাই শোনা গেল
মাইকেল এডওয়ার্ডসের লাস্ট ইয়ার্স অফ বৃটিশ রাজ গ্রন্থে, "The I.N.A. trials were
used by Congress propagandists to glorify the right to rebel against foreign
rule." সেদিনের জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন আজাদ হিন্দ
ফৌজের বন্দীদের মুক্তির দাবীর স্বপক্ষে না দাঁড়ালে জনগণের কাছে তাঁদের
বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাবে। তাই জওহরলাল নেহরু,ভুলাভাই দেশাই
প্রমুখ ছয়জনকে নিয়ে গঠন করা হল আই.এন.এ ডিফেন্স কমিটি। নেতাজীর ছায়া দীর্ঘ
থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লীমেন্ট
এটলীর কথায়,
"We
were sitting on the top of the volcano।" কিন্তু কোন ভলক্যানোর কথা বলছেন
এটলী ? প্রবল পরাক্রান্ত বৃটিশের ভয়টা ঠিক কোনখানে? পট্টভি সীতারামাইয়া তাঁর ‘দ্য হিস্ট্রী অফ দ্য ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল
কংগ্রেস’ গ্রন্থে লিখছেন, "It looked as though the I.N.A. itself
eclipsed the Indian National Congress and the exploits of war and violence
abroad threw into obscurity the victories..of..non-violence..at..home." (Vol-2:..p-784)
কি সাংঘাতিক কথা। কংগ্রেসের
নিয়ম-তান্ত্রিক আন্দোলন কি তবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে? ওদিকে বৃটিশ
সমর বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, "The I.N.A. affair was threatening to tumble
down the whole edifice of the Indian army." এটলীর অবস্থা
সত্যই সঙ্গীন। আই.এন.এ.র বিচার পর্বে সত্যিই বৃটিশের অবস্থা
সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছিল । কারণ যে দুইটি স্তম্ভ ভারতে বৃটিশের সাম্রাজ্যকে ধরে
রাখতে বরাবর সাহায্য করে এসেছে, সেই জাতীয় কংগ্রেস এবং বৃটিশ সেনাবাহিনীর প্রভুভক্ত
ভারতীয় সেনাদের উপর নেতাজী ও তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রভাব দিনে দিনে বৃদ্ধি
পাচ্ছিল। পরিস্থিতির এই পরিবর্তনে বৃটিশের সামনে একটাই পথ খোলা ছিল, নেতাজীর
পুনরাবির্ভাবের পূর্বেই মানে মানে বৃটিশভক্ত কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বের কাছে শর্ত
সাপেক্ষে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া। আর সেই লক্ষ্যেই
সাম্প্রদায়িক ভাগ বাঁটোয়ারা করে দেশভাগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নেতাজীর প্রভাব
সম্পূর্ণ ধুয়ে দেওয়া। আর ঠিক সেটাই তারা করল। জাতীয় কংগ্রেসের
নেতৃত্ব, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতি সারা দেশের অনুরাগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সেই
আবেগকে ইন্ধন করে দেশবাসীর আনুগত্য নিজেদের দিকে টেনে নিয়ে, ভারতবর্ষের
রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই বাড়িয়ে নিল। যার ফল পাওয়া গেল হাতে
হাতে, ১৯৪৬এর ৪ঠা জানুয়ারী লালকেল্লা থেকে আই.এন.এ-র জেনারেল শাহনওয়াজ খান,
কর্নেল সেইগল এবং ধীলন এর ঐতিহাসিক মুক্তির পর নির্বাচনে কংগ্রেসের
জয়-জয়াকারে। বৃটিশ মুখপাত্র হিউ টয়ের মতে, এই বিচার পর্বেই বোঝা যায়, নেতাজীর এই অপরিসীম প্রভাব কংগ্রেসের রাজনৈতিক অগ্রগতির পক্ষে কতটা সুবিধে
করে দিল। আর স্বভাবতঃই কংগ্রেসের এই অগ্রগতি বৃটিশের পক্ষে আশীর্বাদ হয়ে দেখা
দিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর সংগ্রামের দেশজোড়া আবেগের পিঠে সওয়ার হয়ে জাতীয়
কংগ্রেসের এ হেন সাফল্যে বৃটিশের একটি দুর্ভাবনা ঘুচল। দেশবাসীর মনকে এবার
নেতাজীর দিক থেকে ঘুরিয়ে আবার অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের রূপকথায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা
সহজ হবে। হলোও ঠিক তাই। আর এবিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের
নেতৃবৃন্দের মতো বৃটিশের এমন সৃহৃদ আর কে আছে। অবশ্য মুসলীম লীগ
নেতৃত্বও এই বিষয়ে জাতীয় কংগ্রেসের থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিল না। আর এই দুই পক্ষের
নাকের ডগায় সাম্প্রদায়িক বিভেদের উস্কানীমূলক ক্ষমতার ভাগ বাঁটোয়ারার টোপ ঝুলিয়ে
দেশভাগের সুনিপুন ষড়যন্ত্রের খাল কেটে নেতাজীর আদর্শের চিরতরে সলিল সমাধি ঘটিয়ে
তবেই দেশ ছাড়ল বৃটিশ। নিজের শর্তে।
১৯৪৬এ নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে সেদিনের
পরিস্থিতি সম্বন্ধে সাবধান করে বলা হল, "Although the Indian National Army has been disbanded
following the futile attempt to 'liberate' India with Japanese support; it is
still an explosive political issue and more emotionally surcharged than any to
be found..here...." নেতাজী ও তার আই.এন.এ-র প্রভাব নিয়ে এতটাই
আতঙ্কগ্রস্ত ছিল ইঙ্গমার্কিণ শক্তি । এবং আশঙ্কা যে মোটেই অমূলক ছিল
না সেই সত্য প্রমাণ হল ১৮ই ফেব্রুয়ারী। শুরু হলো বিখ্যাত নৌবিদ্রোহ। বিদ্রোহের প্রথম
সূত্রপাত বোম্বাইতে। তারপর ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ল করাচী, মাদ্রাজ,
বিশাখাপত্তম প্রভৃতি বন্দরে। আবারও বৃটিশ মুখপাত্র
হিউ টয়ের ভাষ্যে, "There can be little
doubt that the serious naval mutinies and the unrest in the other two services
early in 1946; owed something to its (I.N.A.) influence."
এবার দেখা যাক কি ছিল নৌবিদ্রোহীদের দাবীর মধ্যে। একটি প্রধান দাবী ছিল, আজাদ হিন্দ
ফৌজের সমস্ত বন্দীদের দ্রুত মুক্তি দিতে হবে। সরাসরি আবারও নেতাজীর
আই.এন.এ-র প্রভাব। আটাত্তরটি জাহাজের নৌসেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন একে একে। বৃটিশের পক্ষে মাত্র
দশটি জাহাজ। সমস্ত জাহাজ থেকে বৃটিশের পতাকা নামিয়ে তোলা হল কংগ্রেস, লীগ ও
কম্যুনিস্ট পার্টির পতাকা। নৌবাহিনীর নাম পরিবর্ত্তন করে
রাখা হল, ইণ্ডিয়ান ন্যাশানাল নেভি। তরুণ নৌসেনাদের এই বিদ্রোহে
নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যে আহ্বান জানানো হলো বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দকে। বিদ্রোহী নৌসেনাদের
নিয়ে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এম এস খান তাঁর সহযোগীদের নিয়ে রাজনীতিবিদদের
কাছে গিয়ে হতবাক হয়ে গেলেন। কেউ তাদের ডাকে সাড়া দিতে রাজী
নয়। সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা খেলেন লৌহমানব, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সর্দার
বল্লভভাই প্যাটেলের কাছ থেকে। নেহরু রুষ্ট হয়ে উঠলেন
নৌবিদ্রোহের সমর্থনে হরতাল ডাকায় । গান্ধী বললেন, "Why should they
continue to serve; if service is humiliating for them or India." প্যাটেল বললেন, "...Bunch of young hotheads messing with
things they had no business in.." টাইমস অফ ইণ্ডিয়ায় লেখা হল, "As a result of the
extravagant glorification of the I.N.A. following the trials in Delhi; there
was released throughout India a flood of comment which had inevitable sequel in
mutinies and alarming outbreaks of civil violence..." নিউইয়র্ক টাইমসের
মতে, "....Stimulated
by the propaganda of CHANDRA BOSE; the pro-Japanese leader who had won
followers among Moslems and Hindus alikes...." বৃটিশ
মন্ত্রীসভায় বড়লাট লর্ড ওয়াভেল প্রেরিত রিপোর্টে পরিস্কার জানানো হলো, পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। সর্বস্তরের মানুষের কাছেই
বৃটিশ সরকার অপ্রিয় হয়ে উঠছে। আবুল কালাম আজাদের মতে, "A most remarkable
change had in the meantime come about in all the public services..all the three
branches of the Armed Forces -the Navy; the Army; and the Air Force -were
inspired by a new spirit of patriotism...these sentiments were wide-spread; not
only among officers..but..also..among..the..ranks."
এই রকম অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে
ঝাঁপিয়ে পড়ার বদলে সেদিন বৃটিশের প্রধান সহায় হয়ে দাঁড়ালো জাতীয় কংগ্রস ও মুসলীম
লীগের নেতৃবৃন্দ। এটাই ভারতবর্ষের ইতিহাস। নেতাজীর ভাবাদর্শের ছোঁয়ায়
গোটা দেশ যখন দেশপ্রেমে সংগ্রাম মুখর, তখনই আঘাত এল ঠিক পেছন দিক থেকে। নৌবিদ্রোহীদের নেতাদের
আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। লৌহ মানব। তিনি তাদের
প্রতিশ্রুতি দিলেন,
তাদের সব দাবী-দাওয়া পূরণের জন্যে বৃটিশের সাথে তারা কথা বলবেন। নৌবিদ্রোহীদের যাতে
কোনো শাস্তি পেতে না হয়,
সেই বিষয়ে কংগ্রেস তাদের পাশে থাকতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাদ গেল না মুসলীম
লীগও। মহম্মদ আলী জিন্না তাদের জানালেন, তাদের প্রতি যাতে ন্যায় বিচার হয়,
তিনি ও লীগ সর্বতোভাবে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন এবং তাদের অভিযোগ
পুরণের জন্যেও তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। ২২শে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৬। বিদ্রোহীরা সেই
প্রতিশ্রুতি মত সমস্ত সেন্টারে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন। হাঁফ ছাড়ল বৃটিশ। এবার ডাইরেক্ট একশন। জাতীয় কংগ্রেস ও
মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দের প্রতিশ্রুতি পেয়ে বিদ্রোহী নৌসেনারা যখন যুদ্ধ বন্ধ করে, প্রাথমিক
লক্ষ্য পূরণের আনন্দে মাতোয়ারা,ঠিক তখনই বৃটিশ সৈন্য বোঝাই
যুদ্ধ জাহাজগুলি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কামানের গোলা ছুটে এল তাদের দিকে তাক করে। প্রথমে শান্তির পতাকা
লাগানো বৃটিশের যুদ্ধ জাহাজগুলি এগিয়ে আসতে দেখে তারা ভেবেছিল, তাদেরই
সমসাথীরা প্রীতিবিনিময় করতে এগিয়ে আসছে জাতীয় নেতাদের প্রতিশ্রুতি পেয়ে। কিন্তু শান্তির পতাকার
আড়াল থেকে ছুটে এল বৃটিশের লক্ষ্যভেদী গোলা।
জাতীয় নেতারা বৃটিশের কথা মতো কাজ করেছেন। এবার বৃটিশের পালা
তাদের হাতে নিরাপদে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যাওয়া। পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার
চুক্তি। ফণিভূষণ ভট্টাচার্য তার নৌবিদ্রোহের ইতিকথায় সেদিনের এই চূড়ান্ত
বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে জানান অতর্কিত এই হানায় বিদ্রোহীদের দেড়শর
ওপর সৈন্য অকুস্থলেই শহীদ হন। কিন্তু তাতেও দমবার পাত্র
ছিলেন না কেউ কেউ। বীর সৈনিক মদন সিং "খাইবার" জাহাজের বেতারে আবার যুদ্ধ
ঘোষণা করলেন। অল আউট যুদ্ধের ডাক দিয়ে শুরু করলেন গোলাবর্ষণ। দেশের জনগণের উদ্দেশে
বললেন, "See our national
leaders. They are nothing but traitors of our motherland..." ফলে লড়াই করেও
বিনা শর্তে আত্মসমর্পণে বাধ্য হতে হল তাদের। কিন্তু আজও বিশেষ জানা যায়নি, কত হাজার জন
গ্রেফ্তার হয়েছিল, বা কার কি শাস্তি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। পেছন দরজা দিয়ে
কুটকৌশলে নৌবিদ্রোহ দমন করলেও বৃটিশ প্রশাসন বুঝে গেল ভারতীয় সৈন্য দিয়ে আর আগের
মত ভারতবর্ষকে পদানত রাখা যাবে না। কারণ, এই সৈন্যদের
মধ্যে আজাদ হিন্দ বাহিনী ও নেতাজীর প্রভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জেগে উঠছে। এখন আর তারা শুধুমাত্র
বেতনভুক্ কর্মী নয়,
স্বাধীনদেশের সৈন্যরূপেই নিজেদের ভাবতে চাইছে। ফিল্ড-মার্শাল অকিনলেক
রিপোর্ট পাঠালেন; সেই সময়ে ৬,৭০৪ জন অফিসার সহ প্রায় ২২ লক্ষ ভারতীয়
সৈন্যের মধ্যে প্রায় ৭০% সৈন্যই আই.এন.এ-র প্রতি সহানুভূতিশীল এবং স্বাধীনতার
পক্ষে। বৃটিশ দেখল এই অবস্থায় নেতাজী একবার ভারতে ফিরে এলে, একজন বৃটিশও
হয়ত জ্যান্ত ফিরতে পারবে না বৃটেনে। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল তারা।
১৯৪৫-এর ১৮ই আগস্টের তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায়
নেতাজীর মৃত্যুকে ইঙ্গমার্কিণ শক্তি আদৌ বিশ্বাস করেনি বলেই তারা ভেবেছিল ১৯৪৬-এর
মতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে নেতাজী একবার ফিরে এলে গোটা ভারতবর্ষে গণবিপ্লব ঘটে
যাবে। খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মতো বৃটিশ
সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক দলগুলি। ফলে চিরকালের মতোই ভারতবর্ষ
হাতছাড়া হয়ে যাবে তাদের। লণ্ডন অবজারভারে লেখা হল, "India today is a vast powder magazine with
exclusive potentialities exceeding those at any period of Indo-British history
since Mutiny." ঠিক, না আর ঝুঁকি নেওয়া যায় না। এই ঝুঁকি এড়াতে গেলে
শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত করে যাওয়াই ভালো। এই সময় বৃটিশ দুটি কাজ করল
একসাথে। প্রথমেই জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃবৃন্দকে সতর্ক করে দেওয়া
হল, ভারতীয় রাজনীতি যেভাবে নেতাজীর বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ ও আই.এন.এ-র প্রভাবে
প্রভাবিত হয়ে পড়ছে, তাতে ভারতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র
গান্ধী-জিন্নার সমর্থকদের হাত থেকে চন্দ্রবোসের অনুগামীদের হাতে চলে যেতে পারে। ফল মিলল হাতে হাতে। রাজনীতির সমস্ত স্তর
থেকেই মুছে ফেলা শুরু হল নেতাজী ও আই.এন.এ-র প্রভাব। ইতিহাসের পাতায় নির্বাসিত করা
হল,উপমহাদেশের
ভাগ্য পরিবর্ত্তনের এই নির্ণায়ক অধ্যায়। আর এই সূত্রেই
উপমহাদেশের তিন অংশেই নেতাজীকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে গত সাত দশকে। সত্য বড়ো কঠিন। বলেছিলেন বিশ্বকবি।
দ্বিতীয়ত,বৃটিশ ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে,সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশভাগের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। এ বিষয়েও সহযোগী রূপে
কাছে টেনে নিল কংগ্রেস ও লীগ নেতৃত্বের প্রধান অংশকে। এই কাজে বাংলা, বিহার, পাঞ্জাবে গোপনে অস্ত্র ও গুণ্ডাবাহিনী সরবরাহ করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
লাগিয়ে দিয়ে, দেশভাগের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, নেতাজী ও আই.এন.এ-র প্রভাবিত অসাম্প্রদায়িক ঐক্যবোধের স্বদেশচেতনাকে
নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হল সহজেই। আর এই পথেই সাম্প্রদায়িকতার
ভিত্তিতে দেশভাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে উভয় পক্ষের টিকিই ইঙ্গমার্কিণ
শক্তির হাতে শতাব্দীব্যাপী বাঁধা রাখা নিশ্চিত করল বৃটিশ প্রশাসন। আজ যা কঠোর বাস্তব। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দেশভাগ। একদিকে চৌদ্দো পুরুষের
ভিটেমাটি,সহায় সম্পদ,জীবিকা ত্যাগ করে সীমানা পেরিয়ে শরণার্থী
শিবিরে আশ্রয়। নতুন জায়গায় নতুন করে শূন্য থেকে জীবন শুরু করার কঠোর
সংগ্রাম। আর একদিকে স্বাধীন দেশের ক্ষমতাতন্ত্রের চাকভাঙ্গা মধু খেতে
দলতন্ত্রের রাজনীতিতে বুদ্ধির শান দেওয়া। এসবের মাঝে কত সহজেই তলিয়ে
গেলেন নেতাজী তার অসাম্প্রদায়িক দেশপ্রেমের দুর্ম্মর ভাবাদর্শ নিয়ে। বিস্মৃতির অন্তরালে
চলে গেল আই.এন.এ। নৌবিদ্রোহের অকথিত কাহিনী, বিশ্বাসঘাতকতার নির্লজ্জ ইতিহাস সব- সবই
ধামা চাপা পড়ে গেল বৃটিশ ও তার ভারতীয় সহযোগীদের সুনিপুণ কৌশলে। এটাই সেদিনের ইতিহাস।..ইঙ্গমার্কিণ..শক্তির..দুরন্ত..সাফল্য। রাজনৈতিক ইতিহাসের
এটাই এক সাধারণ ধর্ম। ক্ষমতার কেন্দ্রে বিজয়ী শক্তির অঙ্গুলি হেলনে
অর্দ্ধসত্যের সাথে অসত্যের জাল বুনে প্রচারিত হয় জনসাধারণকে পরিচালিত করার জনপ্রিয়
ইতিহাস। রামায়ণ মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে এটাই মানব সভ্যতার চরম সত্য। উপমহাদেশের স্বাধীনতার
নামে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিহাসে আজ তাই ব্রাত্য নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস ও তাঁর
বৈপ্লবিক ভাবাদর্শ। স্বাধীন ভারতের সৈন্যবাহিনীতে ঠাঁই হয়না আজাদ হিন্দ ফৌজ ও
নৌবিদ্রোহের দেশপ্রেমী বীর সেনানীদের। ইতিহাসের পাতায় তাদের ত্যাগ, বীরত্ব ও
কৃতিত্বকে ধামাচাপা দেওয়া হয় নিপুণ কৌশলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
অস্পষ্ট হতে থাকে প্রকৃত-ইতিহাসের..অকথিত-কাহিনী।
অথচ সেদিন ইঙ্গমার্কিণ শক্তি হন্যে হয়ে খুঁজে
বেড়াচ্ছে নেতাজীকে। কোথায় অন্তর্ধান করল চন্দ্রবোস। ভারতে ঢোকার সমস্ত পথে
অতন্দ্র প্রহরা। কোনো ভাবেই যেন ভারতে ঢুকতে না পারে নেতাজী। কিন্তু বিশ্বাস নেই
লোকটাকে। নিশ্ছিদ্র প্রহরার জাল কেটে বেড়িয়ে গিয়েছিল লোকটা। বারবার চেষ্টা করেও
তারপর আর তার নাগাল পায়নি,
প্রবল পরাক্রান্ত ইঙ্গমার্কিণ শক্তি। তাই আর ঝুঁকি নিয়ে
বেশিদিন অপেক্ষা করতে পারেনি বৃটিশ মন্ত্রীসভা। ক্ষমতা হস্তান্তরের
জন্যে ১৯৪৮ সালকে স্থির করলেও একবছর আগেই এদেশে তাদের সহযোগীদের হাতে তড়িঘড়ি
ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যেতে হল তাদের। এতটাই প্রবল ছিল সেদিন নেতাজী
ছায়া বৃটিশের আতঙ্কসরূপ..হয়ে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের ছায়া কতটা প্রবল ছিল
সেদিনের বৃটিশ প্রশাসনে,
সেকথা লেখা আছে মাইকেল এডওয়ার্ডসের ‘দ্য লাস্ট ইয়ার্স অফ বৃটিশ
ইণ্ডিয়া’ গ্রন্থে। লেখকের মতে, "The ghost of Subhas Bose; like Hamlet's father; walked
the battlements of the Red Fort; and his suddenly amplified figure over-awed
the conferences that were to lead to independence." এখানেই শেষ নয়। বৃটিশ মুখপাত্র হিউ
টয়ের মতে, "There can be little
doubt that the Indian National Army; not in its unhappy career on the battlefield;
but in its thunderous disintegration; hastened the end
of..British-rule..in..India." ইতিহাসের কি করুণ পরিণতি। যে ভারতবর্ষের
স্বাধীনতার জন্যে নেতাজীর এতবড়ো সংগ্রাম, যে সংগ্রামে তাঁর ডাকে হাজার হাজার
ভারতীয় সামিল হয়েছিলেন, যে সংগ্রামে শতশত আজাদী-সৈন্য শহীদ
হল, যে সংগ্রামের প্রভাব পড়ল বৃটিশ সেনাবাহিনীর সকল বিভাগে
কর্মরত ভারতীয় সৈন্যদের ওপর; সেই স্বাধীনতা এল না। অথচ তার বদলে তথাকথিত
ভারতীয় স্বাধীনতার নামে ক্ষমতার হস্তান্তর হল পেছনের দরজা দিয়ে সেই নেতাজীরই
পুনরাবির্ভাবের আতঙ্কে। আজ এসত্য স্পষ্ট, ১৯৪৫এর ১৮ই আগস্ট সত্যি সত্যিই তাঁর
মৃত্যু হলে বৃটিশ অত তড়িঘড়ি পাততাড়ি গোটাতো না। কিন্তু একথাও সত্য, পাততাড়ি
গোটালেও তারা নেতাজীর স্বপ্নের স্বাধীনতাকে চিরতরে ব্যর্থ করে যেতে সফল হয়েছিল
সেদিন।
====উপসংহার====
দেশবিভাগের লজ্জার মধ্যে দিয়ে এল ১৯৪৭-এর ১৫ই
আগস্ট। সম্পূর্ণ বৃথা গেল নেতাজীর আকুল আবেদন। "I have no doubt that if
India is divided; she will be ruined. I vehemently oppose the Pakistan scheme
for the vivisection of our motherland; our divine motherland shall not be cut
up." অথচ ক্ষমতার মধুলোভী রাজনীতিবিদরা সেদিন দেশভাগের জন্যে বৃটিশের ষড়যন্ত্রে
সামিল হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তারাই স্বাধীন ভারতে
নেতাজী, তাঁর ভাবাদর্শ ও আই.এন.এ-র বীর সেনানীদের সবরকম ভাবে একঘরে করে রাখার
সুবন্দোবস্ত করেছিলেন অনমনীয় দৃঢ়তায়। এবার দেখা যাক স্বাধীন ভারতে
আই.এন.এর সৈন্যরা কি পুরস্কার পেয়েছিল
সেদিন। লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল "Sardar Patel; India's first Home-Minister;
explained to me in 1950 that he had been very careful indeed not to reinstate
any of the officers who had gone over to Subhas Bose's I.N.A. He also saw to it
that they did not thrive in politics."
[Reporting-India:..Taya-Zinkin]
এবার স্বাধীন ভারতের রূপকার নেহরু। "He (Nehru) wanted them to
be kept out of politics and made no hint of any possibility of their being reinstated
in the Indian army before or after the transfer of power." [The Indian
National Army: K.K.GHOSE.]
আর জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী? তিনি আজাদী
সৈনিকদের চাষ-আবাদ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন নিজের নিজের গ্রামে ফিরে গিয়ে। ইতিহাসের পাতায় আজও
তাই একঘরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।
"There is no power on earth that can keep
India enslaved. India shall be free and before long." [Netaji]
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
মাইকেল এডওয়ার্ডস!
হিউ টয়!
পট্টভি সীতারামাইয়া!
ফণিভূষণ আচার্য!
শৈলেশ দে!
লণ্ডন অবজারভার!
টাইমস অফ ইণ্ডিয়া!
নিউইয়র্ক টাইমস!
ডঃ কে.কে ঘোষ!
প্রমুখ!
[শ্রীশুভ্র]

